আলাপচারিতায় ফয়েজ আলম | অংশ- ০১



উত্তর উপনিবেশী তাত্ত্বিক ফয়েজ আলম। উপনিবেশী শাসন, শোষণ ও তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও ব্যক্তি কর্তৃক ব্যক্তির শোষণ-নিপীড়ণে ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে প্রবন্ধ, আর্টিকেল লিখে চলেছেন গত ২০ বছর ধরে। কথা বলছেন নানা ফোরামে। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশে দেশে পশ্চিমের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর সেই সঙ্গে নিজ রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক শোষণ ও চক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর লেখা যেমন একটি আন্দোলনের সূচনা করেছে তেমনি উদ্দীপ্ত ও সাহসী করে তুলেছে একদল নতুন প্রজন্মকে। বাংলাদেশের বহু তরুণের উত্তর উপনিবেশী জ্ঞানচর্চার হাতেখড়ি হয়েছে তাঁর লেখার মাধ্যমে।
কালেরকণ্ঠ-শিলালিপি কর্তৃক ১৯৭১ থেকে ২০১০ সাল অবধি ৫০টি সেরা বাংলা প্রবন্ধগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে তাঁর লেখা ‘উত্তর উপনিবেশী মন’ প্রবন্ধগ্রন্থটি। শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী মেহেদী চৌধুরী পরিচালিত লন্ডনভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘সমাজচিন্তা ও দর্শন’ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত বাংলাদেশের লেখক-বুদ্ধিজীবীর তালিকায়ও তাঁর নাম রয়েছে। অনুবাদ করেছেন এডওয়ার্ড সাঈদের “অরিয়েন্টালিজম”“কাভারিং ইসলাম” বই দুটি।

তাঁর প্রকাশিত মৌলিক প্রবন্ধগ্রন্থগুলি হলো উত্তর উপনিবেশী মন, ভাষা ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে এবং বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বজলছাপে লেখা উত্তর উপনিবেশী ভাবধারায় লেখা কবিতার বই।

২৮ ফ্রেব্রুয়ারি, ২০২১ এ নিউইয়র্কভিত্তিক অনলাইন চ্যানেল ‘ভয়েস ওভার’-এর উদ্যোগে তাঁর সাথে আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন কথাসাহিত্যিক শাপলা সপর্যিতা। অনুষ্ঠানটি ভয়েস ওভার অনলাইনে লাইভ প্রচার করে। সেই আলাপচারিতারই লেখ্যরূপ অকালবোধনের পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো।



শাপলা সপর্যিতা : আমি আপনার কবিতা নিয়ে, বিশেষ করে আপনার কাব্যভাষা নিয়ে আজকের আলাপচারিতা শুরু করতে চাই। আপনার কবিতার শব্দব্যবহার, ভাষাভঙ্গি, ভাব বেশ অন্যরকম। তার কারণও আছে। উত্তর উপনিবেশবাদ নিয়ে প্রায় বিশ বছর ধরে আপনি কাজ করছেন। সাধারণত আমরা অনেক কথাই বলি, লিখিও; কিন্তু লেখা এবং কাজের মধ্যে নানারকম অমিল যেটাকে বলে সেটা থাকে, কথাকে কাজে প্রয়োগ অতটা করা হয় না। আমরা দেখেছি আপনি আমাদের সমাজ ও মানসিকতার উপর উপনিবেশের প্রভাব এবং তা কাটিয়ে উঠার জন্য উত্তরউপনিবেশবাদ নিয়ে কাজ করছেন, বিভিন্ন পরিসরে বক্তৃতা করছেন। এ সম্পর্কে আমরা পরে আরো খুঁটিনাটি আলোচনায় ঢুকবো, দর্শক-শ্রোতাদের জন্য। তো, যেটা বলছিলাম, উপনিবেশের প্রভাব ও উত্তরউপনিবেশী জ্ঞানর্চচা সম্পর্কে আপনার বক্তব্যের সাথে আপনার কবিতার ভাষা খুবই সঙ্গতিপূর্ণ। আপনার কবিতায় একেবারে বাঙালি মনের মুলের শব্দভান্ডার–শেকড়ের স্পর্শ আছে। যেখান থেকে আমরা অনেকটা সরে এসেছি। আমাদের ভাষা বিভিন্ন সময়ে নানা আগ্রাসনে পড়েছে। উপনিবেশী শাসনকালে ইংরেজদের আগ্রাসনে পড়েছে, বৃটিশ উপনিবেশকদের উস্কানিতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের উদ্যোগে সংস্কৃতের আগ্রাসনে পড়েছে। এর ফলে হয়েছে কি আমরা সে সময় পর্যন্ত প্রচলিত বাংলা বাদ দিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের তৈরি কৃত্রিম বাংলা গ্রহণ করি, যার অনেক শব্দ, বাগবিধি এখন অবধি আমাদের কাছে আপন মনে হয় না। আমি নিজেও অনেক শব্দ সম্পর্কে বুঝতে পারি না যে, এটা আসলে বাংলা না সংস্কৃত শব্দ, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মাধ্যমেই যা চালু হয়। আজ যেটাকে আমরা প্রমিত বাংলা বলি সেই বাংলার অনুকরণে কথা বলতে পারলে আমরা নিজেদেরকে খুব সাংস্কৃতিক-সামাজিক মর্যাদার একটা জায়গায় স্থাপন করি। আমরা খুব সুন্দর করে প্রমিত বাংলা বলতে পারি, লিখতেও পারি। কিন্তু আপনার সাম্প্রতিক কবিতার বই ‘জলছপে লেখা’-তে প্রমিত বাংলা নেই, আছে আমাদের প্রতিদিনের কথ্য বাংলা, একেবারে আমাদের মুখের কথ্যভাষা। যদিও আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপখাওয়া মানুষ’-এ প্রমিত বাংলার ব্যবহার ছিলো, দ্বিতীয় বইটি সম্পূর্ণ বিপরীত। ‘জলছপে লেখা’ থেকে নমুনা হিসাবে একটা কবিতা পড়তে চাই যেটা নিয়ে আমি বিস্তারিত আলাপে যাবো পরে। কবিতাটি নিয়ে যখন বিস্তারিত আলচনা করবো তখন আমি বিনয়ের সাথে দর্শকদের একটু বাড়তি মনোযোগ আশা করবো। কবিতাটির নাম হচ্ছে ‘একুশ শতকের দুই বাঙালির আলাপসালাপ’:

ধরেন যে, দূর্বায় চিত হইয়া শুইয়া আমি যখন দেখি নীল আসমান
আপনি কইলেন ‘দিকদিগন্তে শুভ্রনীলাকাশ’।
এই কথায় আমার আসমানে কালিঝুলি, রৈদ মনমরা
আর আপনে বিদ্যুতের খুটিতে ‘শুভ্রনীলাকাশ’ লটকায়া
ঢ্যাং ঢ্যাং…কুড়ির শতক পার হইয়া যান আজব বাজারের পথে;
জঙ্গলি ফুলের বাসে মাতাল বাংলা কথাডা কিন্তু আমার শুরুই হইল না।

আমার পায়ের নিচে মাটির উম, কার্তিকের বাস
আপনি কইলেন ‘পদতলে মৃত্তিকার ওম, শস্যের ঘ্রান’।
যেই কথা আমার না, যেই কথায় বাস মায়া কিচ্ছু নাই
সেইসব কিতাবী কথা আমি শুনি আপনার জবানে;
শুনতে শুনতে আমি বিলপাড়, কাইমের রঙ্গিন পাখ হারায়া ফেলি
ধানক্ষেত জঙ্গলিফুল, রাখখোয়ালের আনমনা বিচ্ছেদী গান
আহা এই বাংলাদেশ–আমি বেবাকই হারাই।

আর আপনি কিতাবে সওয়ার পার হয়্যা যান
এই বাংলাদেশ–খাল বিল গাঙ কচুয়া জমিন
আর কিতাবের দূর দেশে একখান বাঙালি চোতা লটকায়া
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো…… ’
অথচ আষাইড়্যা চান রাইতের নিশা কিবা
বাসমতি ধানের কথাডা আমার কওয়াই হইল না!

এই কবিতায় আপনার একটা অন্তর্গত বেদনা আর ক্ষোভের প্রকাশ আমরা দেখতে পাই। সে বিষয়ে আপনার কাছে বিস্তারিত শুনবো।
ফয়েজ আলম: এতক্ষণ যে কবিতাটি পড়েলেন ‘একুশ শতকের দুই বাঙালির আলাপসালাপ’ সেটি আমার সারাজীবনের যে কাজ-সারাজীবনের যে লক্ষ্য-উপনিবেশী প্রভাব চিহ্নিতকরন ও তা কাটিয়ে উঠার জন্য উত্তরউপনিবেশী বা উত্তরউপনিবেশবাদী জ্ঞানচর্চা যা বলেন, তার একটা সারমর্ম এই কবিতার মর্মে জড়িয়ে আছে। একটু আগে যেটা বললেন, আমার কাব্যভাষা স্বতন্ত্র। আমার এই স্বতন্ত্র কাব্যভাষা অর্থাৎ মান কথ্যভাষায় কবিতা লেখার শুরুটাও সেটিও ঐ বোধের সাথে জড়িত। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনার জন্য ভর্তি হলাম তখন দেখলাম এখানে একটা বিস্তৃত পরিসর–সৃজনশীলতার জন্য, লেখালেখির জন্য; যে যা করতে চায় তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। তো আমি এখানে এসে প্রায় সার্বক্ষণিক লেখালেখি শুরু করলাম বিভিন্ন পত্রিকায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা পড়তাম। কিন্তু কেন জানি না তথাকথিত প্রমিত বাংলার চেয়ে আমাদের কথ্যভাষার প্রতি আগ্রহটাই ছিলো বেশি। ভাষাভঙ্গি এবং শব্দচয়নে বাংলাদেশের মান কথ্যবাংলার একটা ছাপ আমার মধ্যে ছিলো ছোটবেলা থেকে, হয়ত পূর্ববঙ্গের মানুষ হিসেবে।

শাপলা সপর্যিতা: একটু পরিস্কার হয়ে নিই। পূর্ববঙ্গ বলতে তখনকার ভারতবর্ষের সাপেক্ষে পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ এখনকার বাংলাদেশ, সেই অংশটাই তো?
ফয়েজ আলম: ঠিক তা না। একটু পরিষ্কার করা দরকার। নিজেকে পূর্ববঙ্গের মানুষ বলতে বাংলাদেশের পূর্বাংশ অর্থাৎ আমার এলাকা ময়মনসিংহের কথা বোঝাচ্ছি। আর ভাষা প্রসঙ্গে আমি বোঝাতে চাইছি বাংলাদেশের ভাষাকে। অর্থাৎ যেটাকে বলছি মান কথ্যবাংলা। বাংলাদেশের মানুষ আঞ্চলিক ভাষার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সাথে পাস্পরিক ভাব বিনিময়ে যে ভাষাটা ব্যবহার করছে তার একটা সার্বজনীন রূপ আছে। এইটাকে বলা যায় মানকথ্য বাংলা। এই ভাষা সম্পর্কে আমার একটা আগ্রহ আগে থেকেই ছিল। আপনি জানেন যে কলকাতার ভাষার সাথে আমাদের ভাষার একটা পার্থক্য বহু আগে সুচিত হয়ে গেছে। আমার কবিতায় আমি চেষ্টা করতাম প্রমিত বাংলা যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করার। আমাদের বাকভঙ্গি, শব্দ এবং বাক্যরূপকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য। যেটাকে আমরা গণমানুষের ভাষা অর্থাৎ মান কথ্যবাংলা বলছি, আপনি আমি যখন আড্ডা দেই বন্ধুবান্ধব মিলে, বা বাড়িতে, অফিসে কথা বলি, তখন যে ভাষাটা ব্যবহার করি সেইটা আমি আমার কবিতায় আনার চেষ্টা করতাম। তো, এরফলে ঐ সময়ে আমার সাথে যারা লিখতেন তাদের সমালোচনার সম্মুখীন হই। তারা নানাভাবে প্রশ্ন করতে থাকেন যে, কেনো এই বাংলা লিখি কেন, কেন প্রমিত বাংলার মান বজায় রেখে লিখি না, এইসব।
এক পর্যায়ে আমার মনে হয় যে আমি দলছুট হয়ে যাচ্ছি এবং সত্যিকার অর্থে আমি তাদের কাছ থেকে সরে আসি। চেষ্টা করি নিজের মত করে লেখার, কিন্তুআমার ঐ বিশ্বাস ও অভ্যাস থেকে সরে যাইনি। আমার কাব্যভাষার যে স্বকীয়তা তা প্রমিত বাংলা থেকে বাংলাদেশের মান কথ্যবাংলার আলাদা রূপই নির্দেশ করে। এই ভাষা জীবনঘনিষ্ট। এই বিশ্বাস থেকেই আমি অনুসন্ধান শুরু করি বাংলা ভাষার উৎপত্তি, সংস্কৃত ভাষার উৎপত্তি ও পরিচয়, ভাষার রাজনীতি ও ধর্মঘনিষ্ঠতা এইসব বিষয়ে।

শাপলা সপর্যিতা: ফয়েজ ভাই, আমি এ বিষয়ে পরে বিস্তৃত আলাপে যাবো। আপাতত যে কবিতাটা আবৃত্তি করলাম তার ভেতর থাকতে চাই। কারণ আমার কিছু সম্পুরক প্রশ্ন আছে। কবিতাটা নিয়ে কথা বলতে চাই, এই প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলতে চাই এই যে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা, এই যে আমরা ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বলে’ ভীষণরকম প্রচার চালাই এতে তো শহীদ দিবসটাকেই আমরা ভুলে যাচ্ছি। আমাদের নিজের আসল জায়গাটাই ভুলে যাচ্ছি। আজকেই আমার এক শিক্ষক, আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের হলের সাবেক প্রভোস্ট বেগম জাহানারা ফেসবুকে এরকম স্ট্যাটাস দিয়েছেন: ‘এই যে আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে কথা বলছি, আসলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসটা কি? কেউ তো এই নিয়ে কথা বলেন না।’ আমি তখন তাকে লিখেছি যে এ ব্যাপারে আজকে আমি কথা বলব ফয়েজ আলম ভাইয়ের সাথে। আপনি এই জায়গাটায় নিয়ে যদি একটু কথা বলেন। আপনি নিজেও আলোচ্য কবিতার একটা চরণে লিখলেন এরকম:
কিতাবের দূর দেশে একখান বাঙালী চোতা লটকায়া
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো……

ফয়েজ আলম: এটা একটা ভালো প্রসঙ্গে তুলেছেন; এই নিয়ে আমার এক ধরণের, আমি বলবো যে, বেদনাবোধ আছে। আমি খুব ছোটবেলা থেকেই ২১শে ফেব্রুয়ারীর দিন খালি পায়ে শহীদ মিনারে যেতাম, গান গাইতাম, ফুল দিতাম। এই দিনটা আর তার কর্মকান্ডের সাথে আমাদের একটা বিশেষ আবেগঘন সংযোগ আছে; বুদ্ধিবৃত্তিক সংশ্লিষ্টতাও আছে। দুই দিক থেকেই শহীদ দিবস আমাদের জতির মনোজগতের মেরুদন্ডের মত যেন প্রায়। আমাদের শহীদ দিবসের দিনটি অর্থাৎ ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষনা করায় এর সাথে আরেকদফা সম্মান যোগ হয়েছে।
আপনি খেয়াল করে দেখবেন বছরের ৩৬৫ দিনে বহু আন্তর্জাতিক দিবস আসে যায়। আন্তর্জাতিক মা দিবস, আন্তর্জাতিক পিতৃ দিবস, আন্তর্জাতিক ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক টীকা দিবস, আন্তর্জাতিক পাট দিবস– আরও কত কি দিবস–এগুলো আছে, এগুলো তো থাকবেই। ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হলো তার অর্থ হলো ২১ শে ফেব্রুয়ারি তারিখে পৃথিবীর সমস্ত জাতি,সমস্ত রাষ্ট্রের মানুষেরা তাদের মাতৃভাষা নিয়ে কথা বলবে, মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং অনুষ্ঠান ইত্যাদি করবে। আন্তর্জাতিকভাবেও মাতৃভাষার গুরুত্ব তুলে ধরা হবে, ইত্যাদি। এর অর্থ এই না যে, পৃথিবীর সমস্ত মানুষ বাংলাভাষাকে নিয়ে কথা বলবে, বাংলাভাষা নিয়ে আলোচনা করবে, বাংলাভাষাকে সম্মান দেখাবে। তো, ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে আমরা যদি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা নিয়ে অকারণ উচ্ছ্বাসে মাতি তাহলে আমাদের শহীদ দিবস পালন করবে কে? আমরা দেখছি গত কয়েক বছর ধরে ২১শ ফেব্রুয়ারি এলেই সবাই বলছে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আমাদের কাছে শহীদ দিবস বড়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তার চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ন।
শাপলা সপর্যিতা: অর্থাৎ ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আমরা শহীদ দিবস পালন করব, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নয়, তাইতো?
ফয়েজ আলম: হ্যাঁ, তাইতো করার কথা। প্রতিটা পত্রিকায় হেড লাইন হয় ‘আজকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। তার মানে শহীদ দিবস পালন হচ্ছে না আমাদের দেশে। এটা কেন হবে? শহীদ দিবস অনেক বড় একটা বিষয় আমাদের কাছে; আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমি ছোট করে পালন করব, সারা পৃথিবীর মানুষ পালন করছে আমিও করব। তাই বলে শহীদ দিবসের কথা আমি ভুলে যাবো? এইখানে কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পৃথিবীর অন্য দেশের মতো আমিও পালন করবো, শহীদ দিবসের কথা ভুলে গিয়ে নয়। শহীদ দিবস যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে, পাশাপাশি ছোট করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সারা পৃথিবীর সমস্ত মানুষের সাথে পালন করবো। আমি বুঝতে পারছি না এইটা নিয়ে কী হচ্ছে। এইটা নিয়ে এই পর্যন্ত কোন আলোচনা হয়নি, কেউ কিছু বলেওনি। আজকে প্রসঙ্গটা আসায় মনে পড়ল এবং খুবই বেদনা বোধ করছি এই ভেবে যে, তাহলে শহীদ দিবস কি উঠে যাচ্ছে? আমরা কি ভাষা শহীদদের ভুলে যাচ্ছি?
আমার কবিতার যে-দুটো ছত্রের কথা বললেন তা নিয়ে বলি। ‘বাঙালি চোতা লটকায়া’ বলে বোঝাতে চাইছ যে, আমি পরিচয় দিচ্ছি বাঙালি, ২১শে ফেব্রুয়ারি এলে গান গাইছি, ফুল দিচ্ছি। কিন্তু সারা বছর আর বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের আগ্রহ বা ভাবনা চিন্তা নাই। আপনি দেখতে পাচ্ছেন আমাদের উপর হিন্দির আগ্রাসন কিরূপ ধারণ করছে? বহু হিন্দি টিভি চ্যানেলে শ্রীকৃষ্ণ, ভীম, অর্জুন, মহাভারত ইত্যাদি নানা বিষয়ে রচিত হিন্দি সিরিয়াল দেখে দেখে আমাদের বাচ্চারা এখন হিন্দিতে কথা বলতে পারে, ইংরেজিতেও কথা বলতে পারে। আমাদের দোকানের সাইনবোর্ডগুলা দেখবেন সব ইংরেজিতে লেখা। অযথা, কোন কারণ ছাড়া বাচ্চদেরকে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করানো হচ্ছে।
সুযোগ হলে আপনি দেখে নেবেন, আমাকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি করেছিলেন একাত্তর টিভির ব্রাত্য আমিন। সেখানে কয়েকজন অভিভাবকের স্বাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিল। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় কেন তারা তাদের বাচ্চাদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করান। তাদের বেশির ভাগই হাসতে হাসতে বলেছেন যে, এটা একটা মর্যাদার বিষয়। পাশের বাড়ির ভাবীর বাচ্চাটা ইংরেজি স্কুলে পড়ে, আর আমাদের বাচ্চাটা যদি ইংরেজি স্কুলে না পড়ে তাহলে মর্যাদা থাকে না। এইসব জবাব আমরা পেয়েছি। আপনি দেখেন যে অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। আমরা ২১ শে ফেব্রুয়ারির দিন পা খালি করে লোকজন নিয়ে গিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে আসছি আর মনে করছি আমাদের বাচ্চাদের ইংরেজি স্কুলে ভর্তি না করালে মান থাকছে না। আমাদের কারো কারো মানসিকতা ও বাইরের আচরণের এই ফারাক এবং তার ভিতর দিয়ে বাংলা ভাষাকে অবহেলা করার এই প্রবণতার বিরুদ্ধে একটা ক্ষোভ আমার কবিতায় উঠে আসছে। আরেকটা বিষয় আসছে; সেটা হচ্ছে এই যে, আমি প্রমিত বাংলার বিরুদ্ধে। আপনি বলেছেন এই নিয়ে পরে আলোচনা করবেন, ঠিক আছে। বাংলা ভাষাকে ব্যাকরণের শিকলে বেঁধে বলা হচ্ছে যে এর ভিতরে তুমি বাংলা লিখবে, বলবে। আমি এটা মানি না, আমি কখনই মানিনি। প্রমিত বাংলা হচ্ছে সেইসব শব্দ এবং বাক্যকে ব্যবহার করে লেখা ভাষা যার সাথে আমার মনের ঘনিষ্ট কোন সম্পর্ক নাই। এই ভাষা বই থেকে নেয়া। আমি বিভিন্ন জায়গায় বলেছি যে, এটা হল ‘কেতাবি বাংলা’। কেতাবি বাংলা থেকে আমি দূরে সরে যেতে চাইছি। আমাদের অনেক লেখক আছেন সাংবাদিক আছেন যারা এ ভাষার পক্ষে জোর গলায় কথা বলেন। এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে এই কবিতায়।
শাপলা সপর্যিতা: হ্যাঁ, এই কাজ করতে গিয়ে কবিতায় আপনি একেবারে মাটিলগ্ন শব্দ, বাগবিধি, উপকরণ তুলে নিয়ে এসেছেন। কবিতায় আপনি বরাবরই এই কাজগুলো করেন। এখনকার কিছু কবিতাও আমি পড়েছি যেগুলো হয়তো অতি সাম্প্রতিক সময়ে লেখা। আমি আপনার কাব্যগ্রন্থ ‘জলছাপে লেখা’ থেকে আরেকটি কবিতা পড়বো। কেন পড়বো বলি। এই কবিতার কিছু শব্দ আজকের অনুষ্ঠানের শ্রোতাদের নিকট পরিচয় করে দেওয়ার জন্য। আমার ধারণা, তাদের অনেকে হয়তো এইসব বাংলা শব্দ আগে শুনেননি, বা ব্যবহার করেননি কিংবা ভুলে গেছেন। আবার এগুলোর উৎসও হয়তো তাদের নিকট অজ্ঞাত। আমি শব্দ ধরে ধরে কথা বলবো। কবিতটার নাম ‘কানাওলি জোছনার নিশানা’। আমি কবিতাটা পাঠ করি:

তুমি বুঝি কানাওলি জোছনার নিশানা!
যেদিকেই পাও মেলি
তোমার দেওড়িতে গিয়ে ঠেকে মুখ।
ছায়া পইড়া থাকে পথে পথে।

সুর থেকে শব্দ শুষে নিয়ে
তোমার নিঃশব্দ্যে আমার সকল গান আজ নিরাকের হাহাকার।
রক্তের প্রত্যেক বিন্দুতে কেবল তোমার
স্বেদ কিবা বিষ পড়ে আছে।
যে-তিরাস পথে পথে ঝরে
আমি জানি তোমার তালুতে তার নিবারণ নাই।

তবু পীরিত আর ঘেন্নার ভেতর
এই ঘোর লাগা হাওয়া বুকে নিয়া
আমি কোথায় চলেছি?
আমার সকল পথই তো আজ
তোমার মধ্যে এক হয়্যা আছে।

এই কবিতার কতগুলো শব্দ যেমন কানাওলি, পাও, দেউরি, নিরাক, পিরীত এই শব্দগুলো সাধারণত আমরা ব্যবহার করতে চাই না বা করি না। যেমন ধরেন আপনার নিরাক শব্দটির অর্থ আমার মনে হয় অনেকেই জানে না। আবার পাও শব্দটার কথা ধরা যাক। আমার বাড়ি সিলেটের সুনামগঞ্জ। আমার বাবাকে আমি কখনো ‘পা’ বলতে শুনি নাই। আব্বা বলতেন ‘পাও’, যদিও তিনি সে সময় উচ্চশিক্ষিত শ্রেণির মানুষই ছিলেন, সারাজীবন শিক্ষকতা করেছেন। তো এই শব্দগুলো এবং তাদের ব্যবহার নিয়ে একটু বলেন।
ফয়েজ আলম: এইটা আমার অন্যতম প্রিয় একটা কবিতা। ধন্যবাদ, আপনি খুব চমৎকারভাবে এটা পড়েছেন। আপনি একসময়ে আবৃত্তি করতেন, তাই আপনার মুখে এত ভালো লেগেছে। আমি পড়লে হয়তো অতটা ভালো লাগতো না।

শাপলা সপর্যিতা:কবিরা তাদের কবিতা ভালো পড়তে পারে না।
ফয়েজ আলম: হ্যাঁ, তাই মনে হয়। রবীন্দ্রনাথের মুখে রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুল কন্ঠে নজরুলের গান–নিশ্চয়ই বিরূপ অভিজ্ঞতা আছে এ বিষয়ে। যাই হোক, মূল কথায় ফিরে আসি। পাও-এর অর্থ তো আপনি জানেন–ঠ্যাং, প্রমিত বাংলার প্রভাবে প্রচলিত কোলকাতার কথ্য বাংলায় পা, তাই আমাদের কাছেও পা হয়ে গেছে আরকি।
কানাওলি জোছনা’র ‘কানাওলি’ শব্দটা সম্পর্কে বলি। আমাদের ওখানে বর্ষায় চারদিক ডুবে যায়। চারদিক মনে হয় সফেদ সমুদ্রের মত, যদিও অনেক জায়গায়, বিশেষ করে ফসলি জমিতে পানির গভীরতা থাকে কম, এক দেড়ফুট থেকে শুরু করে ৮/১০ ফুটের বেশি না। কিন্তু উপর থেকে দেখলে সবটাই অথৈ সমুদ্রের মত লাগে। প্রায় সারা বাংলাদেশেই কমবেশি এইরকম পানি হয় বর্ষায়। আমাদের ওখানে বেশি। পুরা হাওর পানিতে ভাসছে, আবছায়া জোছনায় হয়তো কেবল মাঝখানে একটা মাটির রাস্তা ভেসে থাকে। ওইসময়ে বলতো ইউনিয়ন বোর্ড বা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সড়ক। যখন চাঁদ উঠে আর তার মরা আলো এসে পড়ে হাওড়ের পানিতে তখন মনে হয় সমুদ্রের মত চারদিকে ছড়ানো এই অথৈ পানির প্রসার যেন এক রহস্যময় পরিসর, যার কিছুটা দেখা যায় আর বেশির ভাগটাই অদেখার রাজত্ব। আবার অমবস্যার সময় থাকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মানুষ পাটকাঠির আলোতে পথ দেখে নেয়। এরকম রাতে মানুষ কুপি বাতি বা পাটকাঠির আলো জ্বালিয়ে অগভীর পানিতে কোচ দিয়ে মাছ মারতে নামে। মাঝে মধ্যে এমন হয় সে কেবল গভীর পানির দিকে যেতে থাকে, পরে সচেতনভাবে চেষ্টা করে শুকনার দিকে ফিরতে গেলেও সঠিক দিক খুঁজে পায় না। বরং গভীর পানির দিকে তাকিয়ে ভাবে ঐতো শুকনো জমিন। এভাবে বিভ্রান্ত হয়ে সে কেবল গভীর পানির দিকেই যেতে থাকে। এইরকম ঘটনা বাস্তবে অনেক ঘটে। পরে অনেক কষ্টে মানুষ শুকনো জমিনের দিকটা খুঁজে পেয়ে ফিরেও আসে। এমন না যা মানুষ চিরতরে হারিয়ে যায় বা পানিতে ডুবে মারা যায়। আমার নিজেরও এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে।
যাইহোক, আগেরকাইলা মানুষেরা এই বিষয়টাকে ব্যাখ্যা ও বিশ্বাস করে এইভাবে যে: কানাওলি হলো জ্বিন/ভুত/পরী/দেও জাতীয় এক শক্তি। এরা রাতের বেলা পানিতে নামা মানুষের দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করে গভীর পানিতে নিয়ে যায় এবং পানিতে চুবিয়ে মেরে ফেলে। যেহেতু দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করে অর্থাৎ প্রায় কানা বানিয়ে গভীর পানির দিকে টেনে নেয় তাই এর নাম দেয়া হয়েছে কানাওলি। আমার যেটা মনে হয় অনেককক্ষণ ধরে আলোর রশ্মি বরাবর পানিতে তাকিয়ে থাকার কারণে মানুষের সাময়িক দৃষ্টিবিভ্রম ঘটে। যখন সে ফিরতি পথ ধরে তখন সে আর রাস্তা খুঁজে পায়না, বরং দৃষ্টি বিভ্রমের জন্য গভীর পানির দিকে তাকিয়ে কোন একটা ঢেউ বা পাইন্যা আগাছার সারিকে শুকনা রাস্তা বলে ভুল করে গভীর পানির দিকে যেতে থাকে। শেষে পানির গভীরতা অনেক বেড়ে গেলে ভুল বুঝতে পেরে উল্টো দিকে চলে ফেরত আসে।
আমার নিজের জীবনে এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে। একবার আমি আর আমার এক সহপাঠী বন্ধু শখ করে রাতের বেলা এরকম মাছ মাছতে বের হয়েছি বর্ষার অগভীর পানিতে। অনেকক্ষণ পর ফিরতি পথ ধরেছি, দেখি পানি বাড়ছে। প্রথমে হাঁটু পানি হয়ে গেল, পরে উরু পানি। আমরা সন্দেহে পড়ে গেলাম। দূরে তাকিয়ে দেখি গভীর পানির দিকেই সামনে যেন ডিষ্ট্রিক বোর্ডের সড়ক দেখা যাচ্ছে। তাহলে পানি কেন বেড়ে যাচ্ছে? আমার বন্ধু বললো, পানি বাড়–ক, রাস্তা তো দেখা যাচ্ছে। আরেকটু যাওয়ার পর কোমর পানি, কাপড় ভিজে গেছে, এরপর পেট পর্যন্ত পানি আসতেই আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। একজন আরেকজনকে বললাম আমাদেরকে কানাওলি ধরেছে। আমরা শুনেছি কানাওলি ধরলে কিছু না ভেবেই উল্টা দিকে হাঁটতে হয়। আমরা উল্টা দিকে হাঁটা শুরু করলাম। পানি কমতে থাকলো। এক পর্যায়ে এক ফুট পানিতে চলে আসলাম। সামনে তাকিয়ে দেখি ডিষ্ট্রিকবোর্ডের কাঁচা সড়ক লম্বা হয়ে পড়ে আছে আমাদের কতদূর সামনেই। আমরা দৌড়াঁতে শুরু করলাম। আলোটালো কোচ-মাছ সব ফেলে দৌড়। সড়কে উঠার পর হাঁফাতে হাঁফাতে দুইজনে বলছিলাম যে, আমাদেরকে আজ কানাওলি ধরেছিলো, কোনরকেেম বেঁচে গেছি। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কারণে কানাওলীকে একটা নারী চরিত্র হিসাবে দাঁড় করানো হয়েছে আরকি।

শাপলা সপর্যিতা: ডাকিনি, যোগিনীর মতো একটা ব্যাপার আর কি। মানুষকে সমোহিত করে সর্বনাশের দিকে নিয়ে যায়। সেটা নারী-ই করে।
ফয়েজ আলম: কানাওলিকে আমি প্রতিক হিসাবে নিয়ে এসেছি এই কবিতায়। এখানে প্রেম বা এ সংক্রান্ত অন্ধ আাবেগ কানাওয়ালী জোছনার মত মানুষকে বাছবিছার করার সুযোগ না দিয়েই শেষপর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। যদিও সে জানে ওখানেই তার পতন, জীবনের ক্ষয়, তবু সেদিকেই যাবে। আমাদের পূর্ব-পুরুষদের চেতন-অবচেতনে বেঁচে থাকা এই বিশ্বাসটাকে রূপক হিসাবে নিয়েছি কবিতায়। উদ্দেশ্য দুটো: এক প্রেমের বিষয়টাকে আকাঙ্খা অনুযায়ী প্রকাশ করা; দুই: আরব, গ্রীক বা মহাভারতীয় মিথ প্রত্যাখ্যান করে আমার মাটিতে জন্মানো উপকরণ দিয়েই ভাবের প্রকাশ।

শাপলা সপর্যিতা: আপনার কবিতায় আমরা আসলে সত্যিকার অর্থে যা খোঁজে পেয়েছি সেটি হলো উত্তরউপনিবেশী মনোভঙ্গি এবং তার বাস্তব প্রয়োগ। কানাওলি জোছনাসহ অনেক কবিতাই তার প্রমাণ। আপনি যে উত্তরউপনিবেশবাদ, বা ইংরেজীতে যেটাকে বলে পোস্টাকলোনিয়ালিজম, নিয়ে কাজ করছেন। এ নিয়ে আপনার তিনটা বই প্রকাশিত হয়েছে। এখনো দিনের পর দিন গবেষণা করছেন, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, মাইকেল মধুসুদন দত্ত ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। সবই করছেন বাঙালি জাতিসত্তার জন্য অফুরান প্রেম নিয়ে। এটি আমাদের জন্য নি:সন্দেহে মাইল ফলকের মত। উত্তর উপবেনিবেশিকতা নিয়ে আরো শুনব আমরা। তার আগে আপনার মুখে এখন পর্যন্ত অগ্রন্থিত দুটি কবিতা শুনতে চাই। যেগুলো কোথাও প্রকাশিত হয়নি। সিলেটের ওয়াহিদ রুকন, সে আপনার বেশ কিছু কবিতা নিয়ে বড় একটা আলোচনাও করেছেন প্রান্তস্বর পত্রিকায়।
ফয়েজ আলম: ঠিক আছে, দুটো কবিতা পড়ি।

ভবের বাজারের ইস্টিশানে

ট্রেইন চলে গেছে কোন্কালে,
ভবের বাজারের পতিত ইস্টিশানে আমি বইসাই থাকি।
ইঞ্জিনের আলো ধীরে মুছে গেলে তার পিছের আন্ধাইর মাপি।
কারা যেন বৈদুত্যিক পণ্যের দোকানে দাড়ায়া দেখে
শতাব্দির সবচেয়ে উজ্জ্বল চান।

আমি টের পাই এলইডি নিয়নের আলো যেই হারে বাড়ে
সেই হারে পৃথিবীতে জোছনাও কমতেছে।
আকালের দিনে তাই দুই ট্রেইনের মাঝখানের
জোছনার ফ্রেমে নিজে ধরা দেই পাক্কা বেঞ্চের আকরে
যেন বা মরতে মরতে একদিন পৃথিবীতে জোছনাদের জন্ম-নিরোধ হবে।

ভাবতেছি চাইরোদিকে সবই তো রয়ে যায়-
এই গাছগাছালি, পাক্কা বেঞ্চ, তার গায়ে মরা জোছনা
আরেকটি ট্রেইনের সম্ভাবনা;
তবু ট্রেইন চলে গেলে কেন বিরান বিরান লাগে ইস্টিশানে!

পথে পথে

বটের তলায় বসি, কাটায়া উঠি রৈদ-গরমির দ্বিধা
অথচ বাইর হওনের আগে কাগজে আঁকছি কত সোজা সাপটা পথ।
কতগুলাই বা দিন, এরই মধ্যে ভুলে গেছি
পথের পেট থাইকা আরো পথ বাইর হয়্যা আসে কোনদিকে!
পিছপথে ফেলা আসা কোন কোন কান্দন
কেন এতদিনে গান হয়্যা উঠে।

সেই সুর বুকে তুলে বুঝি
পথের দূরত্ব ছাড়াও মানুষেরা কতকিছু ছাইড়া আসে!
আমি সেই ফেলনা কুড়ায়া আনি,
টুকরা শিলটে লেখা তোমার নাম পড়ি ‘দুঃখু’।

সকল ফিরতি পথ যদি ঠেকে গিয়া সাড়ে তিন হাতে
তাইলে যাইতেই পারি তোমার কাছাকাছি কিংবা দূর-
যে কোন গন্তব্যে।

শাপলা সপর্যিতা: বাহ খুবই সুন্দর, আমাদের মান কথ্যবাংলায় রচিত। আচ্ছা, এই যে উপনিবেশবাদ নিয়ে কাজ করছেন, উপনিবেশবাদ নিয়ে কাজ করার ভাবনাটা আপনার মাথায় কিভাবে এলো? আমি যতদুর জানি আপনি শুরু করেছিলেন প্রমিত বাংলায় লেখা দিয়ে, যদিও টান ছিলো আমাদের কথ্য মানবাংলার প্রতি। তারপর আপনার হাতে এডওয়র্ড সাঈদ এর ওরিয়েন্টালিজম বইটা আসার পর কিভাবে আপনার ভাবনার মোড়টা ঘুরে গেল? সেই জায়গা থেকে যদি একটু বলেন তাইলে আমার মনে হয় আমাদের পাঠক-শ্রোতারা উপকৃত হবে।
ফয়েজ আলম: আমি আগে যতটুকু বলেছিলাম সেখান থেকেই শুরু করতে হয়। ১৯৮৬-৮৭ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হলাম। দেখলাম এখানে একটা বিস্তৃত পরিসর–সৃজনশীলতার জন্য, লেখালেখির জন্য; যে যা করতে চায় তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। আপনি জানেন যে, প্রমিত বাংলা বা কেতাবী বাংলা ভাষার দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ও অন্যান্য কারণে কলকাতার কথ্যবাংলা আমাদের আমাদের কথ্যবাংলা থেকে বহু আগেই খানিকটা আলাদা হয়ে গেছে। আমার লেখায় আমি চেষ্টা করতাম আমাদের বাকভঙ্গি, শব্দ এবং বাক্যকে প্রাধান্য দিতে। আপনি আমি যে-ভাষায় কথা বলি, বন্ধুবান্ধব মিলে আড্ডা দেই, পরিবারে ও অফিসে যে কথ্যভাষা ব্যবহার করি সেইটা। এক পর্যায়ে যেটা হয় আমি আমার সময়ের কিছু কিছু হবু-কবিসাহিত্যিকের সমালোচনার মুখে পড়ি। তারা ফতোয়া দেন সংস্কৃত বাংলা ভাষার মা/মাতা। তো আমি কেনো এই গ্রাম্য বাংলার প্রতি আগ্রহ দেখাই, কেন এইসব বিশেষ শব্দ ব্যবহার করি, কেন আমার ভাষাভঙ্গি এইরকম, ইত্যাদি। তো এক পর্যায়ে সত্যিকার অর্থে আমি তাদের কাছ থেকে সরে আসি। কিন্তু আমি আমার মান কথ্যবাংলায় লেখার আকাঙ্খা এবং এ সংক্রান্ত বিশ্বাস থেকে সরিনি। এ সূত্রেই আমার শেকড়ের সন্ধান শুরু। বাংলা ভাষার উৎপত্তি, সংস্কৃত ভাষার উৎপত্তি, বাঙালির জাতির উৎপত্তি ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক পড়াশোনা শুরু করি। এই সময়, খুব সম্ভবত ৯০ বা ৯১ সালে আমার হাতে এডওয়ার্ড সাঈদের অরিয়েন্টালিজম বইটা আসে। আমি তখন থার্ড ইয়ারে পড়ি হয়তো, ঠিক মনে নাই। এবং সত্যি কথা হচ্ছে ঐ সময় আমি বইটা বুঝতে পারিনি। বইটা আমি কিনে নিয়ে এসেছিলাম প্রায় এক হাজার টাকা দিয়ে, নিউমার্কেটের জিনাত বুক স্টল থেকে সম্ভবত।

শাপলা সপর্যিতা: এক হাজার টাকা! ৯১-৯২ সালে এক হাজার টাকা তো অনেক বড় অংকের টাকা। বিশেষত আমরা বাঙালিরা যখন বইয়ের পিছনে টাকা খরচ করতে চাই না। একুশের বই মেলায় এতো এতো টাকা খাবারের পিছনে খরচ করি, কিন্ত একটা বই কিনতে চাই না।
ফয়েজ আলম: হ্যাঁ, ওই সময় এক হাজার টাকা অনেক টাকা। যেহেতু বইটা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ, আমি বিভিন্ন লোকের কাছে শুনেছি এটা গুরুত্বপূর্ন বই। সেজন্য বইটা কিনে নিয়ে আমি পড়তে শুরু করি। ৯১-৯২ সালে আমি বইটা পড়ে ফেলি। কিন্তু ঐভাবে হৃদয়ঙ্গম করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ৯৩ সালে এর ভূমিকাটা অনুবাদ করে কিছু অংশ ছেপেও দেই। তবে এক কিস্তিই ছাপা হয় মাত্র কোন একটা লিটল ম্যাগে, এখন নাম মনে নেই। এর মধ্যে ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসে; আমি পরীক্ষা দেই। কবিতা আগের মতই লিখতে থাকি।
১৯৯৬ সালে নতুন করে এবিষয়ে আমি আবার সজাগ হয়ে উঠি যখন আন্তর্জাতিক পত্র পত্রিকায় এবং মিডিয়ায় পোস্ট কলোনিয়ালিজম, কলোনিয়ালিজম, নিও কলোনিয়ালিজম এগুলো নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। তখন বইটা আবার আমি পড়তে শুরু করি। এরমধ্যে নানামুখি পাঠ থেকে আমার একধরণের পরিপক্কতা এসেছে। বইটা আমাকে একেবারে নাড়িয়ে দেয়। আমি বলবো অরিয়ান্টালিজম পড়ার পর আমার বোধ, আমার লক্ষ্য, আমার বুদ্ধিভিত্তিক বিচরণ সবকিছুতেই নতুন এক আলোকপাত ঘটে। আমি উপলব্ধি করি গত কয়েকশ বছরে পৃথিবীতে একটা বিরাট ঘটনা ঘটে গেছে, তা হলো উপনিবেশ। পশ্চিমের লোকেরা প্রাচ্যের লোকদেরকে দখলদারিত্বের মধ্যে নিয়ে আসার জন্যে, শাসন শোষনের মধ্যে নিয়ে আসার জন্যে, জ্ঞানের জগতে বিপুল পরিমাণ গ্রন্থ রচনা করেছে। সেখানে প্রাচ্যকে নিকৃষ্ট রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। পুরোটাই হচ্ছে বানানো, বানোয়াট একটা অবস্থার মধ্যে প্রাচ্যকে নিকৃষ্ট আর পশ্চিমকে পশ্চিমকে উৎকৃষ্টরূপে দেখানো হয়েছে। তারপরই যুক্তি দেখানো হচ্ছে যেহেতু প্রাচ্য নিকৃষ্ট, কাজেই প্রাচ্যকে পশ্চিমের সভ্যতার সমতুল্য করার জন্য প্রাচ্যকে দখল করতে হবে, প্রাচ্যকে শাসন করতে হবে, আর তাকে শিক্ষা দিতে হবে, তার জ্ঞান চর্চায় হস্তক্ষেপ করতে হবে। এটি হলো জোর করে অন্যদেশ দখল করা এবং সেখানে লুটতরাজ চালানোর পক্ষে একটা বানোয়াট জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। এই জিনিসটা এডওয়ার্ড সাঈদ এত চমৎকারভাবে তার বইয়ে নিয়ে এসেছেন যা আমার বোধে একটা ভিন্ন প্রান্তরই খুলে দেয়। ফলে এই ১৯৯৬ সালের পরেই আমি সিদ্ধান্ত নেই যে, বইটা অনুবাদ করে ফেলব। আমার লেখার ক্ষেত্রেও অরিয়েন্টালিজম পাঠ পরিষ্কার ছাপ ফেলে। এর পরের যেসব লেখা, ৯৭-৯৮-এর পরের যেসব লেখা সেগুলো নতুন আঙ্গিকে, নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে শুরু হয়।

শাপলা সপর্যিতা: আপনি পড়েছিলেন তাহলে অরিজিনাল ইংলিশটা- অরিয়েন্টালিজমের।
ফয়েজ আলম: হ্যাঁ অরিজিনাল ইংলিশটা, ঠিক। পেঙ্গুইনের পেপারব্যাক।

শাপলা সপর্যিতা: তারপরে সেটা অনুবাদ করেছেন।
ফয়েজ আলম: অনুবাদ শুরু করি আরেকটু পারে।

শাপলা সপর্যিতা: আপনি কাভারিং ইসলামও অনুবাদ করেছেন?
ফয়েজ আলম: হ্যাঁ, আমি কাভারিং ইসলামও অনুবাদ করেছি। এডওয়ার্ড সাঈদ-এর পরপরই আমি ফ্রানৎজ ফানোর ‘ব্লাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক‘, ‘রেচেড অব দি আর্থ’ এবং এমি সিজারের লেখাও পড়ে ফেলি। উনিবেশের প্রভাব সম্পর্কে যেসব বইপত্র জোগাড় করা সম্ভব হয় তার সবই পড়ে ফেলি। এই পাঠ আমার লেখক জীবনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে। এর পরে আমি যেসব কবিতা লিখেছি সবই মান কথ্যবাংলায়, কখনো ঐ তথাকথিত ‘প্রমিত বাংলায়’ অর্থাৎ কেতাবী বাংলায় ফেরৎ যাইনি। আপনি ‘ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ খাওয়া মানুষ’ প্রসঙ্গে বলছিলেন। বইটা বেরিয়েছে ৯৯ সালে, কিন্ত কবিতাগুলো মূলত ৯৬ সালের আগের লেখা। আর পরের লেখাগুলো ‘জলছাপে লেখা’ বইয়ে দিয়েছি। ফলে প্রমিত বাংলার যা কিছু ছিল ‘ব্যক্তির মৃত্যু এবং খাপ খাওয়া মানুষ’-এর মধ্যেই শেষ হয়েছে, মানে ৯৬ সালের আগেই শেষ হয়েছে। এরপর আমি উপনিবেশবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ এগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করি এবং লিখতে শুরু করি; পরেতো অরিয়েন্টালিজম অনুবাদ করলাম। এই হলো উপনিবেশ, উত্তরউপনিবেশবাদ ইত্যাদি বিষয়ে আমার লেখাজোখা শুরুর ইতিহাস।

শাপলা সপর্যিতা: আচ্ছা, কিছু পরিভাষা সম্পর্কে যদি এখানে পরিস্কার করে বলেন। যেমন: উপনিবেশ, নয়া উপনিবেশ, উত্তর উপনিবেশবাদ, এই বিষয়গুলো নিয়ে যদি আমাদেরকে একটু বিস্তারিত বলেন।
ফয়েজ আলম: উপনিবেশ ও উপনিবেশী শাসন সম্পর্কে তো আপনি জানেন। এ সংক্রান্ত আরেকটি পরিভাষা হলো স্থানান্তর, ইংরেজীতে মাইগ্রেশন বলে। এক অঞ্চলের একদল লোক যখন তাদের বাসভূমি ছেড়ে অন্য কোন অঞ্চলে গিয়ে জায়গা দখল করে স্থায়ীভাবে থেকে গেছে সেটাকে চিহ্নিত করা হয়েছে স্থানান্তর হিসাবে। যেমন উত্তর ভারতের উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুরা মধ্যএশীয় অঞ্চল থেকে এসে ভারতে জায়গা দখল করে স্থায়ী বসতি করে। তারা ভারতে থেকে গেছে এবং ভারতের সংস্কৃতি ও ভারতের ভাষার সাথে নিজেদের ভাষার সংমিশ্রণও মেনে নিয়েছেন। একইভাবে মধ্যযুগে মোগলার এসেছিলো এবং মোগলারও এই সমাজের মধ্যে বিলিন হয়ে গেছে, এখানকার সংস্কৃতি ও পরিবেশ মেনে নিয়েছে, এই জনগোষ্ঠীতের মিশে গেছে। এটাই স্থানান্তর বা মাইগ্রেশন। কিন্তু উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা হলো এক জাতি কর্তৃক আরেকটা জাতিকে তার ভূখন্ডসহ জোর করে দখল করে শাসন করা, তাদের সম্পদ লুট করে নিজ দেশে নিয়ে যাওয়া, কিন্তু সেখানে স্থায়ী বসত প্রতিষ্ঠা না করা। উপনিবেশকরা দখলকৃত দেশে শাসন-নির্যাতন চালায়, অর্থনৈতিক শোষন চালায়, সম্পদ লুট করে নিজ দেশে নিয়ে যায়। উপনিবেশ টিকিয়ে রাখার জন্য এ বিষয়ে তারা বানোয়াট শিল্প-সাহিত্য ইতিহাস জ্ঞান উপনিবেশিতদেরকে জোর করে গেলায়। এটিই উপনিবেশ। (চলবে)



পরের অংশটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


One thought on “আলাপচারিতায় ফয়েজ আলম | অংশ- ০১

Comments are closed.