কোন একদিন

উষ্ণতা ছড়িয়ে সোমবারের ভোরটা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছিল। বৃষ্টিহীন। অরেলিও এসকোবারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী না থাকলেও তিনি এ শহরের দাঁতের ডাক্তার। খুব ভোরে ওঠারও অভ্যাস তাঁর। ঠিক ছ’টায় নিজের অফিস খুলে বসলেন তিনি। কাচের বাক্স থেকে কিছু নকল দাঁত বের করলেন। দাঁতগুলো তখনো প্লাষ্টারের ছাঁচে বসানো। এক হাতের মুঠিতে কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে টেবিলে সাজিয়ে রাখলেন এক এক করে। আকার অনুসারে। তাঁর পরনের ষ্ট্রাইপড শার্টে কোনো কলার ছিল না। শার্টটা গলার কাছে একটা সোনালি বোতাম দিয়ে আটকানো। আড়াআড়ি সাসপেণ্ডারে প্যাণ্টটাও শাসনে বাঁধা। তিনি লম্বা আর কৃশকায় আকৃতির মানুষ। চেহারায় সবসময় একটা নির্বিকার ভাব যেখানে তাঁর আশেপাশে চলতে থাকা ঘটনাবলীর কোনো ছাপ তেমন পড়ত না। বধির কোনো ব্যক্তির চেহারায় যেমন উদাস ভাব থাকতে পারে, তেমনই।

যন্ত্রপাতিগুলো সব টেবিলে গুছিয়ে রাখার পর তিনি চেয়ারে বসলেন। ড্রিল করার যন্ত্রটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে নকল দাঁতগুলো পালিশ করতে শুরু করলেন। তিনিও যন্ত্রের মতোই কাজ করছিলেন। কীসের পর কী করবেন তা নিয়ে কোনো চিন্তা করছেন বলে মনে হচ্ছিল না। শান্তভাবে একে একে করে যাচ্ছিলেন সব। তাঁর দু’টো পা ড্রিল করার যন্ত্রটাকে পাম্প করে যাচ্ছিল। যখন প্রয়োজন হচ্ছিল না এমনকি তখনও পা চলছিল ঠিকই।

সকাল আটটা পর্যন্ত টানা কাজ করে গেলেন তিনি। যন্ত্র নিয়ে যন্ত্রের মতো। আটটার পর কিছুক্ষণের জন্য আকাশ দেখার বিরতি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে চোখে পড়ল পাশের বাড়ির ছাদে দু’টো ধ্যানমগ্ন বাজপাখি অলসভাবে বসে সূর্যের আলোয় নিজেদের শুকিয়ে নিচ্ছে। দুপুরের খাবারের আগেই আবার বৃষ্টি নামবে বলে মনে হল। ভাবতে ভাবতেই আবার কাজে মন দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। এমন সময় তাঁর এগার বছরের ছেলের তীক্ষ্ণ কণ্ঠ মনোযোগের জাল ছিন্ন করে দিল।
“বাবা!”
“বলো?”
“মেয়র সাহেব জানতে চাইছেন তুমি তার দাঁত তুলে দেবে কিনা!”
“বলো যে আমি এখানে নেই।”

একটা স্বর্ণের দাঁত পালিশ করছিলেন তিনি। সামনে ধরে আধবোজা চোখে সেটাকে পরীক্ষা করে দেখলেন। তাঁর ছেলে পাশের ছোট বসার ঘরটা থেকে আবার চেঁচিয়ে উঠল।
“তিনি বলছেন তুমি আছো! তিনি নাকি তোমাকে শুনতে পাচ্ছেন।”

ডাক্তার এসকোবার তবু সমস্ত মনোযোগ দিয়ে দাঁতটাকেই পরীক্ষা করতে থাকলেন। অবশেষে সেটাকে টেবিলের ওপরে রেখে তারপর তিনি বললেন,
“আরো ভালো কথা।”

ড্রিল করার যন্ত্রটা আবার চালু করলেন তিনি। পাশে একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স রাখা ছিল যেটায় ভবিষ্যৎ কাজের জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে রাখা থাকত। সেখান থেকে বেশ কয়েকটা ব্রিজের টুকরো বের করলেন। তারপর সোনালী দাঁতটাকে পালিশ করার দিকে আবার মন দিলেন ডাক্তার।

“বাবা!”
“হুঁ?”
তাঁর অভিব্যক্তি এতটুকুও বদলাল না।
“মেয়র সাহেব বলেছেন তুমি যদি তার দাঁত তুলে না দাও, তাহলে তোমাকে তিনি গুলি করবেন।”
কোনোরকম তাড়াহুড়ো ছাড়াই, অত্যন্ত শান্তভাবে ডাক্তার এসকোবার ড্রিল করার যন্ত্রটা বন্ধ করলেন। চেয়ারের সামনে থেকে ঠেলে সেটা সরিয়ে দিলেন দূরে। টেবিলের নিচের ড্রয়ারটা টেনে পুরো খুললেন। সেখানে অলসভাবে পড়ে আছে একটা রিভলভার।
“ঠিক আছে, তাকে বলো আমাকে যেন এসে গুলি করে।”

চেয়ারটাকে ঘুরিয়ে দরজামুখী হয়ে বসলেন তিনি। ড্রয়ারের কিনারে ডান হাতটা ফেলে রাখা। দরজায় মেয়রকে দেখা গেল একটু পরেই। মুখের বাঁ দিকের দাড়ি সুন্দরভাবে কামানো। কিন্তু ডানদিকের গালে পাঁচদিনের দাড়ি জমে আছে। ফুলে থাকা মুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ব্যথার তীব্রতা। মেয়রের ঘোলা চোখগুলোয় বহু নির্ঘুম রাতের যন্ত্রণা জমে বেপরোয়া এক হতাশা ছেয়ে আছে। একবার তাকিয়েই ডাক্তার আলতো করে ড্রয়ারটা বন্ধ করে দিলেন। নরম স্বরে বললেন,
“বসুন।”
“শুভ সকাল।”
“আপনাকেও।”

যন্ত্রপাতিগুলো গরম পানিতে সেদ্ধ হচ্ছিল। ইত্যবসরে চেয়ারে মাথাটা এলিয়ে শুয়ে পড়ার পর একটু ভালো লাগছিল মেয়রের। তার নিঃশ্বাসে তখনো বরফের শীতলতা।

ডাক্তারের অফিসঘরের চেহারা বেশ দীন। কাঠের একটা পুরানো চেয়ার। ড্রিল করার যন্ত্র। সিরামিকের বোতল সাজানো একটা কাচের আলমারি। চেয়ারের উল্টোদিকের জানালায় কাপড়ের পর্দা ঝুলছে। ডাক্তারকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। সাথে সাথেই মেয়র সাহেব হাত-পা শক্ত করে মুখটা হাঁ করলেন।

অরেলিও এসকোবার মেয়রের মুখটা ঘুরিয়ে বাতির দিকে ধরলেন। সংক্রমিত দাঁতটাকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে তিনি সাবধানে আবার হাঁ করা মুখটা বন্ধ করে দিলেন।
“অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই তুলতে হবে।”
“কেন?”
“কারণ একটা ফোড়া আছে আপনার।”

মেয়র সরাসরি ডাক্তারের চোখের দিকে তাকালেন। হাসি দেবার চেষ্টা করে বললেন,
“ঠিক আছে।”
ডাক্তারের শীতল দৃষ্টি সেই হাসি ফেরত পাঠাল না। বরং জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ভেজানো ছোট গামলাটা কাজের টেবিলে নিয়ে এলেন তিনি। কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়া ধীরে এক জোড়া ঠাণ্ডা চিমটা দিয়ে যন্ত্রপাতিগুলো পানি থেকে এক এক করে তুললেন। জুতোর ডগা দিয়ে থুকদানিটা এগিয়ে দিয়ে বেসিনে নিজের হাত ধুতে গেলেন। এত কিছু করার সময় একবারও মেয়রের দিকে ফিরে তাকান নি ডাক্তার। কিন্তু মেয়র তার নজর ক্ষণিকের জন্যও ডাক্তারের উপর থেকে সরালেন না।

নিচের দিকের একটা আক্কেল দাঁতই ছিল সব যন্ত্রণার হোতা। দু’পা ছড়িয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গরম ছোট সাঁড়াশি দিয়ে দাঁতটাকে ভালোভাবে আঁকড়ে ধরলেন ডাক্তার। মেয়র দু’হাতে চেয়ারের দুই হাতল শক্ত করে চেপে ধরলেন। দু’পা মেঝেতে গেঁথে দিলেন সর্বশক্তিতে। তার মনে হচ্ছিল শীতল এক শূন্যতা তার ভেতরে কিডনি পর্যন্ত ছেয়ে যাচ্ছে। তবুও তিনি টুঁ শব্দ করলেন না। ডাক্তার এসকোবারের কবজিটাই নড়ে উঠল শুধু। কণ্ঠে কোনো বিদ্বেষ নয়, বরং তিক্ত এক কোমলতা নিয়ে ডাক্তার বললেন,
“আমাদের বিশজন নিহতের প্রাণের মূল্য এবার চুকাবেন আপনি।”

নিজের চোয়ালে হাড় আর মাংসের টানাটানির জান্তব ঘর্ষণ অনুভব করলেন মেয়র। চোখদু’টো আপনাআপনি পানিতে ভরে উঠল। কিন্তু দাঁতটা শেকড় থেকে উঠে আসা পর্যন্ত তিনি নিঃশ্বাসটাও নিলেন না। তারপর চোখ ভর্তি অশ্রু ঠেলে ঝাপসা দেখতে পেলেন সেটাকে। এ ক’দিনের ব্যথার প্রচণ্ডতার কাছে খাপছাড়া দেখাচ্ছিল ফ্যাকাশে হলুদ দাঁতটাকে। এইটুকু বস্তুর জন্য গত পাঁচ-পাঁচটি রাত নির্ঘুম অত্যাচারে কেটেছে তা বিশ্বাস করতে কষ্টই হচ্ছিল মেয়রের।

থুকদানির ওপরে উপুড় হয়ে, ঘামতে ঘামতে আর হাঁপাতে হাঁপাতে জামার বোতাম খুললেন মেয়র। রুমাল বের করার জন্য পকেট হাতড়াতে যাচ্ছিলেন তিনি। ডাক্তার তার হাতে একটা পরিষ্কার কাপড় ধরিয়ে দিলেন।
“চোখের পানি মুছে নিন।”

মেয়র তাই করলেন। বাঁশপাতার মতো কাঁপছিলেন তিনি। ডাক্তার এসকোবার হাত ধুতে বেসিনের দিকে গেলেন। মেয়র চেয়ারে শুয়ে ঘরের ক্ষয়ে যাওয়া ছাদের দিকে তাকিয়ে স্থির হবার চেষ্টা করছিলেন। একটা ময়লা মাকড়শার জাল চোখে পড়ল তার। মাকড়শার ডিম আর মরা পোকামাকড় আটকে আছে তাতে। ভেজা হাত মুছতে মুছতে ডাক্তার ফিরে এলেন।
“বাড়ি গিয়ে শুয়ে থাকুন। আর লবণ পানি দিয়ে গার্গল করবেন।”
মেয়র উঠে দাঁড়িয়ে মিলিটারি কায়দায় একটা সালাম দিয়ে বিদায় জানালেন। পা টেনে দরজার দিকে হেঁটে চললেন তিনি। জামার বোতাম তখনো খোলা। কোনোরকমে বললেন,
“বিল পাঠিয়ে দেবেন।”
“শোধ করবে কে? আপনি, নাকি এই শহরটা?”
মেয়র ফিরে তাকালেন না। দরজাটা বন্ধ করে পর্দার ফাঁক দিয়ে বললেন,
“ওই একই কথা!”


লেখক

শিমন শারমিন
গল্পকার, অনুবাদক


error: Content is protected !!