অণু ভবের জার্নাল



“বন্দনা”



নুনু কবিতার ভাববিশ্ব- সমসাময়িক কবিতার অধুনান্তিক ট্রেইল

‘ডানে বামে যেসব প্লাস্টিক দৌড়াইতেছেন সাইড লন’

ঠাকুরের কণিকা কিংবা অধুনান্তিক ন্যানো কবিতা (nano-poetry) বা অণু কবিতা (micro-poetry) বা সংহত কবিতা বা ঝুরা কবিতা বা চূর্ণ কবিতা যারে আমি বলি ‘নুনু কবিতা’- হ, যার অঙ্কুরোদগম হইছে, গাছ হইতে পারে আবার ঘাসও হইতে পারে- পাঠকের মগজে। এই পোকাগুলো আবার প্রজাপতিও হইতে পারে, জানি তো-

‘‘Insects are small, they already know how to fly, and- best of all- they power themselves.’
– Emily Anthes

প্রতিযুগেই ক্ষমতার একটা সুনির্দিষ্ট ভাষা থাকে যা অনড় অচল অপরিবর্তনীয় এবং সে নিজেকে বিশুদ্ধ ভাষা বলে দাবী করে। জনজীবনের ভাষা (যা মূলত: হাইব্রিড) তার থেকে এগিয়ে যায়, নতুন রূপ লাভ করে। জীব, বস্তু, সমাজ বা ভাষা সুশৃংখলায় আটকে পড়রে অবলুপ্তির সম্ভাবনা বেড়ে যায়, আমরা স্মরণ করতে পারি সংস্কৃত ভাষার পরিণতি। বলা দরকার, একাডেমিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বাংলা ভাষা আজকের বাঙালী সমাজ জীবনের ব্যবহৃত বাংলা ভাষার পিছু পিছু হাঁটছে।

বিশ্ব সাহিত্যে একটা প্রচলিত প্রবণতা হচ্ছে যা কিছু কাব্যিক বিবেচনা করা হয়েছে তাদের দৈনন্দিন জীবনমুখী করার আন্দোলন- যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কবিতাকে বামন বা বনসাই করা- To Shrink and believe that will grow at the hour of need. বনসাই করার প্রক্রিয়ায় ‘বিষয়’ এবং ‘গঠন’ (content and form) উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। বিষয়ের দিক থেকে অলৌকিক বা অভিজাত বা উচ্চশ্রেণীর থেকে ফোকাস শিফ্ট হচ্ছে অস্তিত্ববাদী, ব্যাবহারিক বিষয় এবং সাধারণ মানুষের দিকে এবং প্রথাগত বড় গঠন থেকে সুইচ করে ফোকাস যাচ্ছে ছোট গঠনে, কঠোর ব্যাকরণসম্মত নিয়মনীতি থেকে শিথীলতায় (high registers to low) ও সিরিয়াস থেকে প্রহসনে।

‘ন্যানো’ কবিতার (nano-poetics) ‘ন্যানো’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘nanos’ (one-billionth) থেকে। ন্যানো প্রযুক্তি (nano-technology) এই টার্মটি প্রথম ব্যবহার করে। ন্যানো প্রযুক্তি থেকে ন্যানো কবিতা দুইটি জিনিস ধার করেছে- বনসাইকরণ এবং অবিনির্মাণ (miniaturisation and duplication/ deconstruction) ।

প্রথম ঋণ ‘ন্যানো’ নিজেই, পুঁচকে একটা কিছু যা আবার স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিমা। কবিতার আকার ‘ছোটের’ দিকে এই অভিগমন আসলে কবিতার বৈশিষ্ট্যের স্বাভাবিক সম্প্রসারণ- কবিতার ক্ষুদ্রতম গাঢ় নান্দনিক একক। বলা আবশ্যক যে, যদিও সমসাময়িক কবিতায় নানা উদ্ভাবন এবং ট্রেন্ড চলছে, তবু শুধু আকারই ন্যানো কবিতার বৈশিষ্ট্য নয়- মূলত বিষয় ও গঠন উভয়ই ছোট হিসাবে বিবেচিত হয়েছে এমন যা কিছু দৈনন্দিন বা সাধারণ ভাষায় বাহ্যত সাধারণ জিনিস এবং ঘটনা, প্রান্তবর্তী মানুষ ও স্থান, রসাত্মক, সূক্ষ্ম, ভাসা ভাসা, গদ্যের মতো বা এই জাতীয় কিছু কিংবা সমাজের সংখ্যালঘুর (হিজরা, সমকামী, নৃগোষ্ঠী, বাউল ফকির বা ধর্মীয় অন্যান্য সংখ্যালঘু) সাব অলটার্ন কন্ঠস্বর।

‘Down here, in daily life, in the low-rent districts of the masses, there is more space for poetry than high up on Olympus, in the VIP seats of the gods.’
– Gilad Meiri

দৈনন্দিন জীবনে, প্রান্তের গণ-মানুষের জীবনে অভিজাত বা উচ্চবর্গের বা বেহেশতের ভিআইপি আসনের চেয়ে কবিতার জায়গা বেশি। শুধু সাহিত্য রসের দোহাই দিয়ে সংরক্ষিত অঞ্চলের বাইরে কবিতার অনেক স্পেস রয়ে গেছে। অভিজাত ক্লাব সদস্যদের সংকোচিত ডোমেইনের বাইরে যেসব শৈলী, বিষয় বা গঠন রয়েছে তা সংখ্যায়ই শুধু বিপুল নয় তারা গুরুত্বপূর্ণ এবং মনোযোগের দাবিদার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: মধ্যযুগের প্রথাগত সনেট লেখা হয়েছে মূলত প্রেম ও ঈশ্বর বা বীরত্বগাঁথা নিয়ে, যেখানে সমসাময়িক সনেট লেখা হচ্ছে অপ্রচলিত বা অব্যবহৃত এমন কোনো বিষয় নাই যা কবি চিন্তা করতে পারে।

বৃহৎ থেকে ক্ষুদ্রে যাত্রার এই আন্দোলন বিশিষ্ট কিছু প্রবণতা দিয়ে চিহ্নিত করা যায়Ñ বিমূর্ত, ঐশ্বরিক, পবিত্র, অপরিবর্তনীয়, সামষ্টিক, গম্ভীর, প্রথাগত, চিত্তাকর্ষক কিংবা সুসজ্জিত হওয়ার চেয়ে সুনির্দিষ্ট, পার্থিব, ক্ষণজীবী, ব্যক্তিগত/একক, অস্বাভাবিক, শ্লেষপূর্ণ এবং সংযত হওয়ার ঝোঁক।

অণু হওয়ার এই বাসনা আসলে ঘনিষ্ঠতা বা অন্তরঙ্গতার আমন্ত্রণ। কবিতার বনসাইকরণের অন্যতম উদ্দেশ্য আন্তরিক এবং সূক্ষ্মভাবে পুনরাবৃত্ত যান্ত্রিক প্রতিদিনকে দেখা। Admiel Kosman যেমন তার ‘ Hymn’ কবিতায় ঈশ্বরের সাথে মানুষের যোগাযোগের জন্য প্রস্তাব করছেন ক্ষুদ্র ও পরিশুদ্ধ অহংয়ের যা সনাতন ভারতীয় বুদ্ধ দর্শনের প্রতিধ্বনি।

Amen, make us into these tiny creatures. Very teeny tiny, please, under your vast galaxies. Amen, make us very tiny, pinky size, under the galaxies, suns, Milky Ways, waters and your blazing light.

Amen, make us different size, tiny, invisible and uncomprehending, unseeing of what you have or don’t. What do you care? Make us itty-bitty, pinky-size, and we will praise for it, amen.
– Admiel Kosman’s ‘Hymnn’

দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ভাষার এই প্রার্থনায় ব্যাজস্তুতিতে প্রার্থনাকারী নিজেই ঈশ্বরে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ছোট করার এই প্রার্থনা আসলে ঐশ্বরিকতা কমিয়ে ঈশ্বরকে মানুষের নিকটবর্তী করার প্রার্থনা।

The change in focus produces a different order of preference in relation: instead of a connection based on power, one based intimacy is offered, that is, a reduction of the distance of people from God.

দ্বিতীয় ঋণটি হচ্ছে অবিনির্মাণ duplication/ deconstruction যা নির্ভর করে বনসাইয়ের miniaturisation ওপর। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে রিসাইকেল বা অবিনির্মাণে পুরা মূল কবিতা কপি করা যায় না- কবিতার বড় গঠন ভেঙে একটি অংশ বা কয়েকটি অংশ উদ্ধৃতি, অলংকরণ, প্যারোডি বা ইন্টারটেক্সুয়াল রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয় নতুন অনুষঙ্গ বা প্রসঙ্গে (new context).

উদ্ধৃতি আঁটসাঁট তথ্যের বাহক যা একটি দীর্ঘ আখ্যানের বদলি হিসেবে কাজ করতে পারে। একটা সুনির্দিষ্ট ভাষা ইশারা একটা কাব্যিক অপটিক্যাল ফাইবারের মতো যা গোটা একটা আখ্যানকে পরিবহন করার জন্য যথেষ্ট। দ্রুতি আক্রান্ত এই সময়ে তথ্যের স্তুপ তৈরি করছে নানান নতুন ভাষা চিপ্স বা কাব্যিক অপটিক্যাল ফাইবার যা রিসাইকেল করার কাঁচামালের আওতা বৃদ্ধি করছে।

সম্পর্কিয়ানা (Intertextuality):

কবিতার ভেতর অন্য কবিতা/কবিতাংশ বা গান (টেক্সট) বা কোনো পরিচিত চরিত্রের উপস্থাপন/অন্তর্ভুক্তি (The acknowledgement of previous another literary works) হলো সম্পর্কিয়ানা (Intertextuality).

যেহেতু অধুনান্তিকতা একটা বিকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের কথা বলে যেখানে কোনো ব্যক্তির কাজ যূথ বিচ্ছিন্ন সৃষ্টি নয়, সেহেতু অধুনান্তিক সাহিত্য ইন্টারটেক্সুয়ালিটির ওপর ফোকাস করে- একটা টেক্সটের সাথে অপর টেক্সটের সম্পর্ক তৈরি বা কোনো টেক্সটকে সাহিত্য ইতিহাসের বুননে নিয়ে আসা। সমালোচকরা অবশ্য এটাকে অধুনান্তিকতার মৌলিকতার অভাব এবং সস্তা জিনিসের ওপর নির্ভরশীলতার লক্ষণ মনে করে। ইন্টারটেক্সুয়ালিটি অধুনান্তিক সাহিত্যে অন্য একটি সাহিত্য কর্মের বরাত বা দোহাই কিংবা সমান্তরাল আরেকটি সাহিত্য কর্ম হতে পারে যা ঐ কাজটির প্রবর্ধিত আলাপ বা ঐ শৈলীর আত্তীকরণও হতে পারে, যেমনটা বাউল বা বয়াতিদের মাঝে দেখা যায়।

অবিনির্মাণ (Deconstruction):

অবিনির্মাণ কোনো ‘টেক্সট’ যদি পেঁয়াজ হয় তবে তার প্রতিটি স্তর তুলে দেখার প্রক্রিয়া। সচেতন এই প্রক্রিয়াটি করা হয় কোনো ‘টেক্সটের’ প্রতিটি কোণার তথ্য তল্লাশি করে উদ্ধার এবং আলাদা করার জন্য, ফুকো উদ্ধারকৃত তথ্যভান্ডারকে বলছেন ‘Episteme’, সনাতন ভারতীয় দর্শনের শব্দের অর্থকে বলা হয়েছে ‘contextual’। এই কথার অর্থ হচ্ছে কোনো একটা সুনির্দিষ্ট সময়ে প্রতিটি টেক্সট একটা সম্পর্কের নেটওয়ার্ক বা জালে জড়ানো থাকে যা ঐ টেক্সটের অর্থকে প্রভাবিত করে। এভাবে অবিনির্মাণ প্রমাণ করে যে, আসলে কোনো টেক্সটের একটা মাত্র পরম মানে নেই।

মানবিক চিন্তন-ক্রিয়ায় ‘অহং-উপস্থিতি’ থাকার কারণে মানুষ সবসময় তার পছন্দমতো একটা কেন্দ্র (center) নির্ধারণ করেই চিন্তা-ক্ষেত্রে এগুতে চায়। একজন মানুষ যখন তার জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কিছু চিন্তা করে, ঠিক তখনই তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান নেয় ‘আমি’ এবং ‘আমি কেন্দ্রিক’ কিছু ধারণা বা সেন্টার, যাকে কোনো অবস্থাতেই অহং-অস্তিত্বের বাইরে রাখা সম্ভব নয়। আসলে মানবিক চেতনা-কাঠামো সবসময় অহংকেন্দ্রিক বিভিন্ন যুগ্ম- বৈপরীত্য বা binary opposition -কে কেন্দ্র করেই তার অনুভূতি ধারণার বৃত্ত রচনা করতে চায়। ভালো/মন্দ, দেহ/মন, সত্য/মিথ্যা, ঈশ্বর/মানব, ঈশ্বর/শয়তান, মানুষ/পশু, শুরু/শেষ ইত্যাদির মতো অহংকেন্দ্রিক যুগ্ম- বৈপরীত্যসমূহকে বাদ দিয়ে কিছু চিন্তা করতে গেলে, অহং নিজেই ‘অস্তিত্ব/অনস্তিত্ব’ যুগ্ম- বৈপরীত্য নিয়ে হয়ে উঠে অস্তিত্বের প্রধান কেন্দ্র বা পরম সত্তা। অহংসহ যে-কোনো সত্তার চরম ও পরম অস্তিত্ব শুধুমাত্র উচ্চারিত শব্দেই পাওয়া সম্ভব, মানুষের সহজাত এই ধারণার ওপর নির্ভর উচ্চারিত মৌখিক ভাষা সবসময় লিখিত ভাষার ওপর প্রাধান্য পেয়েছে। ‘মৌখিক ভাষা/লিখিত ভাষা’- এই যুগ্ম- বৈপরীত্যের শ্রেণীমর্যাদা বা যরবৎধৎপযু নির্ধারণ করলে মুখের ভাষার স্থান প্রাধান্য পেয়ে অহং-অস্তিত্বের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। ফলে স্বনকেন্দ্রিক (logocentric) চিন্তার মাঝে ধ্বনিকেন্দ্রিকতাই (photocentricism) হয়ে ওঠে মুখ্য। ধ্বনিকেন্দ্রিকতার ওপর প্রাধান্য দেওয়ায়, যে কোনো রকম লিখিত ভাষা দূষিত বলে গণ্য হতে পারে, কারণ মৌখিক ভাষার অবস্থান থাকে মানবিক চিন্তার খুব কাছাকাছি।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের অনন্যসাধারণ সৃষ্টি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ এ অবিনির্মাণের উদাহরণ হিসেবে খুবই উল্লেখযোগ্য। মেঘনাদবধ কাব্য রামায়ণের কিছু অংশকে কেন্দ্র করে লেখা, যেখানে ধ্রুপদী বিশ্বাসের অন্তর্গত ‘রাম/রাবণ’ যুগ্ম- বৈপরীত্যের অবিনির্মাণ করা হয়েছে নতুনভাবে। অবিনির্মাণের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হচ্ছে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর বিখ্যাত কবিতা ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’র ভাস্কর চৌধুরীর অসাধারণ অবিনির্মাণ ‘আমার মা কবি ছিলেন’।

নুনু কবিতার ভাই-ব্রাদার:

নুনু (nano or micro-poetry) কবিতার দাদা দাদি প্রাচীন ভারতের ঋগে¦দের শ্লোক ও সূত্র, আর বাংলা ভাষায় মা হাওয়া খনা। শায়েরী বা হাইকু একই ফ্যামিলির। হালের ভাই ব্রাদারগণ টুইটারে লেখা টুইটকু (W.G. Sebald), কাইকু (ভাস্কর চৌধুরী), ম্যাক্সিম (ইমতিয়াজ মাহমুদ), ঝুরা কবিতা (কাজল সেন), চূর্ণ কবিতা (শামীম আজাদ), অণু কবিতা (অলোক বিশ্বাস) এবং প্রসব যন্ত্রণায় যারা আছে। কবি সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর ‘হুদাই’ সিরিজ বা তুহিন দাসের ‘অসুখময় দিনরাত্রি’ নুনু কবিতার বই। হুদাই সিরিজের একটি কবিতা-

‘ঠিকই রোজ রাতে ঠিকঠাক বাড়ি পৌঁছাই
তুমি ভাল থেকো রাই’

টুইটকু বা টুইহাইকু:

টুইটকু (tweetku, also known as twihaiku, twaiku, or twitter poetry and captcha poetry, which is characterized by text generated through CAPTCHA anti-spamming software) ১৪০ ক্যারেক্টারে এবং ১৭ সিলেবলে লেখা হয়।

সংকর নুনু:

একটা সিলিকন চিপের সাথে একীভূত কবিতা যা কবিতা এবং চিপের সংকর, বাস্তবতা এবং স্বপ্নের সংকর অথবা বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সংকর। ভারতীয় প্রোগামার ও কবি এস এস প্রসাদের বাইনারী ভাষায় লেখা সংকর নুনু কবিতা ‘ Sunflower’-

‘-

‘সূর্যমুখী’ কবিতাটা দুই পৃষ্ঠায় লেখা। প্রথম পৃষ্ঠা থেকে দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় যাত্রার মধ্যবর্তী হচ্ছে দিন (যে ক্ষীণ সময়টুকু সূর্যমুখীর জীবন আসলে) যার দুই প্রান্ত (শুরু ও শেষ) ভোর থেকে সন্ধ্যার প্রতীক।

প্রথম এবং দ্বিতীয় পৃষ্ঠার বিন্যাসক্রম আলাদা। বিন্যাসক্রমের সাথে দুই পৃষ্ঠার তথ্য বা নির্দেশনাও আলাদা হয়েছে। সমস্ত কম্পিউটার ল্যাংগুয়েজ বাইনারী ভাষায় লিখিত যাতে মাত্র দুইটা প্রতীক ‘O’ এবং ‘1’ (ÔOnÕ Ges ÔOffÕ) ব্যবহৃত হয়। এই কবিতায় ‘O’ সূর্যের প্রতীক যা বাইনারী সংখ্যার জাফরীর (lattice) দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে। সূর্যের মুখ দিক বদলের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে সূর্যমুখীর জাফরী।

অণুজীব নুনু:

গণকবিতার এই স্পর্শকাতর সময়ে কবি ক্রিস্চিয়ান বক ব্যাকটেরিয়ায় (E. coli) লিখেছেন অণুজীব কবিতা, সম্পূর্ণ নতুন এই ক্ষেত্রে কাজ করে তিনি ভেঙে দিয়েছেন শিল্প ও বিজ্ঞানের সীমানা, এমন একটা মোহনা তৈরি করেছেন যেখানে কবিতা মিলিত হয়েছে জিনতত্ত্বের সাথে।

Words on a page- that’s usually how we conceive of poetry. But Christian Bök, at the University of Calgary, has done something no other writer has ever done: as part of his recent project, The Xenotext, he’s enciphered a poem into a micro-organism, which then “rewrote” that poem as part of its biological response. His eventual hope is to encode a poem inside a near-indestructible bacterium (deinococcus radiodurans) which may actually outlast human civilization.

নুনু কবিতার ইতিহাস পাঠ:

বিশ্বের প্রধান প্রধান ভাষার সাহিত্যে এক পংক্তি, দুই পঙ্ক্তি, তিন পঙ্ক্তি, চার পঙ্ক্তি কিংবা পাঁচ পঙ্ক্তির ছোট অবয়বের কবিতা রয়েছে। এগুলো মূলত অন্ত্যমিলয্ক্তু পদ্য বা ছড়া। তবে পঙ্ক্তির ভিন্নতা বা আঙ্গিকগত দিক দিয়ে এগুলা স্বতন্ত্র নাম ও বৈশিষ্ট্যে পরিচিত। বাংলা ভাষায় এক পঙ্ক্তির চল খুব বেশি নেই।

কয়েকটি উদাহরণ:

আমার হৃদয় যতটা বামে, আমি তার চেয়ে বেশি বামপন্থী নই
– অমিতাভ দাশগুপ্ত

ঘাসও পূজায় লাগে, শ্রাদ্ধে লাগে
– বিনয় মজুমদার

Gods, tired of their paradise, envy man.
– Fireflies, Rabindranath Tagore

দুই পঙ্ক্তিতে রচিত ইংরেজি সাহিত্যে রয়েছে এপিগ্রাম, ফরাসী সাহিত্যে কাপলেট, উর্দু সাহিত্যে শায়েরী, বাংলা সাহিত্যে রয়েছে প্রবাদ-প্রবচন ও সংস্কৃত সাহিত্যে রয়েছে শ্লোক। তবে এগুলো কখনও কখনও দুইয়ের অধিক পঙ্ক্তিতেও রচিত হয়ে থাকে। দুই পঙ্ক্তি লেখার সুবিধা হচ্ছে অন্ত্যমিলের অবকাশ, যা পাঠকের মনে একই সঙ্গে তোলে অনুরণনও। কিন্তু অনেক সময়েই অন্ত্যমিল হয়ে ওঠে আরোপিত। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘কণিকা’র ছোট কবিতাগুলো চিরন্তন সত্যের, কোনো কোনোটি জ্ঞানবর্ধক বা নীতি শিক্ষণীয় পঙ্ক্তি:

শৈবাল দিঘিরে বলে উচ্চ করি শির,
লিখে রেখো এক ফোঁটা দিলাম শিশি
– ক্ষুদ্রের দম্ভ

তিন পংক্তিতে রচিত কবিতার নাম ‘হাইকু’ এর উদ্ভব ষোল শতকে জাপানে। এর নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, প্রাকৃতিক দৃশ্যবস্তুকে নিয়ে রচিত হাইকুতে ১৭টি শব্দাংশ থাকে যা ৫+৭+৫ এ ভাগ হয়ে তিনটি পঙ্ক্তিতে বিন্যস্ত হয়, তবে আধুনিক হাইকু মুক্ত ছন্দে লেখা হচ্ছে। বাংলা ভাষায় হাইকু ১৭ মাত্রার। বাংলায় তিন পঙ্ক্তির উল্লেখযোগ্য কবিতার বই আশরাফুল মোসাদ্দেকের ‘জাপানের ভালোবাসার হাইকু’, শিশির কুমার দাশের ‘অবলুপ্ত চতুর্থ চরণ’। কোরীয় কবিতা ‘সিজো’ও তিন পঙ্ক্তির।

চার পঙ্ক্তিতে রচিত কবিতার নাম রুবাইয়াত, যার উদ্ভব দশম শতকে পারস্যে। এই শ্রেণির কবিতা বা ছড়ায় ২৪টি শব্দ থাকে, নির্ধারিত কোনো বিষয়বস্তু থাকে না, তবে ভাব ও ভাষার দিক দিয়ে চতুর্থ পঙ্ক্তিটি ব্যঞ্চনাময় হয়ে ওঠে। এর স্তবকগুলোর প্রথম, দ্বিতীয় এবং চতুর্থ লাইনের শেষে মিলযুক্ত, তৃতীয়টি ছাড়া। রুবাইয়াতকে মূলত বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তোলেন খৈয়ামের অনুবাদকেরাই; বাংলায় যেমন নজরুল, ইংরেজিতে তেমনি ফিটজেরাল্ড।

A Book of Verse underneath the bough,
A jug of wine, a book of verse and thou
Beside me singing in the wilderness Oh, wilderness
Were paradise enow!
– Edward Fitzgerald

এক সোরাহি সুরা দিও, একটু রুটির ছিলকে আর,
প্রিয় সাকি, তাহার সাথে একখানা বই কবিতার,
জীর্ণ আমার জীবন জুড়ে রইবে প্রিয়া আমার সাথে,
এই যদি পাই চাইব না তাখত আমি শাহানশার।
– কাজী নজরুল ইসলাম

পাঁচ পঙ্ক্তি বিশিষ্ট কবিতা বা ছড়াকে লিমেরিক বলা হয়, যার উদ্ভব আয়ারল্যান্ডে। পাঁচ পঙ্ক্তির লিমেরিকের প্রথম, দ্বিতীয় ও পঞ্চম পঙ্ক্তি দীর্ঘ এবং অন্ত্যমিলযুক্ত সমমাত্রার। তৃতীয় ও চতুর্থ পঙ্ক্তি অপেক্ষাকৃত ছোট সমমাত্রার স্বতন্ত্র অন্ত্যমিলযুক্ত। সাধারণত লিমেরিকের বক্তব্য অর্থবোধক হয় না, দ্যোতনাযুক্ত হয়।

ইংরেজি সাহিত্যে লিমেরিক লিখে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন এডওয়ার্ড লিয়ার (A book of Nonsense) । বাংলা ভাষায় সচেতন বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনেকেই লিমেরিক লিখেছেন। এদের মধ্যে দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, সুকুমার রায় ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো প্রধান প্রধান কবিরাও রয়েছেন।

বাংলা একটি লিমেরিক:

তাঁতীর বাড়ি ব্যাঙের বাসা
কোলা ব্যাঙের ছা।
খায় দায়,
গান গায়,
তাইরে নাইরে না

আমীরুল ইসলামের একটা লিমেরিক:

‘চিড়িয়াখানার এক যে ছিল গরিলা
খাঁচা ভেঙে হঠাৎ কী কাম করিলা
গাছের ডালে চড়িলা
লম্ফ দিয়া পড়িলা
ট্রাকের চাপায় অপঘাতে মরিলা’

রাজু আলাউদ্দিন ন্যানো সাহিত্যতত্ত্বে ইশতেহার (কবিতাংশ):

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের বহু দিনের স্বপ্ন বস্তুজগতের তাবৎ রহস্যকে- প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলকে (Gravitational Force, Electromagnetic Force, Weak Nuclear Force and Strong Nuclear Force) এক করে- একটি মাত্র তত্ত্বের সংকেতে (Grand Unification theory) প্রকাশ করা। স্বভাবসুলভ উচ্চাশায় ভর করে, বোর্হেস স্বপ্ন দেখতে গিয়ে বলেছিলেন, “কেমন হয় যদি সকল ভাষা, সকল অভিব্যক্তি, সমগ্র কবিতা কেবল একটি পঙ্ক্তিতে বা এমনকি একটি মাত্র শব্দে সংকুচিত করা যায়?”

বিজ্ঞানী ও কবিরা এতদিন যার স্বপ্ন দেখেছেন এবং এখনও দেখছেন তা বাস্তবায়িত করার সময় এসেছে। জীবন ছোট, তাই সময় এতো মূল্যবান। এই মূল্যবান সময়কে অতিকথন, অপ্রয়োজনীয় শব্দ আর অনাবশ্যক বৃহত্বে অপচয় করা যাবে না। সাহিত্যের সব শাখাকে তাই এসব লক্ষণ থেকে মুক্ত করে ন্যানো আয়তনে যেতে হবে। প্রকরণের সকল বৈশিষ্ট্য নিয়েই সাহিত্যের প্রতিটি শাখাÑ হোক সে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক-নিজেকে প্রকাশ করবে। কিন্তু যথাযথ তা আর মিতব্যয়িতা হবে এর মূলমন্ত্র। ‘দূর ব্রহ্মান্ডকে তিলে টেনে’ আনতে চাই আমরা। চাই তিলের মধ্যে তালকে দেখতে। তিলকে তাল বানাবার আতিশয্য ত্যাগ করে বিন্দুর সিন্ধুতে প্রবেশ করতে চাই। সবচেয়ে দীর্ঘতম ন্যানো কবিতাটি হবে সর্বোচ্চ ৩০ শব্দের।

ন্যানো কবিতার বৈশিষ্ট্য:

১. ভাবালুতাকে পুরোপুরি বর্জন করতে হবে।
২. উপমার প্রচলিত ধরনকে বর্জন করে এর সারাৎসারকে প্রকাশ করতে হবে কবিতায়।
৩. কবিতায় অর্থহীন বিশেষণ পুরোপুরি বর্জনীয়।

ন্যানো কাব্যতত্ত্ব অনুসারে আমরা যে ধরনের কবিতার জন্ম সম্ভব করে তুলতে চাই তার বীজ এর আগে অসচেতন- প্রসূত ভ্রুণাবস্থায় ছড়িয়ে আছে অবশ্যই। আমরা চাই সজ্ঞানে একে সংঘটিত এবং বিকশিত করতে। কখনও কখনও ইদানীং ফেসবুকেও এ ধরনের ভ্রƒণের জন্ম হচ্ছে। আমরা চাই এর সজ্ঞান ও সচেতন পরিস্ফুটন। ন্যানো কবিতার একটি উদাহরণ:
ওই দূরে দেখা যায় দিবসের রক্তিম ভ্রƒণ,
এখানে ট্রেনে-কাটা মানুষের দেহখণ্ড, খুন।

জীবনের উদায়াস্তকে আমরা এই কাব্যোত্তীর্ণ মিতব্যায়িতায় প্রকাশ করতে চাই। একই সঙ্গে চাই অর্থহীন প্রলাপের শাব্দিক অপচয় থেকে কবিতাকে মুক্ত করতে। ইঙ্গিতময়তা ও সাংকেতিকতা হবে ন্যানো কাব্যের মূলমন্ত্র।

কোরাস:

নুনু কবিতা আসলে প্রচলিত এবং জায়মান সমস্ত ছোট কবিতার আর্ট ফর্ম যার সুনির্দিষ্ট নিয়ম নাই- বিষয় এবং গঠন বা হরফের সীমা উভয় ক্ষেত্রেই। এই ধরনের কবিতার প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে প্রজ্ঞা, পরামর্শ, সতর্কতা এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টি উল্লেখযোগ্য। কবিতায় জীবন ও শিল্প-সাহিত্যের ভেদ থাকে না যা কখনও কখনও যাদুবাস্তবতা বা বহুসীমায় শেষ হয়। কখনও কখনও শব্দকে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে ঠেলে দেয় এবং জ্ঞান ও যুক্তির এলাকা থেকে মুক্ত করে বহুরৈখিক অর্থের দিকে চালিত করে লোকায়াত সংস্কৃতির বহুত্বকে স্বীকৃতি জানায়। যে মাধ্যমে কবিতাটি প্রকাশিত হবে সেই মাধ্যমের সীমা দ্বারা নুনু কবিতার সীমানা নির্ধারিত, যেমন টুইটারের ১৪০ ক্যারেক্টার কিংবা মোবাইলে ১৬০ ক্যারেক্টার।

এপ্রিল, ২০১৮ পাঞ্জাবে উপস্থাপিত একটি কনফারেন্সের রিপোর্টে বলা হচ্ছে, বিভিন্ন সাময়িকী বা সংবাদপত্রে প্রকাশিত নিবন্ধের চেয়ে শব্দ ক্রীড়ার অণু কবিতা বৈদিক দর্শনকে সুনির্দিষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করে। ভবিষ্যতের মহাবিশ্বে রাজত্ব করবে সূক্ষ্ম পারমাণবিক কণা (sub-atomic particles) যাদের বাইরে মহাবিশ্বে হয়তো পাওয়া যাবে।

যদিও নুনু কবিতার ছাঁচ এমিবার মতো পরিবর্তনশীল তবু আপাত: বলা যায়:

– নুনু কবিতা আমরা যেমন কথা বলি প্রায় সেভাবেই লেখা
– ভাষা ও বিষয় আন্তর্জাতিক
– বাক সংযত
– গদ্যের, কথনের স্পন্দনের পক্ষপাতী
– গোষ্ঠীভাষা সচেতন ব্যক্তিভাষা
– দেশ-ইতিহাস-সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত
– সংশ্লেষণাত্মক ও সৃজনধর্মী
– রূপকের পরিবর্তে লক্ষণার পক্ষপাতি
– মুক্তফর্মে লেখা
– চিত্রকল্প ভঙ্গুর কখনও কখনও, কখনও কখনও অস্থির (The Kinetic image)
– শিরোনাম বা কবিতার কেন্দ্র নাই
– স্লাঙালঙ্কারের ব্যহার কখনও কখনও
– পাঠককে শিকড়চ্যুত করার জন্য কখনও কখনও প্যারোডি, ব্যাঙ্গাত্মক বা শ্লেষাত্মক

প্রান্ত প্রক্রিয়ার এই কবিতাগুলো উড়ে যাচ্ছে প্রথাগত কাব্যচর্চার রাডারের তল দিয়ে- এইগুলা অনুশীলনের চেয়ে বেশি বিষয়, বিষয় বা পণ্যের চেয়ে বেশি প্রক্রিয়া। আমাদের এই সময়ের পৃথিবীতে ‘গুপ্ত উপস্থিতির’ মধ্য দিয়ে (‘the unconscious of language’- N. Katherine Hayles):

– পুঁজিবাদী অর্থনীতির দ্বারা তৈরি অসংখ্য টেলিভিশন, কম্পিউটার ইত্যাদির সার্কিটের মধ্য দিয়ে নিঃশব্দে এবং গোপনে পরিভ্রমণ করছে নুনু কবিতার দল
– কোড বা সূত্রাকারে ভাবী প্রজন্মের জন্য গোপনীয়তা রক্ষা করে যথেষ্ট পরিমাণে বার্তা বহন করছে
– বার্তাগুলো পাঠক বা দর্শকের জন্য উন্মুক্ত
– কিন্তু কোথাও কোনো প্রমাণ নেই।

দোহাই:
১. ন্যানো সাহিত্যতত্ত্ব: একটি ইশতেহার- রাজু আলাউদ্দিন (Arts.bdnews24.com)
২. প্রবন্ধ সংগ্রহ: মঈন চৌধুরী
৩. রবীন্দ্রনাথের ছোট কবিতা (banglanews24.com)
৪. তরুণ কবির কাব্যভাষা: প্রবাল কুমার বসু
৫. ভাষার হাঁড়ি: আলী আফজাল খান
৬. An Introduction to Nano-poetics: Ketovet Literary Review, June-July 2009
৭. SS Prasad’s 100 Poems: Monica Mody


নুনুকবিতা বিষয়ক এই জার্নালটির রচয়িতা কবি, সম্পাদক, প্রকাশক আলী আফজাল খান।