পাহাড়ের গান


টের পাইতে থাকি লাকি আপার মন খারাপ হয়। তাঁর মন খারাপের ভেতরে আমার আনন্দ টগবগ কইরা ফুইটা উঠলেও তাঁর জন্যও আমার মন খারাপ হয়। সেই মন খারাপের কথা না লাকি আপা, না আমি লুকাইতে পারি। আমরা টের পাইতে থাকি আমরা দুইজন পরস্পরের বন্ধু হয়া গেছি। যে-কোন কথা আমি অনায়াসে জানাইতে পারি তাঁরে।


কয়েকটা দিন যাইতে না যাইতেই স্কুলের বাসে জুইটা গেল সোহাগ। একই স্কুলের একই ক্লাসে পড়া সে হইল একমাত্র ছেলে বন্ধু, গচ্ছাবিল থাইকা যে কিনা স্কুলের বাস ধরে। ধরে বটে, কিন্তু বেশিরভাগ দিনই তার দেখা পাওয়া যায় না। স্কুলের বাসে কিংবা ক্লাসে তার দেখা না পাওয়া গেলেও গচ্ছাবিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে প্রতি বিকেলেই তার দেখা নিয়মিতই পাওয়া যায়। কোন কোন দিন তারে জিগাই, ‘স্কুলে যাও না ক্যান?’। সে কোন জবাব না দিয়া বরং ওভারে ছয়টা বলরেই কিভাবে ইয়র্কার বানানো যায় এই আলাপ করে।

বামহাতি ফাস্ট বোলার সে। আমরা দুইজন বন্ধু হওয়ায় ভাগ-বাটোয়ারার খেলায় বেশিরভাগ দিনই বিপক্ষ দলে থাকে সে। ইনিংস ওপেন করতে নাইমা তার ইয়র্কার সামলানোর দায়িত্বও আমার উপরেই পড়ে। পর পর কয়েকদিন তার বলে বোল্ড হইয়া যাওয়ার লজ্জা আমারে খুঁইড়া খুঁইড়া খায়। ডাউন দ্য উইকেটে গিয়া তার ইয়র্কার বলেরে ফুলটস বানায়া স্ট্রেইটে ছক্কা মারার নেশা পায়া বসে। স্ট্রেইটটা খুব লম্বা না হওয়ায় বল গিয়া পড়ে সামনের পাহাড়ের ঝোপঝাড়ে। আর বিপত্তিটা বাঁধে এইখানেই। অই পাহাড়ে যে বল পাঠাইবে বলটা কুড়ায়া আনতে হবে তারেই। সোহাগের ইয়র্কাররে ফুলটস বানায়া ছক্কা মারতে গিয়া দিনে অন্তত কয়েকবার ওই খাড়া পাহাড়টাতে উঠতে হয় আমারে।

ছক্কা মারতে মারতে, পাহাড়ে চড়তে চড়তে স্কুল ছুটির পরে যে খাড়া পাহাড়টারে পাড়ি দিয়া মহামুনি টিলায় আইসা বাস ধরতে হয় সে পাহাড়টারে পাড়ি দেওয়া সহজ হয়া গেল। আমার আর লাকি আপার মধ্যে এক অলিখিত প্রতিযোগিতা চালু হয়া গেল যে কে আগে মহামুনি টিলায় পৌঁছাইতে পারে। কোনদিন লাকী আপা আগে তো কোনদিন আমি পৌঁছাইতে থাকলে আমার ভেতরে তখন আরো জিদ চাইপা বসে যে কী কইরা প্রতিবার আমিই আগে পৌঁছাইতে পারি।

পুরোদমে স্কুল চালু হওয়ায় বিকেলের খেলায় ছক্কা মারার দিন ফুরায়া আসলে গচ্ছাবিলের স্কুলের মাঠের পাশের পাহাড়টাতে চড়ার দিনও ফুরায়া আসে। অথচ ফুরায়া আসে না আরো কত দ্রুত পাহাড়ে চড়া যায় সেই নেশা। নেশা কাটাইবার লাইগা আগায়া আসেন আব্বাদের ক্যাম্প থাইকা নদী পাড় হইয়া সাতটা পাহাড়ের পরে ফাঁড়িতে থাকা আব্বার কলিগ কামরুল আংকেল। এক বিকালে তিনি আমারে তাঁদের ফাঁড়িতে নিয়া গেলে রাস্তাটা চিইনা যাই আমি। গচ্ছাবিল বাজারের ঢাল থাইকা নাইমা পাথরে নদীটার ঠাণ্ডা জলে খুব সাবধানে পা ভিজায়া অইপারে চইলা গেলেই পাহাড়ি জঙ্গল। জঙ্গলের ভেতর নাম না জানা যত সব গাছের ফাঁক দিয়া প্রথম পাহাড়টা পার হয়া গেলেই ধানি জমি। ক্ষেতের আইল ধইরা হাঁইটা দ্বিতীয় পাহাড়টার ঢালে আনারস বাগান। বাগানের ভিতর দিয়া সরু রাস্তা ধইরা আগাইতে আগাইতে পাহাড়টার চূড়ায় দাঁড়াইলে যতদূর চোখ যায় পাহাড় আর পাহাড়। একবার পাহাড়ে চড়া তো আরেকবার একই পাহাড়ের ঢাল গড়ায়া নামা এই করতে করতে অষ্টম পাহাড়টা দেড় ঘন্টার পথ। রোজ শুক্রবার সকালে ঘুম থাইকা জাইগা এই অষ্টম পাহাড়টার কাছেই হাজিরা দিতে লাগলাম।

ফাঁড়ির পাহাড়টার চারপাশে তারকাটার বেড়া। চূড়ায় তাঁবুসদৃশ একটাই দু’চালা ঘর। ঘরে বাঁশ দিয়া বানানো লম্বা খাট। এতো লম্বা যে এক খাটেই কুড়িজন অনায়াসে শোয়া যায়। ফাঁড়িতে ঢুকার লাইগা পাহাড় কাইটা বানানো হইছে সিঁড়ি। সিঁড়ির শেষ মাথায় চেকপোস্ট। বন্দুক হাতে সার্বক্ষণিক বইসা থাকেন একজন। পাহাড়টার বাকি তিনদিকে তিনটা উঁচা উঁচা গোলাকার মাটির ঘর। সেই ঘরে বইসা বন্দুক তাক কইরা দিন পার কইরা দেয় তিনজন। কামরুল আংকেলরে কোন কোন দিন কোথাও খুঁইজা না পাইলে সেই ঘরে গেলেই ডিউটিরত পাওয়া যায়। যতক্ষণ না উনার ডিউটি শেষ হয় ততক্ষণ অই ঘরেই কাটে আমার। তাক করা বন্দুক থাইকা বুলেট সরায়া কখনো কখনো আমিই হয়া যাই সৈনিক।

দিন যতই আগাইতে থাকে, লাকি আপার সাথে প্রতিযোগিতা ততই বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে লাকি আপার আগে মহামুনি টিলায় আমিই পৌঁছাইতে থাকি। এইরকম পৌঁছানোতে লাকি আপার সাথে বাড়তে থাকে দূরত্ব আমার। টের পাইতে থাকি লাকি আপার মন খারাপ হয়। তাঁর মন খারাপের ভেতরে আমার আনন্দ টগবগ কইরা ফুইটা উঠলেও তাঁর জন্যও আমার মন খারাপ হয়। সেই মন খারাপের কথা না লাকি আপা, না আমি লুকাইতে পারি। আমরা টের পাইতে থাকি আমরা দুইজন পরস্পরের বন্ধু হয়া গেছি। যে-কোন কথা আমি অনায়াসে জানাইতে পারি তাঁরে। সেও জানাইতে পারে তাঁর কথা। আমরা প্রায়শ দূরে তাঁদের পাহাড়ি বাগানে যাই। আনারসক্ষেতের যত্ন নিই। আখক্ষেতের যত্ন নিই। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমারে সে পাথরে নদীটার কথা শোনায়। বর্ষায় যখন পাহাড়ের ঢাল গড়ায়া জল মিশে নদীটায়, পাহাড়ি নদী তখন কথা কয় অন্য ভাষায়। বাঁশের ভেলা বানায়া আপারা তখন বহুদূর ভাইসা যায়। আমি বর্ষা দিনের অপেক্ষায় থাকি।

স্কুলে ঘনায়া আসে বিভাগ বাছাইয়ের দিন। বিজ্ঞান বিভাগের ক্লাসে আমরা মাত্র নয়জন। ছেলেদের মধ্যে আমি, সিদ্দিক, জাফর আর উমংচিং। মেয়েদের মধ্যে সীমা, শাহিনূর, মায়া, নীপা, লিসামনি। সীমা ক্লাসের প্রথম মেয়ে। তিনটহরীরই কোন এক প্রভাবশালীর মেয়ে। সে কি আমারে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবল! ভাবতে পারে হয়ত। কোথা থাইকা উইড়া আইসা তার জায়গা কাইড়া নেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আমার ভিতরে। আড়চোখে তাকায় সে। আমি আগ্রহ পাই না পড়াশোনার প্রতিযোগিতায়। আমি তো মইজা আছি উমংচিংয়ে। স্কুল থাইকা তিন ঘন্টা পায়ে হাঁটার দূরত্বে তার বাড়ি। আমি তার সদাহাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকায়া থাকি। তিন ঘন্টা হাঁইটা স্কুলে আইসা কেমন কইরা এই ছেলে মুখে হাসি ঝুলায়া রাখে। তারে আমি জিগাই, কেমন কইরা হাসো তুমি? তার হাসি আরো ছড়ায়া পড়ে। ছড়ায়া পড়া সে হাসির অর্থ সরলতা ছাড়া আর কি’বা হইতে পারে!

উমংচিং আর লিসামনি দুইজনই মারমা। উমংচিংয়ের সাথে আমার মাখামাখি দেইখা লিসামনি উমংচিংকে কিছু একটা কয়। দুজনই আমার দিকে তাকায়। আর হাইসা উঠে একসাথে। কী কথা যে কয় তারা বুঝি না আমি। কিন্তু হাসির ভাষা তো একটাই। বুঝতে পারি তাদের কথার ভেতরে আমি আছি। উমংচিংকে ধইরা বসি, ‘আমারে মারমা ভাষা শিখাও’। উমংচিং রাজি হয়।

‘না নাকো ক্রোতে’- একটা বাক্য ছাড়া আর কিছুই শিখতে পারি না আমি। সেটারও সঠিক উচ্চারণ পারি না। উমংচিং আমারে শিখায়া দেয় লিসামনিরে যেন এই কথাটা গিয়া কই। তা’ই কইলাম আমি। কেবল তারেই না, যারে পাই তার সামনেই এই বাক্যটা কইতে থাকি। হাসে ক্যান সকলেই, বুঝতে পারি না। যখন মায়ারেও এই কথা কই, মায়া হাসে না। চুপ থাকে, লজ্জা পায়। ক্ষণিকের নীরবতা ভাইঙ্গা মায়া কয়া উঠে, ‘মুই তোরে পুচপাং’। কথাটা কওয়া শেষেই মায়া দৌড় দেয়। দৌড় দিয়া চইলা যায় দৃষ্টির বাইরে।

লাকি আপা জাইনা ফেলে আমি যারে তারে ‘না নাকো ক্রোতে’ কইতেছি। স্কুল থাইকা ফেরার পথে মহামুনি টিলার পাশে দাঁড়ায়া লাকি আপা আমারে কয়, ‘তুমি নাকি সবাইরে প্রেম নিবেদন করতেছ?’। আমি যেন মহামুনি টিলা থাইকা গড়ায়া পড়লাম। এই মেয়ে কয় কী! আপা আমারে জানাইল, ‘না নাকো ক্রোতে’য়ের অর্থ ‘আমি তোমারে ভালোবাসি’। লজ্জায় আমার মাথা কাটা গেল। লজ্জামাখা মুখের দিকে তাকায়া আপা আনন্দ পাইলেন। হাসতে হাসতেই কইলেন, ‘সবাই তোমারে বোকা বানাইছে’। উমংচিংকে ধরতে হবে। কিন্তু মায়া যে কইল ‘মুই তোরে পুচপাং’। এর অর্থ কী! কারে জিগাই!

প্রথম ক্লাস শুরু হওয়া অবধি উমংচিং পালায়া পালায়া থাকলেও প্রথম ক্লাসেই তারে ধরলাম। উমংচিং আমারে ঝর্ণা দেখাইতে নিয়া যাইবে কথা দিয়া ছাড় পাইলেও মায়ার চোখের দৃষ্টি থাইকা আমি ছাড় পাইলাম না। ‘মুই তোরে পুচপাং’য়ের অর্থও যে ‘আমি তোমারে ভালোবাসি’ বুঝতে বাকি রইল না। মারমা আর চাকমা ভাষা কিংবা মায়ার চোখ থাইকা আমার দৃষ্টি দূরের পাহাড়ে, যেইখানে উমংচিংয়ের বাড়ি। যেই বাড়ির দিকে যেতে হলে পাড়ি দিতে হইবে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ।

পাহাড়ের ঢালে উমংচিংদের মাচাং ঘর। বাঁশের খুঁটির উপরে কাঠের পাটাতন। ঘরের মাঝ বরাবর বেতের বেড়া। একপাশে উমংচিং আর অন্যপাশে ঘুমায় উমংচিংয়ের মা-বাবা। উমংচিংদের বাড়িটা যে পাহাড়টাতে তার নিচেই ঝিরি। এই ঝিরি থাইকাই যে পানি পাওয়া যায় সেইটাই উমংচিংদের একমাত্র খাবার পানি। ঝিরি পথ ধইরা উমংচিং আগাইতে থাকল। আমি তার পিছে। শত শত বছর ধইরা পইড়া থাকা পাথরে খুব সাবধানে পা ফালায়া আগায়া যাইতেছি আমরা। ঘন্টাখানেক হাঁটতেই শোনা গেল গর্জন। ‘কে ডাকতাছে এমন’ আমি জিগাইলাম উমংচিংরে। উমংচিং কইল, অইটাই ঝর্ণার আওয়াজ। আরো কতদূর আগায়া গিয়া দেখি, ছোট্ট একটা পাহাড় থাইকা অনবরত ঝইরা পড়তাছে জল। পাথরের উপরে ঝইরা পড়া সে জল অদ্ভুত আওয়াজ কইরা ঢুইকা পড়তাছে আমার ভিতরে। শুধুই কি জল? যে পাহাড়টা থাইকা জল গড়ায়া পড়তাছে, আমি টের পাইতাছি জল গড়ানোসহ ওই পাহাড়টাও আমার ভিতরে ঢুইকা পড়তাছে। আমি টের পাইতাছি আমি নড়তে পারতাছি না। আমিও কি তবে ঝর্ণা হয়া গেলাম, আমিও কি তবে পাহাড়!

 



জহির রিপন
কবি ও পরিব্রাজক


error: Content is protected !!