পাহাড়ের হাতছানি


পশ্চিম আকাশটা লাল আভায় ছেয়ে গেছে। পাহাড়ে লুটায়া পড়ছে তার রেশ। গোধূলির আলোয় ম্লান হতে হতে দূরের পাহাড়গুলারে মনে হলো বাড়ায়া দিছে তাদের হাত। তাইলে কি ওই পাহাড়গুলা আমারে ডাকতাছে হাতছানি দিয়া!


ময়মনসিংহ থাইকা ছাইড়া আসা রাইতের বাস মুরাদপুর বাসস্ট্যান্ডে থামল। না হওয়া রাইতের ঘুমে চোখ বুইজা আছে আমার। কার হাঁকডাকে যে চোখ মেইলা গেল, আমি তারে না খুঁইজা জানালা খুইলা তাকাইলাম বাইরে। শীতের সকাল। কুয়াশারে কাইটা রোদ লুটায়া পড়ছে ফুটপাতে। সেই রোদের কিছুটা শরীরে মাইখা দাঁড়ায়া আছে আব্বা। বাসের ভিতর থাইকা পাঠাইলাম ইশারা। হাতের সে ইশারা যেন জানান দিল, ‘চইলা আসছি’। আমারে দেইখা আব্বার মুখে ফুইটা উঠল চিরকালীন হাসি। কে কইব এই মানুষটাই মাসখানেক আগে পাহাড়ি রাস্তায় বাস দুর্ঘটনার শিকার হইছিল! এখনো লাইগা আছে তাঁর কপালে সেই চিহ্ন। যদিও কপালের দাগটা আব্বার হাসিরে ছাপায়া যাইতে পারে নাই।

বাস থাইকা নাইমা জড়ায়া ধরলাম আব্বারে। এই যে ধরা, তা বাপেরে বহুদিন পরে দেখার আবেগই কি কেবল! হারায়া যাইতে যাইতেও ফিইরা আসা আব্বা চুমু খাইলেন কপালে। বাস থাইকা নামতে থাকল জামাভর্তি ব্যাগগুলা। ব্যাগগুলাতে যে কেবল আমার জামায় আছে, তা না। আছে আম্মার জামাসহ সহোদরের জামাগুলাও। আব্বার দুর্ঘটনার খবর পায়া তারা তো প্রায় এক জামাতেই চইলা আসছিল।

আমারে রাইখা আসছিল আম্মা ফিইরা যাইবে বইলাই। আম্মার যে ফেরা হইবে না, তা যেমন আমি জানতাম না, তেমনই জানতাম না ময়মনসিংহ ছাইড়া আমারেও চইলা আসতে হবে স্কুলের পাট চুকায়া। চইলা যে আসতে হইবে এমন কথা তো ছিল না। রূপকথার দেশ কিংবা বেতরাবতী নদীটারে বুকে নিয়া কাইটা গেছে সাতটা বছর। আমি তো থিতুই হয়া গেছিলাম কাঁচামাটিয়া নদীটার পাড়ে।

মুরাদপুরে বাস থাইকা নামলেও আমার গন্তব্য চট্টগ্রামে আটকায়া গেল না। জামাভর্তি ব্যাগগুলা নিয়া আব্বা আর আমি চইড়া বসলাম আরো দূরগামী এক বাসে। মুরাদপুর ছাইড়া সেই বাস যতই আগাইতে লাগল, চোখের পলকে আমি দেইখা নিলাম চট্টগ্রাম শহরটার এক প্রান্ত। এই শহরটারে নিয়া কত কৌতুহলই তো আমার ভিতরে লুকায়া আছে। লুকায়া থাকা কৌতুহলের কিছুই না মিটায়া বাস ছাড়ায়া গেল শহর। আমার চোখে নাইমা আইলো জগতের সবচেয়ে গাঢ় ঘুম।

বাসের ঝাঁকুনিতে গাঢ় হওয়া ঘুম ভাঙতাছে কি ভাঙতাছে না। আধো ঘুম আধো জাগরণে আমি টের পাইতাছি আমাদের বাসটা যেন রোলার কোস্টারে পরিণত হইছে। রোলার কোস্টারে বইসা ঘুমানো তো অসম্ভব। মাথা তুইলা আমি বাহিরে তাকাইলাম। এই কোথায় আইসা পড়ছি আমি! আমার চোখ যতদূর দৃষ্টি ফেলতেছে ততদূর উঁচা উঁচা টিলা। টিলার বুকে ঘন হয়ে আসা বৃক্ষের অরণ্য। সারি সারি গাছ নিয়া খাড়া দাঁড়াইয়া থাকা অইগুলারেই বুঝি কয় পাহাড়! এক টানে আমি জানালাটা খুইলা দিলাম। মাথাটা ঠেইলা দিলাম জানালার বাইরে। সবুজ পাতার উপরে রোদ ঝলমল করলেও বাতাসে এখনো লাইগা আছে শীতের হিম। হিম হাওয়া আমরা চুল ওড়ায়া নিতাছে। শীতের হাওয়া আমার চোখে-মুখে তীরবিদ্ধ করতাছে। এ কেমন তীর যা আমার হৃদয়টারে আনন্দে নাচাইতাছে!

ইঞ্জিনে গর্জন তুইলা খুব ধীরে বাস আগাইতাছে। বাসের গতি কইমা যাওয়ার কারণ খুঁজতে আমি সামনের রাস্তাটার দিকে তাকাইলাম। আঁকাবাঁকা রাস্তাটা এইখানে আইসা এতোটাই খাড়া যে মনে হইতাছে আকাশের দিকে চইলা গেছে। বাসটার গতি এতোটাই কইমা গেছে যে হয়ত এখনি সে গড়ায়া নিচের দিকে চইলা যাবে। নিচের দিকেই যদি বাসটা যায় তাইলে কই যাবে? বাসের সম্ভাব্য গন্তব্যের কথা ভাইবা আমার বুক কাঁইপা উঠল। আমি আব্বার বাহু জড়ায়া ধরলাম। আব্বা আমারে অভয় দিলেন। আমি চোখ বন্ধ করলাম।

চোখ বন্ধ কইরাই আমি টের পাইলাম কোথাও বাস থাইমা আছে। কোথায় সেটা? পাহাড়ি খাদে? বুকের ভেতরের ঢিপঢিপটা বাড়তে লাগল। আমি চোখ মেললাম। সবুজ রঙয়ের এক সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘গাড়িটানা বাজার’। আমি নইড়া চইড়া বসলাম। আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুইড়া ঢুইকা গেল এই নাম। আমি এই নাম থাইকা চোখ সরাইতেই চারদিকে ঝুরি ছড়ায়া রাখা প্রকাণ্ড এক বটগাছ তার দেহরে মেইলা ধরল আমার চোখের সামনে। আমার চোখ আটকায়া গেল বটগাছটায়। কত বয়স হবে গাছটার! আমি আঁচ করতে পারলাম না। তবু অনায়াসে কইয়া দেওয়া যাইতে পারে আমার বয়সের দশগুণ তো হবেই। শতবর্ষী এই বটগাছ যেন গাড়িটানা বাজারের পাহারাদার। থাইমা থাকা বাসটা যাত্রী নামায়া আবার আগাইতে থাকল কি থাকল না বটগাছটা কথা কয়া উঠল। ঝুইলা থাকা ঝুরিগুলা নাড়াইতে নাড়াইতে বটগাছ যেন কইল, ‘এই পাহাড়ি জনপদ আমার অরণ্য। আমার ভুবনে তোমারে স্বাগতম, হে কিশোর’।

কখনো খাড়া আকাশের দিকে তো কখনো মাটির তলার দিকে, আঁকাবাঁকা রাস্তা ধইরা বাস আগাইতাছে। অথচ বুকের ভেতরের ঢিপঢিপটার কোন অস্তিত্ব পাওয়া যাইতাছে না। আমার ভেতর থাইকা যেন সমস্ত ভয় উইবা গেছে। আমি রাস্তাটারে আত্মস্থ করার চেষ্টা করতাছি। আমার আত্মস্থতার ভেতর বাস আবার থামল লোকে লোকারণ্যে এক বাজারে। রাস্তার পাশের দোকানের মাথায় দাঁড়ায়া থাকা সাইনবোর্ডগুলার দিকে তাকায়া আমি জানতে চেষ্টা করতাছি বাজারের নাম। ‘তিনটহরী’ আমি খুঁজেও পাইলাম নামটা। যতটা অদ্ভুত লাগলো নামটারে তারচেয়েও অদ্ভুত লাগল বাজারটারে। হাট বার নাকি! রাস্তার দুইপাশে অস্থায়ী দোকান। অস্থায়ী দোকানগুলার বেশিরভাগই শাকসবজি আর ফল-ফলাদির। এতো মানুষ রাস্তায় যে আমাদের বাস আগাইতেছেই না। আমি মানুষগুলার দিকে তাকাইলাম। অবাক লাগল আমার। এইসব মানুষের ছবি তো আমি পরিবেশ-পরিচিতি সমাজ বইটির পাতায় দেখছি। চাকমা-মারমা আদিবাসীদের চেহারার আদল তাদের মুখে। যাদের আমি এতোকাল বইয়ের পাতায় দেখছি, তাদের সরাসরি দেখব আমি কি কোনোদিন ভাবছি!

তিনটহরী বাজার পার হইতে না হইতেই আমার চোখে বিস্ময় আইসা হাজির হইলো। দূরের পাহাড়গুলার দিকে তাকায়া থাকতে থাকতে আমি দেখতে পাইতাছি আকাশের মেঘে মাথা ঠেকায়া দাঁড়ায়া আছে এক বৌদ্ধমূর্তি। আমাদের বাস যত সামনের দিকে আগাইতে থাকল গাছগাছালির ভেতর থাইকা সোনালি মূর্তিটা আরো স্পষ্ট হইতাছে। কতোটা উঁচা এই মূর্তি? আমাদের বাড়ির নারিকেল গাছটার চেয়েও বেশি নাকি!

মূর্তিটার দিকে ততক্ষণই আমার চোখ আটকায়া থাকল যতক্ষণ না বাস থামল। আমাদের বাস দাঁড়াইয়া আছে মহামুনি টিলায়! আমার চোখ খুঁজতে লাগল আশপাশে কোন টিলা আছে কিনা! যেইখানে হয়ত কোন না কোন মুনি ধ্যানরত। তাঁর ধ্যান কতোটা গভীর হইলে সে মহামুনিতে পরিণত হইছে। বাসের ভিতর থাইকা কতটুকুই আর বাহিরটারে দেখা যায়। আমি কোন টিলা খুঁইজা পাওয়ার আগেই বাসটা আবার চলতে শুরু করল।

ছোট্ট একটা লোহার ব্রিজ পার হইয়া মানিকছড়ি বাজারে থামল বাস। এই মানিকছড়িতেই তো আমাদের যাত্রা শেষ হইবার কথা। কিন্তু আব্বার মইধ্যে বাস থাইকা নামার কোনো তৎপরতা দেখা গেল না। আর কতদূর যাইতে হবে আমাদের? এই প্রশ্ন আমার ভেতরে শেষ হইবার আগেই উত্তর পায়া গেলাম। আব্বা নইড়া চইড়া বসলেন।

যে বাজারটাতে আমরা নামলাম তার নাম গচ্ছাবিল। নামের শেষে বিল থাকলেও পাহাড়ি এই জনপদে বিল কি পাওয়া যাইবে? পাওয়া যাক আর না যাক আমি চোখ ঘুরায়া বাজারটারে দেইখা নিলাম। বাজারের বুক ছিঁইড়া চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ির সড়কটা চইলা গেছে। রাস্তার দুই পাশেই দোকান। বেশিভাগ দোকানই কাঠ আর বাঁশ দিয়া বানানো। বাজার থাইকা সরু একটা রাস্তা চইলা গেছে উত্তরের দিকে। আব্বা সেইদিকে পা বাড়াইলেন। আব্বার পিছে পিছে পা চালাইলাম আমিও। বাজার থাইকা বাহির হইতেই মাদ্রাসা লাগোয়া দীঘি। দীঘিটা পার হইলেই ঢালুপথ। দুইধারে মাটির ঘর। মিনিট তিনেক হাঁটলাম কি হাঁটলাম না পথের ধারের তেমনি এক মাটির ঘরের পাশে আব্বা থামলেন। উঁচা রাস্তা থাইকা ছয়-সাত ধাপের সিঁড়ি বায়া বাড়ির আঙিনায় পা ফেললাম। আর তখনি ঘর থাইকা বাহির হয়া আসলেন আম্মা। সাথে সহোদরও। আম্মারে এক মাস পরে দেখলাম। এতো লম্বা সময় আম্মার কাছ থাইকা তো কখনোই আমার দূরে থাকা হয় নাই।

রাতের না হওয়া ঘুমে ঢইলা পড়লাম আমি। দীর্ঘ সেই ঘুম ভেঙে গেলে ঘড়িতে দুপুর গড়ায়া বিকাল আসি আসি করতাছে। এই প্রথম মাটির ঘরে ঘুমানো হইলো আমার। বিছানা ছাইড়া ঘরের বাইরে বাহির হইলাম। রাস্তা থাইকা অন্তত পাঁচ ফুট নীচে সমতল এই জায়গাটাতে তিনটা মাটির ঘর। মাঝখানে লম্বা উঠান। আমার বুঝতে বাকি রইলো না, কয়েকটা মাস কিংবা কয়েকটা বছরের লাইগা এইটাই আমাদের নতুন বাড়ি। তা সে কত মাসের লাইগা, কত বছরের লাইগা কে জানে!

বিকালে পরিপাটি পোশাক পরায়া আব্বা আমারে নিয়া রওনা হইলো আব্বার ক্যাম্পে। ততক্ষণে ক্যাম্পে চাউর হয়া গেছে সাত বছর আগের বেতরাবতী নদী আর শালবনে ঘুইরা বেড়ানো পাখিটা কত বড় হয়া গেছে। গচ্ছাবিল বাজারের পাশেই ছোট্ট পাহাড়ি খাল। খালের উপর লোহার ব্রিজ। লোহার ব্রিজটা পার হইলেই একপাশে মানিকছড়ি নদী অন্যপাশে পাহাড়। এই পাহাড়ের চূড়াতেই আব্বাদের ক্যাম্প। রাস্তায় পাশেই আর পি পোস্ট। পোস্টের পাশে দিয়াই পাহাড় কাইটা বানানো সিঁড়ি। আব্বা আমারে নিয়া সিঁড়ি বায়া পাহাড়ের চুড়ায় উঠতে লাগলেন। এই প্রথম আমার পাহাড়ে পা দেওয়া। শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকায়া পায়ে ভর দিয়া একটা একটা সিঁড়ি আমি ভাঙতে লাগলাম। সিঁড়ি ভাঙা শেষ হইতে না হইতেই আমি হাঁপাইতে লাগলাম। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছায়া যেন আমি আর দমেই ফেলতে পারতাছি না।

পাহাড়ে চড়ার সাময়িক ক্লান্তি কাইটা গেলে মাথা তুইলা চাইরপাশে তাকাইলাম আমি। চাইরপাশের যেদিকেই তাকাই ছোট ছোট পাহাড়। পাহাড়ের ক্ষেত্রতলে কোথাও কোথাও বাড়িঘর। নদীটারে মনে হইতাছে পাহাড়ের কোলে ছোট কোন খাল। পশ্চিম আকাশটা লাল আভায় ছেয়ে গেছে। পাহাড়ে লুটায়া পড়ছে তার রেশ। গোধূলির আলোয় ম্লান হতে হতে দূরের পাহাড়গুলারে মনে হলো বাড়ায়া দিছে তাদের হাত। তাইলে কি ওই পাহাড়গুলা আমারে ডাকতাছে হাতছানি দিয়া!



জহির রিপন
কবি ও পরিব্রাজক


error: Content is protected !!