পথের হলো শুরু


অনেকটা সময় পার হইবার পরেও লোকটা আর ফিরলো না। লোকটা কি আমাদের সত্যিই পানিতে ডুবায়া মারবে নাকি, মনে হইলো একবার! মরণে এতো ভয় ক্যান? ভয়েই কি আমার মুত পাইলো? আম্মারে কইলাম– ‘আম্মা, মুতমো’।


দুই টাকার পাঁচটা চকচকে নতুন নোট বাড়ায়া দিল বাসকাউন্টারের লোকটা। নোটগুলা ছুঁইড়া দিয়া আমি আরো চিৎকার কইরা কাঁদতে লাগলাম। আমারে যতই আশ্বাস দেওয়া হইতে লাগলো বড় বড় বাসগুলা, ট্রাকগুলা, গাড়িগুলা ছোট ছোট মানুষগুলারে নিয়া আরেকটা বড় গাড়িতে ঢুইকা যাইবো; যে গাড়িটা পানির উপর ভাসতে পারে, পানির ভেতর চাক্কা ঘুরায়া নদী পাড়ি দিতে পারে, আমার ভয় ততই বাড়তে লাগলো। আমার মনে হইতো লাগলো, এরা কোন গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইছে। এরা আমারে, আম্মারে আর ভাইয়ারে পানিতে ডুবায়া মারতে চাইতাছে।

প্রথম পথের স্মৃতি তো বটেই, স্মৃতিতে যতটা ছোটবেলায় যাওয়া যায় ততটুকু গিয়া এই স্মৃতিটাই প্রথম মনে পড়ে। স্মৃতিতে আরো কিছুটা পিছনে যাওয়া যায় অবশ্য। কিন্তু সেইটা ফেরি দিয়া কিভাবে নদী পাড়ি দেওয়া যায় বুঝতে না পারার মতোই ঝাপসা। যেমন এক দুপুরে আমারে ভাতঘুম ঘুমানোর তাড়া দেওয়ার বদলে আম্মারে কাপড় গুছানোতে ব্যস্ত হইতে দেখা গেল। একটা ট্রাংকে গুছানো কাপড় ঢুকানো হইলো আর আমারে নতুন কাপড়-টাপড় পড়ানো হইলো। রিকশায় কইরা আমরা শহরের দিকে যাইতে লাগলাম। এইরকম যাওয়ার দৃশ্যে মনে পড়ে– রিকশা কইরা প্রায়ই আমরা লক্ষ্মীগঞ্জ বাজারে যাইতাম। অনেকক্ষণ পরে একটা বাস আইসা থামতো। আম্মা আমারে এক হাতে কোলে নিয়া আরেক হাতে কাপড়ের ঝুড়ি ধইরা বাসে উঠতেন। বাস থেকে নামার পরেই দীর্ঘদেহী এক লোকেরে দাঁড়ায়া থাকতে দেখতাম। আম্মার কোল থাইকা কাইড়া নিয়া যে আমারে কোলে নিত। আবার আমরা রিকশায় উঠতাম। পথে যাইতে যাইতে অনেকগুলা তালগাছ দেখা যাইতো। যাদের আগায় ঝুইলা থাকতো পাখির বাসা। আমরা যেইখানে থামতাম সেইখানে শাকসব্জির ক্ষেত। ক্ষেতের আলপথ ধইরা অল্প হাঁটলেই বিবিধ নারীগণের এক কোল থেকে অন্য কোল, নানা প্রকার পিঠা, ভালো ভালো খাবার, পুকুরে মাছ ধরা, কারো কারো ঘাড়ে চেপে ফসলের মাঠে ঘোরাঘুরি। সেইখানে আম্মারে অনেকেই বুবু বইলা ডাকতো, মুরব্বীরা ছেড়ি বইলা। যারা ঘাড়ে চড়ায়া ফসলের মাঠ ঘুরাইতো তারা আমারে মামা বইলা ডাকতো।

আমাদের রিকশা সেদিন লক্ষ্মীগঞ্জ বাজারের দিকে গেল না। আমাদের রিকশা যেইখানে থামল, সেইটাকে ঈশ্বরগঞ্জ নামে ডাকতে শোনা গেল। আমরা বাসে উঠলাম ঠিকই, কিন্তু সেই বাস থামার নাম নাই। অইদিকে সন্ধ্যা হয়ে যাইতেছিল আর চারিদিক অন্ধকার ঝাঁকায়া নামতেছিল। আমি একবার ভাইয়ার কোলে তো আরেকবার আম্মার কোলে বইসা আছি। বাস কিছুক্ষণ পর পর থামতাছে। কেউ কেউ নাইমা যাইতাছে, আবার কেউ কেউ উঠতাছে বাসে। কিন্তু আমাদের নামা হইতেছে না। আমি আম্মারে জিগাইলাম, আমরা নামতাছি না ক্যান? আম্মা কোন উত্তর দেয় না। ভাইয়ার দিকে তাকাইলে ভাইয়া বলতে থাকে, ‘আমরা রূপকথার দেশে যাইতাছি। অইখানে যাইতে হইলে সারারাত বাসে থাকতে হয়, বাসে ঘুমাইতে হয়, বাসেই খাইতে হয়’। রূপকথার যে সব গল্প আম্মা আমারে শুনাইছে ততদিনে, সেইসব গল্পে পঙ্খীরাজের কথা আছে, হাতি-ঘোড়ার কথা আছে। ‘আমরা ক্যান পঙ্খীরাজে যাইতেছি না? ক্যান হাতি-ঘোড়ায় চইড়া যাইতেছি না?’ –ভাইয়ারে জিজ্ঞেস করার আগেই ঘুমায়া পড়লাম আমি।

আমার ঘুম ভাঙল মাঝরাইতে। বাস থাইকা আমরা নামলাম। বাসের প্যাঁপোঁ চারদিকে। মানুষে গিজগিজ। আমরা কোন একটা হোটেলে ঢুকলাম। আর কম দামের মাছ বেশি দাম দিয়া কিনলাম। আমরা ভাত খায়া বাসকাউন্টারের দিকে আগায়া গেলাম। কিন্তু জায়গাটা আমি চিনতে পারলাম না। অইটা কি পাটুরিয়া? অইটা কি আরিচা? অইটা কি মাওয়া? আমার তা আর কোনদিন জানা হইলো না। যদি জানতে চাইতাম কিংবা জানতাম আমার কি প্রথম পথের স্মৃতিতে দাগ পইড়া যাইতো নাকি! স্মৃতি এতই অমূল্য যে অইখানে তো কোন দাগ ফেলানো যাইবো না, ভাবি।

বাসকাউন্টারে ঢুইকাই জানতে পারলাম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নদীটা আমাদের পাড়ি দিতে হইবো। নদী পার হইতে হইবে শুইনাই আমি ভয় পায়া গেলাম। ভাইয়া তো আমারে এটা বলে নাই যে রূপকথার দেশে যাইতে হইলে নদীও পাড়ি দিতে হইবো। আমার তখনই মনে হইতে থাকলো, নদীতে ডুইবা মইরা যাইতে পারি আমরা। তখনই আমার কান্নাকাটি শুরু হয়া গেল। আম্মা, ভাইয়া, বাসকাউন্টারের লোকটা ও আরো আরো লোকেরা আমারে কিছুতেই কিছু বুঝাইতে পারলো না। দুই টাকার অই পাঁচটা চকচকে নোট ছুঁইড়া দেওয়ার পর বাসকাউন্টারের লোকটা আমারে কোলে তুইলা নিল। আর কইলো, ‘কিচ্ছু হইব না, খোকা। চলো, আমিও তোমাদের লগে যাইতাছি’।

লোকটা আমারে কোলে নিয়া বাসে উঠলো। আম্মা ও ভাইয়া পিছে পিছে। লোকটা আমারে সিটে বসায়া দিল। আম্মাও বসলো। ভাইয়া দাঁড়ায়া থাকল। ‘তোমার জন্য চকলেট নিয়া আসি’– এই কথা কয়া লোকটা চইলা গেল। অনেকটা সময় পার হইবার পরেও লোকটা আর ফিরলো না। লোকটা কি আমাদের সত্যিই পানিতে ডুবায়া মারবে নাকি, মনে হইলো একবার! মরণে এতো ভয় ক্যান? ভয়েই কি আমার মুত পাইলো? আম্মারে কইলাম– ‘আম্মা, মুতমো’।

বাসের সুপারভাইজার আমারে কোলে নিয়া বাস থাইকা নামল। বাস থাইকা নাইমাই দেখি আরো আরো বাসের লগে আমাদের বাস একটা খোলা বাসের ভিতরে দাঁড়ায়া আছে। চারদিকে পানি আর পানি। বিকট শব্দ হইতে হইতে বড় ও খোলা বাসটা পানির উপর দিয়া ভাইসা ভাইসা যাইতাছে। সুপারভাইজার আমারে বড় ও খোলা বাসটার কিনারে নিয়া গেল। কোল থাইকা নামাইল। আমি সেইখানে মুততে চাইলাম না। সুপারভাইজার কইতে লাগল, ‘ছোট পোলাপাইনের মুতে কোন ছচি নাই, মুতে নদীরে ভাসায়া দাও’।

রাতের বুক চিড়ে ফেরির ছুটে চলা

“আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে”
আম্মার মুখে শোনা এই ছড়ার সাথে আমাদের কাঁচামাটিয়া নদীটারে মিলায়া দেখা, নদীর ব্যাপারে এইটুকুই জানাশোনা আমার। সেই জানাশোনায় বড় ছেদ পড়লো। মুততে মুততে আমি তন্ময় হয়া দেখলাম পদ্মারে। আমাদের নিয়া নদীতে ভাসা বাসের মতো আরো আরো বাস তখন নদীর বুকে। দূরে লাইট ফালায়া সেইগুলা যখন ভাসতে লাগল, সেই লাইটের আলোয় দেখলাম জলের নাচন। নাচতে নাচতে অই জল ধীরে ধীরে কেমন কইরা যেন আমার ভেতরে ঢুইকা যাইতে লাগল। আর আমি পাইতে থাকলাম নদীর জীবন। যে জীবন একবার পাইলে তারে ছাইড়া দেওয়া সহজ নয়।

আমার ভিতরে ঢুইকা যাওয়া নদীর কলকল ভোর নামায়া আনল যে কখন আমি টের পাইলাম না। চোখ মেইলা দেখি আমাদের বাস তখনও ছুটতাছে। দুই ধারে বড় বড় রেইন্ট্রি গাছের সারি। সেই সারি দেইখা আমাদের বাড়ির বড় রেইন্ট্রি গাছটার কথা মনে পইড়া যাইতে লাগল। সেই গাছটারে ফালায়া রাইখা কোন সে রূপকথার দেশে যাইতাছি কে জানে! আমার রেইন্ট্রি গাছটার লাইগা মন কেমন করতাছিল আর তখনই সুপারভাইজার ‘নাভারণ’ বইলা ডাকতে লাগল। বাস থামল। আম্মা সিট ছাইড়া উঠল, ভাইয়াও। বাস থাইকা নাইমা গেলাম আমরা। তিনটা রাস্তার মাথা এইখানে, ছোট্ট একটা বাজার। তিন রাস্তার এক কোণায় একটা দীর্ঘদেহী রেইন্ট্রি গাছ। গাছের তলায় ভ্যানের জটলা। একটা ভ্যানে চইড়া বসলাম আমরা। রিকশার বদলে এইখানে যে ভ্যানে চড়তে হয় এইটা ভাইবা আমার অবাক লাগল।

ভ্যানের মাঝখানে বইসা আছি আমি। সামনে একপাশে আম্মা আর অন্যপাশে ভাইয়া। আমি দুই হাতে আম্মা আর ভাইয়ার দুই বাহু ধইরা রাখছি। রিকশা চালাইবার মতো ভ্যান চালাইতে লাগল ভ্যানওয়ালা। বাজার পার হয়া মিনিট দুয়েক পার হইতে না হইতেই রেললাইন। রেললাইন পার হয়া ভ্যান আগাইতে লাগল। মিনিট পাঁচেক আগাইতে না আগাইতেই একটা শাদা-লাল-সবুজ ঘরের সামনে ভ্যান থামল। যার চারপাশে চোখ কাইড়া নেওয়ার মত ফুলের বাগান। ঘরের ভিতর থাইকা বন্দুক কাঁধে এক খাকি পোশাক পরা লোক বাহির হইল। আম্মারে সে সালাম দিল আর ভাইয়ার সাথে কী জানি কী কথা কয়া আমাদের অই ঘরে বসতে দিল। অই ঘরে বইসা আছি আর খাকি পোশাক পরা বন্দুক হাতের লোকটা আমারে নানান কিছু জিগাইতে লাগল। অত প্রশ্নের উত্তর আমি জানি নাকি! জানলেও চুপচাপই রইলাম আর বন্দুকটার দিকে বারবার তাকাইতে লাগলাম। রূপকথার দেশে বন্দুকওয়ালা পাহারাদার থাকে নাকি; ভাবলাম, একবার ভাইয়ারে জিগাই। তার আগেই লোকটা জাদুমন্ত্রের মতো বিস্কুটের প্যাকেট বাহির কইরা দিল। আমি তা নিতে অস্বীকার জানাইলে লোকটা আম্মার দিকে তাকাইল। আম্মা নেওয়ার ইশারা দিলে আমি ইতস্তত হাত বাড়ায়া দিলাম। আর তখনি খাকি পোশাক পরা লোকটা বসা থাইকা দাঁড়ায়া গেল এবং স্কুলে পিটি করার সময়ে সাবধান হওয়ার যে ভঙ্গিমা সেই ভঙ্গিমা করল। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি ভ্যাবাচ্যাকা খায়া ঘাড় ঘুরাইলাম। ঘাড় ঘুরাইতেই দেখি আব্বা। কিছু বোঝার আগেই এক ঝটকায় আব্বা আমারে কোলে তুইলা নিল।

আব্বা আমারে নামায়া দিলেন পথে। যে পথে পা ফেলতেই আমার পথের হলো শুরু।

রূপকথার দেশে যে আব্বা থাকেন তা আমার জানা ছিল না। আমি জানতাম আব্বা দূরের একটা দেশে থাকে। অইখানে আব্বা বন্দুক নিয়া খেলা করে। আর মাঝেমধ্যে আমাদের কাছে বেড়াইতে যায়। এইবারই ব্যতিক্রম হইল যেন। এইবারই আমরা আসলাম আব্বার কাছে। আব্বা আমারে কোলে নিয়া শাদা-লাল-সবুজ রঙয়ের ঘর থিকা বাহির হইল। সেই ঘর থিকা একটা সুন্দর ও সুসজ্জিত পথ কোথায় যে চইলা গেছে! যার দুই দিকে এতো এতো গাছ আর ফুল যে আমি লাফাইয়া উঠলাম। আব্বা আমারে নামায়া দিলেন পথে। যে পথে পা ফেলতেই আমার পথের হলো শুরু।


জহির রিপন
কবি ও পরিব্রাজক


error: Content is protected !!