আলাপচারিতায় ফয়েজ আলম | অংশ- ০২



উত্তর উপনিবেশী তাত্ত্বিক ফয়েজ আলম। উপনিবেশী শাসন, শোষণ ও তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও ব্যক্তি কর্তৃক ব্যক্তির শোষণ-নিপীড়ণে ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে প্রবন্ধ, আর্টিকেল লিখে চলেছেন গত ২০ বছর ধরে। কথা বলছেন নানা ফোরামে। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশে দেশে পশ্চিমের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর সেই সঙ্গে নিজ রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক শোষণ ও চক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর লেখা যেমন একটি আন্দোলনের সূচনা করেছে তেমনি উদ্দীপ্ত ও সাহসী করে তুলেছে একদল নতুন প্রজন্মকে। বাংলাদেশের বহু তরুণের উত্তর উপনিবেশী জ্ঞানচর্চার হাতেখড়ি হয়েছে তাঁর লেখার মাধ্যমে।
কালেরকণ্ঠ-শিলালিপি কর্তৃক ১৯৭১ থেকে ২০১০ সাল অবধি ৫০টি সেরা বাংলা প্রবন্ধগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে তাঁর লেখা ‘উত্তর উপনিবেশী মন’ প্রবন্ধগ্রন্থটি। শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী মেহেদী চৌধুরী পরিচালিত লন্ডনভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘সমাজচিন্তা ও দর্শন’ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত বাংলাদেশের লেখক-বুদ্ধিজীবীর তালিকায়ও তাঁর নাম রয়েছে। অনুবাদ করেছেন এডওয়ার্ড সাঈদের “অরিয়েন্টালিজম”“কাভারিং ইসলাম” বই দুটি।

তাঁর প্রকাশিত মৌলিক প্রবন্ধগ্রন্থগুলি হলো উত্তর উপনিবেশী মন, ভাষা ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে এবং বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বজলছাপে লেখা উত্তর উপনিবেশী ভাবধারায় লেখা কবিতার বই।

২৮ ফ্রেব্রুয়ারি, ২০২১ এ নিউইয়র্কভিত্তিক অনলাইন চ্যানেল ‘ভয়েস ওভার’-এর উদ্যোগে তাঁর সাথে আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন কথাসাহিত্যিক শাপলা সপর্যিতা। অনুষ্ঠানটি ভয়েস ওভার অনলাইনে লাইভ প্রচার করে। সেই আলাপচারিতারই লেখ্যরূপ অকালবোধনের পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো।



পূর্বের অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন।



শাপলা সপর্যিতা: একটু সরলিকরণ করি যদি ফয়েজ ভাই, স্থানান্তর হচ্ছে যেমন মোগলরা এসেছিল আমাদের দেশে। মোগলার এখানে এসে এই জায়গাটাকে নিজের করে নিয়েছে এবং তাদের ভাষা যেমন আরবি, ফারসি ইত্যাদি আমাদের ভাষার সাথে মিশে নতুন একটা ভাষিক রূপ নিয়েছে। আমরাও ছোটবেলায় ব্যাকরণে পড়েছি যে, স্থানান্তর ও অন্যান্য কারনে আরবি ফারসিসহ বিভিন্ন বিদেশী শব্দ যেমন লুঙ্গি, ফুঙ্গি, চা এগুলো আমাদের ভাষায় ঢুকেছে। এবং মোগলরা এ অঞ্চলের মানুষই হয়ে গেছে। তাই সম্পদ লুট করে কোথাও নিয়ে যাওয়ার দরকার পড়েনি। তাদের সংস্কৃতি ও ভাষা আমাদের সংস্কৃতি-ভাষার সাথে মিশে নতুন এক রূপ তৈরি করেছে–দিনে দিনে আমরা উভয়েই এই নতুন রূপ অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছি। অন্যদিকে, উপনিবেশকরা এখানে এসে বলেছে আমরা উচু জাতের মানুষ, আমরা অসাধারণ, তোমরা কালো, তোমরা খারাপ, তোমরা অযোগ্য। তোমাদের সাহিত্য সৃমদ্ধ নয়, সংস্কৃতি খারাপ, তোমরা নিচু জাতের, বর্বর। কাজেই তোমাদেরকে আমরা শিক্ষিত করব, সমৃদ্ধ করব। আসলে ভিতরে ভিতরে তাদের ইচ্ছা ছিলো এদেশের মানুষের ওপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা আর এদেশের সম্পদ লুট করে নিজ দেশে নিয়ে যাওয়া। তারা তো এখানে থাকতে আসেনি। এটাই হচ্ছে উপনিবেশ, তাইতো?
ফয়েজ আলম: আপনি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রসঙ্গ তুলেছেন। স্থানান্তর বা মাইগ্রেশনের কারণে সংস্কৃতি ও ভাষিক সংমিশ্রণ এবং এভাবে উদ্ভুত একটা নতুন রূপের প্রসঙ্গ। আসলে এটিই ঘটেছে, শুধু এখানে নয় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে। যেমন উত্তর ভারতে মধ্য এশীয় অঞ্চলের একটা জনগোষ্ঠী (আমরা এখন যাদের উচ্চশ্রেণীর হিন্দু বলে জানি, তারা) স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে তাদের ভাষার সাথে স্থানীয় ভাষার মিশ্রণে দেখা দিয়েছে ভাষার এক নতুন রূপ যাকে বলা হয় প্রাকৃত ভাষা। এই নতুন রূপে তাদের ভাষা বা স্থানীয় ভাষা কোনটাই অবিকৃত থাকার কথা নয়, থাকেওনি। পরে প্রাকৃত ভাষা আরো বহুশত বছর ধরে বিবর্তিত হতে হতে ভারতের অন্যান্য ভাষাগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে আবারো বিভিন্ন সময়ে স্থানান্তরের ঘটনা ঘটার কারণে ভাষিক মিশ্রণ হয়েছে। একইভাবে এ অঞ্চলের প্রাকৃত ভাষার বিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষা গঠনের প্রক্রিয়া চলাকালীন এক পর্যায়ে মুসলমানরা জোর করে এদেশে ঢুকে পড়ে স্থায়ী বসতি গাড়ে। ফলে আগত মুসলমানদের ভাষা–বিশেষ করে আরবী-ফারসি এই প্রক্রিয়ার সাথে মিশে যায়। এ ভাষিক মিশ্রণসহ যে-ভাষা এখানে বলা ও লেখা হত উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার ঠিক আগে আগে সেটাই স্বাভাবিক বাংলা ভাষা–বাংলার মানুষের কথ্যভাষা। এভাবে স্বাভাবিক লেনদেনের প্রক্রিয়ায় যে-ভাষিক মিশ্রণ ঘটে তা ভাষা বিকাশেরই এক স্বাভাবিক ঘটনা। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে। প্রথমে এশীয় অঞ্চল থেকে আগত জনগোষ্ঠীর (অর্থাৎ যাদেরকে বর্তমানে উচ্চশ্রেণীর হিন্দু বলে জানি, তাদের) ভাষার নানা উপাদান স্থানীয় ভাষার সাথে মিশে তৈরি হয়েছে প্রাকৃতের রূপ। আরো অনেক পরে এর সাথে মিশেছে আরবী-ফারসী-তুর্কি ইত্যাদি ভাষার উপাদান। এগুলো স্বাভাবিক মিশ্রণের ফল। কোনটাই কৃত্রিমভাবে বানিয়ে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়নি। তাই বেছে বেছে বৈদিক ভাষার বা আরবী ফারসি ভাষার শব্দ বাদ দিয়ে দেয়ার অর্থ হলো ভাষাকে খোঁড়া করে ফেলে, যেটা একবার করা হয়েছিলো উপনিবেশের ছত্রছায়ায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সংস্কৃত প-িতদের উদ্যোগে। তার পরিণামে আমরা তথাকথিত যে ‘প্রমিত বাংলা’ অর্থাৎ কেতাবী বাংলা পেয়েছি সেটি আজও বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রাণের ভাষা হয়ে উঠতে পারেনি।
বাংলা ভাষা থেকে কিছু বাদ দেয়া কিংবা গ্রহনের সুযোগ নাই। আরবি ফারসি বাংলার অংশ। বৈদিক জনগোষ্ঠীর ভাষার শব্দরাজিও প্রাকৃতের মাধ্যমে বাংলার অংশে পরিণত হয়েছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে ‘কেতাবী বাংলা’ সৃষ্টির আগে ঐ বাংলাই ছিলো আমাদের বাঙালির ভাষা, যে ভাষার রূপটা অনেকখানি অক্ষুন্ন রয়ে গেছে বাংলাদেশের মান কথ্যবাংলায়। কলকাতার কথ্যবাংলায় কিন্তু আবার ছাপ পড়েছে ঐ কেতাবী বাংলার, তাছাড়া ভৌগলিক কারণে খানিকটা ব্যবধান তো আগে থেকেই দেখা দিয়েছিলো। ঐ সময়ের বাংলা ভাষায় যেমন বৈদিক উপাদান ছিলো তেমনি ছিলো আরবী ফারসি উপাদান। এইসব মিলিয়ে যে ভাষা সেইটা ছিলো ঐ সময়ের বাংলা ভাষা।
উপনিবেশ প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সাঈদ দেখিয়েছেন উপনিবেশের শুরুটা হয়েছিলো পশ্চিমাদের মনে –প্রাচ্যের তুলনায় তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খায়। তার ছাপ আছে তাদের সাহিত্যিক রচনায়–জ্ঞানচর্চায়।তারা যখন প্রাচ্যকে প্রথম আবিষ্কার করে তখন প্রাচ্যকে দেখেছে আন বা ‘আদার’ হিসাবে। পশ্চিমের মানুষ নিজেকে আমি হিসাবে শ্রেষ্ঠ হিসাবে কল্পনা করে ‘আন’ বা ‘আদার’ প্রাচ্যকে কল্পনা করেছে নিকৃষ্টরূপে। প্রাচ্যকে মনে করেছে অযোগ্য,অনৈতিক, বর্বর এবং নিকৃষ্ট। সেই প্রাচীনকালে এস্কিলাসের নাটকেও এই মনোভাবের প্রকাশ চিহ্নিত করা যায়। এর পর থেকে পশ্চিমের লেখকরা যত গ্রন্থ লিখেছে প্রাচ্যকে নিয়ে সবগুলোতে প্রাচ্যকে ছোট এবং পাশ্চাত্যকে বড় করে দেখানো হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত বিচারে প্রাচ্যকে দেখতে হবে প্রাচ্যের পরিপ্রেক্ষিত থেকে, পশ্চিমকে দেখতে হবে পশ্চিমের আলোকে। প্রাচ্য তার পরিপার্শ্বের বিচারে বড় বা ছোটো হবে, তেমনি পশ্চিমের মূল্যায়নও হবে তার পারিপার্শ্বিক পটভূমিতে। এই ভাবে মূল্যায়নটা করা হয়নি। বরং গোটা পৃথিবীর মূল্যায়ন করা হয়েছে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিকোন থেকে, তাদের মানদন্ডে। এইযে প্রাচ্যকে ছোট করে দেখার মনোভঙ্গি তৈরি হয় তার পরিণামে শত শত বছর ধরে প্রাচ্যকে নিয়ে রচিত শত শত গ্রন্থে প্রাচ্যের দোষই কেবল ধরা হয়েছে: যেমন প্রাচ্য অসুন্দর, প্রাচ্যের আবহওায়া বিরূপ, প্রাচ্যের মানুষ কালো, কুৎসিৎ, বর্বর, অসৎ, প্রাচ্যের সাহিত্য নিকৃষ্ট, সংস্কৃতি বর্বরের সংস্কৃতি, ইত্যাদি। এইসব রচনায় প্রকট মনোভঙ্গি সতর-আঠার-উনিশ শতকে পশ্চিমের রাষ্ট্র-পরিচালকদের উৎসাহিত করে প্রাচ্যকে দখল করার জন্য, দখল করে শাসনের মাধ্যমে সভ্য করে তোলার জন্য। এই মনোভঙ্গি এবং তার প্ররোচনায় ও সম্পদ লুটের বাসনায় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার বিষয়টাকেই বলা হয় উপনিবেশবাদ। আর উত্তরউপনিবেশবাদ এই অবস্থা থেকে উত্তরণের বা মুক্তির চেষ্টা।
উপনিবেশকরা এই দেশে উপনিবেশ দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য এবং নিষ্কলঙ্ক করার জন্য একটা শ্রেণী তৈরী করার চেষ্টা করেছে যারা মনে মানসিকতায় হবে ইংরেজ এবং চামড়ায় ও রক্তে থেকে যাবে বাঙালি। অর্থাৎ এরা হয়ে উঠবে ইংরেজের বিশ্বস্ত দাস। ইংরেজী শিক্ষার মাধ্যমে এই দালার শ্রেণীটি তৈরি করা হবে, পরে এরাই সাধারণ প্রজাদের নিকট ইংরেজের গুনগান গেয়ে সবাইকে ইংরেজভক্ত দাসে পরিণত করবে। আপনি জানেন ভারতে এরকম চমৎকার এবং চৌকশ দালালদের একটা শ্রেণী তৈরি হয়েছিলো। বঙ্কিম, মধুসূদন প্রমুখ এই দালাল শ্রেণীর প্রথম দিককার সদস্য।
এর ফলে আমাদের উপনিবেশিত মানুষদের মন মানসিকতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তার বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তার ঐতিহ্য, তার ভাষা, তার সংস্কৃতি, ইতিহাস সব ধ্বংস করে তার স্থলে জায়গা দেয়া হয়েছে ইংরেজ আর তার দালাল শ্রেণীর রচিত ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি।
উত্তর উপনিবেশবাদ হচ্ছে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আমাদের মূলে ফেরার বা ঐতিহ্যে ফেরার সচেতন জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রয়াস, যার একটা ভাবান্দোলনের রূপও আছে। এখানে ‘উত্তর’ শব্দটির দুইরকম দ্যোতনা আছে। একটা হলো কালিক দিক: ‘উত্তর’ বোঝায় উপনিবেশ অবসানের পরের অবস্থা। কিন্তু উপনিবেশগুলো স্বাধীন হওয়ার পরও উপনিবেশকের জ্ঞানজগতের প্রভাব এখানে রয়ে যায়। এ প্রভাব থেকে উত্তরণ অর্থেও ‘উত্তর’ কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে। আবার উপনিবেশ স্বাধীন হওয়ার আগেও কারো কারো মধ্যে উপনিবেশ-বিরোধী তৎপরতা চিহ্নিত করা যায়। তাদেরকেও উত্তরউপনিবেশী চিন্তার প্রাক-প্রচেষ্টা হিসাবে অঙ্গীভুত করে নিতে হবে। এর অর্থ হলো উপনিবেশ চলাকালীন যেসব লেখক-শিল্পী চেতনায় উপনিবেশের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রভাব অস্বীকার করে শিল্প চর্চা করে গেছেন তাদেরকেও উত্তরউপনিবেশী চিন্তার মানুষ হিসাবে গণ্য করতে হবে। এই হলো উত্তরউপনিবেশবাদ।

শাপলা সপর্যিতা: মানে হলো আমি জাতিগত ভাবে কালো নই, বর্বর নই, আমাদের গায়ের রং খারাপ নয়, আমার ভাষা সুন্দর ও ভাল, আমার সংস্কৃতি উন্নত, আমার সাহিত্য উন্নত, আমার সাহিত্য সংস্কৃতির ভালোত্ব বা মন্দত্ব বিচার চলবে আমার নিজস্ব মানদন্ডে–এইরকম ভাবা এবং সেটা নিয়ে কাজ করা, সেটাই হচ্ছে উত্তর উপনিবেশবাদ । আচ্ছা, আপনার মৌলিক প্রবন্ধগ্রন্থ ”ভাষা ক্ষমতা এবং আমাদের লড়াই প্রসঙ্গ”-তে আপনি বলেছেন যে, ভাষার সৃষ্টি হিসেবে সাহিত্য মানুষের মনোজগতের শিকল পরানোর কাজে উত্তম যোগাল। আমার একটা প্রশ্ন- সাহিত্য কি ভাষা তৈরী করবে? ব্যকরণের কি কাজ?
ফয়েজ আলম: এইখানে দুটো বিষয় মনে হয় আপনি এক সাথে নিয়ে এসেছেন আপনার কথায়। দুটো দিক আছে, একটি হচ্ছে সাহিত্য ভাষা তৈরী করবে কি না?। সাহিত্য ভাষা তৈরি করে না, তবে সমৃদ্ধ করে। ভাষা পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত হয় ঐ ভাষাভাষী মানুষদের অসচেতন ঐক্যমতের প্রয়াসের ভিতর দিয়ে। সাহিত্য তাকে কিছুটা সমৃদ্ধি দেয় সৃজনশীল ব্যবহারের মাধ্যমে। আর ব্যকরণের কাজ হচ্ছে ভাষার পিছনে পিছনে যাওয়া; ভাষা যেদিকে যায় ব্যকরণ যাবে, গিয়ে লিপিবদ্ধ করবে ভাষা কোন নিয়মে যাচ্ছে। এ নিয়ে তর্কবিতর্ক আছে। তবে সার কথা হলো ব্যকরণ নিয়মের দোহাই তুলে ভাষার গতিপথ রুদ্ধ করবে না। আমি অতদূর বিশ্বাস করি যে, কোন কারণে ভাষা যদি ব্যাকরণের নিয়ম ভেঙ্গে বাইরে চলে যায় তাহলে ব্যাকরণ তার এ সংক্রান্ত নিয়ম পাল্টাবে, ঐ ব্যতিক্রমকে তার নিয়মের অন্তর্ভুক্ত করে নিবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক, অর্ধ-শিক্ষিত বাজারী ব্যাকরণ-লেখকরা মনে করেন ব্যাকরণ ঠিক করে দেবে ভাষা কোন দিকে যাবে। তারা বলবেন ভাষাকে এদিকে যেতে হবে। আসলে এটা ব্যকরণের কাজ না। ভাষা ভাষা হিসেবে অস্তিস্ত ধারণ করবে। ভাষা আমাদের বক্তব্য/ভাবের বিনিময়ের একটা বাহন। একটা ধ্বনিতাত্ত্বিক বাহন, শব্দের আওয়াজ/চিহœ নির্ভর বাহন। ব্যকরণের কাজ হচ্ছে ভাষা কখন বদলায় সেটা লিখবে, ভাষাকে নিয়ে কি করা যায়, সেটা বদলে কোনদিকে গেছে সেটা লিখবে। কিন্ত আমাদের ব্যকরণবিদরা, উনিশ শতকের ব্যকরণবিদরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে ভাষাকে নির্দেশ করার চেষ্টা করেছেন যে, ভাষা এদিকে যাবে, ভাষা ঐদিকে যাবে, ভাষার এই শব্দ থাকবে, ঐ শব্দ থাকবে না। এই রাজনীতি করে তারা একটা কৃত্রিম বাংলা ভাষা চাপিয়ে দিয়ে গেছেন যা গত দুইশ বছরেও এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখে আসে নাই। শুধু তাইনা, এই পরম্পরা অনুকরণ করে ..

শাপলা সপর্যিতা: রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে?
ফয়েজ আলম: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রসঙ্গে পরে আসি। যেটা বলছিলাম যে, এই পরম্পরা অনুসরণ করে এখনো কিছু লোক এক ধরণের কেতাবী বাংলায় কথা বলে থাকেন। এটাকে বলা যায় প্রমিত বাংলার কথ্য রূপ। তারা বলেন ব্যাকরণ ও অভিধান মেনে লেখতে হবে, প্রমিত বাংলায় লেখতে হবে, প্রমিত বাংলায় কথা বলতে হবে। আমি কাউকে ছোট কিংবা বড় করার জন্য বলছিনা, শুধু নমুনা হিসাবে নিই: আমাদের একটা মান কথ্যবাংলা আছে যেটাকে রক্ষণশীল অর্থে গণমানুষের ভাষাও বলা যায়; বিভিন্ন এলাকার লোকজন একত্রিত আড্ডা দিচ্ছে, কথা বলছে, এভাবে একটা মান কথ্যভাষা বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা তৈরী হয়েছে। এখন, একটা ছেলে যখন মফস¦ল থেকে আসে তখন এই মান কথ্যভাষায় কথা বলার একটা অভ্যাস আগে থেকেই থাকে। কারণ মফস্বলে থাকলেও সে নাটক, সিনেমা, প্রবাসী বন্ধুবান্ধব মারফত এ ভাষার বোধ তার মধ্যে তৈরি হতে থাকে। বৃহত্তর নাগরিক পরিবেশে আসার পর সে এই ভাষাটাই ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে নেয়। কিন্তু আমরা মানে আমি আপনি এবং অন্য অনেকেই দেখেছি ঢাকায় আগত ছেলেগুলোকে তথাকথিত প্রমিত বাংলা ভাষা শেখানোর জন্য, উচ্চারণ শেখানোর জন্য কতগুলো সংগঠন পর্যন্ত গড়ে উঠেছে। সেগুলোর কাজ হলো এইসব ছেলেদেরকে প্রমিত বাংলার অনুকরণে মুখের ভাষা শেখানো। আর সে যদি বাংলা সাহিত্য পড়ে কিংবা নাটক/সঙ্গীত ইত্যাদির সাথে জড়িত থাকে তাহলে ঐ পরিবেশের গুণে কিছুদিনের মধ্যেই তার মধ্যে জন্ম নেয় কেতাবি ভাষার অনুকরণে প্রমিত বাংলায় কথা বলার প্রবণতা। এবং তার এই তথাকথিত শুদ্ধ মান বাংলার রীতির সাথে জড়িয়ে যায় শ্রেণীমর্যাদার সম্পর্ক। যে প্রমিত বাংলায় কথা বলে তাকে মনে করা হয় মোটামুটি জ্ঞানী ও সাংস্কৃতিকভাবে পরিশীলিত– একরকম সাংস্কৃতিক আভিজাত্য তার সাথে জুড়ে দেয়া হয়।
আমার কথা হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যদি আমার ভাষা শিখতে হয় তাহলে আমি আমার মায়ের পেট থেকে পরে ১৫-২০ বছর ধরে কি করেছি? আমি কি ভাষাবিহীন ছিলাম ? বাস্তবতা হলো যে, আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কথ্য ভাষা আর কেতাবী বাংলার ছায়ায় তৈরি প্রমিত কথ্যবাংলার পার্থক্য এতোই বেশি যে এই চাপিয়ে দেয়া ভাষা রপ্ত করতে হলে ঐসব সংগঠনের সাহায্য নিতে হয় পর্যন্ত। যাহোক, এগুলো হচ্ছে ভাষার সাথে একটা সামাজিক মর্যাদা জুড়ে দেয়ার চেষ্টা। কেউ যদি প্রমিত ভাষায় কথা বলে, কেতাবি ভাষায় কথা বলে, তাহলে তাকে একটা মর্যাদার জায়গায় স্থান দেয়া হয়। এটাকে আমি বলেছি কেতাবি ভাষা এবং আমি কোনদিনও এটাকে সমর্থন করিনা। তো এটার রাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতার রাজনীতি, ভাষাকে ক্ষমতার বা মর্যাদার উৎস হিসেবে ব্যবহার করা।
আপনি নিশ্চয় খেয়াল করেছেন, খেটে খাওয়া মানুষ বা অফিসের নি¤œ-পদের চাকরিজীবীদেরকে ইংরেজিতে ধমক দিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে অনেকে। উদ্দেশ্য, ঐ লোকটা যেন বুঝতে পারে যিনি ইংরেজি বলছেন তার উচ্চ সামাজিক মর্যাদা আছে, তাই তাকে সম্মান দেখাতে হবে। কেতাবি বাংলার অনুকরণে কথা বলার মধ্যেও এই ব্যাপারটা আছে। খেয়াল করলে দেখবেন এক-দুই বছর আগে যে ছেলেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছিলো সে ঐ সব উচ্চারণ সংগঠন বা অন্য কোন সূত্রমারফত কেতাবী বাংলার বাড়তি মর্যাদার বিষয়টি জানতে পেরে সেটি শিখে নিয়েছে আর চিবিয়ে চিবিয়ে সে ভাষায় কথা বলছে। এবং সে প্রায়ই তার বিশ্বস্ত কিতাব/অভিধান থেকে শেখা এমন সব শব্দ ব্যবহার করছে যেগুলো কদাচ মুখের ভাষায় আসে। দীর্ঘ অভ্যাসজনিত পক্ষপাতের বিষয়টা তো আছেই, এইসব কারনেও এরা প্রমিত বাংলা টিকিয়ে রাখতে চায়।

শাপলা সপর্যিতা: আর একটা জরুরী প্রসঙ্গে আসি। আমরা ছোটবেলায় ব্যাকরনে পড়েছি যে, বাংলা হচ্ছে সংস্কৃতের দূহিতা, সংস্কৃতের দুষ্ট কন্যা। মায়ের দুষ্ট ছেলেটা যেমন মায়ের দুয়েকটা কথা শুনেনা, এদিক সেদিক চলে যায়; এভাবেই ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যে, বাংলা হচ্ছে সংস্কৃত থেকে ছুটে যাওয়া কণ্যা। বাংলা পড়াতে গিয়ে আমি বাচ্চাদের দেখেছি নবম দশম শ্রেণীর বা”্চারাও ভীষণ রকম তালগোল পাকিয়ে ফেলে। তারা এটি আসলে মেলাতে পারে না, নিতে পারে না বোধের ভেতরে। এই জায়গাটা যদি একটু পরিস্কার করেন। বাংলা কি আসলেই সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত কোন ভাষা? সংস্কৃতের দূহিতা?
ফয়েজ আলম: একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তুলেছেন। এই নিয়ে আমাদের এখানে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলে আসছে।

শাপলা সপর্যিতা: একটু পেছন থেকে যদি আসতেন। পেছনের ইতিহাসসহ ।
ফয়েজ আলম: হ্যাঁ, পেছনের ইতিহাসসহই বলতে হবে। সংস্কৃত নিয়ে একটা ভুল ধারনা আছে আমাদের। বাংলা ভাষা সংস্কৃতের দূহিতা এটা ভুল ধারনা। আপনি জানেন এদেশে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ও অন্যান্য কারণে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে নানান সময়ে পর্যটকরা এসেছেন। সমাজ, রাষ্ট্রসহ আমাদের ভাষা বিষয়েও তারা নানা কথা বলে গেছেন। এ ধারাও সতর আঠার শতকেও বিভিন্ন পর্যটক এসেছেন এবং এ অঞ্চলের ভাষা সম্পর্কে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন সংস্কৃত, লাতিন এবং আবেস্তার ভাষার সাদৃশ্য আছে। তাদের এই বক্তব্য কিন্তু শব্দভান্ডারের মিল সম্পর্কে। অন্য বিষয়ে তারা কিছু বলেননি, বলার কারণও ছিলনা। তারা হয়তো লিখেছেন যে, সংস্কৃতের সাথে লাতিনের ও আরো কয়েকটি ভাষার মিল আছে এবং আবেস্তার শব্দভান্ডারেরও মিল আছে। তো এই অবস্থায় আমাদের এখানে এলেন বিচারক উইলিয়াম জোনস। কোলকাতায় আসার পর বিচারক জোনস হয়ে গেলেন প্রখ্যাত ভাষাতাত্তিক্ব, প্রাচ্যতাত্ত্বিক, এমনকি কবি, ইত্যাদি।

শাপলা সপর্যিতা: উইলিয়াম জোনস-ই তো প্রথম বলেন যে বাংলা হলো সংস্কৃতের সন্তান, নাকি? কোন পরিপ্রেক্ষিতে তিনি . . .
ফয়েজ আলম: তিনি একাধারে ভাষাতাত্বিক, প্রশাসক, ম্যাজিস্ট্র্যাট, বিচারক, প্রাচ্যতাত্ত্বিক, সমাজকর্মী। মাঝেমধ্যে আমার মনে প্রশ্ন জাগে উইলিয়াম জোনস কি ছিলেন না? কবিও তো ছিলেন উনি। আসলে এডওয়ার্ড সাঈদ যেটা বলেছেন, পশ্চিমের বোধে উপনিবেশ ভারত যেন উন্মুখ হয়ে ছিল এসব লোকদের জন্য। তারা আসা মাত্র জাদরেল ম্যাজিস্ট্র্যাট, নামকরা ডাক্তার, নামকরা প্রশাসক, প্রখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক, প্রতœতাত্ত্বিক ইত্যাদি হয়ে গেলেন। কারণ তাদের ভাষায় এদেশ অশিক্ষিতের আর কুসংস্কারাচ্ছন্নের দেশ। তারা এলেন এদেশের মানুষকে শিক্ষাদীক্ষায় সভ্য করে তুলতে। তারাই তো সবকিছু হবেন। উইলিয়াম জোনস দেখলেন সংস্কৃত, লাতিন, আবেস্তার, ইতালিক কিংবা জর্মন ভাষার অনেকগুলা শব্দের মধ্যে সাদৃশ্য আছে। তিনি এদের কিছু শব্দ এবং বাক্য গঠনের মধ্যে সাদৃশ্য আবিষ্কার করলেন। তিনি কোলকাতায় এসেছিলেন ১৭৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে। ১৭৮৬ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির তৃতীয় বার্ষিক সভায় এমন একটা দাবি সম্বলিত ঘোষনা করলেন যেটি আসলে পরবর্তীতে বাঙালীর নিয়তির মত হয়ে থাকল। উনি ঘোষনা করলেন যে, সংস্কৃত হচ্ছে এই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় অধিকাংশ ভাষার মাতৃস্থানীয়। বললেন, ভারতীয় উপমহাদেশের যত ভাষা আছে সেগুলোর প্রায় সবই সংস্কৃত থেকে এসেছে। উইলিয়াম জোনসের এই ঘোষনার অনেক পরে ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ যাত্রা শুরু করে। তখন মার্কুইজ অব ওয়েলেসলি তার প্রতিবেদনে একই ঘোষনার প্রতিধ্বনি করেন। উনি লেখেন সংস্কৃত হচ্ছে ভারতে এখন পর্যন্ত প্রচলিত সকল ভাষার পিতৃস্থানীয়। উপনিবেশক ইউরোপীয় প্রশাসকরা সংস্কৃতকে সকল ভারতীয় ভাষার ‘পিত’ৃ ও ‘মাতৃ’র উভয় জায়গায় বসিয়ে দেয়ার পর আমাদের দেশের সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতদের মধ্যে বাংলা ভাষা সম্পর্কে নতুন আগ্রহ দেখা দেয়।
এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, সংষ্কৃতের সাথে গ্রীক, লাতিন ইত্যাদি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার সাদৃশ্যের যে-কথা নিজের বলে চালিয়েছিলেন জোনস সেটি আসলে তার নিজের কথা নয়। তার আগে অনেকে বলেছেন। যেমন: বেনজামিন সুলৎজ(১৭১৫-১৭৯০), গ্যাস্টন লরেন্ট চোঁখ্দু (১৭৬৮) নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড (১৭৭৮) প্রমুখও একই কথা বলেছেন তাদের লেখা প্রবন্ধ-নিবন্ধে যা কোলকাতার সংষ্কৃতপন্থী পন্ডিতদের চোখে পড়েনি, কানেও আসেনি। অথচ এই একই লেখায় জোনস উদ্ভট এই ঘোষণা দেন যে, মিশরীয়, চীনা, জাপানি, প্রাচীন মেক্সিকান, পেরুভিয়ান ইত্যাদি ভাষাগুলিও সংস্কৃত তথা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। তিনি ধারণা করেন এসব দেশের মানুষ নিশ্চয় একটি মূল দেশ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে। এই রকম ভয়ংকর প্রমাদপূর্ণ মতামত দেয়া সত্ত্বেও উইলিয়াম জোনসের মন্তব্যই কোলকাতার সংস্কৃতপন্থীদের নির্ভরস্থলে পরিণত হলো। কারণ কারণ জোনস ব্যতিত অন্য কেউ ভারতীয় সকল ভাষাকে সংস্কৃতের সন্তান বলে ঘোষণা করেননি। জোনসের ‘ভারতের সকল ভাষা (বাংলাসহ) সংস্কৃতের সন্তান’ কথাটির মধ্যে কোলকাতার সংস্কৃতপন্থী প-িতরা যে বিপুল সাম্প্রদায়িক গৌরব ও উল্লাস বোধ করার পরিসর খুঁজে পেলেন সেটি অন্য লেখকদের মন্তব্যে ছিলো না। তাই উপনিবেশক জোনস ক্রমে তাদের কাছে হয়ে উঠলেন অতি বিশ^স্ত, মহাপ-িত এক ভাষাতাত্ত্বিক।
নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ লেখলেন: ‘এ গ্রামার অব দ্য বেঙলি ল্যাঙ্গুয়েজ’, একেবারেই প্রাথমিক একটি ব্যাকরণ। তার ভূমিকায় লেখেন তখন প্রচুর আরবী ফারসি মিশ্রিত বাংলা যারা বলতে পারতেন তাদের বাংলা ভাষাতেই সৌকর্য আছে বলে মনে করে হয়। সেটিই সুন্দর বাংলা। সেখানে আরেকটা কথা তিনি লিখেছেন যে, সংস্কৃত ভাষার অনেক নিয়ম কানুন, অনেক বিধিনিষেধ; বাংলায় তার কোনটাই নাই। নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডকে মনে করা হতো ভাষার দিক থেকে বাঙালি। উনি নাকি অনেক সভা সমিতিতে গিয়ে কথাবার্তা বলে চলে আসতেন, কেউ বুঝতে পারতো না যে উনি বাঙালী নাকি ভিন্ভাষী? বাংলা ভাষায় এতটাই দক্ষতা তার ছিল। এসব কারণে বাংলা গদ্য সৃষ্টির সূচনা পর্বে তার মতামতকে গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু দেয়া হয়নি, কারণ হ্যালহেডের কথা মানলে বাংলা গদ্য লেখক সংস্কৃত প-িতদের মনের গোপন সাম্প্রদায়িক আবেগের বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না।
এই যে ইউলিয়াম জোনস প্রচুর ভুল আন্দাজে ভরা নিবন্ধে ঘোষণা দিলেন যে, বাংলা ভাষা সংস্কৃতের দূহিতা তা কোলকাতার সংস্কৃতপন্থী পন্ডিতদের গোপন সাম্প্রদায়িক বাসনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার কারণে বাঙালির কপাল থেকে এই দাগ আর মুছেনি। প্রায় দুশ বছর ধরে আমাদের বইপত্রে, ছাত্র-শিক্ষক-প-িক-সাংবাদিকদের কথাবার্তায় ঘুরে ফিরে উচ্চারিত হতে থাকে ‘বাংলা সংস্কৃতের দূহিতা’; খেয়াল করে দেখুন মেয়ে কিংবা কন্যাও নয়, একেবারে ‘দূহিতা’ কথাটাও সংস্কৃত থেকে আমদানী করে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। পরে এ ধরণের বক্তব্যের কিছু কিছু সমালোচনা হয়েছে। ড: মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এটা নিয়ে কথা বলেছেন, বলেছেন বাংলা সংস্কৃতের দূহিতা না, দূর সম্পর্কের আত্মীয়া। সাম্প্রতিক কালের ভাষাতাত্ত্বিকরাও বলছেন এ পুরোপুরি সত্যি নয়। এ বিষয়ে আমার নিজস্ব মত আছে। যদি সময় থাকে বলতে চাই।

শাপলা সপর্যিতা: হ্যাঁ হ্যাঁ সময় আছে। আমরা শুনতে চাই।
ফয়েজ আলম: ইন্দোইউরোপীয় ভাষা পরিবার হলো একটি অনুমান ভিত্তিক ভাষা পরিবার। কাল্পনিক মূল ইন্দোইউরোপীয় ভাষা থেকে পরবর্তীতে যেসব ভাষা উদ্ভুত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেগুলোর উপাদানের ভিত্তিতে মূল ভাষার কিছু কিছু উপাদান পুনর্গঠিত করা হয়েছে পরে। ধরে নেয়া হয় কোন এক সময় ইন্দোইউরোপীয় ভাষা ছিল। এর থেকে প্রায় তেরটা উপগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। এর মধ্যে পাঁচটা মরে গেছে, আটটা জীবিত আছে। আটটার মধ্যে একটা হচ্ছে ইন্দোইরানীয়। ইন্দোইরানীয়র একটা শাখা হলো ভারতীয় আর্য।

শাপলা সপর্যিতা: এই ইন্দোইরানীয় উপ-পরিবারটি আবার দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়?
ফয়েজ আলম: ঠিক। এর একটা ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। সাধারণভাবে মনে করা হয় অতি প্রাচীনকালে কাস্পিয়ান সাগরের উত্তরে মধ্য এশীয় অঞ্চলে গড়ে উঠা প্রতœ-ইন্দো-ইরানীয় সংস্কৃতির মানবগোষ্ঠী ২০০০-১৬০০ খ্রি. পূর্বাব্দের দিকে অন্তর্কলহের কারণে দুইদলে বিভক্ত হয়ে দুই দিকে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে। এই দুই দলই ক্রমে ইরানীয় ও ভারতীয়-আর্য এই দুই ভাষাভাষী মানবগোষ্ঠী হিসাবে বিকশিত হয়। ভারতীয়-আর্য ভাষার মানুষেরা উত্তর আফগানিস্তান হয়ে ক্রমে বর্তমান পকিস্তান ও উত্তর পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করে। এই স্থানান্তর বিভিন্ন সময়ে ভাগে ভাগে হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। এরাই উত্তর ভারতীয় হিন্দুদের পূর্বপুরুষ।

শাপলা সপর্যিতা: হ্যাঁ হ্যাঁ, এই জায়গাটা একটু পরিষ্কার হতে চাচ্ছি। যদি বলেন? এই ভাগ হওয়ার পরে একটি জাতি ইরানেই থেকে গেল। আর যারা যুদ্ধে হারলো তারা এদিকে এসে পাকিস্তান-ভারতে ছড়িয়ে পড়লো?
ফয়েজ আলম একটু ব্যতিক্রম আছে। আসলে গোটা মানবগোষ্ঠীটাই ছিলো মধ্যএশিয়ায়। একটা দল কালক্রমে ইরানের দিকে গিয়ে ওখানে বসতি করে। আর ভারতীয়-আর্যরা বিভিন্ন ভাগে এদিকে ঢুকলো। একসময় মনে করা হতো প্রথম দলটা পাক-ভারতে ঢুকে হরপ্পা- মহেনজোদারো সভ্যতা ধ্বংস করে জায়গা করে নেয়। এ নিয়ে পরে বিতর্ক হয়। অনেকে মনে করেন হরপ্পা-মহেন্জোদারো সভ্যতা কেউ ধ্বংস করেনি, নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হওয়া কারণে পরিত্যক্ত হয়। এরপর ভারতীয়-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর মানুষেরা সেখানে জায়গা নেয়। যাইহোক, সাধারণভাবে যেটা বলা হয় তাহলো ভারতীয়-আর্যদের প্রথম দলটা পাক-ভারতে ঢোকার পর আরো এক বা একাধিক দল এদিকে স্থানান্তরিত হয়। ফলে পরবর্তীতে যারা আসে তারা আগের দলটিকে ঠেলে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ছড়িয়ে দেয়। কাজেই ধরে নিতে হবে এই ঘটনা ১৬০০ খ্রি. পূর্বাব্দের পরে সংগঠিত হয়েছে।

শাপলা সপর্যিতা: আচ্ছা।
ফয়েজ আলম: এরা তাদের যে-ভাষা নিয়ে এসেছিলেন সেটি তাদের জ্ঞাতিভাই ইরানীয় গোষ্ঠীর ধর্মগ্রন্থ আবেস্তার ভাষার সাথে খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ। স্বাভাবিকভাবেই তখন এই ভাষার কোন নাম ছিল না; এটিই বেদের ভাষা। এখানে স্থানান্তরের পর স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে মেশার ফলে তাদের সংস্কৃতি ও ভাষার সাথে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষার মিশ্রণ হয়। এভাবে যে ভাষা হয়…(চলবে)



পরের অংশটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


2 thoughts on “আলাপচারিতায় ফয়েজ আলম | অংশ- ০২

Comments are closed.