বুকের ভেতর রূপকথার দেশ


আমি টের পাইলাম, আমার গাল বাইয়া জল গড়ায়া পড়তাছে। আমি শুনতে পাইলাম, একটা অদৃশ্য হাত সেই জল মুইছা দিতে দিতে কইতাছে, ‘যে নদী তোমার ভেতরে ঢুইকা গেছে তারে তুমি থামায়া দিও না; যা কিছু তোমার ভিতরে ঢুইকা গেছে তার কোন কিছুই তুমি হারায়া যাইতে দিও না’।


নদী বাঁক বদলায়া বয়া যায়। জীবনও থামে না। বাঁক বদলায় সেও। আমি গোঁ ধইরা বইসা থাকি। নদীর পাড়ে কিংবা জীবনেরই কোলে। বেতরাবতী আমারে ছাড়ে না। ছাড়ে না স্কুল পালানো পাখি-জীবন। আব্বা চিন্তাগ্রস্ত হয়া পড়ে। শালবন লাগোয়া যে বাড়িটা তা বেতরাবতী নদীটার খুব কাছে। আব্বা বাসা বদলের দিন ডাইকা আনে। নদী থাইকা দূরে, শালবন থাইকা দূরে আমরা দুইতলা একটা বাসায় উঠি। নতুন বাসাটার চাইরপাশে উঁচা প্রাচীর। যার মূল গেইট সারাক্ষণই তালাবদ্ধ থাকে। আব্বা নিজেই স্কুলে দিয়া আসে। আর লাগায়া রাখে গোয়েন্দা সার্বক্ষণিক। আমি পালাইতে পারি না। আমার দম বন্ধ লাগে। আমার মন পইড়া থাকে নদীতে। আমার মন পইড়া থাকে শালবনে। আমার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়া যায়। আমার হৃদয় আহত হয়। আমার শরীর অসুস্থ হয়া পড়ে।

আচমকা একদিন ডাকপিয়ন আসে বাড়িতে। হলুদ খামে আসে চিঠি। চিঠিতে গোটা গোটা অক্ষর। হাতের লেখায় চিনতে ভুল হয় না এই চিঠি নাহিদা আপার। পড়তে পারি না আমি। অসহায় লাগে। ভাইয়া পইড়া শোনায়। চিঠিতে নাহিদা আপা কইতাছে, ‘নিয়মিতই চিঠি লিখুম তোমারে। তুমিও লিইখো আমারে’। আমি তো লিখতে পারি না। আমি তো পড়তে পারি না। কী কইরা আমি চিঠি লিখুম! কী কইরা’বা আমি চিঠি পড়ুম! আমি টের পাই, আমার ভিতরে নাম না জানা এক নদী বাঁক বদলাইতাছে। সাথে বদলাইতাছি আমিও।

আমারে স্কুলে নিয়া যাইতে হয় না আব্বারে আর। কোন গোয়েন্দারেও আর নজর রাখতে হয় না আমার উপরে। স্কুল থাইকা ফিইরা আর ফাঁকি দেওয়া হয় না ভাতঘুম। হারমোনিয়ামের কীগুলাতে আঙ্গুল চালাইবার প্রাণান্তর চেষ্টা থাকে ভাতঘুম শেষে। আম্মার চিন্তা কমে। আব্বা অবাক হয়। আমারে চুপ হয়া যাইতে দেইখা কোন কোন দিন আব্বা আমারে নিয়া যায় তাদের ক্যাম্পে। প্যারেড গ্রাউন্ডে ছাইড়া দেয় আমারে। খালি পায়ে আমি সবুজ ঘাসের উপরে হাঁটি। ঘাসগুলা জড়ায়া ধরে আমার পা। আমি ঘাসের ভাষা বুঝতে পারি! নত হই। আমি ঘাসের উপরে শুয়া পড়ি। যেন ঘাসেরে আলিঙ্গন করি আমি। আর ঘাসও আমারে।

আব্বাদের ক্যাম্পের ভেতর এক বিশাল দীঘি। দীঘির এক কোণায় মসজিদ। চারপাশে খেজুর বাগান। প্রায় সকালে আব্বার ফজরের নামাজের সঙ্গী হই আমি। কোন কোন সকালে আব্বা আমারে ওই দীঘিতে গোসল করাইতে নিয়া যায়। আব্বা আমারে ছাইড়া দেয় পুকুরে। আমি কি কোন হাঁস নাকি! জলে ভাসার মন্ত্র জানি না। আব্বা আমারে সাঁতার শেখায়। একদিন আমি জলে শরীর ভাসায়া রাখতে সক্ষম হই। জল থাইকা মাথা বাহির কইরা দীঘির চারপাশটারে দেখি। খেজুর গাছগুলা তার সরু লম্বা পাতা মেইলা রাখছে। ওই পাতার দিকে তাকায়া আমি ডুইবা যাইতে যাইতেও ডুবি না। নদী থাইকা বিতাড়িত আমি, আমারে কি আর ডুবাইতে পারবে দীঘি! শালবন থাইকা বিতাড়িত হইলেও খেজুরগাছ আর তার বাগান আমারে আপন কইরা নিল। স্কুল, ভাতঘুম, বাড়িতে পড়ার কাজ শেষ কইরা দুপুরের পরে বিকালের সোনা রোদ যখন হামলায়া পড়ে রাস্তায়, আমারে ঘর থাইকা তখন বাহির হইতে কেউ বাধা দেয় না। তারা জাইনা ফালাইছে আমি আর নদীতে যাই না। আমি যাই না দূরের ওই শালবনেও।

আমার বিকাল কাটে খেজুর বাগানে। খেজুর বাগানের এক মাথা থাইকা আরেক মাথায় হাঁইটা বেড়াই গোটা বিকাল। আমার প্রেম হয়া যায় খেজুর গাছের সাথে। আমি খেজুর গাছেরে জড়ায়া ধরি। আমি খেজুর পাতার দিকে তাকায়া বিড়বিড় করি। কী কথা কই আমি পাতার সাথে! কোন অভিযোগ তার কাছে জানাই অথবা কোন সে বেদনার কথা! আনন্দের কথাও কি কই আমি? এইসব আমারে জিগায় আমাদের বাসার মালিকের বউ। বাসার দুইতলার বারান্দায় প্রায়ই তিনি বইসা থাকেন। খেজুর বাগানটা সেইখান থাইকা স্পষ্ট দেখা যায়। তিনি কি তাইলে আমার দিকে নজর রাখেন! আমি তারে কিছুই কই না। আমার নীরবতার ভেতর তিনি কি আমার বেদনারে পইড়া ফালাইছেন! তিনিই রটায়া দিছেন, আমি যখন পথে হাঁটি গাছগুলা স্থির থাকতে পারে না। আমার সাথে সাথে তারাও নাকি হাঁটে।

দুইতলা বাড়িটার চাইরপাশে উঁচা প্রাচীর থাকলেও খোলা জায়গাও কম না। খোলা জায়গার পুরাটা জুইড়াই নারিকেল, সুপারি আর কাঁঠালের গাছ। ফুলের গাছও যে নাই, তা নয়। আন্টিরে মাঝে মাঝে নিচে নামতে দেখা যায়। গাছগুলার পরিচর্যা তিনিই করেন। আম্মার কাছে থাইকা আমার খবরাখবরও নেন। ‘ছেলেটা চঞ্চল’ আম্মার কাছে কইতে থাকেন। এইটা কি অভিযোগ নাকি প্রশংসা আমি বুঝতে পারি না। বুঝতে পারি আমারে তিনি পছন্দও করেন। প্রায়শই আমারে দুইতলায় ডাইকা নিয়া যান। সেইখান থাইকা ছাদে। ছাদ থাইকা গাছগুলার বাইড়া উঠার গল্প শোনান তিনি। তার গল্পের ভিতরে আমি গাছের জীবনচক্র পইড়া ফেলি। তিনি আমারে নিয়া গাছের পরিচর্যা শুরু করেন। আমি সুযোগ বুইঝা তারে বেতরাবতীর নদীটার কথা কই। আমার নদী প্রেম দেইখা তিনি অবাক হন। তার মায়া হয়। আন্টির এক ছেলে, এক মেয়ে। ডলি তার বড় মেয়ে। আপার সাথে দেখা হয় না আমার। ঢাকায় বড় কোন ক্লাসে পড়ে। বাবু ভাই আমার ভাইয়েরই সমবয়সী৷। একই কলেজে তারা পড়ে। আন্টি আমার আম্মা-আব্বার চোখ ফাঁকি দিয়া বাবু ভাইরে দিয়া আমারে নদী দেখতে পাঠায়।

শালবনে, বেতরাবতীর নদীর পাড়ে যাওয়ার দিনগুলা ফুরায়াই আসছিল। আন্টি আর তার ছেলে মিইলা আমারে সেই দিনগুলা ফিরায়া দিল। এই দিনগুলাতে কোন আতঙ্ক নাই, নাই কোন ফাঁকিবাজি। এইরকম দিন যতই আগাইতে থাকে আন্টি হয়া উঠে ততই আপন। যেন আমি বাবু ভাইয়ের মতোনই তার আরেকটা ছেলে। জ্যৈষ্ঠে কাঁঠাল পাকার গন্ধে সারা বাড়ি যখন চাউর হয়া যায়, আমার ডাক পড়ে। কাঁঠাল খাওয়ার সুখ্যাতি ততদিনে হয়া গেছে আমার। গাছ পাকা কাঁঠাল ততক্ষণ দোতলায় উঠে না যতক্ষণ না আমি ক্লান্ত হই। আমার কাঁঠাল খাওয়ার দৃশ্যে আন্টি তাকায়া থাকে। অই তাকানোর ভঙ্গিমায় কী লুকায়া থাকে? মুগ্ধতা নাকি শিশুর আনন্দ!

দুনিয়ায় নাইমা আসে শীত। খেজুরগাছের গলায় ঝুইলা থাকে হাড়ি। এইরকম হাড়ি ঝুইলা থাকার দিনে ফুরায়া আসে রূপকথার দেশে আমার আনন্দের দিন। ভাতঘুম থাইকা জাগায়া আমারে পরায়া দেওয়া হয় সবুজ রঙের সোয়েটার। সবুজ রঙের সোয়েটার পইরা আমি, আব্বা আর আমার দশ মাস বয়সী সহোদর নাভারণ বাজারে যাই৷ বাজারের একমাত্র ছবি তোলার স্টুডিয়োর নাম শাপলা। শাপলা স্টুডিয়োতে আমরা ছবি তুলি। ফোনের রিসিভার কানে রাইখা একটা সিঙ্গেল ছবিও আমার তোলা হয়। আমি বুঝতে পারি না এইসব ছবি তোলার মানে কী! ছবি কি কেবলই স্মৃতি ধইরা রাখার জন্যই তোলা হয় নাকি! কেউ কেউ বলতে থাকে, ‘বড় হয়া যতদিন না আসতাছো, এই ছবি দেইখা দেইখা তোমাদের ছোট দুই ভাইরে মনে রাখা হইবে’! আমি টের পাই, রূপকথার দেশ ছাইড়া আমারে চইলা যাইতে হবে।
বুকের ভেতর হুহু কইরা উঠে। গলায় হাড়ি ঝুলায়া রাখা খেজুর গাছগুলারে রাইখা কই যামু আমি! কই যামু নারিকেল, সুপারি আর কাঁঠালগাছ ঘেরা বাড়িটারে রাইখা! আন্টির মুখের দিকে তাকাই। অইখানে জগতের আন্ধাইর নাইমা আসে। বাবু ভাইরে কোথাও খুঁইজা পাই না। আমার মনে পইড়া যায় বেতরাবতীর নদীটার কথা। বাবু ভাই কি নদীর পারে! বাবু ভাই কি নদীটারে আনতে গেছে! আমরা যে চইলা যাইতাছি নদীটারেও কি আমরা সাথে নিয়া যামু না!

সন্ধ্যা ঘনায়া আসে। একটা একটা করে ব্যাগ উঠতে থাকে ভ্যানে। একটু পরেই রূপকথার দেশে বাস আইসা থামবে। নিজের হাতে বোনা মাফলার আমার গলায় জড়ায়া দেয় আন্টি। বাসার সামনের দোকানের খালেক আংকেল হাতে ধরায়া দেয় চিপসের প্যাকেট। আব্বার কলিগদের কেউ কেউ আসে। তারাও আমারে কিইনা দেয় নানান কিছু। আমার ব্যাগ ভইরা যায়। আমার দুই হাত ভইরা যায়। আমার কোল ভইরা যায়। কিন্তু এইসবের কিছুই তো আমি সাথে নিতে চাই না। আমি কেবল নিয়া যাইতে চাই নদীটারে। পাখিসমেত শালবনটারে। যেই পথে নদী, যেই পথে শালবন অই পথ ধইরা বাবু বাইরে আসতে দেখা গেল। বাবু ভাইয়ের হাতে নদী নাই। বাবু ভাইয়ের পকেটে শালবনটা নাই। আমার চউখ টলমল কইরা উঠে।

আমাদের ভ্যান আগাইতাছে। যেই পথে নাইমা আমার পথের হইছিল শুরু সেই পথটার দিকে একবার তাকাইলাম। সংক্ষিপ্ত হয়া আসলো সেই পথও। দৃশ্য থাইকা হারায়া যাইতে লাগল। হারায়া আর যাইতাছে কই। আমি টের পাইতাছি পথটা আমার বুকের ভিতরে ঢুইকা যাইতাছে। তার পিছনেই শালবাগান লাগোয়া আমাদের আগের বাড়িটা। ভ্যান আগাইতাছে। শালবাগান সমেত বাড়িটাও ঢুইকা যাইতাছে আমার বুকের ভিতরে। পিঁপড়ার সারির মতো লাইন ধরে একে একে আগায়া আসতাছে মাটির বাড়িগুলা, সাথে বিড়ি বানানো নারীগুলা। আগায়া আসতাছে কলাবাগান-পেঁপেবাগান, বেতরাবতীর পাড়ের খোলা মাঠ, নদীতে যাওয়ার রাস্তা। আমার বুকের ভেতরে একে একে ঢুইকা যাইতাছে ট্রেনসহ রেলব্রিজটা, পাখিসমেত নদীর জলে তলায়া যাওয়া আকাশটা। নদীর ওপারের শালবনসহ আমার বুকের ভেতরে ঢুইকা যাইতাছে নদীটাও।

ভ্যান আইসা থামলো বাস কাউন্টারে। আন্টি আমারে কোলে তুইলা নিল। পাশেই বাবু ভাই। তাদের পাশে আব্বার কলিগরা। একে একে ব্যাগ উঠানো হইলো বাসে। চইড়া বসলাম আমরাও। বাস আগাইতে থাকল। আন্টি হাত নাড়ল, হাত নাড়ল বাবু ভাই ও অন্যান্যরাও। অদৃশ্যও হয়া গেল তারা। গেল বটে, নাড়ানো হাতসহ আন্টির মুখ, বাবু ভাই, আব্বার কলিগরা ঢুইকা যাইতে লাগল আমার বুকের ভিতরে। ঢুইকা যাইতে লাগল বেনাপোল বর্ডার, আন্টিদের দোতলা বাড়িটা, আব্বাদের প্যারেড গ্রাউন্ড, মসজিদসহ দীঘিটা, গলায় হাঁড়িসহ খেজুর গাছগুলা। দৃশ্য থাইকা এইসব হারায়া গেলেও এইসব আমার ভিতরে ঢুইকা আমার বুকটারে ভারী কইরা তুলল। আমি টের পাইলাম, আমার গাল বাইয়া জল গড়ায়া পড়তাছে। আমি শুনতে পাইলাম, একটা অদৃশ্য হাত সেই জল মুইছা দিতে দিতে কইতাছে, ‘যে নদী তোমার ভেতরে ঢুইকা গেছে তারে তুমি থামায়া দিও না; যা কিছু তোমার ভিতরে ঢুইকা গেছে তার কোন কিছুই তুমি হারায়া যাইতে দিও না’।

 



জহির রিপন
কবি ও পরিব্রাজক


 

error: Content is protected !!