দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ০৫



এলিফ শাফাক (Turkey: Elif Şafak; English: Elif Shafak) একজন টার্কিশ-বৃটিশ লেখিকা। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ছোটবেলা কাটে মাতৃভূমি তুরস্কে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। ঔপন্যাসিক এলিফকে তুরস্কের সর্বাধিক পঠিত নারী লেখক হিসাবে গণ্য করা হয়। টার্কি ও ইংরেজিতে এ পর্যন্ত এলিফের মোট উনিশটি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার বারটিই উপন্যাস।  ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস THE FORTY RULES OF LOVE প্রকাশের প্রথম মাসে দেড় লক্ষ কপি বিক্রি হয়। বলা হয়ে থাকে, এটিই তুরস্কের কোন লেখকের সর্বাধিক বিক্রিত বই। বিবিসি (BBC) একশটি উপন্যাসকে বাছাই করেছিল, যেগুলো পৃথিবীকে একটা রূপ দেয়, দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ তার মধ্যে অন্যতম।

অকালবোধনের পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি বাংলায় অনুবাদ করছেন কবি, অনুবাদক আকিল মোস্তফা। অনুবাদটি অকালবোধনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।


পূর্বের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


শিক্ষানবীশ

বাগদাদ এপ্রিল, ১২৪২

মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে আমি বিচারককে বিদায় দিয়ে থালা-বাটিগুলো ধু’তে পাঠানোর জন্য ফিরে এসে দেখি বাবা জামান এবং সেই দরবেশ কোন কথা না বলে তাদের জায়গায় চুপচাপ বসে আছে। চোখের কোন দিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করতে করতে ভেবে অবাক হচ্ছিলাম এটা কি সম্ভব কোন কথা না বলেও আলোচনা এগিয়ে নেয়া। আরেকটু বুঝার জন্য কোন কথা না বলে পরিস্থিতিটাকে আরেকটু ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমি নানারকমের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম, এই যেমন তোষক ঠিক করা, ঘর পরিষ্কার করা, কার্পেটে জমে থাকা ময়লা বের করে আনা, কিন্তু এতসব করেও ঘরে আর অবস্থানের কোন কারন খুঁজে পেলাম না।
ভগ্নচিত্তে আমি ভাড়ার ঘরে চলে আসলাম। আমাকে দেখামাত্রই পাচক তার খবরদারি শুরু করে দিল। “টেবিলগুলো মোছ, মেঝে ভালোভাবে পরিষ্কার কর, থালা-বাটি ধোও, চুলা আর দেয়ালের পাশের গ্রিল ভালোভাবে ঘষ। আর সব কাজ শেষ হয়ে গেলে ট্যাপের মুখগুলো একবার চেক করতে ভুলনা।“ ছয়মাস আগে যখন থেকে আমি এই আশ্রমে এসেছি এই পরিচারক তখন থেকেই আমার সাথে রূঢ় আচরণ করতে ছাড়তনা। প্রত্যেকদিন সে আমাকে কুকুরের মত কাজ করাত আর বলত এগুলো নাকি আধ্যাত্মিক তালিমেরই একটি অংশ, যেন তৈলাক্ত থালা-বাটী পরিষ্কার করাও একধরণের আধ্যাত্মিকতা।
অল্পজ্ঞানের ঐ পাচকেরও একটা পছন্দের মন্ত্র ছিল এইরকম “পরিচ্ছন্নতাই আধ্যাত্মিকতা, আধ্যাত্মিকতাই পরিচ্ছন্নতা।“
একবার সাহস করে তাকে বলেই ফেললাম, “যদি এটাই সত্যি হত তাহলে বাগদাদের সমস্ত স্ত্রীরাই হত আধ্যাত্মিকতার শ্রেষ্ঠ গুরু।“
একটা কাঠের চামচ আমার দিকে ছুঁড়ে ফুসফুসের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে সে আমাকে বলল, “এই কথার পিঠে কথা বলাটা ত্যাগ না করলে তুমি লক্ষ্য হারিয়ে ফেলতে পার। যদি দরবেশ হতে চাও তবে ঐ কাঠের চামচের মত বোবা হয়ে যাও। কথায় কথায় বিদ্রোহ করা শিক্ষানবিশের জন্য ভালো নয়। যত কম কথা বলবে তত তাড়াতাড়ি দীক্ষিত হতে পারবে।“
আমি এই পাচককে যতনা ঘৃণা করি তার থেকে বেশী করি ভয়। আমি কখনই তার আদেশ অমান্য করিনি যেমন আজকের এই সন্ধ্যায়ও না।
যেইমাত্র পাচক আমার দিক থেকে পিঠ ফিরিয়েছে অমনি আমি ওখান থেকে সরে পড়ে নিঃশব্দে দরবেশ যে ঘরে বসে ছিল সেই ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। তার সম্বন্ধে আরো জানার জন্য আমার ভেতরটা একদম অধীর হয়ে পড়ছিল। কে সে? এখানে তার আসার কারন কি? সে এই আশ্রমের অন্যান্য দরবেশদের মতও না। তার চোখ দু’টি ভীষণ অশান্ত আরা ভয়ংকর। এমনকি যখন সে বিনয়ের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে মাথা নুইয়ে থাকে তখনও না। তার মধ্যে এমন কিছু আছে যা সাধারণ নয় এবং পুর্বে থেকে অনুমান করাও সম্ভব নয় এবং সর্বোপরি ভীতিকরও বটে।
আমি দরজার একটা ছোট্ট ফাটা দিয়ে ভেতরে তাকালাম। প্রথম প্রথম কিছুই বোঝা না গেলেও একটু পরে ভেতরের আলো-আঁধারি সয়ে আসতেই আমি তাদের মুখগুলো বুঝতে পারলাম।
শুনতে পেলাম আশ্রমের অধ্যক্ষ তাকে জিজ্ঞেস করছেন, “তাবরীজের শামস আপনি কি বলবেন কি এমন বিষয় যা আপনাকে বাগদাদে টেনে আনল? আপনি কি স্বপ্নে সেই জায়গাটা দেখেছেন?”
দরবেশ মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল, “না, এখানে আসার পেছনে কোন স্বপ্ন নয়, আমি কোন স্বপ্ন দেখিনা, বলতে পারেন চোখের সামনে ভেসে ওঠা একটা দৃশ্যের মতন।“
বাবা জামান খুব নম্রভাবে বললেন, “প্রত্যেকেই স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সবসময় সব স্বপ্ন মনে থাকেনা। এইজন্যই আপনার কাছে মনে হচ্ছে আপনি স্বপ্ন দেখেননা”
“কিন্তু আমি দেখিনা।“ দরবেশ জোরের সাথেই বলতে থাকলেন, “বলতে পারেন এটা সৃষ্টিকর্তার সাথে আমার একধরনের চুক্তি। বালক অবস্থায় আমি ফেরেশতাদের দেখতে পেতাম। তারা আমার সামনে জগতের গোপন সমস্ত কিছু তুলে ধরত। যখন আমার বাবা-মা’কে এসব জানালাম, তারা আমাকে আজগুবি স্বপ্ন দেখতে মানা করল। মার বন্ধু-বান্ধবদেরকে বিশ্বাস করে বলতে গেলে তারাও আমাকে বানোয়াট স্বপ্নের উদ্ভাবক বলে অবিশ্বাস করল। আমার শিক্ষকদের সাথে এ বিষয়ে আলাপ করার চেষ্টা করলে তাদের প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন কিছু হলনা। অবশেষে বুঝতে পারলাম সাধারণরা যখন অস্বাভাবিক কিছু শোনে তারা তাকে স্বপ্ন বলে প্রতিপন্ন করতে চায়। আমি তারপর থেকে এই স্বপ্ন শব্দটা এবং এদ্বারা যা কিছু বোঝান হয়ে থাকে সবই অপছন্দ করতে শুরু করি।“
এতটুকু বলে দরবেশ এমনভাবে চুপ করে গেলেন যেন সে হঠাৎ কোন শব্দ শুনতে পেয়েছে। তারপরই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। দরবেশ বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মেরূদন্ড টানটান করে সোজা ধীরে এবং মনে হল জেনেশুনেই সে আমি যে দরজার পিছনে লুকিয়ে ছিলাম সে দিকে অগ্রসর হতে লাগল। ভাবটা এমন যেন সে ধরে ফেলেছে আমি তাদের উপর গোয়েন্দাগিরি চালাচ্ছি।
মনে হল সে যেন দরজা ভেদ করে সব দেখতে পাচ্ছে।
আমার হৃদপিণ্ড মধ্যে পাগলের মত ধুপধাপ আওয়াজ হতে লাগল। আমার পা জমে গেল, একদৌড়ে রান্নাঘরের দিকে পালিয়ে যেতে চেয়েও আমি পারলামনা। আমার হাত-পা’সহ সমস্ত শরীর বরফের মত জমে গেল। তাবরীজের শামসের ঘন কালো চোখ এসে আমার উপর স্থির হল। আমি ভীষণ ভীত হয়ে পড়লাম এবং একই সাথে এও অনুভব করলাম একটা ভীষণ শক্তি আমার সমগ্র দেহে বিদ্দূচ্চমকের মত খেলে গেল। সে এসে দরজার সম্মুখে দাঁড়াল আর যখনই দরজা খুলে আমাকে ধরে ফেলবে বলে মনে হল ঠিক তখনই সে থেমে গেল। কাছে চলে আসায় তার মুখ দেখতে পাচ্ছিলামনা বিধায় সে কেন আর দরজা খুললনা তা বুঝতে পারলামনা। তখন মনে হচ্ছিল আমরা অসহনীয় দীর্ঘ সময় পার করছি। দরজার দিক পিঠ ঘুরিয়ে তার পূর্বের জায়গায় যেতেযেতে তিনি আবার তার গল্প বলা শুরু করলেন।
“যখনই তার কোন ছোট আদেশ আসত, আমি খোদাকে বলতাম আমার স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা উঠিয়ে নাও। প্রতিবারই তীব্র তার বিরোধিতা করে বলতাম আমি বুঝতে চাই আমি আর স্বপ্ন দেখছিনা। সে আমার কথায় রাজি হল, আর তারপর থেকেই আমি আর কোন স্বপ্ন দেখিনা।“
কথাগুলো বলার সময় তাবরীজের শামস ঘরের ওপাশে জানালায় গিয়ে দাঁড়ালেন। বাহিরে তখন গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল, সে বিষণ্ণ চিত্তে তা দেখতে দেখতে বলল, “খোদা স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা ফিরিয়ে নিলেও এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তিনি আমাকে দিলেন অপরের স্বপ্নকে বুঝবার ক্ষমতা। যেজন্য আমি এখন স্বপ্নের তাবীরকারী বা অনুবাদক বা ব্যাখ্যাকারী।“
আশা করছিলাম বাবা জামান এখনই তাকে এইসব আজগুবি কথাবার্তার জন্য বকাঝকা করবেন যেমনটা আমাকে সবসময় করে থাকেন।
কিন্তু তা না করে উল্টো মাথা ঝুঁকিয়ে সমীহের সাথে বললেন, “মনে হচ্ছে আপনি সাধারণের মত নন। বলুন, আমি কিভাবে আপনার কাজে আসতে পারি?”
“আমি জানিনা। আসলে আমি আশা করছিলাম আপনিই আমাকে একটা পথ দেখাবেন।“
হতবুদ্ধি গুরূজী জিজ্ঞেস করলেন, “মানে?”
“আজ চল্লিশ বছর হতে চলল আমিদরবেশ হয়ে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছি। মনুষ্য সমাজ আমার কাছে যতটা অপরিচিত প্রকৃতি আমার কাছে ততটাই অধিক পরিচিত। আমি এক বন্য জন্তুর মত যুদ্ধ করতে পারি কিন্তু আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। বিধাতা এই পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন যেমন আকাশের তারকারাজি যার প্রত্যেকটার নাম আমার জানা, বনের গাছ-গাছালি যার প্রত্যেকটা সম্বন্ধে আমি বলতে পারি, এমনকি প্রতিটি মানুষ আমি একেকটা খোলা বইয়ের পাতার মত পড়তে পারি।“
প্রদীপ জ্বালানোর সময়টুকুতে ছোট্ট এক বিরতি দিয়ে শামস আবার বলতে থাকলেন’ “একটা সূত্র বা নিয়ম এরকম, এই মহাবিশ্বের সবকিছুর মধ্য দিয়েই তুমি চাইলে খোদাকে চিনতে পার, কেননা তিনি শুধু মসজিদ, উপাসনালয় বা চার্চেই থাকেননা। কিন্তু তারপরও যদি তোমার সন্তষ্টি না আসে, তুমি জানতে চাও তার সত্যিকার আবাস, তাহলে একটাই জায়গা আছে আর তাহল খোদা প্রেমে মশগুল আশিকের হৃদয়। এ দুনিয়ায় এমন কেউ নেই যে তাকে দেখে এখনও জীবিত যেমনটা এমন কেউ নেই যে তার দর্শনে মারা গেছে। একবার যে খোদার দর্শন লাভে সমর্থ হয়েছে সে আসলে সর্বক্ষণের জন্য সবসময়ের জন্যই তার হয়ে যায়।“
এই হালকা নিভু নিভু আলোতে তাবরীজের শামসকে আরো দীর্ঘ লাগছিল, তার ঢেউ খেলানো চুলগুলো এলোমেলোভাবে ঘাড়ের উপর এসে পড়ছিল।
অর্জিত জ্ঞান আসলে ফুলদানির তলায় সঞ্চিত জলের মতই কোথাও না ফেলতে পারলে তা নোনতা বা নষ্ট হয়ে যায়। বছরের পর বছর আমি খোদার কাছে প্রার্থনা করেছি একজন উপযুক্ত সঙ্গীর যাকে আমি আমার লব্ধ জ্ঞানের অংশীদার করতে পারি। অবশেষে সমরখন্দে থাকাকালীন আমার সামনে আবার ভেসে উঠল সেই অমোঘ আদেশ যেখানে বলা হল আমি যেন আমার নিয়তিকে পরিপূর্ণ করতে বাগদাদে এখানে আসি। আমি বুঝতে পারছি আপনি আমার সেই সঙ্গীর নাম জানেন এবং তার হদিস দিতে পারবেন। আমাকে তা দিন, যদি এখন নাও পারেন তাহলে পরে দিন।“
বাহিরে তখন রাত নেমে গেছে, জানালা গলে একটুকরো চাঁদের আলো ঘরের মধ্যে এসে পড়ছিল। বুঝলাম অনেক দেরী হয়ে গেছে, পাচক নিশ্চয় আমাকে খুঁজে গেছে। কিন্তু বিষয়টাকে থোরাই পাত্তা দিতে ইচ্ছে করল। একবার অন্তত নিয়মের ব্যতিক্তম করে ভালোলাগতেছে।
গুরুজী উত্তর করলেন, “বুঝতে পারছিনা আপনি আসলে আমার কাছে কি উত্তর প্রত্যাশা করচেন? যদি এমন কোন তথ্য প্রকাশ আমার নিয়তিতে যদি থেকে থাকে তবে তা যথাসময়েই ঘটবে। ততক্ষণ একজন অতিথি হয়েই আপনি আমাদের মাঝে থাকেন।“
উত্তর শুনে সেই দরবেশ অত্যন্ত বিনয় এবং কৃতজ্ঞতায় বাবা জামানের হাত ধরে চুমু খেল। আর তখনই গুরূজী তাকে এক অদ্ভুত প্রশ্ন করল, “আপনি বললেন আপনার অর্জিত জ্ঞান কাউকে দিয়ে যেতে চান। আপনি সত্যকে আপনার হাতের তালুতে লুকিয়ে রেখেছন যেন মহামূল্যবান কোন রত্ন যা আপনি তেমন বিশেষ একজনের কাছেই হস্তান্তর করতে চান। কিন্তু কারো হৃদয়ের দরজা খুলে পারলৌকিক আলোর সন্ধান পাইয়ে দেয়া মানুষের জন্য কোন সামান্য কাজ নয়। আপনি খোদার উজ্জ্বল রশ্মিকে চুরি করছেন। পরিবর্তে আপনি কি দিতে পারবেন মনে করেন?”
এর প্রত্যুত্তরে দরবেশ যা বলেছিল আমি আমৃত্যু তা ভুলবনা। একটা ভুরূ উঠিয়ে দৃঢ় স্বরে সে বলল, “আমি আমার মাথা দিয়ে দিতে প্রস্তত।“
আমি শিউরে উঠে অনুভব করলাম একটা শীতল কম্পন আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নিচে নেমে গেল। পুনরায় যখন আবার দরজার ফাটলে চোখ রাখলাম দেখলাম দরবেশের এই উত্তর তাকেও আলোড়িত করেছে।
দী্র্ঘনিশ্বাস ফেলে বাবা জামান বললেন, “অনেক কথা হল আজকের মতন থাক তাহলে। নিশ্চয়ই আপনি অনেক ক্লান্ত। দেখি একজন শিক্ষানবিশকে ডেকে দিচ্ছি সে আপনাকে আপনার ঘরের পথ দেখাবে, পরিষ্কার চাদর বিছিয়ে খাবার জন্য এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে আসবে।“
তাবরীজের শামস আবার দরজার দিকে ফিরতেই আমি তার দৃষ্টিকে আমার হাড়ের গভীরে টের পেলাম। তার দৃষ্টি ছিল দেখার থেকেও বেশী কিছু, যেন সে আমার মনের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছে, পড়ে নিচ্ছে অবলীলায় আমার আত্মার আলো ও অন্ধকার দিক, খুঁজে বের করছে লুকিয়ে থাকা গোপন কিছু যা হয়ত আমি নিজেও জানতামনা। খুব সম্ভব সে কালো যাদু জানে অথবা কুরআনে সাবধান করে দেয়া দুই ফেরেশতা হারূত ও মারূত এর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করা কেউ। অথবা অতিমানবীয় গুণ সম্পন্ন কেউ একজন যার পক্ষে দেয়াল ভেদ করেও আমাকে দেখা সম্ভব। যাইহোক সে আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে।
কিছুটা উচ্চকিতভাবে সে বলল, “মনে হয়না কোন শিক্ষানবিশকে ডাকার দরকার আছে। মনে হচ্ছে সে আমাদের আশপাশেই আছে এবং আমরা এতক্ষণ যা আলোচনা করেছি সবই সে শুনেছে।“
আমি এতজোরে খাবি খেলাম যে কবরের মরাও সেই শব্দে জেগে যেত। আমি লাফ দিয়ে উঠে দৌড়ে বাগানে গিয়ে অন্ধকারে লুকোনোর জায়গা খুঁজতে থাকলাম। কিন্তু কে জানত সেখানে আমার এক অস্বস্তিকর চমক অপেক্ষা করছে।
পাচক সেখানে ঝাড়ু হাতে আমাকে তাড়া লাগিয়ে চিৎকার বলতে লাগল, “ও তাহলে তুমি এখানে, ব্যাটা ক্ষুদে বদমাশ। এখনও বুঝনাই কোন বিপদে পড়ছ তুমি!”
আমি একপাশে ঝাঁপিয়ে পড়ে কোনমতে ঝাড়ুর আঘাত হতে নিজেকে রক্ষা করলাম।
পাচক আমার পেছন থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করতে লাগল, “এ’দিকে আস বলছি নাহলে আমি তোমার পা ভাঙ্গব!”
তার ডাকে সাড়া না দিয়ে বরং তীর বেগে বাগান থেকে বের হয়ে গেলাম। যতক্ষণ তাবরীজের মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে থাকল ততক্ষণই দৌড়তে থাকলাম। এমনকি অনেকটা দূর যাওয়ার পরও আমি বাতাসের পথে ধরে দৌড়তে থাকলাম যেখানে প্রধান সড়কের সাথে আশ্রমের যাওয়ার পথ মিলে গেছে। এতদূর আসার পরও আমার দৌড় থামছিলনা। আমার হৃদপিণ্ড জোরে জোরে বাড়ি খাচ্ছিল, গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল, তারপরও আমি দৌরতেই থাকলাম যতক্ষণ না আমার হাঁটু ভেঙ্গে আসছিল এবং আমি আর দৌড়তে পারছিলাম না।



এলা

নর্দাম্পটন, মে ২১, ২০০৮

ঝগড়ার প্রস্ততি নিয়েই খুব সকালে ডেভিড বাসায় ফিরে দেখল ঘুমন্ত এলা’র কোলের মধ্যে খোলা সুইট ব্লাসফেমী’র পাণ্ডুলিপি আর তারই পাশে পড়ে ওয়াইনের খালি গ্লাস। সে একবার ভাবল এগিয়ে গিয়ে তার কম্বলটা ভালোভাবে গায়ে জড়িয়ে দিবে, কিন্তু পরক্ষণেই মন বদল করল।
দশ মিনিট পরেই এলা জেগে বাথরুমে ডেভিডের গোছলের শব্দ শুনতে পেল কিন্তু অবাক হলনা একটুও। তার স্বামী অন্য মহিলার সাথে পরকীয়া করতে পারে, আবার তাদের সাথে রাত্রিযাপন করতে পারে কিন্তু নিজের বাথরুম ছাড়া অন্যকোথাও গোসল করতে পারেনা। ডেভিড গোসল শেষে ঘরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেলেও এলা ঘুমের ভাব করেই পড়ে রইল যেন তাকে রাত্রে বাড়ি না ফেরার কারন ব্যাখ্যার ঝামেলায় পড়তে না হয়।
এক ঘণ্টার মধ্যে তার স্বামী ও সন্তানরা বের হতেই এলা আবার রান্নাঘরে একাকী হয়ে পড়ল। দেখে মনে হচ্ছে সেদিনের ঘটনার পর আবার জীবন তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পেয়েছে। সে তার পছন্দের রান্না’র বই Cullinary Artistry Made Plain and Easy থেকে বেশ কয়েকটা চাহিদাসম্পন্ন বিকল্প থেকে এমন একটা বেছে নিল যেটা তৈরীতে তার সারাটা মধ্যাহ্ন চলে যাবেঃ
জাফরান, নারকেল আর কমলার মিশ্রণ দিয়ে বানানো ঝিনুকের স্যূপ
মাশরুম, টাটকা সবজী ও পঞ্চ পনির দিয়ে পাস্তা
রোজমেরী, ভিনেগার এবং ভাজা রসূন দিয়ে পাকানো কচি বাছুরের পাঁজরের মাংস
লেবুর রসে ভেজানো কচি বরবটি এবং ফুলকপির সালাদ

তারপর সে একটা হালকা ফেনিল উষ্ণ চকোলেটের একটা মিষ্টান্ন ঠিক করল।
রান্না করা এলার বিশেষ পছন্দ এবং তার কিছু কারনও আছে। এই যে সাধারণ সব উপাদান ব্যবহার করেই মজাদার খাবার তৈয়ারিতে শুধুই যে সন্তষ্টি ও পরিপূর্ণতা কাজ করে তাই নয় সাথে অদ্ভুত একধরণের মাদকতাও আছে। অধিকন্তু সে যে রান্নায় শুধু আনন্দই পায় তাই নয় একইসাথে এই কাজে তার সবিশেষ দক্ষতাও গুরূত্বপূর্ণ এবং তার মনকেও প্রশান্তি দেয়। রান্নাঘরই একমাত্র জায়গা যেখানে গিয়ে সে বাহিরের পৃথিবী থেকে শুধু বিচ্ছিন্নই করেনা উপরন্তু নিজের মধ্যে বইতে থাকা সময়কেও থামিয়ে দেয়। সে ভাবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হয়ত যৌনতাও একই ফল দিতে সক্ষম কিন্তু তৎসত্ত্বেও তা রান্না’র মতন নয়। যৌনতার জন্য দু’জন দরকার কিন্তু রান্না’র জন্য সর্বোপরি যা দরকার তা হল সময়, যত্ন আর ব্যাগ ভর্তি বাজার।
টেলিভিশনে যারা রান্না-বান্না’র অনুষ্ঠান করেন তাদের দেখলে মনে হয় রান্না-বান্না মানেই ব্যাপক উৎসাহ, মৌলিকতা ও সৃজনশীলতার ব্যাপার। তাদের পছন্দের শব্দ হচ্ছে “পরীক্ষা-নিরীক্ষা” যা এলার একদকমই অপছন্দ। পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিজ্ঞানীদের কাঁধে ফেলে বরং শিল্পীদের উপর উদ্দীপনা শব্দটা চাপানো যেতে পারে। রান্না-বান্না আসলে মৌলিক বিষয়গুলো শিক্ষার মাধ্যমে প্রদেয় নির্দেশাবলীর অনুসরণ ও এব্যাপারে গুরুজনদের অর্জিত জ্ঞানের উপর আস্থা রাখা মাত্র। তোমাকে মূলত যা করতে হবে তা হল প্রচলিত মত ও পথের অনুসরণ এবং তা নিয়ে নতুন কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে না যাওয়া। রান্না’র উপর দক্ষতা আসে প্রচলিত নিয়ম-নীতি অনুসরণের মধ্যে দিয়েই এবং যদিও আজকাল ঐতিহ্য’কে কমই গুরুত্ব দেয়া হয় তথাপি রান্নার ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণার অনুগামী হওয়াটা দোষের কিছুনা।
এলা তার দৈনন্দিন কাজের তালিকাটা একবার দেখল। মোটামুটি প্রতিদিন একই সময়ে সকালের নাস্তা, প্রতিসপ্তাহে নির্ধারিত শপিং মলে বাজার করতে যাওয়া, এবং প্রতি মাসের প্রথম রবিবার প্রতিবেশীদের সাথে ডিনার পার্টি। কারন কাজপাগল ডেভিডের হাতে সময় খুব কম থাকায় বাসার সব খবরদারী এলারঃ এই যেমন বাসার যে কোন প্রয়োজনে অর্থের ব্যবস্থা করা, নষ্ট হওয়া ফার্নিচার ঠিকঠাক করা, নিত্তনৈমিত্তিক কথা-বার্তার আদান-প্রদান, বাচ্চাদের কাজে সাহায্য করা ও তাদের হোমটাস্ক দেখে দেয়া এবং এমন আরও অনেক কাজ। বৃহস্পতিবার দিন সে রান্নার ফিউশন ক্লাবে যায়, সেখানে ক্লাবের সদস্যারা বিভিন্ন দেশের রান্নার সংমিশ্রণ ঘটায় আর পুরাতন হয়ে আসা বিভিন্ন রেসিপি’তে নতুন নতুন মসলা যোগ করে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করে। প্রতিদিন শুক্রবার সে ঘন্টাখানেক কৃষিবাজারে সময় কৃষকদের বিভিন্ন পণ্য দেখে সময় ব্যয় করে যেমন কখনও হয়তবা স্বল্প চিনির জামের অর্গানিক জ্যাম খুটিয়ে দেখলতো আবার কখনও অন্য দোকানিকে বোঝানোর চেষ্টা করল কিভাবে কচি পোর্টাবেলা মাশরুমের স্যূপ রাঁধতে হয়। যা কিছুই তার মনে ধরূকনা কেন সে ঐ কৃষি বাজার থেকে বাসায় নিয়েই আসবে।
অতঃপর শনিবার ডেভিড এলাকে নিয়ে কোন রেস্তোরায় যাবে (বেশীরভাগ সময়ই এটা কোন চাইনিজ বা জাপানিজ রেস্তোরাই হয়ে থাকে) তারপর রাতে ফেরার পর তারা যদি অত্যধিক ক্লান্ত বা মাতাল না হয়ে থাকে তাহলে যথারীতি সেক্সও হবে। কিছু সংক্ষিপ্ত চুমু আর হালকা শরীরি নড়াচড়ায় আবেগের থেকে করুণাই যেন সেখানে বেশী ঝরে পড়ে। তাদের একসময়কার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের মাধ্যম যৌনতা এখন তার যাদু হারিয়েছে। এমনও হয়েছে সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলে গেছে তারা একবারের জন্যও সেক্স করেনি। সেক্স একসময় তাদের জীবনে কত গুরূত্বপূর্ণ ছিল ভাবতেই এলার এখন কেমন বোকা বোকা লাগে। অথচ এই সেক্সহীন জীবন তার কাছে অনেক নির্ভার আর মুক্তির স্বাদ নিয়ে এসেছে। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে ধীরে ধীরে শারীরিক আকর্ষণ ও চাহিদা কমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের আরো যৌক্তিক অন্যান্য উপায় বের হবে এই স্বাভাবিকতায় মোটামুটি এলা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
সমস্যা একটাই দেখা দিল, ডেভিড তার স্ত্রী’র সাথে সেক্স করা বাদ দিলেও অন্য নারীর সাথে তা বাদ দেয়নি। বুঝতে পারলেও এলা কখনই সামনাসামনি ডেভিডকে এই ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করেনি এমনকি সন্দেহও পর্যন্ত তৈরী করতে দেয়নি যে সে বুঝতে পারছে। এই জেনেও না জানার ভান করে থাকা ছাড়া অন্যকোন পদ্ধতি তার ঘনিষ্ঠ কোন বন্ধুরও জানা ছিলনা। না কোন স্ক্যান্ডাল না, কোন অস্বস্তিকর অবস্থা না, এমনকি কোন ফিসফাসও ছিলনা। এলা বুঝতেই পারতনা ডেভিড কিভাবে সব ঠিকঠাক রাখছে। বিভিন্ন নারীর সাথে বিশেষত তার সহকারীর সাথে ঘনঘন মিলিত হওয়ার পরও ডেভিড খুবই কুশলতার সাথে ঠিকঠাক সব ম্যানেজ করে নিত। এলা শুধু এটাই জানত পাপের একটা গন্ধ আছেই।
যদি এই ঘটনাগুলোর কোন পরম্পরা থেকে থাকে তবে এলা বলতে পারবেনা কোনটা আগে কোনটা পরে। তার স্বামী’র তাকে প্রতারিত করার কারন কি সেক্স করতে আগ্রহের অভাব নাকি অন্যকোন কিছু? ডেভিডই কি তাকে প্রথম ধোঁকা দিয়েছিল, আর এটা বুঝতে পেরেই কি সে তার শরীরকে অবজ্ঞা করতে শুরু করে, ফলাফল সে সেক্সের উপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলে?
যেভাবেই দেখা হোক’না কেন ফলাফল একইঃ তাদের মধ্যের সেই আভা সেই আলো এখন অনুপস্থিত যা তাদের বিবাহিত জীবনের সামনে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা বাতলাতো, তাদের স্বপ্নগুলোকে জিইয়ে রাখত, এমনকি সেই আলো অনুপস্থিত তাদের জীবনে তাদের তিন সন্তান আগমনের পরও।


———


পরবর্তী তিনঘণ্টা তার মন চিন্তার জালে মগ্ন থাকলেও তার হাতদুটো ছিল ক্লান্তিহীন। কখনও সে গমের রুটি বানানোর জন্য ময়দা ভালো করে ফেটিয়ে নিয়ে ডলছিল তো কখনও সে টমেটো কাটছিল, রসূনের কোয়া ছাড়াচ্ছিল, পিঁয়াজগুলো অন্য উপাদান থেকে আলাদা করছিল আবার কখনওবা আচাড়’কে হালকা উত্তপ্ত করে নিয়ে কমলার ছিলকাগুলো ভালো করে থেঁতলে নিচ্ছিল। তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে পর এই পন্থাগুলো ডেভিডের মা তাকে যত্ন করে শিখিয়েছিল।
তিনি বলতেন, “সদ্য ভাজা রুটির গন্ধই একটি বাসার মানুষকে মনে রাখার জন্য যথেষ্ট। রুটি না কিনে নিজেই বানাও। ঘরোয়া পরিবেশকে আরো ঘনিষ্ঠ করতে এর জুড়ি মেলা ভার।“
সারাদুপুর কাজ করে এলা মোটামুটি সবদিক মিল রেখে ন্যাপকিন, সুগন্ধি মোমবাতি ও উজ্জ্বল হলুদ ও কমলা বর্নের ফুল দিয়ে সাজিয়ে,দেখলে মনে হবে নকল, একটা দারুণ কেতাদুরস্ত টেবিল তৈরি করে ফেলল। শেষমুহূর্তের কাজ হিসাবে সে ঝলমলে ন্যাপকিনের রিং বানিয়ে রাখল। যখন সে শেষ করল দেখে মনে হচ্ছিল অভিজাত কোন ম্যাগাজিনের পাতায় সাজানো খাবার টেবিলের ছবি।
ক্লান্ত হলেও সন্তষ্ট চিত্তে সে রান্নাঘরের টেলিভিশিনটা দুপুরের খবর শোনার জন্য চালু করল। একজন নবীন মহিলা থেরাপিষ্ট তার অ্যাপার্টমেন্টে ছুরিকাহত, শর্ট-সার্কিট হয়ে হাসপাতালে আগুন এবং এই দুস্কর্মের জন্য চারজন হাই-স্কুলের ছাত্র আটক। খবর দেখতে দেখতে সে বর্তমান পৃথিবীতে ঘনিয়ে ওঠা এইসব অপকর্মের কারণে ভবিষ্যতের আসন্ন দুর্বিষহ অবস্থার কথা ভেবে আপন মনে মাথা নাড়তে লাগল। আজিজ জেড জাহারা’র মত মানুষরা কিভাবে যে অনুন্নত দেশগুলো ঘুরে বেড়ানোর কথা ভাবতে পারে যেখানে আমেরিকার মত দেশের মত গ্রামাঞ্চলগুলোই নিরাপদ নয়?
কিন্তু এলা বুঝেই পায়না এই অননুমেয় এবং রহস্যময় পৃথিবী একইসাথে যেমন তাকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখছে আবার অন্যদিকে তেমনই আজিজের মত মানুষদেরকে উসকে দিচ্ছে দূরে ভুলে যাওয়া পথের খোঁজে বের হওয়ার জন্য।
সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিটে এলা রূবিনষ্টেইন ছবির মত সাজানো টেবিলে এসে বসল, সারা ঘরে তখন ছড়িয়ে পড়ছে প্রজ্বলিত সুগন্ধি মোমবাতির এক অজানা ঘ্রাণ। বাহির থেকে কেউ দেখলে তাদেরকে এক সুখী পরিবার বলে মনে হবে, বাতাসে ধীরে মিশে যাওয়া এক ঝলক সূক্ষ্ণ ধোঁয়ার জালের মতই কমনীয়।এমনকি জেনেটের অনুপস্থতিও তাতে একটুও দাগ বসাতে পারলনা। অরলি আর অভি’র তাদের সেদিনের স্কুলের অনুষ্ঠানের ঘটনা নিয়ে বকবকানি এলাকে উল্টো মনে মনে খুশীই করে তুলল। তাদের এই বাচালতা ও প্রগলভতা পরিবেশটাকে বরং হালকা করে দিল নয়ত এই নীরবতা তার ও তার স্বামীর উপর বোঝার মত চেপে বসত।
চোখের কোন দিয়ে এলা দেখল ডেভিড কাঁটাচামচে কিছু ফুলকপি নিয়ে মুখে পুড়ে ধীরে ধীরে চিবোচ্ছে। এলার দৃষ্টি গিয়ে তার অতি পরিচিত সেই মুখ, চিবুক, মুক্তার মত দাঁত আর পাতলা ঠোঁটের উপর যা সে বহুবার চুমু খেয়েছে। মনে মনে সে কল্পনায় দেখল ডেভিড অন্যকোন মহিলাকে চুমু খাচ্ছে। যে কোন কারনেই হোক ডেভিডের নবীন সহকারী’র মুখটা না ভেসে তার জায়গায় ভেসে উঠল সুসান সারানডোমেরই বয়স্ক সংস্করণ। তাকে দেখতে বেশ আত্মবিশ্বাসী ও শক্ত-সমর্থ্য শরীরের অধিকারী, সাথে আঁটসাঁট জামায় তার স্তনদ্বয় বেশ উচ্চকিত, হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা উঁচু হীলের চামড়ার বুটের সাথে চকচকে মুখে অদ্ভুত মেক-আপ। এলা কল্পনা করল সেই মহিলাকে ডেভিডের ক্ষুধার্ত ও তৃষিত চুম্বন, যা মোটেই এই খাবার টেবিলে তার ফুলকপি খাওয়ার মত নয়।
তৎক্ষণাৎই তার Culinary Artistry Made Plain and Easy থেকে বানানো পদ দিয়ে রাতের খাবার সময় মনে হল ঐ মহিলার স্বামীও হয়ত গোপনে পরনারীতে আসক্ত। সে মনের গহীনে স্পষ্ট বুঝতে পারল তার অনভিজ্ঞতা ও ভীরুতা সত্ত্বেও হয়ত একদিন সে সব অর্থাৎ তার রান্নাঘর, তার প্রিয় কুকুর, তার সন্তান, তার প্রতিবেশী, তার স্বামী, তার রান্নার বই ও রুটি বানানোর নিজস্ব কৌশল, সব ত্যাগ করে সোজা হাঁটতে থাকবে সেই পৃথিবীর দিকে যেখানে সর্বদাই ভয়ংকর কিছু না কিছু ঘটেই যাচ্ছে।
বাতাসের ঝাপটা তার ভালোলাগতে লাগল। আশরীরি আত্মা তখনও তার পাশে, অস্থির এবং চাপা গড়গড় আওয়াজ করে বাতাসে ক্রমাগত জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে। তার কুকুরের চোখ প্রথমে ছোট হয়ে আসল তারপর বড় ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল আর কান দু’টো এমনভাবে খাড়া হল যেন সে কিছু দূরেই অশুভ কিছুর অস্তিত্ব্য টের পাচ্ছে। এলা আর তার কুকুর সেই শেষ বসন্তের রাতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আশেপাশেই ঘুরে বেড়ানো অশরীরী কিছুর অপেক্ষায় ঘন ভীষণ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকল।



অনুবাদ করছেন কবি আকিল মোস্তফা


পরবর্তী অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন:



One thought on “দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ০৫

Comments are closed.