সুনীতার বিয়ে

(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)


অগত্যা সুনীতা সব খুলে বলল রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে।

– দেখেছেন, এত কষ্ট আর দুঃখে থেকেও লোকটা শুধু নোবেলের জন্য লিখে গেল, ভাবতে পারেন? তাই সেই পদকটা চুরি গেল!


পরীক্ষা দিয়ে বেশ কিছুদিন পর একটা সাক্ষাৎকারের ডাক পেল সুনীতা । সরকারি হাইস্কুলে শিক্ষিকার চাকরি । এটা পাওয়া অসম্ভব, জানত ও । কারণ কোথায় যেন টাকা দিতে হয় আর যারা টাকা দেয়, তাদেরই চাকরি হয়, এটা সবাই জানে ।

ইংরেজিতে এম. এ করার পর বিএডটাও করেছে। এম. এ’তে ঠিক ৫০ শতাংশের একটু বেশী পেয়েছিল, যার ফলে নেট পরীক্ষা দিতে পারবে না । আর না পারলে- কলেজের অধ্যাপক পদের জন্য নেট পরীক্ষায় বসা অসম্ভব ।

একমাস পর চাকরিটার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেতে নিজেই তাজ্জব সুনীতা । মা, অবসরপ্রাপ্ত বাবা, ছোট বোনকে নিয়ে সংসার । বাবার পেনসনে আর বেশী হাত পড়বে না, এটা ভেবে আরও আনন্দ । কোলকাতার উত্তর থেকে ট্রেনে ঘন্টা দেড়েকের জার্নি ওই স্কুলে যেতে । এটাই কষ্টকর । সকালে সাড়ে আটটায় বেরিয়ে আবার সন্ধে সাতটায় ফেরা । খুব অবসন্ন লাগে নিজেকে, এই দু’বছরে । উনত্রিশ বছর বয়েস হয়ে গেল, এখনও বিয়ের সময় করে উঠতে পারল না সুনীতা । বাড়িতে আবার অন্যজাতে বিয়ে করা চলবে না, এই ফরমান জারি আছে । বাউন বলে কথা! আরও অনেক বাধা, এই একুশ শতকেও তার পরিবারে । একেক সময় অসহ্য লাগলেও মা বাবার বুড়ো বয়েসে, তাদের মনে আঘাত দিতে চায় না।

এই সময় কলকাতার দক্ষিণপ্রান্ত থেকে একটা বিয়ের সম্বন্ধ এল। ছেলেটি, বাবা চাকরি চলাকালীন দুর্ঘটনায় মারা যাওয়াতে চাকরিটা পেয়েছে সরকারি দপ্তরে। মা আর ছেলের সংসার, নিজেদের তিন কামরার ফ্ল্যাট, ভবানীপুরে। ছেলের মাও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। তারা সুনীতাকে দেখে গিয়ে তখনই জানিয়ে দিল, মেয়ে পছন্দ, বিয়ে ফাইনাল। শুধু ছেলেটি যাবার সময় নিজের ফোন নম্বর দিয়ে সুনীতার ফোন নম্বর নিল। ও নাকি একান্তে কথা বলবে!

তার পরের দিনই ফোনটা এল।

– সুনীতা বলছেন?
= হ্যাঁ।
– আমি বিশ্বজিৎ। চিনতে পারছেন?
= হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন।
– সেদিন জিজ্ঞেস করা হয়নি, আপনি বই টই পড়েন?
= টই পড়ি না, তবে বই তো পড়ি। বলতে গেলে, ওটাই আমার একমাত্র সময় কাটানোর পন্থা।
– কোন লেখক ভাল লাগে আপনার?
= সেটা নির্ভর করে, বিষয়ের ওপর। তবে রবীন্দ্রনাথ আমার প্রথম পছন্দ।
– আমি খালি ভাবি, ভদ্রলোক বিয়ে না করে, ওরকম প্রেমের কবিতা লিখলেন কী করে?

সুনীতা খানিক চুপ ।

– কী? লাইন কেটে গেল নাকি?
= না। তবে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করেননি, এই তথ্যটা কোথায় পেলেন?
– না! জানি আর কী!

অগত্যা সুনীতা সব খুলে বলল রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে।

– দেখেছেন, এত কষ্ট আর দুঃখে থেকেও লোকটা শুধু নোবেলের জন্য লিখে গেল, ভাবতে পারেন? তাই সেই পদকটা চুরি গেল!


সুনীতা, আত্মহত্যার চেয়ে সারাজীবন বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ।



লেখক

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল
রম্যলেখক


 

error: Content is protected !!