দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ০৪



এলিফ শাফাক (Turkey: Elif Şafak; English: Elif Shafak) একজন টার্কিশ-বৃটিশ লেখিকা। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ছোটবেলা কাটে মাতৃভূমি তুরস্কে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। ঔপন্যাসিক এলিফকে তুরস্কের সর্বাধিক পঠিত নারী লেখক হিসাবে গণ্য করা হয়। টার্কি ও ইংরেজিতে এ পর্যন্ত এলিফের মোট উনিশটি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার বারটিই উপন্যাস।  ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস THE FORTY RULES OF LOVE প্রকাশের প্রথম মাসে দেড় লক্ষ কপি বিক্রি হয়। বলা হয়ে থাকে, এটিই তুরস্কের কোন লেখকের সর্বাধিক বিক্রিত বই। বিবিসি (BBC) একশটি উপন্যাসকে বাছাই করেছিল, যেগুলো পৃথিবীকে একটা রূপ দেয়, দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ তার মধ্যে অন্যতম।

অকালবোধনের পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি বাংলায় অনুবাদ করছেন কবি, অনুবাদক আকিল মোস্তফা। অনুবাদটি অকালবোধনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।


পূর্বের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


গুরু

বাগদাদ, এপ্রিল, ১২৪২

বাগদাদ হয়ত তাবরীজের শামসের আসার দিনটিকে মনে রাখেনি, কিন্তু আমি আমাদের শান্ত-নিরিবিলি দরবেশ আশ্রমে তার আশ্বাসর দিনটিকে কখনই ভুলবনা। সেদিন মধ্যাহ্নে আমাদের কিছু গুরূত্বপূর্ণ অতিথি ছিল। তার সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে সেখানে আসার কারণে অতিথিদের সাথে আলোচনায় ইতি টানতে হল। আমার বিশ্বাস তার সেই আগমনের পেছনে শুধুই সৌহার্দসূচক দর্শন ছাড়াও আরো কিছু ছিল। সূফীজমের প্রতি তার বিরাগ জানা থাকায়, সেদিনের বিচারক অতিথিরা বললেন সে এখানে এসেছে আমাদের উপর নজরদারী করতে যেমনটা সে এলাকার অন্য সূফীদের উপরেও করে থাকে।
বিচারক ছিলেন চওড়া মুখ, ঝুলে পড়া ভুড়ী, ছোট ছোট হোঁৎকা আঙুল যার প্রতিটিতে আবার বিভিন্ন দামী দামী অঙুরীয় পড়া একজন উচ্চাভিলাষি মানুষ। তার অধিক খাওয়া অনুচিত হলেও কেউ এমনকি তার ডাক্তারও তাকে এটা বলার সাহস রাখেনা। ধর্মীয় পণ্ডিত ব্যক্তিদের মাঝে সে ঐ এলাকার সবচেয়ে প্রভাবশালী একজন। এক আদেশেই সে একজনকে যেমন শূলে চড়াতে পারে আবার তেমনি চাইলে একজন দোষীকে সহজেই ক্ষমা করে ফাঁসির অন্ধকূপ থেকে বের করেও নিয়ে আসতে পারে। সে সবসময় অতি মূল্যবান গয়না আর পশমের জামা পড়ে জাঁক-জমকের সাথে একজন সঙ্গী নিয়ে ঘুরে বেড়ায় যে তার গুরুত্ব সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। এইসব লোকদেখানো অতি-আড়ম্বরতা আমার পছন্দ না হলেও আশ্রমের স্বার্থে এই সামাজিকভাবে প্রভাবশালী লোকের সাথে আমাকে ভালো সম্পর্ক রাখতেই হয়।
মুখের ভিতরে একটা আঙুল চালাতে চালাতে ঐ বিচারক বলতে লাগলেন, “দেখুন আমার এইমুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ শহরে আছি। বর্তমানে বাগদাদ মঙ্গোল সেনাদের হাত থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থিতে ভরে যাচ্ছে। তোমরা কি বোঝনা, বাবা জামান, এ জায়গা এখন পৃথিবীর মধ্যমণি বলতে পার।“
আমি সাবধানে প্রত্যুত্তর করলাম, “কোন সন্দেহ নেই।কিন্তু একইসাথে এটা ভুললে চলবেনা শহর হচ্ছে অনেকটা মানুষেরই মত, সে জন্ম নেয়, শৈশব ও কৈশোর পার করে এবং একসময়ে সে বৃদ্ধ হয়ে অবশেষে একদিন মারাও যায়। আর এখন বাগদাদ তার শেষ যৌবনে আছে। যদিও আমারা এখনও গর্ব করতে পারি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প আর কবিতার জন্য, কিন্তু আমারা প্রকৃতপক্ষে খলিফা হারূন-অর-রশীদ এর সময়ের মতে সম্পদশালী নই। কে জানে হাজার বছর পরে এই শহর দেখতে কেমন হবে? অনেক কিছুই তখন ভিন্ন হতে পারে।“
একটা খাবারের থালা শেষ করে অপর আরেকটার দিকে হাত বাড়ানোর সময় একটা খেজুর মুখে পুড়তে পুড়তে সে বলল, “খুবই হতাশাবাদি কথা। মনে রেখ আব্বাসিয় শাসনই কায়েম থাকবে এবং সামনে আরো ভালো করবে। হাঁ, খেয়াল রাখতে আমাদের মধ্যে থাকা বিশ্বাসঘাতকরা যেন কোন ক্ষতি করতে না পারে। কিছু এমন আছে যারা নিজেরদের মুসলিম বলে কিন্তু তাদের তথাকথিত ইসলামি কার্যকলাপ কাফেরদের থেকেও ভয়ঙ্কর।“
আমি নীরব থাকাটাই সমীচীন মনে করলাম। এটা না বুঝার কিছু ছিলনা, বিচারক আসলে সূফীদের রহস্যময়তা এবং ইসলাম নিয়ে তাদের নিজস্ব ধ্যানধারণার দিকেই ইঙ্গিত করছিলেন। তিনি আমাদের দায়ী করছিলেন কেননা শরীয়া’কে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা আসলে প্রশাসন ও তার কর্তা ব্যক্তিদেরকে-যেমন তিনি- অশ্রদ্ধা দেখাচ্ছি। মাঝে মাঝে আমার এটাও মনে হত যে পারলে উনি সব সূফীদেরকেই লাথি দিয়ে বাগদাদ থেকে বের করে দিতেন।“
দাড়িতে আঙুল চালাতে চালাতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা সূফীরা ক্ষতিকর না হলেও তোমার কি মনে হয়না কেউ কেউ একটু অন্যরকম অতটা বিবর্ণ নয়? “
আমি বুঝতে পারছিলামনা আমার কি বলা উচিত। আলাহর কাছে হাজার শুকুর ঠিক তখনই দরজায় করাঘাত হল। একজন আদা রংয়ের চুলওয়ালা এক বালক। সে আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে কাছে এসে কানে কানে ফিসফিস করে জানাল একজন ভ্রমণরত দরবেশ এসেছেন এবং আমার সাথে ব্যতীত আর কারো সাথেই সাক্ষাৎ ও কথা বলতে চাচ্ছেননা। সাধারণত শিক্কখানবীশকে আমার বলা উচিত ছিল যাও অতিথিকে অভ্যর্থনা কক্ষে বসাও, উষ্ণ খাবার পরিবেশন কর আর বলা আমাদের বিদ্যমান অতিথি না যাওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। কিন্তু বিচারকের সাথে এমন কঠিন সময় পার করার চেয়ে তাকে ভেতরে ডেকে তার মুখ থেকে মজাদার রং-বেরংয়ের কাহিনী শুনে পরিবেশটাকে হালকা করতে পারা উত্তম বলে মনে হল। এমনটা ভেবে আমি শিক্ষানবিশকে বললাম তাকে ভেতরে নিয়ে আস।
কিছুক্ষনপর দরজা খুলে পা থেকে মাথা কালোজামা পরিহিত একজন প্রবেশ করল। চোখা নাক, গভীর কালো চোখ এবং চোখের উপর আছড়ে পড়া ঘন বাবরি চুলওয়ালা রোগাটে দীর্ঘকায় একজন যার বয়স ঠিক ঠাহর করা যায়না। দীর্ঘ কালো পশমের চাদর দিয়ে তার মাথা ও শরীর আবৃত এবং পায়ে ভেড়ার চামড়ার বুটজুতা। তার ঘাড়ে বেশ কয়েকটা কবচ আর হাতে একটা বাটি যেভাবে সাধারণত দরবেশরা নিয়ে ঘুরে বেরায় তাদের ভেতরে অহং ও দাম্ভিকতাকে অপরের দান গ্রহণ করে নিশ্চিহ্ন করতে। আমি অনুভব করলাম উপস্থিত মানুষটি সমাজ তাকে নিয়ে কি ভাবছে তা নিয়ে মোটেও বিচলিত নয়। লোকে তাকে ভবঘুরে বা ভিক্ষুক যাই ভাবুকনা কেন তা’তে সে বিন্দুমাত্রও বিচলিত নয়।
নিজের পরিচয় দেয়ার জন্য সে যখন অপেক্ষা করছিল, তাকে দেখামাত্রই আমি বুঝলাম সে সাধারণ কেউ নয়। এটা তার দৃষ্টিতে ছিল, তার অঙ্গ-ভঙ্গী’তে ছিল, ছিল তার দেহের প্রতিটি অংশে লিখিত। অনেকটা অজ্ঞের চোখে মনে হওয়া দুর্বল ওক বীজ অথচ যা কিনা ঘোষণা করছে অতিশীঘ্রই তার পূর্ণাংগ ওক গাছে পরিণত হওয়ার সংবাদ। সে আমার দিকে গভীর কালোচোখে তাকাল এবং নীরবে মাথা ঝাঁকালো।
আমার সামনে কুশনে বসার ইশারা করে তাকে বললাম, “আমাদের আশ্রমে আপনাকে স্বাগতম, দরবেশ।“
ঘরের প্রত্যেককে সম্ভাষণ জানিয়ে তাদেরকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে সে এসে আসনে বসল। অবশেষে তার দৃষ্টি গিয়ে বিচারকের উপর পড়ল। কোন কথা না বলে দু’জন একে অপরের দিকে মিনিটখানেক নিবিষ্টভাবে তাকিয়ে থাকল এবং আমার ভেতরে প্রচণ্ড আগ্রহ জন্মাচ্ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দু’জন একে অপরের সম্বন্ধে কি ভাবতে পারে তা ভেবে।
আমি তাকে উষ্ণ ছাগ-দুগ্ধ, মিষ্টি ডুমুর আর খেজুর খাবার অনুরোধ করলেও সে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করল। তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে সে নিজেকে তাবরীজের শামস হিসাবে পরিচিত করাল এবং বলল সে আসমান এবং জমিনের সৃষ্টিকারী খোদা’র খোঁজে ভ্রমণরত এক দরবেশ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আমাদের পক্ষে কি তাঁকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?”
মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়ার সময় তার মুখে এক আলো-ছায়া খেলে গেল, “নিশ্চয়ই, সে’তো আমার সাথেই থাকে সর্বক্ষণ।“
কৃত্রিম হাসি লুকোনোর চেষ্টা না করে বিচারক তাতে যোগ করলে, “আমি কখনই বুঝলামনা তোমরা দেবেশরা কেন জীবনকে এত জটিল করে তোল। খোদা যদি তোমার সাথেই থাকে সারাক্ষণ তাহলে সারা পৃথিবী ঘুরে তাঁকে তন্ন তন্ন করে খোঁজার মানেটা কি?”
তাবরীজের শামস চিন্তাণ্বিতভাবে মাথা ঝাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। যখন সে আবার মুখ খুলল তখন তার চেহারা শান্ত আর কণ্ঠ অত্যন্ত সংযত- বলল, “যদিও সত্য যে খুঁজে তাকে পাবেনা, তারাই পাবে যারা তার সন্ধান করেছিল।“
ব্যঙ্গভরে বিচারকের উক্তি, “যত্তসব শব্দের খেলা। তুমি কি বলতে চাঁচ্ছ একজায়গায় সারাজীবন কাটিয়ে দিয়ে খোদা পাওয়ার আশা মিছে? বাজে কথা। তাহলে সবাইকেই তোমার মত ছেঁড়া কাপড় পড়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে হবে!”
ঘরের মধ্যে লোকটি যখন তার ও বিচারকের মধ্যে চুক্তিনামা দেখাতে চাচ্ছিল তখন সম্মিলিত কলহাস্যের একটা ছোট-খাট ঢেউ উঠল- বিচারককে খুশী করতে ঘরের লোকগুলো উচ্চস্বরে, অবিশ্বস্তভঙ্গীতে এবং অসুস্থভাবে হেসে উঠল। আমি অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। দরবেশ এবং বিচারককে একজায়গায় বসানোটা মস্ত ভুল ছিল।
দরবেশ স্বীকার করে বলল, “খুব সম্ভব আমি বুঝাতে পারিনি।আমি এটা বলতে চাইনি যে কেউ আপন শহরে থেকে খোদাকে খুঁজে পাবেনা। অবশ্যই পাবে। এমন অনেক লোক আছে যারা পৃথিবীর কোথাও ভ্রমণ না করেও পৃথিবীকে অনেক ভালোভাবে চেনে-জানে।“
বিচারক দাঁত কেলিয়ে বিজয়ীর হাসি দিয়ে বলল, “ঠিক তাই।“ কিন্তু তারপরই দরবেশ যা বলল তা শুনে তার হাসি শূন্যে মিলিয়ে গেল।
“বিচারক সাহেব আমি আসলে বলতে চেয়েছি পশমের কোট, রেশমি জামা আর বহুমূল্য অলঙ্কারের মধ্যে থেকে খোদাকে খুঁজে পাওয়া যায়না যেমনটা এখন আপনি পড়ে আছেন।“
একটা হতচকিত নীরবতা ঘরের মধ্যে নেমে আসল। দীর্ঘশ্বাসের শব্দ সেখানে ধুলায় মিলিয়ে গেল। আমরা সবাই এমনভাবে দম আটকে বসে রইলাম যেন মারাত্মক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে কিন্তু তার ধরণ আমার জানা ছিলনা।
বিচারক বললেন, “দরবেশ হলেও তোমার জিহ্ববা বেশ ধারালো।“
“যখন বলা উচিত মনে করি তখন সারা পৃথিবী যদি আমার ঘাড়ে চেপেও বসে তাও আমাকে চুপ করাতে পারবেনা।“
কড়া করে কিছু বলবে মনে হলেও বিচারক তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে তেমন কিছু না করে বললেন, “যেমনটা আপনার ইচ্ছা। যাইহোক আপনার মত লোকই আমাদের এই মুহূর্তে দরকার। মাত্রই আমরা আমাদের শহরের জৌলুষ ও বৈভব নিয়ে কথা বলছিলাম। আচ্ছা আপনি বলেন আপনিতো পৃথিবীর বহু জায়গা ভ্রমণ করেছেন, বাগদাদের চেয়েও বেশী মনোমুগ্ধকর আকর্ষণীয় জায়গা দেখেছেন কি?”
ধীরে নম্রভাবে সবার দিকে এক এক করে তাকিয়ে শামস বলল, “কোন সন্দেহ নেই বাগদাদ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কিন্তু কোন সৌন্দর্‍্য্যই’তো চিরস্থায়ী নয়। শহরগুলোর ভিত্তি তার আধ্যাত্মিক আবহ। যেন একটা বিশাল আয়না যেখানে শহরের অধিবাসীদের হৃদয়ের প্রতিফলন হচ্ছে। যদি হৃদয়গুলো বিশ্বাস হারিয়ে অন্ধকারে ছেয়ে যায় তবে আয়নাও তার ঔজ্জ্বলতা হারাবে। এটাই ঘটে এবং সবসময় এমনটাই হতে দেখেছি।“
তার প্রতি নতচিত্ত হওয়া থেকে আমি নিজেকে সংবরণ করতে পারলামনা। নিজের চিন্তা থেকে বের হয়ে তাবরীজের শামস মুহূর্তের জন্য আমার দিকে চোখে বন্ধুত্বের দীপ্তি নিয়ে তাকালেন। তার দৃষ্টি আমার কাছে প্রজ্বলিত সূর্যের উত্তপ্ত রশ্মির বিকিরণ বলে অনুভূত হল। তখন আমি স্পষ্টভাবে বুঝলাম তিনি তার নামের মতনই উজ্জ্বল। তার মধ্য থেকে ক্রমাগত তেজ এবং প্রাণশক্তি বের হয়ে আসছে যেন ঘূর্ণায়মান এক অগ্নিগোলক। কোন ভুল নেই নিশ্চয়ই সে শামস অর্থাৎ “সূর্‍্য্য”।
কিন্তু বিচারক মহোদয়ের মনে অন্য কিছু ছিল, “নাহ, তোমরা সূফীরা সবকিছুকে ভীষণ জটিল করে তোল। কবি এবং দার্শনিকের ক্ষেত্রেও একই! এত কথার দরকার কি ভাই। মানুষ তার সকল ধরণের চাহিদা নিয়েও খুবই সাধারণ সৃষ্টি মাত্র। তাদের নেতারাই ঠিক করবে তাদের কি প্রয়োজন কতটুকু প্রয়োজন এবং এটাও নিশ্চিত করবে যে কোনভাবেই তারা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আর এইজন্যই শরিয়া আইনের প্রয়োগ দরকার তা নিশ্চিত করার জন্য।
তাবরীজের শামসের প্রত্যুত্তর ছিল, “শরিয়া হল অনেকটা মোমের আলো। মোম আমাদের আলো দেয় সত্যি কিন্তু ভুলে গেলে চলবেনা মোমের আলো আমাদেরকে আসলে অন্ধকারে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পথ দেখায়। আমাদের গন্তব্য ভুলে আমরা যদি মোমের আলোতেই নিজেদের কেন্দ্রীভূত করি তাহলে আর এর প্রকৃত সত্যের সন্ধান পাওয়া যাবে কি?”
বিচারক সাহেব ব্যাঙ্গাত্মক হাসি দিয়ে তার মুখ বন্ধ করলেন। আমার ভিতরে উদ্বেগের একটা স্রোত বয়ে গেল। শরীয়া’র গুরুত্ব নিয়ে ক্ষমতাধর কোন বিচারকের সাথে তর্কে যাওয়া, যার কাজই হচ্ছে শরীয়া নির্ভর আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে কাউকে শাস্তি নিশ্চিত করা, মানেই ভয়ঙ্কর জলে নেমে সাঁতরানোর চেষ্টা করা। শামস কি এটা বুঝতে পারছেনা?
আমি যখন সুযোগ খুঁজছিলাম শামসকে ঐ ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসার তখনই থাকে বলতে শুনলাম, “এধরণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে এমন একটা নিয়ম আমার জানা আছে।“
“কি নিয়ম?” বিচারকের সন্দিগ্ধ জিজ্ঞাসা।
শামস সোজা হয়ে বসে এমনভাবে তাকালো যেন কোন খোলা বই থেকে দেখে বলছে, “প্রত্যেকেই তার নিজস্ব উপলদ্ধি ও বোধের স্তর থেকে পবিত্র কুরআন’কে বোঝার চেষ্টা করে থাকে। আত্মার চারটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তরটা বাহ্যিক যা নিয়ে সর্বসাধারণ সন্তষ্ট। দ্বিতীয় ধাপের নাম বাতেনী- এটা ভিতরের ধাপ। তৃতীয় ধাপ আরো ভিতরের আর চতুর্থ ধাপ এত বেশী ভিতরের যে তাকে ভাষায় কোনভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব না বিধায় এইস্তরকে অব্যাখ্যেয় আখ্যা দেয়া যায়।“
জ্বলজ্বলে চোখে শামস বলে যেতে থাকল, “যে সকল পণ্ডিত শরীয়া নিয়ে আছে তারা শুধু এর বাহ্যিক অর্থেই অভ্যস্ত আর সূফীরা জানে এর অন্তর্নিহিত অর্থ। সাধুরা জানে আরো গূঢ় তাৎপর্য। আর চতুর্থ স্তরের ধারণা শুধুমাত্র নবী-রাসূল এবং খোদার নিকটবর্তীদেরই জানা আছে।“
থালায় আঙুলের টোকা দিতে দিতে বিচারক জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন কুরআন সম্বন্ধে শরীয়া ভিত্তিক বিদ্বানদের চেয়েও সূফীরা অধিক দখল রাখে।“
একটা সূক্ষ্ণ ব্যাঙ্গাত্মক হাসি খেলে গেলেও দরবেশ চুপ করে রইল।
বিচারক বললেন, “বন্ধু সাবধান। আপনার অবস্থান আর ধর্মের অপব্যাখ্যা বা অজ্ঞতার মধ্যে ফারাক খুব কম।“
এটাকে যদি সাবধান করে দেয়ার ইঙ্গিত হিসেবে ধরে নেয়া হয় তবে বলা যায় দরবেশের তাতে কোন নজরই ছিলনা। উলটো একটা দম নিয়ে সে বলল, “ধর্মের অপব্যাখ্যা বা অজ্ঞতা আসলে কি? আমাকে অনুমতি দিলে এ বিষয়ে আমি একটা গল্প বলতে পারি।“
অতঃপর সে যা বলল তা অনেকটা এরকমঃ
একদিন মুসা (আঃ)পাহাড়ে একা একা হাঁটার সময় দেখতে পেলেন কিছু দূরে একজন রাখাল হাঁটু গেড়ে বসে দু’হাত আকাশের দিকে তুলে দোয়া করছিল। খুব খুশী হলেও মুসা যখন কাছাকাছি হয়ে তার দোয়া শুনল, সে অবাক হয়ে গেল।
“ওহ, খোদা তুমি কি জান আমি তোমাকে তুমি নিজেকে যতটা ভালোবাস তারও অধিক ভালোবাসি। শুধু বলে দেখ, আমি তোমার জন্য সব করতে পারি। এমনকি তুমি চাইলে আমার পালের সবচেয়ে ভালো ভেড়াটাকে কোন দ্বিধা ছাড়াই তোমার নামে কুরবানি দিতে পারি। আর তুমি তা দিয়ে রোস্ট বানিয়ে খেতে পার আবার ওটার লেজের চর্বি দিয়ে সুস্বাদু ভাত রান্না করেও খেতে পার।“
মুসা আরেকটু কাছে গেল যেন আরো মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারে।
“তারপর তোমার পা ধুয়ে পরিষ্কার করে দিব, কানের ময়লা বের করে দিব,মাথার উকুন বেছে দিব। আর এভাবেই তোমার প্রতি ভালোবাসাকে স্বততঃ প্রকাশ করে যাব।“
যথেষ্ট শোনা হলে মুসা চিৎকার করে রাখালকে বলল, “এই মূর্খ তুমি চুপ করতো। তুমি কি জান কি বলছ?তোমার কি ধারণা খোদা ভাত খায় বা তোমাকে ধু’তে দেয়ার জন্য তার পা আছে? এটাকে প্রার্থনা বলেনা, বলে ধর্মবিষয়ক অজ্ঞতাজনিত নিছক বাজে কথাবার্তা।“
হতবুদ্ধি এবং লজ্জিত রাখাল বারবার ক্ষমা চেয়ে বলতে লাগল এমনটা আর কখনই হবেনা এবং প্রতিজ্ঞা করল অন্যান্যরা যেভাবী প্রার্থণা করে এখন থেকে সেও সেভাবেই করবে।
অতঃপর সেই মধ্যাহ্নেই মুসা তাকে কিছু প্রার্থনার পদ্ধতি ও দোয়া শিখিয়ে দিল, যা শিখে রাখালও বাস্তবিকই খুবই খুশী মনে সেখান থেকে নিজের গন্তব্যে চলে গেল।
কিন্তু সেই রাত্রেই মুসা খোদার গায়েবী আওয়াজ শুনতে পেল,
“আহ, মূসা এ তুমি কি করলে? তুমি সেই সামান্য রাখাল বালককে ভৎসর্না করলে অথচ এটা বুঝতেও পারলেনা আমি কতটা পছন্দ করতাম। হয়ত তার পদ্ধতি ঠিক ছিলনা কিন্তু সে ছিল একান্ত নিবেদিত একজন। তার আত্মা পবিত্র আর উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। আমি তার ব্যাপারে সন্তষ্ট ছিলাম। তার উচ্চারিত বাক্যসব হয়ত তোমাদের কাছে অধর্ম মনে হতে পারে কিন্তু আমার কাছে তা মিষ্টি অধর্ম।“
মুসা (আঃ) তার ভুল বুঝতে পেরে পরেরদিনই সেই রাখালের খোঁজে পাহাড়ে চলে গেলেন। সে তাকে সেখানে পূর্বের মতই প্রার্থনায় নিমগ্ন দেখতে পেল, কিন্তু মুসা খেয়াল করল তার পূর্বের সেই অনুরাগ ও উত্তেজনা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাকে সেখানে দোয়া পড়তে গিয়ে সে বারবার হোঁচট খাচ্ছে আর তোতলাচ্ছে। মুসার অনুতাপ হল। সে তৎক্ষণাৎ রাখালের ঘাড়ে হালকা চাপড় দিয়ে বলল, “ভাই আমার ভুলের জন্য দুঃখিত। তুমি আগে যেভাবে প্রার্থনা করতে সেভাবেই কর। খোদার চোখে ওটাই অনেক অনেক প্রিয় ছিল।“
এ কথা শুনে রাখাল যারপরনাই আশ্চার্যাণ্বিত হলেও সে ভিতরে ভিতরে অনেকটাই প্রশান্তি পেল। সে যাই হোক এরপর থেকে সে তার পুরাতন বা নতুন প্রথাগত পদ্ধতি যা সে মুসা (আঃ) এর কাছে থেকে শিখেছে কোনটাই পালন করতনা। সে সম্পূর্ন নতুন এক তরীকা বের করল। তার অকপট ও সরল একনিষ্ঠ ভক্তিতে আপন সন্তষ্টি ও খোদার আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার পরও সে বর্তমানে ঐ স্তর অতিক্রম করে গেছে- তার মিষ্টি অধর্ম সত্ত্বেও।

“তো বুঝতেই পারছেন কখনই খোদাকে ডাকার প্রত্যেকের নিজস্ব পন্থাকে নিজের মতের প্রেক্ষিতে বিচার না করাই উত্তম।“এই বলে শামস শেষ করতে চাইল, “দেখুন প্রত্যেকরই খোদা’কে ডাকার নিজস্ব মত ও পথ আছে। খোদা আমাদের উচ্চারিত শব্দ দেখেননা, তিনি দেখেন আমাদের অন্তরের গভীরটা। আত্মার পবিত্রতা না থাকলে ধর্মীয় উপাচারগুলো আসলে কোন পার্থক্যই তৈরী করতে পারেনা।“
আমি বিচারকের মুখের ভাব বুঝার চেষ্টা করলাম, বুঝলাম আত্মবিশ্বাসী ও সংযমী চেহারার অন্তরালে তার পরিষ্কার বিরক্ত ও রাগত অবস্থা। ধুরন্ধর ব্যক্তি হওয়ায় সে তৎক্ষণাৎ একটা কৌশলী অবস্থান নিল। সে জানে শামসের বর্ণিত ঘটনার উপর প্রতিক্রিয়া দেখাতে গেলে তার ঔদ্ধত্যের জন্য তাকে শাস্তি দিতে হবে, যেটা আবার লোকসমক্ষে বিচারক হিসাবে তার উচ্চ অবস্থানকে ছোট করতে পারে এই বলে যে এক সামান্য দরবেশও তারমত একজন উঁচু মর্যাদার বিচারকের সাথে তর্ক করতে ভয় পায়না। তার থেকে এরূপ ভান করা ভালো যে আসলে এ’নিয়ে মর্মাহত হওয়ার মত কিছু ঘটেনি এবং আলোচনার এখানেই সমাপ্তিটানা উত্তম।
বাহিরে তখন সূর্য ঢলে পড়ছে । আকাশ ছেয়ে আছে হাজারো লাল আভায়। সেগুলোকে আবার অসংখ্য কালোমেঘ এখানে-সেখানে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। এরই কিছুমধ্যে বিচারক তার অন্য জায়গায় কিছু গুরূত্বপূর্ণ কাজ আছে বলে উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নুইয়ে আর তাবরীজের শামসের দিকে শীতল দৃষ্টি দিয়ে তিনি প্রস্থান করলেন। আর তার দলবলও বিনা বাক্যব্যয়ে তার পিছু নিল।
সবাই চলে গেলে আমি শামস্কে বললাম, “আমার ভয় হচ্ছে বিচারক সাহেবের মনে হয় আপনাকে ঠিক মনঃপূত হয়নি”।
মুখ থেকে চুলগুলো সরাতে সরাতে হেসে তাবরীজের শামস বললেন, “ওহ, এটা কোন ব্যাপার না। বেশীরভাগই আমাকে পছন্দ করেনা এতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি”।
আমি নিজের উত্তেজনা চাপতে পারছিলামনা কারন আমি এই আশ্রমের দ্বায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেখেছি শামসের মত একজন অতিথির আগমন এখানে খুবই কদাচিৎ ঘটনা।
আমি বললাম, “বলবেন কি আপনার মত একজন দরবেশের বাগদাদে আসার কারন?”।
উত্তর শোনার প্রচণ্ড আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও নিজের ভেতরে একটা অদ্ভুত ভয়ও কাজ করছিল।



এলা

নর্দাম্পটন, মে ২০, ২০০৮

ঐ রাতে যেদিন এলার স্বামী বাসায় ফেরেনি তার স্বপ্ন জুড়ে শুধু বেলী ড্যান্সার আর সেই দরবেশই ঘোরাঘুরি করল। তার মাথার মধ্যে পান্ডুলিপিটা ঘুরছিল, সে দেখল একগাদা নিষ্ঠুর দেখতে কিছু সৈন্য পথের পাশের সরাইখানায় খেতে বসেছে, তাদের থালাগুলো উপচে পড়ছে সুস্বাদু পাই আর মিষ্টান্নে।
এরপর সে নিজেকে দেখল ভিন্ন কোন শহরের এক দূর্গের মধ্যে ব্যস্ততম বাজারে কোন একজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার চারিদিকের মানুষগুলো কেমন যেন একটা নির্দিষ্ট ছন্দে দুলে দুলে ধীরে চলছে কিন্তু সেই শব্দ আবার সে শুনতে পাচ্ছেনা। ঝুলে পড়া মোছওয়ালা মোটাসোটা একজনকে দাঁড় করাল তাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে বলে, কিন্তু সে প্রশ্ন মনে করতে পারছেনা। লোকটা তার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে কেমন জবুথবুভাবে চলে গেল। সে পথিমধ্যে আরো কিছু বিক্রেতা ও দোকানদারের সাথে কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু কেউই তার ডাকে সাড়া দিলনা। প্রথমে তার মনে হল মনে হয় তাদের ভাষা না জানার জন্য এমনটা হচ্ছে। তারপর সে তার মুখের ভিতরে হাত দিতেই তার ভয়ে শিউড়ে উঠ দেখল তার জিহ্ববা কেটে নেয়া হয়েছে। প্রচণ্ড অস্থিরতায় সে আয়না খুঁজতে লাগল জানার জন্য সে আসলে প্রকৃতই সে কিনা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে বাজার তখন জনমানবহীন হয়ে গেছে। বিশ্রী শব্দ করে কাঁদতে কাঁদতে সে জেগে উঠল, ভুলেই গেছে তার জিহ্ববা এখনও আছে।
ঘুম ভেঙ্গে এলা খেয়াল করল অশরীরী কিছু একটা তার ঘরের পেঁচের দরজায় বাজেভাবে আঁচড়াচ্ছে। মনে হয় অন্যকোন জানোয়ার উঠোনে ঢুকে পড়ায় কুকুরটা উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। এদিকে বেজীর মত একধরনের প্রাণী আছে যা তাকে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তাছাড়া গত বছরের শীতে তার অপ্রস্তত সম্মুখযুদ্ধ এখনও স্মৃতিতে টাটকা। এমনকি এলার কয়েকসপ্তাহ লেগেছিল কুকুরের গা থেকে ঐ বাজে গন্ধ দূর করতে। এক বালতি টমেটোর রসে ডুবানোর পর উল্টো সে গন্ধ রাবার পোড়া গন্ধের মত আরো দীর্ঘায়িত হয়েছিল।
এলা দেয়ালঘড়ির দিকে তাকাল। পৌনে তিনটা মত বাজে। ডেভিড এখনও ফেরেনি মনে হয়না ফিরতেও চায়, জেনেট তার ফোনের কোন উত্তর দেয়নি। তাছাড়া মনে হয়না এই মানসিক হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় জেনেট এলাকে তা করতও। কন্যা এবং স্বামী দু’জনের দিক থেকেই পরিত্যক্ত হবার ভয় তাকে পেয়ে বসল। সে ফ্রিজ খুলে ভিতরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। মোটা হবার ভয় থাকা সত্ত্বেও সে চেরী ভ্যানিলা আইসক্রিম খাওয়ার ইচ্ছা করল। কোনরূপ কষ্ট ছাড়াই প্রয়োজনের অতিরিক্ত জোরের সাথে সে ধাক্কা দিয়ে ফ্রিজের দরজা বন্ধ করল।
এলা তার নিজের জন্য একগ্লাস রেড ওয়াইন ঢালল। হালকা কিন্তু তেজী রেড ওয়াইনের স্বাদটা বেশ মজার, অনেকটা টক-মিষ্টি, তার পছন্দ। শুধুমাত্র যখন তার দিত্বীয় গ্লাস খাবার আগ্রহ হয় সে ডেভিডের দামী মদের কেবিনেটটা খুলে। সে মদের বোতলের গায়ের লেবেলটা দেখল- লেখা শ্যঁতে মারগক্স ১৯৯৬। এলা ভ্রূকুঞ্চিত করে বোঝার চেষ্টা করল তাতে কি বোঝায়।
প্রচণ্ড ক্লান্তি এবং ঘুম তাকে আর পড়তে দিচ্ছিলনা। সে ঠিক করল মেইলটা একবার চেক করে দেখা যেতে পারে। অর্ধ ডজন জাঙ্ক মেইল আর পাণ্ডুলিপি পড়া কেমন এগোচ্ছে জানতে চেয়ে মিশেলের মেইলের সাথে আজিজ জেড জাহারা’র একটা মেইলও সে দেখতে পেল।

প্রিয় (অনুমতিসাপেক্ষে) এলা,
মমোঅস্টেনাগো নামে গুয়াতেমালার এক গ্রামে থাকাকালীন সময়ে আমি তোমার মেইলটা পাই। এটা এমন এক জায়গা যেখানের সবাই এখনও মায়ান ক্যালেন্ডারই ব্যবহার করে। আমার হোস্টেল ছেড়ে একটু সামনে এগোলেই দেখতে পাওয়া যাবে একটি ইচ্ছাপূরণ বৃক্ষ তুমি চিন্তা করতেও পারবেনা যার সারা গা জুড়ে ঝুলান আছে নানা রংয়ের ও আকারের শতশত কাপড়ের টুকরা। তারা এটাকে ভগ্ন হৃদয়দের বৃক্ষ বলে থাকে। যাদের হৃদয় ভেঙ্গেছে তারা তাদের হৃদয়ের আরোগ্য কামনা করে একটুকরো কাগজে লিখে তা গাছটির কোন শাখায় ঝুলিয়ে দেয়।
আশা করতে পারি তুমি এটাকে অতিআগ্রহী কার্যকলাপ হিসাবে দেখবেনা।তোমার মেইল পড়ে আমি ইচ্ছাপূরণ গাছের কাছে গিয়ে তোমার আর তোমার মেয়ের মধ্যে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝির সমাধান চেয়ে প্রার্থনা করলাম। ভালোবাসা তা যত ক্ষুদ্রই হোকনা কেন তাকে ছোট করে দেখবার অবসর নেই কেননা রুমী বলেছেন ভালোবাসা হচ্ছে মানুষের জীবনে পানির মতই অপরিহার্য।
গত কয়েকবছরে আমি একটা জিনিষ শিখেছি তাহল আশেপাশের মানুষের ব্যাপারে কম নাক গলান কারন তাদের অবস্থার পরিবর্তন করতে না পারলে তখন হতাশা গ্রাস করে। বহিরাগত হিসেবে অকারন নাক গলানোর জন্য আমি কি ক্ষমা চেয়ে নিতে পারি?
কেউ কেউ এই ক্ষমা চাওয়াকে একধরনের দুর্বলতা ভেবে থাকে। “দুর্বলতা” আসলে ক্ষমার মাহাত্ম্যকে ছোট করে দেয়। বিশ্বব্রক্ষান্ডে ক্ষমা এক শান্তির বারতা নিয়ে আসে এমনকি সেইসব ক্ষেত্রেও যা আমরা এখনও বুঝতে বা পরিবর্তন করতে অক্ষম।
মায়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে আজ অত্যন্ত শুভ এক দিন। অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ জোতির্মণ্ডলীয় পরিবর্তন চলছে কক্ষপথে, মানুষের জীবনে নতুন চেতনার আবির্ভাবের সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। সুর্যাস্তের সাথে সাথে দিন শেষের আগেই তোমাকে এই মেইলটা পাঠানোর তাড়া কাজ করছে নিজের ভেতর।
আশা করি ভালোবাসা তোমাকে জড়িয়ে থাকুক সর্বত্র এমনকি যখন এবং যেখানে তুমি ন্যূনতম আশাও করনি।
তোমারই একান্ত

আজিজ

ল্যাপটপ বন্ধ করে সরিয়ে রাখল এলা। বুঝতে চেষ্টা করল পৃথিবীর আরেক প্রান্তে বসে সম্পূর্ণ অচেনা একজন ভালো চেয়ে প্রার্থনা করছে। সে চোখ বন্ধ করে কল্পনায় দেখতে লাগল একটুকরো কাগজে লেখা তার নাম ইচ্ছাপূরণ বৃক্ষের শাখায় এমনভাবে ঝুলছে যেন খোলাআকাশে উড়ছে মুক্ত সুখী এক ঘুড়ি।
এরই কিছুপর সে রান্নাঘরের দরজা খুলে বাইরে এলো এবং বাহিরে তখনো অশান্ত বাতাসের ঝাপটা তার ভালোলাগতে লাগল। আশরীরি আত্মা তখনও তার পাশে, অস্থির এবং চাপা গড়গড় আওয়াজ করে বাতাসে ক্রমাগত জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে। তার কুকুরের চোখ প্রথমে ছোট হয়ে আসল তারপর বড় ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল আর কান দু’টো এমনভাবে খাড়া হল যেন সে কিছু দূরেই অশুভ কিছুর অস্তিত্ব্য টের পাচ্ছে। এলা আর তার কুকুর সেই শেষ বসন্তের রাতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আশেপাশেই ঘুরে বেড়ানো অশরীরী কিছুর অপেক্ষায় ঘন ভীষণ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকল।



অনুবাদ করছেন কবি আকিল মোস্তফা


পরবর্তী অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন:



One thought on “দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ০৪

Comments are closed.