ও নদী! ও মানুষ!


আমার মনে হইলো আমার দুইটা নদীর একটা হারায়া যাইতাছে। আপার চইলা যাওয়ার দিন ঘনায়া আইছে ভাবতেই আমার বুক কাঁইপা উঠল। আমি ঘর ছাইড়া নদীর পাড়ে গিয়া বইসা রইলাম। অইপাড়ের শালবাগানে পাখিগুলার চিৎকার অন্যদিনের চাইতেও বাইড়া গেল। ওই চিৎকারের ভেতর আমার কান্দন পাইল। নদীর প্রতি তীব্র অভিমান হইল। নদীর দিকে ঢিল ছুঁড়তে ছুঁড়তে আমি কাঁদতেছিলাম কি কাঁদতেছিলাম না, পিছন থাইকা একটা হাত আইসা ঘাড়ে পড়ল।


যে শিশুর প্রথম পাঠ্যবই নদী, স্কুলঘরের ডাকে ক্যামন কইরা সে সাড়া দিবে! বুরুজ বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ডাকে আমিও পারি নাই সাড়া দিতে। স্কুলঘরের উঁচা-নিচা বেঞ্চ, ব্ল্যাকবোর্ড, চক-ডাস্টার, খেলার মাঠ কিংবা উচ্চস্বরে পড়া ‘অ আ ক খ’ কিছুই টানলো না আমারে। আমার মন পইড়া রইলো বেতরাবতীর নদীটার জলে। ব্ল্যাকবোর্ডে ম্যাডাম যখন স্বরবর্ণগুলা লিখে, আমার তখন মনে হয় আকাশের শাদা মেঘ নদীটার জলে সাঁতার কাটতাছে। যখন ডাস্টার দিয়া তা মুইছা ফালায়, আমার মনে হয়, নদীর এইপাড় থাইকা ফুড়ুৎ কইরা একটা পাখি উইড়া নদীর অইপাড়ে শালবনে হারায়া গেছে। যখন সমস্বরে ক্লাসের সবাই পড়তাছে ‘এ বি সি ডি’, আমার তখন মনে হয়, শালবনে লুকায়া পাখিগুলা ডাকতাছে। প্রথম কয়েকটা দিন ঠিকঠাক স্কুলের বেঞ্চে বইসা থাকা হইলেও পরে আর আমার স্কুলের বেঞ্চে বসাই হইলো না। আব্বা স্কুলের ক্লাসে বসায়া দিয়া যাওয়ার মিনিট কয়েক পরেই স্কুল পালায়া আমি চইলা যাই নদীর ধারে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলায়া বইসা থাকি নদীটার কূলে। কোন কোন দিন রেলব্রিজ ধইরা হাঁইটা নদী পার হয়া চইলা যাই নদীর এইপাড় থাইকা দেখা অইপাড়ের শালবনে। গাছে গাছে সবুজ পাতা, পাতার ফাঁকে ফাঁকে আকাশ হয়া উঠে ‘আমার বাংলা বই’। পাতার আড়াল থাইকা ডাকাডাকি করা পাখিগুলার পিছনে ঘুরতে ঘুরতে বেলা ফুরায়া যায়। ওরা হয়া উঠে ‘English For Today’। আমারে দেয় ইংরেজির পাঠ। রেললাইনের পাতগুলা, বনের ভিতরে সারি সারি গাছগুলা, নদীর জলে পড়া গাছের ছায়ারা হয়া উঠে ‘প্রাথমিক গণিত’। এদের কাছ থাইকাই আমি শিখি নামতা। আমি শিখতে থাকি যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ।

স্কুল ফাঁকি দিয়া নদীর ধারে বনের কাছে নিয়মিতই হাজিরা দেওয়া হইতে থাকায় স্কুলের উপস্থিত খাতায় ম্যাডামের চোখে আটকায়া গেল। একদিন আব্বা আমারে স্কুলঘরে রাইখা যাওয়ার সময় ম্যাডাম আব্বার পথ আটকাইল। অফিসরুমে ডাইকা নিয়া কী না কী কইলো। আমি ধরা খায়া গেলাম। আব্বা স্কুলের বাইরে কোথাও একটা লুকায়া রইল। আমি সেইদিনও স্কুল পালাইলাম। আব্বা যে আমার পিছে পিছে আসতাছে আমি টেরও পাইলাম না। সেইদিন বনের ভিতরে আমি ঝইরা পড়া পাতা দিয়া ব্যঞ্জনবর্ণগুলারে লিখতেছিলাম। আব্বা সেই দৃশ্য দেইখা কী মুগ্ধই হইলেন যে বাড়িতে নিয়া আইসা আমারে কোন ধমকধামক দিলেন না৷ আমি ভয় পাইলাম যদিও। আব্বা হাসতে হাসতে আম্মার কাছে আমার এমন কর্মের বর্ণনা দিতে লাগলেন। বাড়িতে হাসাহাসির রোল পইড়া গেল। মনে হইলো, যেন আমি পৃথিবীর সবচাইতে মজার কাজটা করছি। যদিও আম্মারে আবোলতাবোল বকতে শোনা গেল। আব্বা পাত্তা দিলেন না। আব্বা আমাদের সবাইরে নিয়া সেইদিন বেনাপোলে গেলেন। বর্ডার দেখা এক বিনোদনের ঘটনা হইলেও সীমান্তের এইপাড়ে দাঁড়ায়া আমি দেখলাম একই যশোর রোড ক্যামন কইরা দুইটা ভাগ হয়া গেল। অইপারের প্রতি আমার তুমুল আগ্রহ জন্মাইল। আব্বা সুযোগটা নিলেন। আমারে তখন অইপাড়ে যাইতে হইলে যে আগে স্কুলঘরে নিয়মিত গিয়া পড়াশুনা শিইখা বড় হইতে হইবে তা বুঝাইলেন।

নদী যদি একবার নেয়, আর কোথাও যাওয়ার থাকে না। নদী যে কইছিল, বড় হইলে বুকে নিবে, আমি কি বড় হয়া গেছি অল্প কয়দিনেই। আমার স্কুল ফাঁকি দেয়া কিছুতেই থামল না। কিন্তু স্কুলে যাওয়া একেবারেই বন্ধ হয়া যাওয়ার আগেই এক সকালে ভূত দেখার মতো কিছু একটা ঘইটা গেল। ঘুম থাইকা জাইগা বিছানার পাশে নাহিদা আপারে দেইখা আমি যেন ভূতই দেখলাম। নাহিদ আপা আমার ফুফাতো বইন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ কইরা আসা নাহিদা আপা ফলাফল হওয়ার মধ্যবর্তী সময়টায় আমাদের লগেই থাকব। কিন্তু সে আসার লগে লগেই তার কাছে আমার স্কুল ফাঁকি দিয়া বন আর নদীর কাছে নেওয়া পাঠসংক্রান্ত যাবতীয় ঘটনা বইলা ফালাইছে আম্মা। আমার ভাতঘুমের পাশে শুয়া নাহিদ আপা কানে কানে কইল, ‘তুমি কি আমারে নদীর পারে, শালবনে তোমার যে স্কুল সেইখানে নিয়া যাইবা?’ আমি অবাকই হইলাম। এই প্রথম কেউ নদীটার প্রতি আগ্রহ দেখাইল।

বিকেলটা গোধূলিতে মিলায়া যাওয়ার আগেই আমি আর নাহিদা আপা রাস্তায় নাইমা আইলাম। বাড়ি লাগোয়া শালবনটার ভিতর দিয়া আগাইতে থাকলাম আমরা। শালবনটা ছাড়ায়া যাইতেই মাটির ঘরগুলা। বিকেলের আলোয় ঝলমল কইরা উঠল। বাড়ির উঠানে বইসা তখনও নারীরা বিড়ি বানাইতাছে। বাড়িগুলা থাইকা চোখ সরায়া আমরা খোলা একটা মাঠের কোণায় দাঁড়াইলাম। আড়াআড়ি মাঠটা পার হইলেই নদী। আপারে হাতের ইশারায় দেখাইলাম নদীটা। নদী যতটা না দেখা গেল তারচেয়েও বেশি দেখা গেল নদীর অইপারের শালবনটারে। আমরা ধীরে ধীরে আগায়া নদীটার কাছে গেলাম। ইশারায় আপারে জলের দিকে তাকাইতে কইলাম। আপারে কইলাম, ‘দেখো, আকাশটা কেমন কইরা যেন নদীটার ভিতরে ঢুইকা গেছে?’ আপা খিলখিল কইরা হাইসা উঠে। আমি সেই হাসির অর্থ বুঝি না। অর্থ না বোঝা সেই হাসি নদী ছাড়ায়া হারায়া গেল দূরের শালবনে। সাথে হারায়া গেল আকাশে ওড়াউড়ি করা পাখিগুলাও। প্রতিদিনকার মতো ট্রেনের হুইসেলটাও বাইজা উঠল তখন। আপা আমার কাঁধে হাত রাখে। ট্রেনের ঝনঝনাঝন আওয়াজ বাড়তে থাকে। আমরা দুইজনই চুপ হয়া থাকি। ব্রিজটারে কাঁপায়া ট্রেনটা পার হয়া যায় নদী। আমি আপার দিকে তাকাই। আপা কথা কয় না। তার দৃষ্টি ওই ব্রিজ থাইকা সইরা কোথায় যে হারায়া গেছে আমি আন্দাজ করতে পারি না। আন্ধাইর নাইমা গেছে ততক্ষণে। নদীর পাড় ছাইড়া আপা আর আমি রাস্তায় উঠি। আমি সামনে, আপা পিছনে। যেন আপারে আমি পথ দেখায়া বাড়ির দিকে নিয়া যাইতাছি।

তিন রুমের বাড়িটার এক রুমে আমি আর আপা থাকি। একটাতে ভাইয়া অন্যটাতে আব্বা-আম্মা। দিনের মতো, সন্ধ্যার মতো রাইতেও আপা আমার সঙ্গী। আমারে ঘুম পাড়ায়া দিতে দিতে আপা জিগায়, ‘মাথার উপরে যে আসমানটা নদীতে ডুইবা গেছে সেইটা ক্যান গেছে কইতে পারো?’ আমি চক্ষের ইশারায় কই, ‘জানি না’। আপা আবার জিগায়, ‘জানতে চাও তুমি’? আমি এইবারও চক্ষের ইশারায় কথা কই, ‘চাই’। আপা কয়, ‘তাইলে তো তোমারে স্কুলে যাইতে হইবে। বইগুলা পড়তে হইবে’। আপা কি আমারে প্রলোভন দেখায়, আমি বুঝতে পারি না! আমি কথা কই না। আমার নীরবতার ভেতর আপা কয়, ‘আমি তোমারে স্কুলে নিয়া যামু। আমি তোমারে নিয়া আসমু স্কুল থাইকা। আমিই স্কুলের বইগুলা পড়ামু। তুমি আমারে প্রতিদিন নদীর পাড়ে নিয়া যাবা। শালবনের ভিতরে নিয়া যাবা’। কইতে কইতে আপার চোখ টলমল কইরা উঠে। ক্যান উঠে? আপা আমারে কাছে টাইনা নেয়। আপা আমার মাথায় হাত রাইখা জিগায়, ‘যাবা না স্কুলে আমার লগে? নিয়া যাবা না আমারে নদীর পাড়ে?’। আপার গাল ভিইজা যায় চক্ষের জলে। আমি আপারে জড়ায়া ধরি। এই জড়ায়া ধরার অর্থ যে ‘তোমার সব কথা মাইনা চলুম’, তা আর আপারে কইতে হয় না। আপা টের পায়া ঠোঁট দিয়া আমার কপালে আঁইকা দেয় আনন্দফুল।

বাড়ি থাইকা এক মিনিট হাঁটলেই স্কুলে যাওয়ার মূল রাস্তা। প্রতি সকালে আপা আমারে নিয়া ভ্যানে চইড়া বসে। স্কুলেরই এক পাশে বইসা স্কুল ছুটি হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। ততদিনে আম্মার কোল জুইড়া আসছে আমারই সহোদর। আম্মার কাছ থাইকা দূরে সইরা যাই আমি। আপাই হয়া উঠে আমার আম্মা। স্কুল থাইকা ফিইরা শালবনের বদলে ঘরেই হয়া উঠে আমার অরণ্য। দুপুরের ভাতঘুম শেষে আপা আমারে পাশে বসায়া হারমোনিয়াম নিয়া বসে। হারমোনিয়ামের কীগুলাতে আমি বৃদ্ধাঙ্গুলির ব্যালেন্স রাখতে পারি না। আপা যতই দেখায়া দেয় ততই ব্যর্থ হই। হারমোনিয়াম রাইখা আমরা চইলা যাই শালবনে। গোধূলিরও আগে নদীর পাড়ে। পথে দেখা হয়া যায় নানান পাখির সাথে। আপা আমারে পাখি চেনায়। রাস্তায় রাস্তায় যারা পায়চারি করতাছে ওরা শালিক। দূরে যে পাখি ডাকতাছে ওইটা ডাহুক। নদীতে ওৎ পাইতা যে বইসা আছে, মাছরাঙা সে। ট্রেনটা ব্রিজ পার হইবার আগে নদীর কাছাকাছি ঘুড়ির লাগান যে পাখিটা উড়ে, ওইটা চিল। পাখি দেখাইতে দেখাইতে আপা যেন কখন আনমনা হয়া যায়। নদীটার দিকে স্থির তাকায়া থাকে। আমি তাকায়া থাকি আপার দিকে। নদীটার পাশে আপারেও তখন আরেকটা নদীর মতো লাগে। যে নদীটার আমি এক পোষ মানা পাখি। মাছরাঙা নাকি চিল?

নদী বিলীন হইলে পাখিদের ওড়াউড়ি থাইমা যায়? এক দুপুরের ভাতঘুম শেষে আপারে কাপড় গুছাইতে দেইখা আমার মনে হইলো আমার দুইটা নদীর একটা হারায়া যাইতাছে। আপার চইলা যাওয়ার দিন ঘনায়া আইছে ভাবতেই আমার বুক কাঁইপা উঠল। আমি ঘর ছাইড়া নদীর পাড়ে গিয়া বইসা রইলাম। অইপাড়ের শালবাগানে পাখিগুলার চিৎকার অন্যদিনের চাইতেও বাইড়া গেল। ওই চিৎকারের ভেতর আমার কান্দন পাইল। নদীর প্রতি তীব্র অভিমান হইল। নদীর দিকে ঢিল ছুঁড়তে ছুঁড়তে আমি কাঁদতেছিলাম কি কাঁদতেছিলাম না, পিছন থাইকা একটা হাত আইসা ঘাড়ে পড়ল। আমি ঘাড় ঘুরায়া আপারে দেখতে পাইলাম। আপা আমার চোখ মুইছা দিয়া কইলো, ‘নদীটারে দেইখা রাইখো’। আমি চিৎকার কইরা কাঁদতে লাগলাম। আপা আমারে বুকে জড়ায়া নিল। যতক্ষণ না আমার কান্দন থামল ততক্ষণ শক্ত কইরা জড়ায়া রাখল। কিন্তু আপারে আমি কইতে পারলাম না, ‘তোমারে ছাড়া আমি আর কোন নদীরে দেখতে চাই না, আমার আর কোন নদীর দরকার নাই’।

রাতের বাসে উইঠা বসে আপা। জানালা খুইলা হাত নাড়ায়। বিদায়ের ভাষা রপ্ত করতে পারি না আমি। অসাড় হয়া আসে হাত। ক্ষীণ আলোতে চলতে চলতে বাসটা হারায়া যায় অন্ধকারে। আমার ভেতর থাইকা একটা পাখি ডাকতে থাকে ‘ও নদী! ও মানুষ!’। ফিরে না মানুষ, নদী হয়া বইয়া যায়।



জহির রিপন
কবি ও পরিব্রাজক

error: Content is protected !!