স্কুল বদলের দিনে


অন্য পাশ দখল কইরা রাখছে একাই একটা বটগাছ। সেই বটগাছের দিকে নির্নিমেষ তাকায়া থাকতে দেখে লাকী আপা জিগাইলেন, ‘বলো তো, গাছটার বয়স কত হবে?’ আমি ভাবি, কত আর! পঞ্চাশ, ষাট না হয় একশ! আপা কইলেন, ‘ এই গাছের বয়স তিনশ বছরেরও বেশি’। আমি ঘাড় ঘুরায়া আবার গাছটারে দেখলাম। সকালের রইদে প্রকাণ্ড কান্ড নিয়া দাঁড়ায়া থাকা গাছটারে আমার ঋষিতুল্য কেউ মনে হইলো


পাহাড়ি জনপদের ঘোরে পইড়া টেরই পাইলাম না কখন যে লম্বা হয়া গেলাম। অষ্টম শ্রেণী থাইকা নবম শ্রেণীতে উইঠা গেলে এইরকম হুট কইরাই লম্বা হয়া যায় নাকি মানুষ! লম্বা হইলাম বটে, বড়ও কি হইলাম! যদি নাই বা হই, কী কইরাই বা মাইনা নিলাম অতি চেনা গ্রামেরে ছাইড়া আইসা এই অচেনা পাহাড়ি জনপদেরে!

ক্লাসের প্রথম দিন। নেভি ব্লু প্যান্টটা ঠিক থাকলেও বদলায়া গেছে স্কুলশার্ট। আকাশি শার্টের বদলে আমি পইরা নিলাম নতুন জামা। ধবধবে শাদা। পুরানা স্কুলব্যাগটা কাঁধে চাপাইলেও বদলায়া গেছে স্কুলের বাহন। ঘর থাইকা বাহির হইতেই বুকের ভেতর হুহু কইরা উঠতাছে। না, অতোটা বড়ও হই নাই। আমার উড়ালপঙ্খী সাইকেলটার লাইগা কাঁইদা উঠল মন! যে সাইকেলটাতে প্যাডেল মাইরা খুব সকালে কাঁচামাটিয়া নদীর পাড়ের স্কুলে যাইতাম, কিরম আছে সে? সাইকেলটার চেইনে মবিল দেওয়া হয় না ম্যালাদিন! মরিচা ধইরা গেছে নাকি, কে জানে!

গচ্ছাবিল বাজারের দিকে আগাইতে আগাইতে মনে মনে সাইকেলটাতে প্যাডেল মারলাম। প্যাডেল মারতে মারতে থামলাম আব্বাদের ক্যাম্পের চেকপোস্টের সামনে। চেকপোস্টের বিপরীতে মসজিদ। মসজিদের গেইটে বড় দুইটা কাঁঠাল গাছ। দাঁড়ায়া থাইকা কাঁঠাল গাছের তলায় তাকায়া আছি আব্বাদের ক্যাম্পের পাহাড়টার দিকে। পাহাড়টারে ছাড়ায়া দৃষ্টি আরো দূরে চইলা যাইতাছে।। ঈশ্বরগঞ্জ-ময়মনসিংহ সড়ক থাইকা ঢাল গড়ায়া একটা রাস্তা চইলা গেছে সোনালি টকিজের দিকে। আমার সাইকেলটা সড়ক থাইকা ছাইড়া দিলেই ওই ঢাল গড়ায়া চইলা যাইতো সোনালি টকিজের সামনে। সিনেমার রঙিন পোস্টারের দিকে আড়চোখে তাকায়া একটু আগাইলেই বিশ্বেশ্বরী পাইলট। পাহাড়ের ওইপারে যতদূরে দৃষ্টি পড়ছে আমার তার শেষ প্রান্তে বিশ্বেশ্বরী পাইলটের মূল ভবনটারে দেখতে পাইলাম। ওই ভবনটাতে বুঝি আমার আর কখনোই যাওয়া হইবে না? প্রশ্ন আছে, উত্তর জানা নাই। উত্তরের আশায় পাহাড় কিংবা পাহাড়েরও আরো দূর থাইকা দৃষ্টি সরায়া ডাইনে-বামে তাকাইলাম।

ঠোঁটে হাসি ঝুলায়া চোখের পাতা নাচাইতে নাচাইতে লাফায়া লাফায়া আগায়া আসতাছে লাকী আপা। তার পিছনে রেহেনা আর হাসনাহেনা। লাকী আর রেহেনা দুই বোন। আব্বার বন্ধু কফি আনানের মেয়ে তারা। হাসনাহেনা তাদেরই ফুফাতো বোন। দুয়েকদিন আগে এদের লগে প্রথম দেখা। কফি আনান আংকেলই ডাইকা নিয়া পরিচয় করায়া দিলেন। রেহেনা আর হাসনাহেনা আমার ক্লাসেরই। লাকী আপা এক ক্লাস উপরে। আমার সামনে আইসাই চোখের পাতা আবার নাচাইলেন। নাচাইতে নাচাইতেই কইলেন, ‘আসমানে তাকায়া কী দেখতেছিলা?’। কী যে দেখতেছিলাম তা তো একান্ত গোপন। ‘আপনার আব্বার নাম সত্যিই কফি আনান?’- জিগাইতে গিয়াও আমি থাইমা গেলাম। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, গায়ের রঙ কিংবা চুলের স্টাইল, জাতিসংঘের প্রেসিডেন্টের লগে জাহাঙ্গীর আংকেলের এতো মিল! দুইজনরে একলগে দাঁড়া করায়া দিলে কে যে সত্যিকারের কফি আনান চেনা মুশকিলই হবে।

কফি আনান বিষয়ক কৌতুহল থামতে না থামতেই বাস আইসা থামল। চোখে ইশারা দিলেন লাকী আপা। বুঝতে বাকি রইল না স্কুলের আলাদা কোনো বাস নাই আমাদের। এই গণপরিবহনই পৌঁছায়া দিবে স্কুলে। আমারেই আগে উঠতে দেওয়া হইল। পিছে পিছে লাকী আপা, রেহেনা, হাসনাহেনা। এছাড়াও আরো কয়েকজন উঠল বটে কিন্তু তাদের কাউকেই চিনি না। তাদের না চেনাটা আমার ভেতরে কোনো ভাবনা না জাগাইলেও এইখান থাইকা যে কোনো ছেলে স্কুলের বাস ধরে না তা আমারে ভাবায়া তুললো। আমার ভাবনার ভেতরে আবারো ফালি কাটল লাকী আপার চোখের পাপড়ির নাচন। কী আশ্চর্য এই মেয়ে! মুখে তার ভাষা সামান্যই। চোখের ভাষাতেই দেখি কথা কয় বেশী! বাসে যে কয়টা সীট ফাঁকা, তারচেয়ে আমরা মানুষ বেশী। আমি দাঁড়ায়া থাকতে চাইলাম। লাকী আপা চোখের ইশারায় বসতে কইলেন। আমি বসতে না চাইলে চোখের ভাষা তাঁর থাইমা গেল। এইবার ঠোঁট নাইড়া উঠল, ‘আমাদের স্কুলে আজ তোমার প্রথম দিন। প্রথম দিনেই দাঁড়া করিয়ে তো নিয়ে যেতে পারি না’। বসতে বসতে তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। স্মিত হাসলেন। শব্দহীন সে হাসি ছড়ায়া পড়ল বাসের আনাচে-কানাচে।

একপাশে পাহাড়ি নদী, অন্য পাশে বাড়িঘর। মাঝে মাঝে ছোট ছোট টিলা। বাস কিছুদূর আগায়া যাইতেই নদীটা হারায়া গেল পাহাড়ের বাঁকে। আমি কি একবার লাকী আপারে জিগামু, ওই নদী কই গেছে? আপা কি রাখে নদীর খবর? আমি তাঁর দিকে তাকাইলাম। পলকহীন তাকায়া আছে সে বাসের উইনশীল্ড গ্লাসের দিকে। আমি তাঁর চোখের দিকে। আচমকা ব্রেক কইষা বাস থাইমা গেল। আপা আমার দিকে তাকাইলেন। চোখে চোখ পড়ায় কিশোর মুখ আমার লাল হইলো কি হইলো না আপা কাঁধে হাত রেখে ডাক দিলেন। বাহিরের দিকে ইশারা দিয়া কইলেন, ‘এইটা মৈত্রী কলেজ’। থাইমা থাকা বাসের ভেতর বইসা কলেজটার দিকে তাকায়া রইলাম। একটাই ভবন। লাল ইটের । প্রথম দেখায় যে কেউ হয়ত রাজবাড়ি মনে কইরা অবাক হইতে পারে। লাল ভবন দেইখা অবাক না হইলেও কলেজের নাম শুইনা অবাক হইলাম। কে যে কার সাথে গইড়া মৈত্রী, বানাইছে এই কলেজ কে জানে!

কলেজে ঢুকলেই হয়ত জেনে যাব কলেজের ইতিহাস। কিন্তু কে আমারে জানাইবে কলেজের পাশে ছোট্ট বাজারের নাম কেন হইলো ধর্মগড়! বাজারের একপাশ দখল কইরা রাখছে আদিবাসী দোকানপাট আর অন্য পাশ দখল কইরা রাখছে একাই একটা বটগাছ। সেই বটগাছের দিকে নির্নিমেষ তাকায়া থাকতে দেখে লাকী আপা জিগাইলেন, ‘বলো তো, গাছটার বয়স কত হবে?’ আমি ভাবি, কত আর! পঞ্চাশ, ষাট না হয় একশ! আপা কইলেন, ‘ এই গাছের বয়স তিনশ বছরেরও বেশি’। আমি ঘাড় ঘুরায়া আবার গাছটারে দেখলাম। সকালের রইদে প্রকাণ্ড কান্ড নিয়া দাঁড়ায়া থাকা গাছটারে আমার ঋষিতুল্য কেউ মনে হইলো।

মহামুনি টিলা ছাড়ায়া বাস থামলো স্মৃতিধাম ভাবনা কেন্দ্রের সামনে। লাকী আপার চোখ পুনরায় কথা কইল৷ আমি টের পাইলাম আমাদের নামার সময় হইলো৷ দূর থাইকা দেখা বুদ্ধমূর্তিটা এখন হাতের দূরত্বে। সোনালি আভা তার ছড়ায়া পড়ছে পাহাড়ে পাহাড়ে, গাছের পাতায়, শাখা-প্রশাখায়। কাঁচামাটিয়া নদী থাইকা স্মৃতিধাম ভাবনাকেন্দ্রের দূরত্ব আমি মাপতে পারতাছি না। অথচ কাঁচামাটিয়া নদী তীরবর্তী বিশ্বেশ্বরী পাইলট থাইকা একটা সড়ক দুর্ঘটনা আমারে নিয়া আসছে এই ভাবনাকেন্দ্রের দেয়ালঘেঁষা স্কুলে।

সড়ক থাইকা লম্বা মাঠ পার হইলেই তিনটহরী উচ্চ বিদ্যালয়৷ নবম শ্রেণীর শ্রেণীকক্ষ থাইকা স্মৃতিধাম ভাবনাকেন্দ্রের বুদ্ধমূর্তিটা স্পষ্ট দেখা যাইতাছে। ক্লাসে মেয়েদের সংখ্যা বেশি হইলেও ছেলেদের সংখ্যা হাতে গোনা৷ কয়জন হবে আর? ১২, ১৪ কি ১৭। বিশ্বেশ্বরী পাইলটে ছেলেদের ছিল আলাদা সেকশন৷ এক সেকশনেই শ’দুয়েক ছেলে। মাঝামাঝি সারির বেঞ্চে বসতাম, যেন অজিত স্যারের বাংলা ক্লাসে বইসা কলম দিয়া কাটাকাটি খেলতে পারি। এইখানে প্রথম সারি, মাঝামাঝি সারি বা শেষ সারি বইলাই কিছু তো নাই। কলম দিয়া কাটাকাটি খেলতে যে পারব না, এই ভাইবা মন খারাপ হইল। শেষ বেঞ্চে বসলাম। খানিকবাদেই লাকী আপা আইসা ক্লাসে ঢুকল। পিছন বেঞ্চ থাইকা ব্যাগ টাইনা আইনা সামনের বেঞ্চে বসাইলেন আর মোটামুটি শিক্ষকসুলভ ভাব নিয়া ক্লাসে পরিচয় করায়া দিলেন, ‘আমার ভাই। তোমাদের নতুন সহপাঠী’।

ক্লাসে বাঙালি ছেলেমেয়ের চেয়ে অবাঙালি ছেলেমেয়ের সংখ্যাই বেশি। এরই মধ্যে একজন হাত বাড়ায়া দিল, ‘উমংচিং মারমা’। একে একে হাত বাড়ায়া দিল সুশান্ত চাকমা, সিদ্দিক, জাফর, রনি। ক্লাসের প্রথম বেঞ্চের মেয়েটা তাকাইল আড়চোখে। শাহিনুর, মায়া ডি কস্টা, লিসামনি মারমা জানাইল, হ্যালো।

ইংরেজি ক্লাসটা শুরু হইলো পহেলা পিরিয়ডে। বেটে ফর্সামতো যে স্যার ক্লাস ঢুকলেন এতোটাই তরুণ সে তারে স্যার না ভাইবা এক ক্লাস উপরের বড় ভাই ভাবা যায় অনায়াসে। ‘তুমিই নতুন ভর্তি হয়েছ’- নজরুল স্যার পরিচয় জাইনা নিয়া ক্লাস শুরু করতে না করতেই ঘন্টাধ্বনি বাইজা উঠল। শুরু হইতে না হইতে ক্লাস শেষ হয়া গেল নাকি! কোথা থাইকা ভাইসা আসল এই ঘন্টাধ্বনি। যতক্ষণ না ছুটি হইল স্কুল, আমার মনযোগ আটকায়া রইল ওই ঘন্টাধ্বনিতে।

স্কুল থাইকা মহামুনি টিলার দূরত্ব এক কিলোমিটার। বাড়ি ফেরার লাইগা আমাদের হাঁইটা যাইতে হবে সেইখানেই। পিচঢালা পথ ধইরা দুইটা পাহাড় আমাদের পাড়ি দিতে হইবে৷ বাসগুলা যে ক্যান স্কুলের সামনে থামতে চায় না, বুঝি না৷ অন্তত দুইটা পাহাড়ের মধ্যে যে খাড়া ঢাল বাইতে হয়, তা থাইকা রক্ষা পাওয়া যাইতো। ঢাল বাইতে বাইতে ক্লান্তিতে পথের পাশে বইসা পড়লে লাকী আপা পানির বোতলটা বাড়ায়া দিলেন। ‘ধীরে হাঁটো, সমান তালে’- আপা বাতলায়া দিলেন ক্লান্তিহীন হাঁটার কৌশল। তবু ক্লান্তি ছাড়ে না৷ মহামুনি আইসা দেখি আমাদের আগেই পৌঁছায়া গেছে বাকি সকলেই। কমছে কম ৫০-৬০ জন তো হবেই। ওদের স্ট্যামিনা দেইখা আমি হতাশ হইলাম৷ হতাশ মুখের দিকে আপা তাকায়া মায়ার দৃষ্টি ফেললেন নাকি! ‘যে বাসটা আসবে এই বাসে সবাই যাইতে পারব না৷ আমরা একটু দেরিতে যাই বরং’- আপা কইলেন। কতক্ষণ যে দাঁড়ায়া থাকতে হবে কে জানে। কথা কম কওয়া ছেলে আমি ধুরু ধুরু বুকে আপারে জিগাইলাম, ‘এই বাজারের নাম মহামুনি টিলা। কিন্তু সেই টিলাটা কই?’ আপা পিছনে তাকাইতে কইলেন। তাও চোখের ইশারাতেই। তাকাইলাম আমি। আমরা দাঁড়ায়া আছি টিলাটার শেষ প্রান্তে। ‘আসো আমার সাথে’- আপা কইলেন। একটা একটা সিঁড়ি ভাইঙা টিলাটার চূড়ায় উইঠা দাঁড়ালাম। টিলাটির অপর প্রান্তে মানিকছড়ি নদী। নদীর বুকে বাঁশের ভাঙা সাঁকো। প্রায় জলহীন নদী পার হইলেই রাজবাড়ি। তার পরেই মানিকছড়ি বাজার। পরনের কাপড় হাঁটু অবধি তুইলা কয়েকজন পাহাড়ি নারী পার হয়া যাইতাছে নদী। পিঠে তাদের ঝুইলা রইছে ঝুড়ি। বাজার বসার সময় হইল, পায়ে তাদের ভীষন তাড়া। তাদের তাড়ার দৃশ্য আমার কিশোর অন্তরে ঢুইকা জানান দিল, স্কুল বদলের দিনের পাহাড়ি এই জনপদেরে কোনোদিন ভুলা যাবে না।



জহির রিপন
কবি ও পরিব্রাজক


error: Content is protected !!