মেডিটেশন কোন বাণিজ্যিক পণ্য নয়


বীণা, ভারী সুরের বাঁশি ইত্যাদি গম্ভীর গমকযুক্ত স্থির সুরযন্ত্র ধ্যানে প্রবেশের আগে শুনলে একপ্রকার স্থিরতা আসে মস্তিষ্কে। ধ্যানের পরে শুনলে আরেক প্রকার স্থিরতা আসে। আর গুরু বয়ান বাদ দিয়ে শুধু সংগীতের মাধ্যমে যে তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘোরের মধ্যে ব্রেন আরাম করে, সেটিকে বলে মিউজিক থেরাপি। এই মিউজিক থেরাপিকালে নিঃসঙ্গ থাকাই কর্তব্য। ভিডিও গুরুর বয়ানের সাথে তাই তানপুরার প্রয়োজনীয়তা নেই। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, আপনাকে উচ্চ মার্গে প্রতারিত করার জন্য তানপুরার আওয়াজ টেকনিক্যালি ব্যবহার করা হচ্ছে।


এটি একপ্রকার গুরুমুখী গুরুবিদ্যা। ভয়ঙ্কর বিদ্যাও বলা চলে। কারণ এটি মস্তিষ্ককেন্দ্রিক চর্চা। দমে দমে এর আধ্যাত্মিকতা চিন্তাপ্রক্রিয়ায় প্রতিস্থাপিত করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে একদল মেডিটেশন ব্যবসায়ীশ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে, যাদের কাণ্ড-কারখানা দেখলে আসন্ন ভয়াবহ দিনের জন্য আশঙ্কাও জাগছে। তাই এ প্রসঙ্গে কিছু জরুরি সমাজচেতনা জাগানো জরুরি। কতিপয় মেডিটেশন ব্যবসায়ী কোম্পানি/এজেন্সি খুলে, আর্বান-টাকাওয়ালা শ্রেণি সমাজের লোকজন ধরে ধরে সদস্যপত্র বিলি করে মোটা অঙ্কের কোর্স ফিস নিয়ে মূলত মানবসেবার নামে প্রতারণা করছে। সে সম্পর্কে সচেতন হতে হলে মেডিটেশন আদৌ কী জিনিস সে বিষয়ে প্রাথমিক ও সাধারণ কিছু ধারণা থাকা জরুরি সবার জন্য।

মেডিটেশন একটি বিদেশী শব্দ। বর্তমান জামানায় এটি একটি কর্পোরেট শব্দে পরিণত হয়েছে বলা যায়। এর আদি ভারতীয় শব্দ ‘যোগ’ যার অর্থ ‘ধ্যানবিদ্যা’। বাংলাদেশে কয়েকবছর ধরে মেডিটেশন চর্চার হিড়িক দেখা যাচ্ছে। শিক্ষাপদ্ধতি হলো, একজন গুরু ভিডিও মারফত ধ্যান শেখাচ্ছেন। বাণী দিচ্ছেন। অলৌকিক শক্তির অধিকারী এসব গুরু বলেও দিচ্ছেন আপনি এখন ব্রেইনের অমুক স্তরে আছেন। এখন আপনি তমুক স্তরে উঠছেন উঠছেন। শ্বাস নিচ্ছেন, শ্বাস ছাড়ছেন। তাতে আবার তানপুরাও বাজছে! গুরু যেন জাদুকরও! শিষ্যের মগজ কোন লেভেলে আছে জাদু দিয়ে তিনি দেখতে পারেন! এখন শিষ্য সেই লেভেল বুঝুক না বুঝুক গুরু বলেছে, শিষ্যও পৌঁছে গেছে- ব্যাপারটা সেরকমই দাঁড়ায় বৈকি!

প্রথম কথা হলো, প্রকৃত পরম্পরাভিত্তিক কোন ধ্যানবিদ্যার গুরু কখনোই লোকালয়ে এসে কর্পোরেট জগতে প্রবেশ করে মানবসেবার নামে এরকম এনজিও খুলে ব্যবসা করতে পারে না। সেটা যোগীসমাজে হতে পারেও না। কারণ এটি কঠোরপন্থার গুরুমুখী বিদ্যা যতটা, ঠিক ততটাই চিন্তক-পরম্পরার বিদ্যা। এমনকি এই বিদ্যাকে গুরু মারা বিদ্যা হিসেবেও মানা হয়। কারণ বিদ্যা সম্পন্নকালে গুরু প্রদর্শিত পথ ধরে গুরুরই চিন্তাতত্ত্ব ভেদ করে শিষ্যের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়, নতুন থিওরি দিয়ে গুরুকে ভুল প্রমাণ করা। নয়তো গুরুকেই নতুনরূপে প্রতিষ্ঠা করতে নতুন থিওরির জন্ম দেওয়া। একেই বলে প্রকৃত প্রাকৃত ধ্যানবিদ্যা, ইংরেজিতে মেডিটেশন। তাই এই মস্তিষ্কচর্চাকেন্দ্রিক বিদ্যা থেকেই মনোবিজ্ঞান-দর্শন- মেটাফিজিক্স-জ্যাোতির্বিদ্যা-গণিত-স্বাস্থ্যবিদ্যা-শরীরবিদ্যা-পদার্থবিদ্যা-চিকিৎসাবিদ্যা-সংগীত-অর্থবিদ্যা-রাষ্ট্রবিদ্যা ইত্যাদি বিদ্যার বিকাশ ঘটেছে।

ধ্যানবিদ্যা চর্চার একপর্যায়ে আহার, নিদ্রা এমনকি জল সেবনেও কঠোর নিয়মতান্ত্রিকতা চলে আসে। শরীরের সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও রগ-শিরা (ধমনীপথ) গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ জাতীয় ভেষজ তৈল মর্দন করানো হয় শরীরে। কঠোর শারীরিক ব্যায়াম, আসনশিক্ষা ও যোগাসন পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের চিন্তাপ্রক্রিয়ার কয়েকপ্রকার ধাপ পার করতে হয়। আর এই ধাপগুলো পার করার আগে ইড়া (বাম নাকে ছিদ্র/ গঙ্গা), পিঙ্গলা (ডান নাকের ছিদ্র/যমুনা) ও সুষুম্নাকাণ্ড (নাকের দুই ছিদ্র/ আয়ু) ব্যায়াম ও যোগাসন সাধনায় শরীরের সকল প্রকোষ্ঠের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে হয় । শুরতেই পদ্মাসন গেড়ে নাক চেপে দম চেপে গণিত কষতে হবে এমন কোন নিয়ম নেই। শিষ্যের মতিগতি ও স্বাস্থ্য ভেদে এই চর্চার সূত্র রয়েছে। গুরু স্বয়ং শিষ্যের নিকটস্থ হয়ে স্বাস্থ্যসংগতি অবলোকন করবেন, অতঃপর ইড়া পিঙ্গলার গতি পর্যবেক্ষণ করবেন, শিষ্যের ব্যক্তিত্ব ও মতিগতিও বেশ কিছুদিন বোঝার চেষ্টা করবেন। গুরু নতুন শিষ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল হলে তবেই প্রাথমিক শিক্ষা দিতে শুরু করবেন।

এক ইড়া নাড়তন্ত্রেই রয়েছে চোদ্দগুষ্টি। এই চোদ্দগুষ্টির সবগুলোকেই জাগ্রত করতে সুস্থ-স্বাভাবিক ওজনসম্পন্ন দেহের জন্য লাগে কমপক্ষে আড়াই থেকে পাঁচ মাস পর্যন্ত। আরও তো পিঙ্গলা ও সুষুম্না বাকী! এসব সাধনাতেও একই সময় লাগে। প্রতিটিরই জ্ঞাতি-গুষ্টি জাগ্রত করতে হবে। আরও রয়েছে সপ্তকুণ্ডলীর জাগরণ। এগুলো যদিও বহু পরের সাধনা। এরও গভীরে রয়েছে গুপ্ত সাধনার আরও বেশ কয়েক পর্যায় ও বিভিন্ন পর্ব। এমনকি নাড় জাগানোর আকুপ্রেসার চিকিৎসা পদ্ধতিও এই বিদ্যারই অবদান। যৌনাঙ্গ থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত রয়েছে সপ্তকুণ্ডলির বিভিন্ন ধাপ। সেগুলো ধারাবাহিকভাবে ভেদ না করা পর্যন্ত আপনার মস্তিষ্কের ধ্যানকর্ম-প্রক্রিয়া কেবল প্রাণায়াম ও আসন চর্চা করলেও শুরু হবে না। এই কুণ্ডলি জাগাতেও অনেক সময় আকুপ্রেসার করতে হয় শরীরে। অতো সহজ বিষয় নয় বলেই এই ধ্যানবিদ্যা আয়ত্ত করতে গৃহত্যাগী হতে হয়। ঘর সংসার, ব্যবসায়, অফিস সামলে যারা আয়ত্ত করতে চান, তাদের জন্য তো এটি নয়ই। গুরু স্বয়ং কোন একপর্যায়ে শিষ্যের ধরণ বুঝে তাকে সংসারে ফেরত পাঠিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গৃহিযোগীর দায়িত্ব দিতেও পারেন। কিন্তু সেই সময় সেই শিষ্য সমাজের কারো সাথেই গুরুবাক্য, এমনকি কোন সাধন প্রক্রিয়ার কোন কথাই বিনিময় করতে পারবে না। আবার গুরু-শিষ্য যোগাযোগ অবিচ্ছিন্ন থাকবে। এমনিতে স্বাভাবিক কিছু প্রাণায়াম করলে সাধারণ মানুষের কিছু শারীরিক জটিলতা কমে যায়। ক্লান্তি কমে, কাশি ও এজমায় উপকার হয়, বুকের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত হয়, স্বতঃস্ফূর্ততা বাড়ে আর তাতে ফুরফুরে আমেজ মনে প্রবেশ করে। নিয়মিত দম-ব্যায়ামের ফলে কমপক্ষে দশ পার্সেন্ট নেগেটিভ এনার্জির ক্ষয় হয় রোজ। যার ফলে মানবিক সম্পর্ক ও কাজেকর্মে স্থিতি ও মনোযোগ ফিরে আসে। কিন্তু তার মানে এই নয় আপনি এতেই মেডিটেশন কোর্স কমপ্লিট করে ফেলেছেন। আগেই বলেছি এটি কোন সহজবিদ্যা নয়। এটি একপ্রকার কলা ও বিদ্যা। মনে রাখতে হবে যোগ বা ধ্যানবিদ্যা মহাবিদ্যা হিসেবেও বিবেচিত হয়ে আসছে সহস্র বছর ধরে।

এখন ভাবুন, যারা প্রকৃতই মেডিটেশন শিক্ষার্থী, তাদের সারাদিন প্রহর গুণে কত হাজারবার এই ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্নার সাথে আত্মিক ও শারীরিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে দমচর্চা করতে হয়! এসব কঠোর চর্চায় এক পর্যায়ে শরীর নিস্তেজ হতে বাধ্যও হয়। তাই সাংসারি কাজকর্মে দৌড়ঝাঁপময় জীবনের ফাঁকফোকড়ে ধ্যানবিদ্যা চর্চা একপ্রকার নিষিদ্ধ। কারণ তাতে মস্তিষ্ক ও অঙ্গেরও ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটিই বিশ্বের একমাত্র এমন এক আদিম চর্চা যাতে আপনার মস্তিষ্ক কখন কতক্ষণের জন্য ঘুমোতে পারে আপনার গুরু তো দূরকি বাত, আপনি নিজেও জানবেন না। এমনও হতে পারে, প্রাণায়ামাদি ও আসনাদির জন্য আপনার শ্বাসতন্ত্র ও মস্তিষ্কের জন্য টানা একদিন বা দুইদিন ঘুম প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু মেডিটেশন ক্লাস শেষ করে আপনাকে গাড়িতে উঠতে হবে, বাসায় বা অফিসে যেতে হবে। সংসারে এটা সেটা কাজ করতে হবে। এসবের জন্য আপনার শারীরিক রক্তচাপ আর আপনার বাস্তবতার জন্য মানসিকচাপ এক অবস্থানে থাকতে পারছে না। ফলে আপনার অজান্তেই সুক্ষ্ম গোলযোগের মধ্যে পড়লো আপনার শরীর। আপনি হয়তো টেরই পেলেন না কিছু, কিন্তু আপনার স্নায়ুবিষও ঝরতে পারে তাতে। যা খুবই ক্ষতিকর। অনেক মানুষ এমনিতেও প্রাকৃতিকভাবে কর্মক্ষম ও শক্তিশালী হয়ে থাকে। কিছু মানুষের জীবন অভিজ্ঞতা ও জীবন দেখার নানারকম বৈচিত্র্যময়তার ফলে তাদের ব্রেন খুব সহজে গোলযোগ উতরে যেতে পারে। কিন্তু কোন না কোন একদিন তাদের ক্ষেত্রেও আচমকা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। আবার পাঁচ মিনিটেও একঘণ্টা সমান ঘুমের অবকাশ নিতে পারে অনেকে। কিন্তু সবাই পারে, তা নয়।

কাহ্ন পা-এঁর পদটি চর্যার ১১ নম্বর পদ। আর এই পদটি নাড়তন্ত্র জাগরণের পদ। এখানে মা, শাশুড়ি, শালি ইঙ্গিতপ্ধান শব্দ – যা দেহ নগরীর বিভিন্ন তন্ত্র যেগুলোকে সাধন করতে আলিকালি (ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না) বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করে তোলে পদকর্তাকে। পদটি শুরুই হয়েছে সেই সাধনার নিগূঢ় কথা দিয়ে, ‘নাড়ি শক্তি দিঅ ধরিআ খাটে। অনহা ডমরু বাজই বীর নাটে’, অর্থাৎ নাড়ের শক্তিস্থলকে (নাভি) শক্ত করে খিচে ধরো, তাতে হৃদপিণ্ড (অনাহত ডমরু) বীরত্বের সাথে বাজবে।

ধ্যানবিদ্যা এমনই এক প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা, যাতে পৃথিবীর কোন আধুনিক শিক্ষা প্রযুক্তি খাটে না। কেননা আজ পর্যন্ত আধুনিক মানব শরীরের একটা অঙ্গও বাড়েনি, কোন রক্তবাহী শিরারও কমতি ঘটেনি। মগজেও নতুন কোন প্রকোষ্ঠ গজায়নি। লাখ লাখ বছর আগের নিয়ান্ডারথাল আর হাজার হাজার বছর আগের হোমোস্যাপিয়েন্সে আকৃতি গঠনে তারতম্য ঘটলেও সহস্র বছর ধরে একই শারীরিক বৈশিষ্ট্য সত্তায় টিকে আছে আধুনিক মানুষের দৈহিক কৃষ্টি। গুহাকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা থেকেই এই ধ্যানবিদ্যার বিকাশ নির্জনে ঘটে আসছে। বস্ত্রবুনন আবিষ্কারের পূর্বেই যে মস্তিষ্কে ক্রিয়া করতে শিখেছে প্রাচীন মানুষ তার বড় উদাহরণ হলো শিবমূর্তি। পশুর চামড়া পরিহিত শিব ধ্যান বা যোগিবিদ্যার প্রাক বৌদ্ধিক ও প্রাক মহাযানী প্রতীক। তাই প্রাচীন কাল থেকেই ধ্যানবিদ্যা শিক্ষার প্রথম নিয়ম, নিজেকে সকলপ্রকার সামাজিকতা থেকে দূরে সরিয়ে নিতে হবে শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়েই। যোগ বা মেডিটেশনের জন্য আদর্শ তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে তিব্বত। বহুকাল পৃথিবীর সভ্য দেশগুলো জানতোই না তিব্বতেও প্রাসাদ আছে। সেই প্রাসাদে রাজা থাকেন না। পরম্পরায় বোধিসত্ত্বা জাগ্রত হওয়া কেবল মহাগুরু বা লামার জন্য নির্মিত হয়েছে সেখানকার প্রাসাদ। এই প্রাসাদ কিন্তু আরাম আয়েসরও প্রাসাদ নয়। পৃথিবীর ছাদ অভিহিত তিব্বতের গুহা জুড়ে বিচিত্র ঘরানার যোগি থাকেন নিভৃতে। বর্তমান ভারত ও বাংলাদেশেরও চিত্র এমন শান্ত সুনিবিড় যোগিধ্যানী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সামন্ততান্ত্রিক ও রাজনৈতিক, ধর্মীয় উপনিবেশ ও আক্রমণের চোটে প্রাণ বাঁচাতে এখান থেকেই বড় বড় যোগসাধকরা তিব্বতে চলে গিয়েছিলেন এককালে। সেখানেই যোগি পরম্পরা টিকিয়ে রেখেছেন। তাই লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা তিব্বত সম্পর্কে বহুকাল গোটা পৃথিবী অনবগত ছিল। মনে রাখতে হবে, এসব গুহ্য সাধনায় উত্তীর্ণ গুরুরা কখনোই শিষ্য খুঁজতে লোকসমাজ হাতড়ে বেড়ায় না। বরং গুরুর স্মরণাপন্ন হতে হয় শিষ্যকেই। অতএব দূর থেকে অলৌকিক আসনে বসে ডিজিটাল পর্দায় বসে ধ্যানগুরু বাতলাতে পারেন না এখন আপনি ব্রেইনের তমুক স্তরে আছেন, আরও একটু এগোন, দম নিন, দম ছাড়ুন ইত্যাদি হ্যানত্যান ভুগিজুগি। কোন শিষ্যের শারীরিক ও মানসিক অবস্থান কী রকম- তা কি এইসব ভিডিও গুরুর জানার বা বোঝার কথা? এটা কোন ব্যবসায়িক কর্মও নয় যে, এক সপ্তাহ এক চালান চলবে, পরের সপ্তাহে নতুন চালান আসবে। আর শিষ্যরা হরিরলুটের মতোন প্রতি সপ্তাহে নতুন শিক্ষামাল লুফে নিবে।

মেডিটেশন জগতের পরমগুরু সিদ্ধাচার্য গৌতম বুদ্ধ, সিদ্ধাচার্য মহাবীরও কোন কর্পোরেট গুরুর কাছে ধ্যানবিদ্যা শেখেননি। তাঁরা গৃহত্যাগী ছিলেন আবার গুরুমারা শিষ্যও ছিলেন তাঁরা। উভয়ই বাংলায় তাঁদের নবসিদ্ধি প্রচারে এসেছিলেন। কাছাকাছি সময়ের বলে তাঁদের দু’জনই প্রায় একই মার্গের ছিলেন। সিদ্ধাচার্যগণ সেখানেই সিদ্ধি প্রচারে যাতায়ত করেছেন যে সব অঞ্চল যোগি প্রসিদ্ধ ছিল। তারমানে বাংলার মাটিও যোগি প্রসিদ্ধ ছিল বলেই তাঁরা তাঁদের নব আবিষ্কৃত ধ্যান মার্গ প্রচারের কাজে এসেছিলেন। এখানে চর্যাপদের কথা উল্লেখ করলে একটি বিষয়ের ওপর প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণার অবসানও ঘটতে পারে। প্রাসঙ্গিক বলে আলোচনাটি এখন জরুরি। চর্যাপদের কিছু পদে দেখা যায়, মাকে মেরে, শালিকে মেরে, বৌকে মেরে এই জাতীয় কিছু লাইন পাওয়া যায়। অনেক সাহিত্য বিশ্লেষকরা এই ‘মারা’ শব্দটি সম্পর্কে খুবই ভ্রান্ত কিছু বক্তব্য রেখেছেন। কারো কারো মতে এই শব্দ বিশ্লেষণে পাওয়া যায় মায়ের সাথে পুত্রের যৌনাচার, কিম্বা পদকর্তা মা-বৌ-শালিকে খুন করে, অথবা যৌনতা ঘটায়। তাই পদকর্তা কাপালিক হয়েছেন। এসব এতোই বিভ্রান্তিকর বিশ্লেষণ তাদের বিস্মিত হতে হয় বৈকি! চর্যাপদ যে কোন সাদামাটা মনের ভাব নয়- সেটাই হয়তো শব্দ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভুলে গিয়েছেন তারা। এগুলো সাধারণ গানও নয়, কবিতাও নয় যে মারা মানে খুন ধরে নিতে হবে। এগুলো পদ। সুরে গাইলে সবকিছু গান হয় না। অন্তমিল, ছন্দ থাকলেও নিছক কবিতা হয় না। সেসব আমলে চিন্তক মানুষ নিজ নিজ দর্শনকে পদাবলীতে প্রকাশ করতো। তাই প্রতি পদে পদকর্তা নিজের নাম ও অনেকক্ষেত্রে গুরুরও নাম উল্লেখ করে রেখেছেন। পদাবলী হলো গীতিকাব্যে দর্শন বর্ণনার উৎকৃষ্ট মাধ্যম। যেমন বৈষ্ণবপদাবলীতে জয়দেব নিজ (বিষ্ণুরূপে কৃষ্ণের অবতার) বিশ্বাস ও দর্শনকে গীতকাব্যে (গীতগোবিন্দ) প্রকাশ করেছেন। গীতগোবিন্দেরও বহুকাল আগের চর্যাপদীয় ঐসব যোগীগণের পদে গৌতমবুদ্ধের সিদ্ধি প্রচার হতো পদকর্তার নিজ দর্শনে। তো ‘মারিঅ সাসু নণন্দ ঘরে শালী/ মাঅ মারিঅ কাহ্ন ভইঅ কবালী’ বাক্যাটির বিশ্লেষণের যথার্থতা হলো, কাউকে মূলত ধর্ষণ বা খুন করেননি। এখানে মা- ধরিত্রীপুর, দেহদাত্রী, সাসু(শাশুড়ি) বৌয়ের মা- কাম উৎপাদক, শালি হলো শিথিল রিপুর অভিলাষ, পরনারীও। মহাব্রহ্মাণ্ডের তলায় ক্ষুদ্র নিজেকে দাঁড় করালে সেখানে কোন ব্যক্তির পারিবারিক অস্তিত্বই টিকিয়ে রাখা যায় না। সবকিছুই ব্রহ্মশক্তির সাথে সংযুক্ত। অর্থাৎ, গুরু মারা বিদ্যার মতোই মা-বৌ-শালি চেতনাসমূহ ত্যাগ বা হত্যা করে নতুন চিন্তাপথে বেরিয়ে গিয়েছেন কাহ্ন’র মতোন প্রসিদ্ধ যোগীগণ। সেই অর্থে গুপ্তভাব প্রকাশের সুবিধার্থে নিজেদের কাপালিকও বলেছেন। নিজেদেরই যোগী হয়ে ওঠার পদাবলী এসব। কাহ্ন পা-এঁর পদটি চর্যার ১১ নম্বর পদ। আর এই পদটি নাড়তন্ত্র জাগরণের পদ। এখানে মা, শাশুড়ি, শালি ইঙ্গিতপ্ধান শব্দ – যা দেহ নগরীর বিভিন্ন তন্ত্র যেগুলোকে সাধন করতে আলিকালি (ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না) বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করে তোলে পদকর্তাকে। পদটি শুরুই হয়েছে সেই সাধনার নিগূঢ় কথা দিয়ে, ‘নাড়ি শক্তি দিঅ ধরিআ খাটে। অনহা ডমরু বাজই বীর নাটে’, অর্থাৎ নাড়ের শক্তিস্থলকে (নাভি) শক্ত করে খিচে ধরো, তাতে হৃদপিণ্ড (অনাহত ডমরু) বীরত্বের সাথে বাজবে। পূর্বেই বলেছি, শ্বাসপ্রশ্বাস ছিদ্রেরও একেকটির চৌদ্দগুষ্টি রয়েছে। তো এই পদেও সমাজ-পরিবারের বাপ- মা-বৌ- শাশুড়ি-শালি-ভাই ভাবার কোন প্রশ্নই আসে না। দেহনগরীকেই তারা সংসারের আত্মীয়স্বজনের মতোন উপমা দিয়ে গুহ্যসাধনার তরিকা ব্যাখ্যা করেছেন এমনভাবে, যা গুরুদীক্ষা ব্যাতীত জানা ও বোঝা অসম্ভব। স্বাভাবিক কাব্য ও গীতের মতোন অর্থায়নে এসব পদ বিশ্লেষণ করা অহেতুক কর্ম বৈ আর কিছু নয়। যেমন লালন যুগের ভাষায় লালন নিজ পরিচয়মূলক পদে বলেছেন, ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে…লালন সে জেতের ফাতা ঘুচিয়াছে সাধ বাজারে’, অর্থাৎ তান্ত্রিকবর্গ এসব পারিবারিক-সামাজিক বংশপরিচয় বহু আগেই ঘুচিয়ে দিয়েছে।

মগজীয় ধ্যানবিদ্যায় তানপুরা বাজছে! এতেই আরও সন্দেহ জাগে, সেইসব গুরু আদৌ কতটুকুন সদগুরু! যারা কিনা তানপুরার সুরে আবিষ্ট করিয়ে ভিডিও মারফত ধ্যান শেখাচ্ছেন দলবল গোষ্ঠী বানিয়ে! তারা কি ওয়াকিবহাল আছেন যে, ধ্যানবিদ্যার আবিষ্কার যখন ঘটেছিল তার কত সহস্র বছর পরে তানপুরা আবিষ্কার হয়েছে? আলাউদ্দিন খিলজীর আমলে রাজকীয় সভাসদ আমীর খৌস্রু বিনির্মিত তানপুরার চারটি তার যতই বিল্মবিত লয়ে হোক অঙ্গুলি চালনায় প্রতিটি তারে মাত্রা-লয় ধরে রাখতে হবেই। আর ধ্যানবিদ্যা সম্পূর্ণ স্পেস, তাল লয় মাত্রাহীন শূন্য পর্যায়ে শুরু করতে হয়। সুরের জগতে নিবিষ্ট করানোর জন্য তানপুরা মনে বিশেষ আমেজ সৃষ্টি করবেই। কিন্তু ধ্যানের জগতে প্রবেশের জন্য এরকম জোয়ারি সুরযন্ত্র বাঁধ সাধতে বাধ্য। কারণ সেটি ঘনঘন আপনার শ্রুতিকে আকৃষ্ট করবে। টেনে রাখবে সংগীতের জোয়ারি স্রোতে। আপনার মস্তিষ্কে জোয়ারি আওয়াজ প্রবেশ করে এমনিতেই আপনাকে শান্ত করে ফেলবে। সংগীত এমনিতেই নিজস্ব গুণ সম্পন্ন মহাকলাবিদ্যা। তারজন্য গুরুর বয়ান বা আসন আর প্রাণায়ামাদির দরকারও হবে না। বীণা, ভারী সুরের বাঁশি ইত্যাদি গম্ভীর গমকযুক্ত স্থির সুরযন্ত্র ধ্যানে প্রবেশের আগে শুনলে একপ্রকার স্থিরতা আসে মস্তিষ্কে। ধ্যানের পরে শুনলে আরেক প্রকার স্থিরতা আসে। আর গুরু বয়ান বাদ দিয়ে শুধু সংগীতের মাধ্যমে যে তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘোরের মধ্যে ব্রেন আরাম করে, সেটিকে বলে মিউজিক থেরাপি। এই মিউজিক থেরাপিকালে নিঃসঙ্গ থাকাই কর্তব্য। ভিডিও গুরুর বয়ানের সাথে তাই তানপুরার প্রয়োজনীয়তা নেই। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, আপনাকে উচ্চ মার্গে প্রতারিত করার জন্য তানপুরার আওয়াজ টেকনিক্যালি ব্যবহার করা হচ্ছে।

মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবেই সক্রিয় থাকে সবসময়। কিন্তু সক্রিয় থাকা আর মগজকে আদেশ দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া (কার্যকর করা)- দুটি ভিন্ন বিষয়। ধ্যানবিদ্যার মোক্ষম উদ্দেশ্যই হলো মস্তিষ্ককে কার্যকর করে তোলা। তাই একে যোগবিদ্যাও বলা হয়। অর্থাৎ মস্তিষ্ক, শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ এবং নাড়তন্ত্রের মধ্যে ঐচ্ছিক যোগসূত্র গড়ে তুলে সক্রিয় মস্তিষ্ককেই আদেশ অনুযায়ী কাজ করানোর জন্য উপযুক্ত করে তোলা। মস্তিষ্কের অধিকাংশ জায়গা বেশিরভাগ সময়ই অলস থাকে। খালি পড়ে থাকে। প্রতিটি অংশ একত্রে কাজ করে না। সপ্তকুণ্ডলি জাগ্রত হলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন সেক্টরও জাগতে শুরু করে। যৌনাঙ্গ থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত রয়েছে সপ্তকুণ্ডলির বিভিন্ন চক্র বা ধাপ। সেগুলো ধারাবাহিকভাবে ভেদ না করা পর্যন্ত আপনার মস্তিষ্কের ধ্যানকর্ম-প্রক্রিয়া কেবল ঐসব ভিডিওগুরুর মুখস্থ করানো প্রাণায়াম ও আসন চর্চা করলে চালু হবে না। কারণ মগজ নিজেও জানে না তার আশপাশে কী কী শক্তি আছে, কোন কোন প্রকোষ্ঠ রয়েছে। দেহের সপ্তকুণ্ডলি জাগলে তবেই মগজ তার অচল প্রকোষ্ঠ আবিষ্কার করতে শুরু করে। আপনার আধ্যাত্মিক আদেশবলে চিহ্নিত করতে শুরু করবে সেসব কর্মচক্র। আপন ধ্যানবলে, আধ্যাত্মিক যোগসূত্রে মগজ স্বয়ং সেই বন্ধ প্রকোষ্ঠগুলোর দরজা খুলতে থাকবে। এটাই হলো মগজকে কার্যকর করার প্রকৃত অধ্যায়। তাই এই অধ্যায়টি ভয়ঙ্করও। খুব সাবধানে যথেষ্ট ধীরে সুস্থে নিত্য সাধনা করতে হয় এই পর্যায়ে। এই পর্যায়ে এলেই সংগীতের সুর হাতিয়ার হয়ে ওঠে। কিন্তু সঠিক রাগসুর নির্বাচিত না হলে, তন্ত্রের চরিত্রায়ণে অসতর্কতা, অতিরিক্ত কৌতূহল ও তাড়াহুড়ো করলে, নিঃশ্বাসের উত্তেজনায় প্রকোষ্ঠগুলোর শক্তি ও কুণ্ডলীশক্তি বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারে। আপনি হয়তো ধ্যানের একটি প্রকোষ্ঠেই আজীবনের জন্য আবদ্ধ হয়ে যেতে পারেন। এমনকি কোমা কিম্বা উন্মাদও হয়ে যেতে পারেন। এই স্তরে আপনার শরীরের সকল ইন্দ্র, কুণ্ডলি ও মগজের বিভিন্ন সেক্টর সবে যোগাযোগ সংস্থাপন করতে শুরু করে আপনার আদেশ মেনে। সাধনার এই পর্যায়েরই কয়েকটি স্তর পার করলে কসমিক জগতে সম্পৃক্ত হওয়ারও পথ খুলতে থাকে। আর তখনই আসে ঈশ্বরচিন্তা, দেবদেবী চিন্তা। এসব স্তর তাই গুরুবাক্য পথ ধরে এগোনো ছাড়া গতি থাকে না। মনে রাখতে হবে, দেহের সপ্তকুণ্ডলি জাগ্রত হয় ঠিকই কিন্তু সেগুলোও মগজের মতোন স্বয়ংক্রিয় থাকে, সুপ্ত থাকে। মগজের মতোই সেগুলোর সব প্রকোষ্ঠ সবসময় কার্যকর থাকে না। ধ্যানবিদ্যায় মগজকে দিয়ে যেমন কাজ করানো যায়, তেমনি এই কুণ্ডলীও আপনার আদেশ শুনে কার্যকর হয়ে উঠবে। এতে মানুষের অাধ্যাত্মিক শক্তিও বল পেতে শুরু করে। তখন একটি মাত্র শ্বাস-বায়ু শরীরে প্রবেশ করে হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কের বহুমাত্রিক সেক্টরকে একত্রে কর্মক্ষম রাখতে পারে বহুক্ষণ। ফলে মস্তিষ্ক জাগতিক, মহাজাগতিক বহু বিষয়ে তথ্যাদি জানতেও কার্যক্রম শুরু করে প্রাকৃতিকশক্তি, আধ্যাত্মিকশক্তি এবং গুরুবচন শক্তিকে কেন্দ্র করে। আর এই কার্যক্রমে নিত্য বার্তাবাহকের কাজ করে পঞ্চেন্দ্রিয় শক্তি। টেলিপ্যাথি শক্তিও এই কার্যক্রমে সৃষ্টি হয় সাধনার অন্য ধাপে। এটি তাই গুপ্ত প্রক্রিয়া, গুরু শিক্ষা, কঠোর সাধনার গুরুমুখী বিদ্যা। কেউ আপনাকে ভিডিও মারফত সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক সিলেবাস মুখস্থ করাবেন আর আপনি টপাটপ উত্তীর্ণ হয়ে ছয় মাসেই খুব শক্তিমান কেউ হবেন – এমন প্রত্যাশা করা একেবারেই অনুচিত। বছরের পর এমনকি যুগের পর যুগও লেগে যায় এ সাধনার সিদ্ধি লাভের জন্য। এই জাতীয় ভণ্ড কর্পোরেট এজেন্সিতে মোটা অঙ্কের কোর্সফিস দিয়ে, পরবর্তীতে এমএলএম পদ্ধতিতে একসময় আপনিও গ্রুপ-এজেন্সির মালিক হবেন। ভিডিও গুরুর মেডিটেশন শেখানোর জন্য আরও নতুন দশজন পাঁচজন ধরে এনে গ্রুপ খুলে ধান্দাবাজ, প্রতারক হবেন বড়জোর। কিন্তু এর বেশি কিছুই হতে পারবেন না। আর এসব ধান্দাবাজ প্রতারকদের বিষয়ে গৌতমবুদ্ধ, লালনরা বহু আগেই ঋষিদের সতর্ক করে গেছেন। গৌতম ধ্যানবিদ্যাকে নির্জন বনবাসে আয়ত্ত করতে বলেছেন সদগুরুর সান্নিধ্য লাভের মধ্যদিয়ে। আর ভণ্ড যোগী প্রতারকদের লালন সাঁই দরগার শিরনীলোভীদের সাথে তুলনা করেছেন। ধন্যবাদ।

 


লেখক

নূরিতা নূসরাত খন্দকার
সংগীত শিক্ষক ও গবেষক


error: Content is protected !!