বেতনা নদীটারে ডাকি বেতরাবতী নামে


মাটির প্রাচীর থাইকা নাইমা নদীর দিকে আগায়া গেলাম। শরীরটা সামনের দিকে ঝুকায়া দিয়া নদীটার দিকে হাত বাড়াইলাম। হাতে তুইলা নিলাম নদীর জল। সেই জল মাখলাম গালে-মুখে-চোখে। তারপর আরো একবার জল তুইলা নিলাম হাতে। আর নদীর দিকে ছুঁইড়া দিয়া কইলাম, ‘ও নদী, ট্রেনটারে তুমি ধারণ করতে পারলা না, আমারে পারবা কি! আসমানটার মতো আমারেও নাও তোমারে বুকে’!


পথে নামলেই কি মানুষ হারায়া ফালায় ঘর? যদি নাই বা হারায় তবে আমি ক্যান হারায়া ফেললাম আমাদের দুই চালা ঘর! হারায়া ফেললাম চওড়া উঠানের এক কোণায় মাচাং আর মাচাং ছাড়ায়া নেতায়া পড়া পুঁইশাক লতা। আমাদের বাড়ির সামনের জোড়াদীঘি কই গেল! কই হারায়া গেল পশ্চিম দীঘির পাড়ে মার্বেল গড়ানো দিন! বাঁশঝাড় থাইকা ভাইসা আসা পাখির ডাক আর দিনমান অই পাখির পিছনে ছুইটা বেড়ানো নিমিষেই যেন হাওয়া হয়া গেল। দীঘির পাড়ের সজনে গাছের মগডাল থাইকা যারা লাফ মারত, চেনা সেইসব মুখগুলাই বা কই! অথবা যারা ডুমাইপুরী বিলে জাল পাইতা বইসা থাকত মাছের আশায়, তারাই বা কই। চেনা মুখ ছাইড়া অচেনা মুখের ভিড়ে এ কীরম রূপকথার দেশ! ভাইয়া ও আম্মা ভুলায়া-ভালায়া এ কই নিয়া আইলো আমায়!

রূপকথার দেশ কিংবা নাভারণ যেই নামেই ডাকি তারে এইখানে একবার আইলে বুঝি ফিইরা যাওন যায় না। এইখানে, এই অচেনা দেশে কেমন কইরা টিকমু আমি! কিন্তু যখন আইসাই পড়ছি আর ফিইরা যাওয়ারও উপায় নাই সেহেতু প্রাচীর ঘেরা নতুন বাড়িটারে ভালো কইরা চোখ ঘুরায়া দেইখা নিলাম। পথের পাশেই মূল গেইট। গেইটের পাশেই তিন কক্ষের একটা বাড়ি। এইখানেই আমাদের আবাস। তার সামনে লম্বা উঠান। উঠানের পরেই দুই কক্ষের আরেকটা বাড়ি। উঠানের দুইপাশেই ফুলের বাগান। বাগানের সবগুলা গাছের নাম, ফুলের নাম আমার তো জানা নাই। আমি সেইগুলার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকায়া থাকি। না জানা ফুলগুলার নাম কী কী দেওয়া যায় আমি ভাবি। ভাবনায় ছেদ পড়ে যখন ওই দুই কক্ষের বাড়ি থাইকা বাহির হয়া আসে রমিজ আঙ্কেল। আব্বার কলিগ সে। সাথে আগায়া আসে উনার বউ, রোমেলা আন্টি। রোমেলা আন্টির পাশে তাদের জমজ কন্যা। রূপকথার দেশে আইসা আমার যে মন খারাপ এই খবর রইটা গেছে ততক্ষণে। রোমেলা আন্টি আমারে কোলে তুইলা নিয়া জিগাইল, ‘তুমি নাকি চইলা যাইতে চাও?’। আমি উত্তর দেই না। আমি মুখ ঘুরায়া ফুলের বাগানে তাকায়া থাকি। আন্টি তার মাইয়াদের দিকে ইঙ্গিত কইরা কয়— ‘এরা তোমার নতুন খেলার সাথী। যাও, এদের সাথে খেলতে যাও’।

জারা আর সারা দুই বোন। শ্যামলা চেহারা, ড্যাবড্যাবে চোখ দুজনারই। ওরা কি আমার বড়? হইতে পারে ছোটও। তারা আমারে হাত ধইরা নিয়া যায় পুতুল খেলার ঘরে। আমি কি আর অইসব খেলতে পারি নাকি! পুতুল ভাইঙা, হাঁড়ি-বাটি ছুঁইড়া দেয়াল টপকায়া আমি চইলা গেলাম বাড়ির বাইরে। বাড়ির বাইরেই সেগুন আর শাল বাগান। মেহগনিও আছে হয়ত। যতদূর চোখ যায় গাছ আর গাছ। দীর্ঘকায় গাছগুলা পাতা ঝরায়া যেন আমারে দিল সংবর্ধনা। আমার মন চনমনে হয়া উঠল। ওই বাগানের ভিতর দিয়া হাঁটতে হাঁটতে যতটা গভীরে যাওয়া যায়, চইলা যাই আমি। বসন্ত নাকি এখন! কুহুকুহু কে গাইতাছে! আমার মনে হইতে থাকল আমাদের বাড়ির পশ্চিমের জংগল থাইকা ভাইসা আসতাছে এই গান। কিন্তু তা কী কইরাই বা হয়! এইখান থাইকা কত দূরেই না সেই জংগল। আমার মনে হইতে থাকল,পৃথিবীর পাখিরা সব গায় এক সুরে গান। সেই গান শুইনা শুইনা আমিও যেন পাখি হয়া গেলাম। আমারে খুঁইজা খুঁইজা তখন হয়রান হয়া গেল আব্বা আর ভাইয়া। খুঁইজা খুঁইজা তারা চইলা আইলো শালবনে। পাতার উপরে পাতা সাজায়া আমি তখন পাখির ঘর বানাইতাছি বনের ভিতরে। আব্বা ও ভাইয়া আমারে ধইরা নিয়া যায় ঘরে। যে পাখি হয়া গেছে তারে তারা কোন শিকলে বাঁইধা রাখবে?

খেলার পুতুল ভাঙছি আমি। আম্মা বকা দেয় আমারে। না খায়াই কাটাইলাম রাত। আর সকাল হইতেই টপকাইলাম দেয়াল। দেয়াল টপকায়া আমি শালবনে গেলাম পুনরায়। তাকায়া রইলাম গাছের পাতার দিকে। কান পাইতা শুনলাম গান, সকালের পাখিদের। আব্বা আবার আমারে ধইরা আনলো। যেন পাখি বাঁধলো। পাখি কি আর পোষ মানে? আমিও মানি নাই পোষ, লুকায়েছি ভাতঘুম। শালবন ছাড়ায়া চইলা গেছি বহুদূর। যেইখানে পথের পাশে মাটির ঘর। ঘরের পাশে চওড়া উঠান। কোথাও খোলা মাঠ। উঠানে ও মাঠে, এইখানে সেইখানে মেয়েরা ও মায়েরা কাগজে ফিল্টার জোড়া দিয়া বিড়ি বানায়। সেই দৃশ্যে আমি দুপুর কাটায়া দিলাম। তাদের হাতের তৎপরতা আমার ভেতররে নাড়ায়া দিয়া জানান দিল, এ তো হাছাই রূপকথার দেশ।

রূপকথার দেশে আমি বিড়ি বানাবার দৃশ্য থাইকা আরো আগায়া যাই। পড়ন্ত দুপুরে পথে পথে নির্জনতা। নির্জনতা শরীরে মাইখা, পায়ে পায়ে ধূলি উড়ায়া আমি থমকে দাঁড়াই সবুজের মুখোমুখি। আমার সামনে ফসলি ক্ষেত। ক্ষেতে ফসল বলতে পেঁপে আর কলাগাছ। আমি বুঝতে পারি না একে কি কেবলি ফসলের ক্ষেত কওয়া যায় নাকি স্বর্গের উদ্যান! যেন তাকাইলেই চোখের আরাম। আমি স্বর্গের উদ্যানে ঢুইকা পড়ি। হাত বাড়াইলেই কাঁচা-পাকা পেঁপেফল-কলাফল। ছিঁড়ি না তাদের আমি, বুলাই হাতের পরশ। আদর করি তাদের আমি নাকি নিজেই নিই আদর! ওই পেঁপেক্ষেত আর কলাক্ষেতের ভিতরে আমার নিজেরে মনে হয় এক স্বর্গের শিশু! সে অরণ্য ছাইড়া শিশু কই যাবে আর!

স্বর্গের উদ্যানে দাঁড়ায়া হঠাৎ শুনি দূরে কোথাও বাজতাছে হুইসেল। বিকেল গড়ায়া গেছে তখন। আকাশে ছড়ায়া আছে সিঁদুর রঙ। এরেই কি গোধূলি বলে নাকি! স্বর্গের উদ্যান থাইকা আমি গোধূলির রেখা ধইরা বাজতে থাকা হুইসেলের দিকে পা বাড়াই। পেঁপে-কলাগাছের উদ্যানের সবুজ মায়া পিছনে ফালায়া একটা মাটির প্রাচীরের মুখোমুখি দাঁড়াই আমি। যার অইপ্রান্তে কী আছে, কিছুই তো দেখতে পাইলাম না। কেবলি দেখলাম আসমান। আসমান সাইজা আছে শাদা-নীল-লাল শাড়ীতে। আর ধীরে ধীরে সইরা যাইতাছে শাড়ীটা। শাদা-নীল-লাল শাড়ীর আড়ালে কে আছে, আমি তারে খুঁজি! মাটির প্রাচীরে উইঠা দাঁড়াইলে তারে দেখা যাইব কি!

মাটির প্রাচীরে দাঁড়াইতে আগাই আমি। আমারে শক্তি জোগায় প্রাচীরের ঢালুতে জাইগা উঠা ঘাস। মুঠোতে শক্ত কইরা আঁকড়াইয়া ঘাস প্রাচীরে উইঠা দাঁড়াই। আর মাথা তুইলা সামনে তাকাইতেই দেখতে পাইলাম যারে, জলের শরীর তার। এ কী বিস্ময়, সে যে নদী। শাদা-লাল-নীল রঙের আসমান নাইমা আসছে, ঢুইকা গেছে নদীর জলের গভীরে। মাথার উপরে একটা আসমান, জলের গভীরে আরেকটা আসমান। দুই দুইটা আসমানের মুখোমুখি আমি কি তাইলে কোন এক জাদুবাস্তবতার দেশে চইলা আসছি! নাকি এই নদী স্বর্গের নদী, একবার ভাবি আমি। আর তখন হুইসেলটা আবার বাইজা উঠে। কই থিকা আসতাছে হুইসেল, বাজাইতাছে কে? আমি সুদূরে চোখ রাখি। নদীর ওইপারে, ডাইনে-বামে যদ্দুর চোখ যায় ওইখানেও শালবাগান। উঁচা-উঁচা গাছের মাথার উপরে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়তাছে। ওরা উড়তেছে নাকি ফিরতেছে নীড়ে! আমি ডাইনে তাকাই। শালবাগান আর পেঁপে বাগানের ফাঁক দিয়া নদীটা বয়া গেছে। আমি বামে তাকাই। শালবন- পেঁপে বাগান শেষ সেখানে। যেখানে মাটির একটা রাস্তা আইসা নদীতে ঢুইকা গেছে। আর তারও কিছু পরে নদীর উপরে রেলব্রিজ ঝুইলা আছে। এই ব্রিজটা থাইকা চোখ সরাইবার আগেই ধাপ কইরা নাইমা গেল সন্ধ্যা।

হুইসেলটা ক্রমাগত বাজতেই লাগল। তার সাথে ঝমাঝম শব্দ। রেলব্রিজটায় তীব্র আলো পড়ল। ঝংকার দিয়া উঠল লোহা। সন্ধ্যা নামল বটে, নামে নাই তখনও আন্ধাইর। একটা ট্রেন আইসা হুড়মুড়ায়া ঢুইকা পড়ল লোহার ব্রিজটায়। ধীরে ধীরে পাড় হইতে লাগল নদীটা। আসমান যেমন কইরা নদীর জলের গভীরে ঢুইকা পড়ছিল, তেমন কইরাই ট্রেনটাও ঢুইকা পড়ল। দুইটা ট্রেন নদী পাড় হইতাছে। জলের গভীরের ট্রেনটার দিকে তাকায়া রইলাম আমি। নদী বইতাছে, জলের ভিতর ট্রেনটা নাচতাছে। ওই নাচার মধ্যে আমি টের পাইতাছি আনন্দফুল ফুটতাছে। কিন্তু হুট কইরাই সেই নাচন ফুরায়া গেল। আমি ব্রিজটার দিকে তাকাইলাম। দেখি— ব্রিজের ট্রেনটাও আর নাই। যদিও ট্রেনের হুইসেল আর ঝমাঝম শব্দ তখনও কানে বাজতাছে। একটা ট্রেন না হয় তা বাজাইতাছে, কিন্তু আরেকটা ট্রেন আনন্দফুল ফোটায়া কই ঢুইকা গেল? তারে খুঁইজা পাইলাম না। আমার মন খারাপ হয়া গেল। নদী তো আসমানরে ধারণ করতে পারছে, ট্রেনটারে ক্যান পারল না, এই কথা আমি কারে জিগাই!

মাটির প্রাচীর থাইকা নাইমা নদীর দিকে আগায়া গেলাম। শরীরটা সামনের দিকে ঝুকায়া দিয়া নদীটার দিকে হাত বাড়াইলাম। হাতে তুইলা নিলাম নদীর জল। সেই জল মাখলাম গালে-মুখে-চোখে। তারপর আরো একবার জল তুইলা নিলাম হাতে। আর নদীর দিকে ছুঁইড়া দিয়া কইলাম, ‘ও নদী, ট্রেনটারে তুমি ধারণ করতে পারলা না, আমারে পারবা কি! আসমানটার মতো আমারেও নাও তোমারে বুকে’! নদী কথা কয় না। আমার কেমন কেমন লাগে। এই লাগার নাম কী? আমি জানি না। যেমন জানি না নদীর নামটাও। আমি নদীরে জিগাই, ‘ও নদী, তোমার নাম কী?’! ‘বেতনা’—এইবার নদী কথা কয়া উঠে। আমি খিলখিল কইরা হাইসা উঠি। আর তখন নদী কয়, ‘এইবার বাড়ি যাও’! আমি কই, ‘আমারে নিবাই না তুমি যেমন কইরা নিছো আসমান তোমার বুকে?’! নদী সরসর শব্দ তুইলা কয়, ‘আজ না। আগে বড় হও তুমি, হও আসমানের মতো বিশাল। তারপর তোমারে বুকে তুইলা নেব। যাও, এখন যাও, বাড়িতে খুঁজতাছে তোমারে’!

নদীর পাড় ধইরা হাঁটলেই বাড়ির রাস্তা। নদী আমারে পথ দেখায়া মূল রাস্তায় তুইলা দেয়। বাড়ি ফেরার রাস্তায় উইঠা আমি একবার নদীটার দিকে ফিইরা তাকাই। তার উদ্দেশ্যে কই, ‘আমিও একদিন আসমান হইমু, আসমানের লাগান বিশাল। যতদিন তা না হইতাছি ততদিন আমি তোমারে বেতনা নয়, বেতরাবতী কইয়া ডাকুম, তুমি সাড়া দিও’।



জহির রিপন
কবি ও পরিব্রাজক


 

error: Content is protected !!