আলাপচারিতায় ফয়েজ আলম | শেষ অংশ



উত্তর উপনিবেশী তাত্ত্বিক ফয়েজ আলম। উপনিবেশী শাসন, শোষণ ও তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও ব্যক্তি কর্তৃক ব্যক্তির শোষণ-নিপীড়ণে ক্ষমতার নানামুখি প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে প্রবন্ধ, আর্টিকেল লিখে চলেছেন গত ২০ বছর ধরে। কথা বলছেন নানা ফোরামে। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশে দেশে পশ্চিমের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর সেই সঙ্গে নিজ রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক শোষণ ও চক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর লেখা যেমন একটি আন্দোলনের সূচনা করেছে তেমনি উদ্দীপ্ত ও সাহসী করে তুলেছে একদল নতুন প্রজন্মকে। বাংলাদেশের বহু তরুণের উত্তর উপনিবেশী জ্ঞানচর্চার হাতেখড়ি হয়েছে তাঁর লেখার মাধ্যমে।
কালেরকণ্ঠ-শিলালিপি কর্তৃক ১৯৭১ থেকে ২০১০ সাল অবধি ৫০টি সেরা বাংলা প্রবন্ধগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে তাঁর লেখা ‘উত্তর উপনিবেশী মন’ প্রবন্ধগ্রন্থটি। শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী মেহেদী চৌধুরী পরিচালিত লন্ডনভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘সমাজচিন্তা ও দর্শন’ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত বাংলাদেশের লেখক-বুদ্ধিজীবীর তালিকায়ও তাঁর নাম রয়েছে। অনুবাদ করেছেন এডওয়ার্ড সাঈদের “অরিয়েন্টালিজম”“কাভারিং ইসলাম” বই দুটি।

তাঁর প্রকাশিত মৌলিক প্রবন্ধগ্রন্থগুলি হলো উত্তর উপনিবেশী মন, ভাষা ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে এবং বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বজলছাপে লেখা উত্তর উপনিবেশী ভাবধারায় লেখা কবিতার বই।

২৮ ফ্রেব্রুয়ারি, ২০২১ এ নিউইয়র্কভিত্তিক অনলাইন চ্যানেল ‘ভয়েস ওভার’-এর উদ্যোগে তাঁর সাথে আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন কথাসাহিত্যিক শাপলা সপর্যিতা। অনুষ্ঠানটি ভয়েস ওভার অনলাইনে লাইভ প্রচার করে। সেই আলাপচারিতারই লেখ্যরূপ অকালবোধনের পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো।



পূর্বের অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন।



শাপলা সপর্যিতা: আপনি বলছিলেন তারা সংস্কৃত ভাষাটাকে নিয়ে এসেছিল?
ফয়েজ আলম: না, সংস্কৃত ভাষা নিয়ে আসেনি, তাদের ভাষা নিয়ে এসেছিলো। ঐ সময়ে মানুষের বুদ্ধিতে ভাষার কোন নাম দেয়ার কথা নিশ্চয়ই আসেনি। তাই তাদের ভাষাকে আপাতত কেবল ‘ভাষা’ই বলবো আমরা। ভারতীয়-আর্য বলে আমরা যে ভাষাটাকে নির্দেশ করি ঐটার তিনটা স্তর পন্ডিতরা চিহ্নিত করেছেন। প্রাচীন ভারতীয় আর্য –১২০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ থেকে ৫০০ খি. পূর্বাব্দ পর্যন্ত; মধ্য ভারতীয় আর্য–খ্রি. পূর্ব ৫০০ অব্দ থেকে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত; এটিই আসলে প্রাকৃত ভাষার কাল। এবং নব্য ভারতীয় আর্য– ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এখন পর্যন্ত। নব্য ভারতীয় আর্য হচ্ছে যে ভাষাগুলোতে এখন আমরা কথা বলি; উড়িয়া, আসামিয়া, বাংলা, হিন্দী ইত্যাদি। কালপর্বের বিস্তার নিয়ে কিছুটা বিতর্ক আছে। আমরা তাতে যাচ্ছি না। সাধারণ আলোচনার জন্য তার প্রয়োজনও নেই।
মধ্য ভারতীয় আর্য পর্যায়ে অর্থাৎ খ্রি. পূর্ব ৫০০ অব্দ থেকে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কালপর্বে ভারতীয় আর্যরা এখানে খানিকটা গুছিয়ে বসেছে। তাদের সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্ম নিয়েও চিন্তভাবনা বিকশিত হচ্ছে। তাদের ধর্মগুরু ও শিক্ষাগুরুরা লক্ষ্য করেন যে তাদের মূল ভাষা এরইমধ্যে স্থানীয় মানুষদের ভাষার সাথে মেশার ফলে স্থানীয় ভাষা নবরূপ ধারণ করেছে, যেটি হলো প্রাকৃত ভাষা। তাই তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অর্থাৎ তন্ত্রমন্ত্রের ভাষাও অবিকৃত থাকছে না। এসব কারণেই হয়তো বা, ৩৫০ খি. পূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে প-িত পানিনি ‘অষ্টাধ্যায়ী’ নামে বিখ্যাত ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন এবং সেখানে পরিশুদ্ধ ভাষার নমুনা তুলে ধরেন, ভাষা কথনের নিয়মগুলো স্থির করে দেন যাতে ভাষা আর ‘বিকৃত’ না হয়।
এ সময়ের ভাষিক পরিবেশ সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা দরকার। খুব যৌক্তিকভাবেই ধারণা করা হয় বিরাট দেশ ভারতে সে সময়ে যে ভাষা প্রচলিত ছিলো অর্থাৎ প্রাকৃত ভাষা, অঞ্চলভেদে তার ধরণ ভিন্ন ভিন্ন হয়: যেমন মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত, শৌরসেনী প্রাকৃত, মাগধী প্রাকৃত, অর্ধমাগধী প্রাকৃত, পৈশাচী প্রাকৃত, ইত্যাদি। পানিনি বর্তমান পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি অঞ্চলের কাছাকাছি সালাতুরা নামক গ্রাম বা নগরের লোক ছিলেন। সে এলাকার প্রাচীন নাম গান্ধারা। গান্ধারী প্রাকৃত নামে এক ধরণের প্রাকৃত ভাষারও উল্লেখ আছে। পাণিনি তার অঞ্চলে প্রচলিত প্রাকৃতকে পরিশুদ্ধ করে সংস্কৃত ভাষার নমুনা তৈরি করে থাকবেন এমন ধারণা করাই যুক্তিসঙ্গত। তবে বারো শতকের শেতাম্বর জৈন প-িত নমি সাধু উল্লেখ করেন যে, অর্ধ-মাগধী থেকে পরিশুদ্ধ করে সংস্কৃত ভাষা তৈরি করা হয়েছে। অর্ধ-মাগধী হোক বা অন্য যে প্রাকৃতই হোক, প্রচলিত ভাষাসমূহ অর্থাৎ কোন এক প্রাকৃত ভাষার প্রচল নমুনা গ্রহণ করে পানিনি তার একটি পরিশুদ্ধ রূপ উপস্থাপন করেন এবং ব্যাকরণের নিয়মে বেধে বলেন যে এটিই হলো ভাষার ‘পরিশুদ্ধ’ বা সংস্কৃত রূপ, ভাষা এভাবেই বলতে হবে। এই পরিশুদ্ধ অর্থে সংস্কৃত কথাটির ব্যবহার থেকেই পরবর্তীতে পানিনির ব্যাকরণ-নির্দেশিত ভাষার নাম দেয়া হয় ‘সংস্কৃত’ ভাষা। এটি খ্রি. পূর্ব ৩৫০ অব্দের কাছাকাছির ঘটনা।

শাপলা সপর্যিতা: আচ্ছা।
ফয়েজ আলম: পাণিনি যেসব ভাষার নমুনা নিয়েছিলেন অনেকের মতে সে ভাষাগুলো হলো উত্তর-পশ্চিমা প্রাকৃত এবং উদীচ্যি প্রাকৃত। সেগুলো থেকে নমুনা নিয়ে উনি ব্যকরণ তৈরী করলেন। মানে উত্তর এবং পশ্চিমে প্রচলিত প্রাকৃত ভাষা। অন্যদিকে বাংলা এসেছে কারো কারো মতে প্রাচ্যা-প্রাকৃত হতে বিবর্তিত হয়ে, কারো মতে গৌড়ী প্রাকৃত থেকে বিবর্তিত হয়ে।
এখন ভেবে দেখুন, খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে প্রচলিত প্রাকৃত ভাষার নমুনা নিয়ে পরিশুদ্ধ ভাষার নিয়ম নির্দেশ করলেন পাণিনি। এই একই সময়ে বাংলাভাষার পূর্বপুরুষ প্রাচ্যা প্রাকৃত (মতান্তরে গৌড়ী প্রাকৃত) ছিলো পূর্বাঞ্চলের ভাষা। এই দুই ভাষাই পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ, কারণ দুটোই বৈদিক ভাষার সাথে স্থানীয় ভাষার সংমিশ্রণ থেকে উদ্ভুত। অর্থাৎ পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ দুটি ভাষার একটি থেকে নমুনা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংস্কৃত, অপরটি বিবর্তিত হয়ে হাজার বছর পর জন্ম নিয়েছে বাংলা ভাষা। কাজেই বাংলা এবং সংস্কৃতের শব্দভান্ডারে মিল থাকবে এটিই স্বাভাবিক। একই উৎস থেকে দুই ভাষার উৎপত্তি। এজন্যই ড: মুহম্মদ শহীদুল্লা বলেছেন বাংলা সংস্কৃতের দূর সম্পর্কের আত্মীয়া।
সংস্কৃতের সাথে বাংলার এই সাদৃশ্যের চেয়ে গভীরতর সাদৃশ্যের জন্ম হয় আরো পরে। যখন জোনস দাবী করেন সংস্কৃত হলো ভারতের সকল ভাষার ‘মাতা’ তখন সংস্কৃতজ্ঞ প-িতরা বাংলাভাষাকে ‘যবনের দোষ’মুক্ত করার জন্য সকল আরবী ফারসি শব্দসহ অনেক দেশি শব্দ বাদ দিয়ে সংস্কৃত শব্দ আমদানী করে কেতাবী বাংলা সৃষ্টি করেন উনিশ শতকের প্রথমার্ধ্বে। নতুন সৃষ্ট এই কেতাবী বাংলা পুরোপুরি সংস্কৃতের অুনসারী হয়ে উঠলো। এর ফলে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের ‘দূহিতা’ বলে চালাতে আর কোন সমস্যা রইলো না। জোনসের ঘোষণা আর কোলকাতার সংস্কৃত প-িতদের পরিশোধন কর্মের বদৌলতে কেতাবী বাংলা সংস্কৃতের ‘দূহিতা’ রূপে ব্যাপক প্রচার পেল। এটিই দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মগজে ঘোরপাক খেয়েছে। অর্থাৎ প্রথমে ঘোষণা করা হলো বাংলা সংস্কৃতের মেয়ে, তারপর এই ঘোষণা বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য তার চেহারাসুরত সংস্কৃতের মত করে তোলা হল।
মজার ব্যাপার হলো ‘সংস্কৃত ভাষা’ নামে কোন ভাষাই ছিলো না। পাণিনি ‘সংস্কৃত’ কথাটি লিখেন পরিশুদ্ধ অর্থে। পরে এই শব্দটি পাণিনি নির্দেশিত ভাষার নাম হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। সংস্কৃতের মাতৃরূপ সম্পর্কে জোনসের ঘোষণার পরে সংস্কৃত হয়ে উঠে সাম্প্রদায়িক গৌরব প্রকাশের অবলম্বন। আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো সংস্কৃতি কোন মানব গোষ্ঠীর ভাষা নয়, ধর্মচর্চার জন্য তৈরি কৃত্রিম ভাষা।
ভারতের ভাষাতাত্ত্বিকরা এই নিয়ে চমৎকার এক নামকরণের রাজনীতিও করেন। তারা প্রাচীন ভারতীয় আর্য ও মধ্যভারতীয় আর্য ভাষার সব বৈচিত্রকেই সংস্কৃত নামের আওতায় নিয়ে আসেন। যেমন: বৈদিক সংস্কৃত, ধ্রুপদ সংস্কৃত। আসলে সংস্কৃত কথাটা এসেছে পাণিনির গ্রন্থে। সেইক্ষেত্রে বহু আগের বেদের ভাষার নাম কি করে সংস্কৃত হয়? নামকরণের এই রাজনীতিটা করা হয় যাতে তারা দাবী করতে পারেন যে, সংস্কৃত ভাষা আগে থেকেই ছিলো এবং সংস্কৃত বিকৃত হয়ে প্রাকৃত ভাষার সৃষ্টি হয়েছে, সেই প্রাকৃত থেকে সকল ভারতীয় ভাষার সৃষ্টি হয়েছে বিধায় সকল ভারতীয় ভাষা আসলে সংস্কৃতেরই সন্তান।
কাজেই আমরা যে এখন বলছি সংস্কৃতের সাথে বাংলার গভীর মিল আছে সেই মিলের অনেকটাই কৃত্রিম–উনিশ শতকের প্রথমাধ্বের্র সৃষ্টি। ভাষার যে ইতিহাস আমরা এখন পাঠ করি তাও লেখা হয়েছে উনিশ শতকে। ফলে উনিশ শতকে যে ভ্রমাত্তক বিবরণ এবং ভ্রমাত্তক পরিশোধন সেটাকে ভিত্তি ধরলে বাংলা ভাষার মূল কখনই বোঝা যাবে না। প্রকৃতপক্ষে বাংলা এবং সংস্কৃত পাশাপাশি সমান্তরাল দুইটি প্রাকৃত ভাষা থেকে এসেছে। মানে বাংলা প্রাচ্যাপ্রাকৃত থেকে, সংস্কৃত উদীচ্যীপ্রাকৃত এবং উত্তর-পশ্চিমি প্রাকৃতের আশ্রয়ে। ফলে এই দুই ভাষার একটা আরেকটার মা ছেলে কিংবা মাতা-কন্যা এইসব হাস্যকর প্রতীকি শব্দজোড় ব্যবহার করে বাংলা ভাষাকে ধর্মীয় আবেগের কব্জা করার চেষ্টা অর্থহীন।

শাপলা সপর্যিতা: এবার একটু কথা বলতে চাই বাংলা সমালোচনা সাহিত্য সম্পর্কে আপনার মতামত প্রসঙ্গে। আপনার একটা প্রবন্ধ আছে ‘বাংলা সমালোচনায় উপনিবেশিত’র বোধ’ শিরোনামে। প্রবন্ধটি “ভাষা ক্ষমতা এবং আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে” বইটিতে আছে। এই প্রবন্ধটিতে আপনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন যে, ভারতে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপে ইংরেজরা বেশ বাধার মুখে পড়ে: ফকির সন্যাসিদের বিদ্রোহ, আবু তোরাবের বিদ্রোহ, প্রায় চারযুগ ধরে এইসব স্থানিক গোলযোগ চলতে থাকে। ইংরেজরা বুঝতে পারে এখানে উপনিবেশ ভালোভাবে কায়েম এবং দীর্ঘায়িত করতে হলে স্থানীয়দের মধ্যে একটা দালাল শ্রেণী তৈরি করতে হবে। এজন্য তারা ভাবে যে স্তরে স্তরে এই আগ্রাসনটা চালাতে হবে। আপনার প্রবন্ধটি থেকে আমি একটা অংশ একটু পড়তে চাই যেখানে আপনি দেখিয়েছেন উপনিবেশবাদ কিভাবে আমাদের শিক্ষা ও সাহিত্যের জায়গাটাতে ঢুকে পড়ল। মেকেলে সম্পর্কে আপনি লিখেছেন ”ভারতের ইতিহাস বলতে তিনি আবিস্কার করেছেন কিছু পৌরানিক কাহিনী, পুরানকে ব্রিটিশ যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তার কাছে সবই অবিশ^াস্য গালগল্প ঠেকেছে; এভাবে বিরাট ভারতকে তিনি কিছু পৌরানিক গল্প জানার মাধ্যমে অতি দ্রুত সংক্ষেপে বুঝে ফেলে সিদ্ধান্ত নেন যে, প্রজাদেরকে শিক্ষা দিতে হবে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে, ইংরেজি সাহিত্য থেকে।” এখানটা যদি একটা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন, সাহিত্যটা কিভাবে উপনিবেশী আগ্রাসনের কবলে পড়ল?
ফয়েজ আলম: ১৮১৩ সালে একটা সিদ্ধান্ত হয় যে কোম্পানী ভারতীয় উপমহাদেশের জনগনের শিক্ষার ভার নেবে। কিভাবে তা করবে এ বিষয়ে লর্ড ব্যারিংটন মেকলে ১৮৩৫ সালে প্রকাশ করেন বিখ্যাত মেকলে মিনিট। সেখানে বলা হয় স্থানীয়দেরকে শিক্ষা দিতে হবে ইংরেজী ভাষায়। শেখাতে হবে ইংরেজী সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ইত্যাদি। কেন? কারন মেকলে করেন সারা ভারতীয় উপমহাদেশে সংস্কৃত ভাষা এবং আরবী ভাষায় এযাবতকালে যত গ্রন্থ লেখা হয়েছে সেগুলো যদি ইংরেজদের ব্রিটিশ লাইব্রেরীর একটি সেলফের সাথে তুলনা করা হয় তবু তা এক সেলফ ইংরেজী গ্রন্থের কাছে কিছুই না। কাজেই ভারতীয়দেরকে সভ্য ও জ্ঞানী বানাতে হলে ইংরেজী ভাষা এবং সাহিত্য শেখাতে হবে। ১৮৩৭ সালে ফারসি বাদ দিয়ে ইংরেজী ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসাবে গ্রহণ করা হল। ১৮৫৩ সালে ঘোষণা দেয়া হল সিভিল সার্ভিসে ভারতীয়রা ঢুকতে পারবে, তবে ইংরেজী সাহিত্য বিষয়ে ১০০০ নাম্বারের একটা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যোগ্যতা প্রমাণ করে আসতে হবে। ভেবে দেখুন, চাকরির লোভে ইংরেজী সাহিত্য বিষয়ে ১০০০ নম্বরের পরীক্ষায় পাশ করতে হলে ছাত্র জীবনের শুরু থেকেই ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আলাদা জোর দিতে হবে।
তার আগেই ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিতি হয় হিন্দু কলেজ, ১৮২৯ সাল থেকে কলিকাতা মাদ্রাসায় ইংরেজী পড়ানো শুরু হয়। এরপর সিভিল সার্ভিসে ঢোকার জন্য ইংরেজী সাহিত্য বিষয়ে ১০০০ নম্বরের পরীক্ষা পাশের শর্ত। ফলে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাটা ইংরেজিমুখী হয়ে যায়। ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য পড়তে পড়তে একসময় ইংরেজী সাহিত্যের প্রতি তাদের মধ্যে প্রেম দেখা দেয়, যে কারনে বঙ্কিমরা ইংরেজি সাহিত্যের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। বঙ্কিম সিভিল সার্ভিসেও ঢুকেছিলেন। উপনিবেশী প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মেকলে যে দালাল শ্রেণী তৈরি করার কথা বলেছিলন যারা চেহারা ও গাত্রবর্ণে হবে ভারতীয়, আর মনে রুচিতে হবে ইংরেজ, সেই শ্রেনীটি মোটামুটি তৈরী হয়ে গেল পরবর্তী ১০-২০ বছরের মধ্যে। তাদের প্রথম দলের একজন হলেন বঙ্কিম। এর ফলে দেশীয় সাহিত্য দুই ধরণের সঙ্কটে পড়লো। এক: এ সাহিত্য পড়ে সামাজিক মর্যাদা, সিভিল সার্ভিসে চাকরী বা জীবিকা অর্র্জনের ব্যবস্থা হয় না বলে দেশীয় সাহিত্য মর্যাদা হারালো; দুই- ইংরেজী সাহিত্যের উচ্চমূল্য নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় ইংরেজী সাহিত্যের অনুকরণে সাহিত্য রচনার প্রবণতা স্থায়ী হয়ে গেল। এই অবস্থা এখনো অনেকটাই অটুট রয়ে গেছে আমাদের এখানে। আমাদের সমাজে ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যের একটা আলাদা মর্যাদা এখনো আছে। বরং নয়াউপনিবেশী আধিপত্যের কারণে আবার নতুন করে তার প্রকোপ বাড়ছে।

শাপলা সপর্যিতা: ইংরেজির প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ রয়েই গেছে তো। আমাদের বাংলা সাহিত্য, বাংলা কবিতা, বাংলা গল্প পড়ার চেয়ে, আমি দেখি এই যে ফেইসবুকে লাইভ অনুষ্ঠানগুলোতে, যখনই বিদেশী কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে আসা হয় একটা লাইভ অনুষ্ঠানে, সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বাংলাদেশের একজন কবি সাহিত্যিক নিয়ে আসলে এতো বিপুল পরিমান ভিউ এতো বিপুল পরিমান পাঠক-দর্শক হয় না। তারপরে আরো ব্যাপার আছে।
ফয়েজ আলম: এখনো দেখেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পাঠসূচী অনুযায়ী বইগুলো যদি ইন্ডিয়া থেকে আসে তবে সেখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভারতীয় পরিবেশ জায়গা করে নেয়, যদি সেটা ব্রিটেন থেকে আসে তবে ইংলিশ বিষয়গুলো চলে আসে।

শাপলা সপর্যিতা: ক্যামব্রিজ এর যে সিলেবাস সেখানে জিওগ্রাফী পড়তে গিয়ে বাচ্চারা ইংল্যান্ডের ভূগোল পড়ে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে আমি দেখেছি কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রীদের অভিবাবক বাবা-মা পর্যন্ত বাংলাকে কি পরিমান অবহেলা করে এবং কি ধরনের নিচু মর্যাদার বলে ভাবে। অভিবাবকরা এ কথাও বলে যে বাংলা পড়তে হবে কেনো, আমার ছেলেতো অক্সফোর্ডে পড়তে যাবে, আমার ছেলেতো ক্যামব্রিজে পড়তে যাবে, বাংলা কেনো পড়তে হবে, সে বাংলা পড়তে চায় না, বুঝে না, ইত্যাদি। ক্লাশ ১-৫ এর বাচ্চাদের যুক্ত বর্ণ ভেঙ্গে দেখানোর একটা ব্যাপার থাকে যেমন……ক্ত সমান হচ্ছে ক+ত। এটা আমাদের বাংলা সিলেবাসে আছে, ইংলিশ সিলেবাসে নেই। ম্যাপল লিপে যখন পড়াতাম প্রিন্সিপাল আমাকে বললেন এমনভাবে পড়াতে যাতে বাচ্চারা সৃজনশীল লেখায় আগ্রহী হয়ে উঠে। বাস্তবে আমি দেখি দশম শ্রেণীর অনেক বাচ্চা ‘সহ্য’কে পড়ছে ‘সহহ’। আমি জিজ্ঞেস করলাম এটা কি ক্লাশ ১,২,৩-তে টিচার শেখায়নি। তার বললো না, বাসায় শেখানো হয়েছে ‘সহ্য’ হলো ‘সহহ’। দেখুন অবস্থা। যেসব বাচ্চার বাবা-মা বাংলা পারে না তাদের বাচ্চাদের শেখাবো সৃজনশীল লেখালেখি! আর কত কি! অভিবাবকদের কেউ কেউ আমাদের উপর ক্ষেপে গেলে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেন যে, দুই টাকার বাংলার শিক্ষক, আমাদের টাকায় বেঁচে থাকে, বাংলা পড়ানোরই দরকার নাই।
ফয়েজ আলম: দুই টাকার বাংলা শিক্ষক?

শাপলা সপর্যিতা: চন্দ্রবিন্দু আছে অথচ চন্দ্রবিন্দু ছাড়া শব্দগুলো লেখার পরও আমাকে বলা হয়েছে, ‘নম্বর দিয়ে দেন, চন্দ্রবিন্দু না দিলেও অসুবিধা নাই, বোঝেন না স্টুডেন্টস আর দা মোস্ট ভ্যালুয়েবল কাস্টমার, তাদেরকে আমার ধরে রাখতে হবে’। যাইহোক, আমি আরেকটা প্রসঙ্গে যাই। ‘বুদ্ধিজীবি, তার দায় এবং বাঙালীর বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব’ বইয়ের ‘ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষমতা: ক্ষুদ্র জাতিগুলোর অবস্থান’ প্রবন্ধটিতে বলতে চেয়েছেন উপনিবেশের কারনে বৃহত্তর বাঙালি জাতি যেমন তেমনি ক্ষুদ্র জাতিগুলোও আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। সেজন্য ওরা খ্রিস্টীয় ধর্ম এবং খ্রিস্টান মিশনারীদেরকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছে। কিছু টাকা পয়সা সুযোগ সুবিধা দিয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করিয়েছে, তারপর খ্রিস্টীয় ধর্মের সকল কিছুই তাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। এমনও দেখা গেছে এভাবে পুরো জাতিই একেবারে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যেমন মান্দি তারপরে হাজং, এইসব ক্ষুদ্র জাতিগুলো।
ফয়েজ আলম: বাংলাদেশে অনেকগুলো ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আছে। তাদেরকে ক্ষুদ্র জাতি বলা হয় অথবা আদিবাসী বলা হয়। চিটাগাংএ সম্ভবত ১১টা, ময়মনসিংহে আছে মান্দি সম্প্রদায়। ব্রিটিশরা এইদেশে উপনিবেশ বিস্তার করতে এসে দেখলো ক্ষুদ্র জাতিগুলো বৃহত্তর মূল জাতিগুলোর চাপে নানাভাবে কোণঠাসা অবস্থায় আছে। ব্রিটিশ, স্প্যানিশ, ডাচ, ফ্রেঞ্চ মিশনারিরা বুঝতে পারলো এদের মনে যেহেতু একটা বঞ্চনা আছে, ক্ষোভ আছে এবং আর্থিক সংকটে আছে তাই এখনি সময় এদেরকে কব্জা করার। তারা বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা ও মানসিক সমর্থন নিয়ে তাদের কাছে গিয়ে হাজির হলো, স্কুল কলেজ করে দিলো, চার্চ করে দিলো এবং বললো যে, তোমরা খ্রিস্ট ধর্মে আসো, খ্রিস্ট ধর্ম হচ্ছে সবার ধর্ম। এইভাবে পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষদেরকে প্রলুব্ধ করে বিপুল সংখ্যক মানুষকে খ্রিস্ট ধর্মে নিয়ে আসলো। এরপরই তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিসহ সব কিন্তু আস্তে আস্তে বদলে যেতে শুরু করলো। আপনি দেখবেন যে, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী মান্দি বা অন্যরা কিন্তু চলনে বলনে এবং অন্যান্য আচরনে ইংরেজী সংস্কৃতি অনুকরণের চেষ্টা করে। ইংরেজের প্রতি, ব্রিটেনের প্রতি, আমেরিকার প্রতি তাদের একটা আলাদা টান আছে। এর মধ্য দিয়ে যে কাজটা হয়েছে সেটা হলো বিপুল পরিমান আদিবাসী কিংবা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বিপুল পরিমান মানুষ খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে উপনিবেশকের হাতকে শক্তিশালী করে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমাদের উচিত ছিলো ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর সাংস্কৃতিক ও ভাষিক স্বাতন্ত্র বজায় রেখে তাদেরকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। আমরা যেটা করতে পারতাম, দশম শ্রেণী পর্যন্ত তাদের মাতৃভাষায় পড়াশোনা করানোর পাশাপাশি বাংলা ভাষাও পড়ানোর ব্যবস্থা করতে পারতাম। এরপরে কলেজ স্তরে গিয়ে তারা বাংলায় পড়তো। এর ফলে তাদের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক সঞ্চয়গুলো টিকে থাকতো, তাদের ক্ষোভটা কম থাকতো এবং তারা বাংলাদেশকে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকেও তাদের আপন বলে মেনে নিতে পারতো। আমরা যারা নিজেদের ভাষা,সংস্কৃতি এবং ইতিহাস নিয়ে খুব গর্ব করি তাদের উচিত ক্ষুদ্র জাতিসত্তারগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাসের প্রতি সম্মান দেখানো এবং সেগুলোকে আগ্রাসন থেকে রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখা।

শাপলা সপর্যিতা: হ্যাঁ, যেমন আমরা পড়ছি; আমরা বাঙালি, বাংলায় পড়ছি উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত। তারপরে কেউ চাইলে ইংরেজিতে পড়ছি কিংবা বাইরে যাচ্ছি। তাদেরকেও এ সুযোগ দেয়া যেতো। আরেকটা বিষয়ে কিছু জানতে চাইবো। ‘বাংলা সমালোচনায় উপনিবেশিতর বোধ’ প্রবন্ধটিতে আপনি সমালোচনা সাহিত্য নিয়ে কথা বলেছেন। এক জায়গায় আপনি ভীষণরকম আক্রমানত্মকভাবে অভিযোগ করেছেন যে, বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে উপনিবেশী আগ্রাসনের বিষয়টি কোন প্রভাবই ফেলেনি। অর্থাৎ আমাদের সাহিত্যে যেসব উপনিবেশী প্রভাব সেগুলোকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখা হয়নি। ঐ জায়গাটা পড়ে শোনালে হয়তো অন্যদের বুঝতে সুবিধা হবে। আমি একটু পড়ে শোনাই। আপনি লিখেছেন, “বাঙালি ভিক্টোরীয় রোমান্টিকতায় মুগ্ধ হয়ে তার আলোচনায় গা-ভাসিয়েছে, সংস্কৃতি সাহিত্যনীতির অনুকরণে অলংকারের বিচারে নিমেছে, মার্কসবাদী সমালোচনায় মেধা ও আবেগ ঢেলে দিয়েছে, মনোসমীক্ষণাত্মক সমালোচনা, প্রকরণবাদ, দাদাবাদ, পরাবাস্তবতা, ইত্যাদি নানা বিষয়ে অপরিণত আবেগ দেখিয়েছে। অতি সাম্প্রতিক টেকচুয়াল রীতি নিয়েও তার প্রবল উৎসাহ। কেবল নিজ দেশের মানুষের দুইশ বছরের দাসত্বের ইতিহাসের দায় ও পরিণতি তার সমালোচক-বোধে কোনো ছাপই ফেলতে পারেনি।”বোঝাই যায় এ ব্যাপারে আপনার মধ্যে তীব্র ক্ষোভ কাজ করেছে। এ নিয়ে একটু বলুন।
ফয়েজ আলম: আমি আমার কম বয়স থেকেই দেখে আসছি ইংরেজি ভাষায় যত ধরণের মতবাদ আলোচিত হয় কিছুকাল পরেই আমাদের মধ্যে সেটি ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। রেনেসাঁ বলেন, ভিক্টোরীয় রোমান্টিকতা বলেন, দাদাইজম, পরাবাস্তববাদ, দেরিদার চিন্তাধারা এই সমস্ত বিষয়ে আমাদের আগ্রহের শেষ নাই। কিন্তু এদেশে উপনিবেশ নামে যে একটা ঘটনা ঘটে গেছে এবং আমাদের ঘাড়ের উপর প্রায় দুইশ বছর ধরে চেপে বসেছিলো, আমাদের সাহিত্যে তার ইতিবাচক-নেতিবাচক প্রভাব কি, সেগুলো থেকে কাটিয়ে উঠা উচিত কিনা, উত্তর উপনিবেশী দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সাহিত্যকে বিচার করা যায় কিনা, এমন কোন চিন্তাভাবনা আমার গোচরে আসেনি। এই বোধটা কারো মধ্যে কাজ করে না। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেখেছি কেউ কেউ মোটা মোটা ইংরেজি বই হাতে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করেন, যার সবটাই কাজের ছিলো বলে মনে করি না, কিছুটা দেখানোর জন্যও ছিলো। এখনো দেখি দেরিদার ডিকন্স্ট্রাকশন কথার বাংলা তরজমা অবিনির্মাণ হবে না বিনির্মাণ হবে না কি নানির্মাণ হবে এই নিয়ে মহাতর্ক। অর্থাৎ কতটা অর্থহীনভাবে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে . . .

শাপলা সপর্যিতা: এখানে একটু বলতে চাই। আপনি এক প্রবন্ধে বলেছেন দেরিদার মতামত আমাদের জন্য জরুরী নয়।
ফয়েজ আলম: হ্যাঁ, আমি ঠিক এ কথাটাই বলেছি। এমনকি বলেছি যে, দেরিদা না পড়লেও চলবে, অবশ্যই সাধারণ জ্ঞানচর্চাকারীদের প্রসঙ্গে। ঠিক এ কথাটা বুঝিয়ে বলার জন্য দেরিদা নিয়ে আমি লিখেছি এবং একটি সংকলন সম্পাদনা করেছি। শুধু এইটা দেখানোর জন্য যে, দেরিদা নিয়ে এত মাতামাতির কোন প্রয়োজন নাই। দেরিদা যেটা নিয়ে কথা বলেন–টেক্সটের বাইরে কিছু নেই, এটি নয়াউপনিবেশী রাজনীতিরই একটা অসচেতন অস্ত্র মাত্র। আমি উপনিবেশের মানুষ, উপনিবেশের প্রভাব আমার সমাজে বিরাজমান। আমি জানি পশ্চিমের টেক্সটের একটা পরিপ্রেক্ষিত থাকে। পশ্চিমের যে-সমাজে বাস করে দেরিদা বা অন্য কেউ লিখেন সেই সমাজ আমার দেশ ও সমাজ সম্পর্কে একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি পোষন করে। দেরিদা বা সেই কাল্পনিক লেখক সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবের আওতায় থেকে লেখেন। তাই সেই সমাজ-পটভূমি ভাবনায় না রাখলে তার টেক্সটের আসল অর্থ আমার পক্ষে উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। তাই আমি যদি দেরিদার এই কথায় বিশ^াস করি যে, টেক্সটের বাইরে কিছুই নাই তাহলে আামি তার টেক্সটের রাজনীতিটা ধরতেই পারবো না।
উত্তর উপনিবেশবাদের কিছু মূল্যবোধ আছে। সেটা হচ্ছে এই যে, আমার ভারতীয় কিংবা আমার বাংলাদেশের যা কিছু আছে তার কোন কিছুকে বাছবিচার ছাড়াই যদি নিন্দা করা হয় তবে সেই সাহিত্যকে নিকৃষ্ট সাহিত্য হিসাবে চিহ্নিত করব। আমার ইতিহাস, আমার ভাষা আমার সংস্কৃতি এগুলোকে উচ্চ মর্যাদায় তুলে ধরা হয়েছে যে-সাহিত্যে সেই সাহিত্যের আমি প্রশংসা করবো। এ জাতীয় কোন বোধ আমাদের সমালোচকদের মধ্যে কাজ করে না। আপনি আমার প্রবন্ধের কথা বলেছেন; সেই প্রবন্ধে আমি বাংলা ভাষার একটা ছোটেগল্প ও একটা উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করে দেখিয়েছি উত্তর-উপনিবেশী দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনা কিরকম হওয়া উচিৎ।

শাপলা সপর্যিতা: সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা উপন্যাসের…
ফয়েজ আলম: হ্যাঁ, সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা উপন্যাস, নামটা আমি ভুলে গেছি, আর প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের একটা ছোট গল্প। সুনীলের উপন্যাসের বিষয় এরকম: নগর মানে কেন্দ্র মানে কলকাতা থেকে একজন লোক মহুলডেরায় বা সাঁওতাল পরগণায় কিংবা এরকম কোন একটা জায়গায় গিয়ে আমোদ ফূর্তি করে; এক পর্যায়ে সে গাড়ী দুর্ঘটনায় পড়ে স্মৃতিভ্রংশের শিকার হয় এবং একটা মিশনারী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নীত হয়। সেখানে একজন নার্স আছেন যিনি অত্যন্ত সুন্দরী এবং সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী। আর যিনি ক্যালকাটা থেকে গেছেন তিনি হচ্ছেন নাগরিক, তিনি হচ্ছেন পশ্চিমা ধর্ম, পশ্চিমা নৈতিকতায় বিশ্বাস করেন যার নাম দিয়েছেন তিনি ‘মানব ধর্ম’। লোকটি স¥ৃতিহারা হলে হবে কি তার স্বভাববশত: এই মেয়েটাকে নানাভাবে ফুসলানোর চেষ্টা করেন। মেয়েটি ভারতীয় সনাতন ধর্মের বিধিনিষেধের দোহাই দেয় আর লোকটি পশ্চিমের মানব ধর্মের কথা বলে ফুসলানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখে এবং এক পর্যায়ে মেয়েটির সাথে যৌনকর্ম করতে সক্ষম হয়। মেয়েটি প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়। ছেলেটি সুস্থ হয়ে আবার কোলকাতা অর্থাৎ নগর অর্থাৎ কেন্দ্রে ফিরে আসে মেয়েটির কোন ব্যবস্থা না করেই। সংক্ষেপে বলি, লোকটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেয়েটাকে স্বীকার করে নেয়না। ফলে মেয়েটা লোকলজ্জার ভয়ে দূরে, হিমালয়ের পাদদেশে আরেকটা মিশনারী হাসপাতালে চলে যায়। সেখানে বসে একটা চিঠিতে সে লেখে জীবনকে পুড়ে পুড়ে সে খাঁটি সোনা করেছে।
একটা লোফার লোক পশ্চিমা দর্শন এবং পশ্চিমা নৈতিকতার কথা বলে একটা মেয়েকে ফুসলিয়ে তাকে প্রেগন্যান্ট করার পর তার মানব ধর্ম উধাও হয়ে যায়। আর সেই মেয়ে পালিয়ে চলে যায় হিমালয়ে। সে তার নামে মামলা করছে না, অভিযোগ করছে না, তাকে জেল খাটাচ্ছে না, সে চলে যাচ্ছে হিমালয়ে; সেখানে কি করছে, জীবনকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে খাঁটি সোনা করছে।
এইটা হচ্ছে সুনীলের বক্তব্য। এর মানে কি? এর অর্থ বুঝতে হবে উত্তরউপনিবেশী দৃষ্টিকোণ থেকে। এর অর্থ হচ্ছে হচ্ছে সুনীল পশ্চিমের দর্শন ও প্রাচ্যের দর্শন-বিশ^াসকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে প্রাচ্যের দর্শনের হার দেখিয়েছে। প্রাচ্যের দর্শন হেরে যাওয়ায় মেয়েটির সর্বনাশ হয়েছে। তারপর কি উদ্ভট পরিণতি দেখানো হয়েছে দেখেন, এই মেয়েটা মামলা করেনি এই লোকটার বিরুদ্ধে,—দাবী করেনি এই লোকের কাছে, কিছুই চায়নি। এই মহত্ত হচ্ছে ভারতীয় ক্ষমা ও মহত্বের লক্ষণ। সে চলে যাচ্ছে হিমালয়ে। সেখানে গিয়ে সে সাধ্বী এবং বিবাগী জীবন-যাপন করছে এবং বলছে জীবনকে পুড়ে পুড়ে সে খাঁটি সোনায় পরিণত করছে। আসলে সুনিল এখানে সাধারণ ভারতীয়র মতই এই বিশ^াসে স্থিত যে, নগরের অর্থাৎ কেন্দ্রের লোকের বিশ^াস ও জ্ঞান সবসময় সঠিক এবং প্রান্তের মানুষ (অর্থাৎ মেয়েটি) নগরের মানুষের বিশ^াস ও জ্ঞানের কাছে পরাজিত হয়ে নিজের সর্বনাশ করার জন্যই যেন অপেক্ষা করে বসে থাকে। তারপর সর্বনাশ হয়ে যাওয়ার পর প্রান্তের মানুষ আবার ক্ষমা ও মহত্বের অবতারে পরিণত হয় এবং লোকলজ্জার ভয়ে দেশ ছাড়ে, তবু কোন অভিযোগ করে না।
সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়ের মধ্যে যদি খানিকটা উত্তরউপনিবেশী সচেতনতা থাকতো তাহলে দেখা যেতো ভারতীয় নৈতিকতার জয় হয়েছে এবং এই মেয়েটি চরিত্রহীন লোকটাকে অনৈতিক প্রস্তাব দেয়ার অপরাধে জুতিয়ে হাসপাতাল থেকে বের করে দিয়েছে। কিংবা দুর্ঘটনা যদি ঘটেও যায়, তাহলে পরে মামলা করে ওকে জেল খাটাচ্ছে। কিন্তু বইয়ে এমনটা হয়নি। কারণ সুনিল অসচেতনভাবে সারাজীবন উপনিবেশী শিক্ষা ও বিশ^াসই গ্রহণ করেছেন। ফলে তার কাছে মনে হয়েছে পশ্চিমের মানব ধর্ম ফুসলিয়ে যৌনকর্ম করার জন্য ব্যবহৃত হতেই পারে, তাতে মানবধর্মের মূল্য কিছই কমে না। আর দশজনের মত সুনিল ছোটবেলা থেকেই শিখেছেন পশ্চিমা বিশে^র দর্শনই বড়, ভারতীয় নৈতিকতা ও ধর্ম কুসংস্কার মাত্র। সেটারই প্রমান দিয়েছেন তিনি এই উপন্যাসে।

শাপলা সপর্যিতা: আমি দেখেছি আপনি আপনার কবিতায় আমাদের মুখের ভাষাকে সাবলীলভাবে ব্যবহার করেন। আপনার এই কাব্যভাষা সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।
ফয়েজ আলম: আমি কবিতায় যে-ভাষা ব্যবহার করি সেটাকে বলা যায় মান কথ্যবাংলা। মান কথ্যবাংলা বলতে আমি বোঝাচ্ছি আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষেরা পরস্পরের সাথে কথা বলতে গিয়ে যে ভাষা ব্যবহার করি সেইটা। আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন গত শতক পর্যন্ত বাংলা কবিতার ভাষা তিরিশের কাব্যভাষা থেকে খুব একটা আগায়নি। বরং কবিতায় আরো কিছু সংকট তৈরি হয়েছে। যেমন কবিতায় পারম্পর্যবিহীন একের পর এক চিত্রকল্প সাজিয়ে চিত্রকল্পের কোলাজ তৈরি করা হচ্ছে, ফলে পাঠকের মনে কোন সামগ্রিক সংবেদনা তৈরি হয় না। কেউ কেউ ব্যঙ্গাত্মক ভাষার মধ্যেই কবিতা শেষ করে ফেলছেন। নতুনরা আরো একধাপ এগিয়ে বৈসাদৃশমূলক উপমা টেনে ভাষিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন কাব্যভাষাকে, যেটাকে আবার পরাবাস্তবতার লেবাস দিয়ে জায়েজ করার চেষ্টা আছে। তো এভাবে আামদের কাব্যভাষার সাথে কবিতার পাঠকদের বিস্তর দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আমার মনে হয়েছে মান কথ্যবাংলায় কবিতা লেখা উচিত। তাহলে পাঠকদের সাথে দূরত্ব যেমন কমবে, তেমনি মানকথ্য বাংলা আমার প্রতিদিনের ভাব প্রকাশের ভাষা বলে এ ভাষায় আমার আবেগ অনুভূতির প্রকাশও সহজ ও সাবলীল হবে। আমার সাম্প্রতিক কবিতার বই ‘জলছাপে লেখা’ প্রকাশিত হওয়ার পর এ বিশ^াস আমার আরো শক্ত হয়েছে। আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন প্রচলিত কাব্য ভাষা থেকে অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, কেউ কেউ আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লিখছেন। এসবই ইঙ্গিত করে তিরিশের কাব্যভাষা বহুব্যবহৃত, এর ছালচামড়া উঠে গেছে। আমাদের পরিবর্তিত সময়ের ভাব প্রকাশের জন্য একটি নতুন কাব্যভাষা দরকার।

শাপলা সপর্যিতা: ভাষার সাথে দূরত্ব তৈরি হলে যে শিকড়ের সাথেও দূরত্ব তৈরি হয় তার প্রমাণস্বরূপ আপনি একটি ছড়ার উল্লেখ করেছেন যেখানে একটি ছেলে ফারসি ভাষা শিখে বাড়িতে এসে মায়ের সাথেও ফারসিতে কথা বলে। তো একবার গলায় খাবার আটকে গেলে সে ‘আব আব’ বলে মায়ের কাছে পানি চায়। মা জানেন না যে ‘আব’ অর্থ পানি। পানির অভাবে ছেলেটি মারা যায়। এই গল্পের নৈতিক কথাটা হলো ভাষায সাথে দূরত্ব তৈরি হলে তার আশপাশের সাথেও বিচ্ছেদ দেখা দেয়। এ প্রসঙ্গে মাইকেল মাইকেল মধুসূধন দত্তের কথা শুনতে চাইবো আমরা কাছে। আমরা যারা সাহিত্য পড়েছি তারা সবাই জানি, বাংলাকে কতটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, কত অবহেলা করে ইংরেজ কবি হতে চেয়েছিলেন তিনি। এ জন্য তিনি খৃষ্টান ধর্ম গ্রহন করেছিলেন। নিজের ধর্মকে, নিজের দেশকে, নিজের ভাষাকে ছোট করে চলে গিয়েছিলেন বিদেশে। কিন্তু তিনিই আবার ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্য রচনা করলেন, যেটা আমাদের সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদায় আসীন।
ফয়েজ আলম: আমি বুঝতে পেরেছি আপনি কোন অংশ নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন।

শাপলা সপর্যিতা: আপনিক কি মেঘনাদবধ থেকে খানিকটা পড়ে শোনাবেন। তারপর আলোচনাটা শুরু করি।
ফয়েজ আলম: মাইকেল মধুসূদন দত্ত উপনিবেশের আদর্শ শিকারের নমুনা। তার মধ্যে তীব্র আকর্ষন তৈরি হয়েছিল ইংরেজের প্রতি। পারলে গায়ের চামড়া বদলে সাদা চামড়া লাগিয়ে ইংরেজ হওয়ার চেষ্টা তিনি করতেন। তিনি ইংরেজিতে কথা বলতেন। ইংরেজরা যা করে তাই করতেন। তিনি নামকরা এক জমিদারের ছেলে ছিলেন। দেশীয় জমিদার-অভিজাত পরিবারের মেয়েদের তিনি বিয়ে করলেন না। উনি সাদা চামড়ার মেয়েদের বিয়ে করতে চাইলেন। কিন্তু সাদা চামড়াতো নেটিভদের ঘৃনা করে, মেয়ে বিয়ে দেয়ার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু তিনি সাদা চামড়ায় এতটাই মোহগ্রস্থ ছিলেন যে, শেষে এতিম খানার একটি মেয়েকে বিয়ে করলেন। আমাদের সমাজে আমরা এতিমখানার মেয়েদের নিকৃষ্ট চোখে দেখি না, কিন্তু ওরা এতিমখানার মেয়েদের নিচু চোখে দেখে। সেই মেয়ে মারা যাওয়ার পর আবার একটা এতিম সাদা মেয়ে বিয়ে করলেন তিনি। তারপর ফ্রান্সে চলে গিয়েছিলেন ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করার জন্য । ওখানে না খেয়ে মরতে বসেছিলেন । এ অবস্থায় বিদ্যাসাগর ও অন্যান্যরা মিলে আর্থিক সাহায্য দিয়ে তাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। মেকলে উপনিবেশ টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দেশীয়দের মধ্য থেকে যে ধরণের দাসশ্রেণী তৈরি করতে চেয়েছিলেন মধুসূদন তার আদর্শ নমুনা।
তো এই মধুসূদন লেখলেন ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্য। বাংলা সাহিত্যে এর বিশাল মর্যাদা। কারণ ওখানে রাবনকে বড় এবং রামকে ছোট করে দেখানো হয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি এটি মধুসূদনের দেশ প্রেমের পরিচয় নয়, নিজের জাতকে, ভাষাকে আর সংস্কৃতিকে যে সারাজীবন ঘৃণা করেছে তার আবার দেশপ্রেম কি! এটি আসলে ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাবের ফল। বিশেষত হোমারের ‘ইলিয়াড’ এবং মিল্টনের প্যারাডাইস লস্ট’-এর অনুসরণে তিনি দেবতা রামকে খাটো করে রাবনকে মহত ও বীর হিসাবে দেখালেন। এটাকে দীর্ঘদিন ধরে তার দেশপ্রেম হিসাবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। আরেকটা বিষয় বলি, এই মেঘনাদবধ কাব্যে তিনি যে ভাষা উপহার দিলেন সেটাকে আমি পুরোপুরি বাংলা বলা যৌক্তিক মনে করি না। এরমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হারের শব্দ আছে যেগুলো সাধারণ পাঠক অভিধানের সহায়তা ছাড়া বুঝতে পারবেন না। আমি কয়েকটা লাইন পড়ি:

“এতক্ষণে”, অরিন্দম কহিলা বিষাদে
“জানিনু কেমনে আসি লক্ষণ পশিলা
রক্ষঃপুরে ! হায়, তাত, উচিত কি তব
একাজ, নিকষা সতী তোমার জননী,
সহোদর রক্ষশ্রেষ্ঠ ? –শূলী-শম্ভূনিভ
কুম্ভকর্ণ ? তব ভ্রাতৃষ্পুত্র বাসব বিজয়ী ?
নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে ?
চন্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে ?
কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমায়, গুরুজন তুমি
পিতৃতুল্য। ছাড দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে,
পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে,
লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে ।”

অনেক পুরানা স্মৃতি থেকে পড়লাম, জানি না ভুল হয়েছে কি না। আপনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রী। যা পড়লাম তার কয়টা শব্দ আপনি অভিধান ছাড়া বুঝতে পেরেছিলেন? এটাকে আপনি কিভাবে বাংলা ভাষা বলবেন?



বিজ্ঞাপন


শাপলা সপর্যিতা: প্রথম প্রথম অধিকাংশ শব্দই দুর্বোধ্য ঠেকতো আমাদের কাছে।
ফয়েজ আলম: যাইহোক বাংলা ভাষার পিছনের পাঁচশ বছরের যে রীতি-ঐতিহ্য, এবং এরপরের দেড়শ বছরের রূপ- এ দুয়ের মাঝখানে এই ‘মেঘনাধবধ’ একটা অযৌক্তিক বেখাপ্পা চুড়ার মত হয়ে আছে। ঐ সময়ের আরো কিছু কাব্যগ্রন্থও তাই। বঙ্কিমের ভাষাও অত্যন্ত সংস্কৃতবহুল। যারা এই কেতাবী বাংলার সূচনাপর্বে হ্যালহেডের বিবরণমত, খাঁটি দেশী বাংলা শব্দ ও আরবি ফারসি শব্দবহুল সাধারণ সহজ বাংলায় লিখতেন তাদেরকে খারিজ করে দেয়া হয়েছে। রামরাম বসু এদের একজন। আমার কাছে মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র অবস্থানটা হচ্ছে এরকম। এটা আপনি জানতে চেয়েছিলেন; তাই বললাম।

শাপলা সপর্যিতা: আপনি তার স্বরস্বতী বন্দনার কথা উল্লেখ করেছেন।
ফয়েজ আলম: হ্যাঁ, মধুসূদন ’স্বরস্বতী বন্দনা’ দিয়ে কাব্য শুরু করেছেন। এটা একেবারেই আবার বাঙালি ঐতিহ্য। মধ্যযুগের বাংলা কাব্যের সাধারণ প্রবণতা হলো স্বরস্বতী/পীরমুর্শিদের বন্দনা দিয়ে কাব্য শুরু করা। আমি দেখিয়েছি মনে প্রাণে ইংরেজ হওয়ার চেষ্টা সত্ত্বেও মধুসূদন নিজের অজান্তেই দেশীয় ঐতিহ্যের একটা প্রবণতা তুলে ধরেছেন।

শাপলা সপর্যিতা: আচ্ছা। ঐযে রবীন্দ্রনাথের জীবন দেবতা, একই ভাবেই তো?
ফয়েজ আলম: রবীন্দ্রনাথও কিন্তু ইংরেজদের খুব প্রশংসা করেছেন। উনি ইউরোপকে বলেছেন পুরুষ আর প্রাচ্যকে বলেছেন প্রকৃতি। পুরুষের স্পর্শে প্রাচ্য ফলবতী হয়েছে। আপনি বুঝতেই পারছেন উপমাটা কোন দিকে যাচ্ছে। এগুলো নিয়ে আমাদের লজ্জা পাওয়া উচিত। এইগুলো হলো বাঙালির দুঃখের কথা, বেদনার কথা। আমি জানিনা অন্যরা এটা অনুভব করে কি না। পশ্চিমকে পুরুষ ভাবতে হবে; পশ্চিমের সংস্পর্শে এসে প্রাচ্যকে পূর্ণ হয়ে উঠতে হবে; আমি জানিনা এটা কি মনোবৃত্তি প্রকাশ। যাইহোক, এটা অনেকের মধ্যেই ছিল। তারা ইংরেজের সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন, নৈতিকতার আলোকে অনুগত দাস অনুদাসে পরিণত হয়েছেন। তবে আমরা আশাবাদী। এই যে এখানে আলোচনা করছি নিশ্চয়ই কিছু মানুষ নতুন করে উদ্ভুদ্ধ হতেও পারেন, কিছু লোকের মনে হয়ত এই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, কেন আমি আমার নিজ দেশ, জাতি এবং ঐতিহ্যকে বড় করে দেখছি না।

শাপলা সপর্যিতা: আমরা অনুষ্ঠানের প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমার আর একটা প্রশ্ন আছে, সেটা দিয়ে শেষ করতে চাই। সেটা হচ্ছে, আপনি যেটাকে বলছেন মান কথ্যবাংলা বা গণমানুষের মুখের ভাষা, আমিও যেটা বুঝি সেইটা নিয়ে নানারকম বিতর্ক হয়। অনেকে এ ভাষার কবিতা পড়ে মন্তব্য করেন যে, এগুলো আঞ্চলিক বাংলায় লেখা কবিতা। আপনার কবিতায়ও বোধহয় কেউ একজন লিখলেন যে, এটা আঞ্চলিক ভাষায় লেখা চমৎকার প্রকাশ। আসলে আঞ্চলিক ভাষা এবং মান কথ্যভাষায় একটা উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যটা সম্পর্কে আপনি যদি একটু পরিস্কার করে বলেন।
ফয়েজ আলম: একট পেছন থেকে বলি। আপনার হয়ত মনে পড়বে ২০-৩০ বছর আগে নাটকে একটা উদ্ভট ভাষা নিয়ে আসা হয়: আইমু,যাইমু,খাইমু,করছ ক্যা? যাচ ক্যা? এধরনের একটা ভাষা নাটকে ব্যবহার করা হতো আঞ্চলিক ছোঁয়া দেয়ার জন্য। এটাকে সবাই বলতো আঞ্চলিক ভাষা। আমি অনেককে জিজ্ঞাসা করেছি, বলেন তো এটা কোন অঞ্চলের ভাষা? তারা কোন নির্দিষ্ট জবাব দিতে পারেন নাই। এই ভাষা আসলে কোন অঞ্চলের ভাষা নয়। আপনিও সেটা জানেন। যদি বলতেই হয় তাহলে বলতে পারেন যে, এটি ‘নাট্যজগত’ নামক একটি সৃষ্টিশীল অঞ্চলের ভাষা।
মূল প্রসঙ্গে আসি। আমি যে ভাষায় কাব্যচর্চা করি, আগেও বলেছি, এটা কোন অঞ্চলের ভাষা নয়। কিছুদিন আগে ফেসবুকে একজন বললেন, আঞ্চলিক বাংলায় লেখা চমৎকার কবিতা। আমি উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, বলেন তো এটা কোন অঞ্চলের ভাষা? উনি আর জবাব দিতে পারেননি। আমি যেটা বলেছি যে, ঢাকা, সিলেট, চট্রগ্রাম প্রভৃতি বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন উপলক্ষে একসাথে হয়, কথা বলে। প্রাত্যহিক ভাব বিনিময় হয়, সেটা কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষা নয় আবার প্রমিত বাংলাও নয়। আঞ্চলিক ভাষাভাষীরা যখন একত্রিত হচ্ছে বিভিন্ন পরিসরে,কিংবা বিভিন্ন উপলক্ষে তখন ভাববিনিময়ের একটা মান বাংলা ব্যবহৃত হচ্ছে;এটাই হচ্ছে মূলত মান কথ্যবাংলা। বহুযুগ আগেও এটা ছিলো, এখনো আছে। কবিতায় আমি এই ভাষাটাই ব্যবহার করছি। আমি মনে করি এই ভাষার প্রকাশ ক্ষমতা অনেক বেশি। কবিতায় যখন আমি একটা বাক্য এই ভাষায় লিখি আমার মনে হয় অনেককিছু বলতে পেরেছি, যেটা ওই কেতাবী বাংলায় প্রকাশ করা সম্ভব না। অনেকেই প্রশ্ন তোলে যে, এই ভাষায় কি গল্প এবং উপন্যাস রচনা করা সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব, সাম্প্রতিক কালের নাটকে তো এই ভাষা চমৎকার যাচ্ছে। নাটক যেহেতু সংলাপ নির্ভর তাই এই ভাষাই সেখানে যথাযথ।

শাপলা সপর্যিতা: আমরা আলাপচারিতার শেষ পর্যায়ে এসে গেছি। আমরা জানি, আপনি দীর্ঘদিন ধরে উপনিবেশের বৈরি প্রভাব চিহ্নিত করা এবং উত্তরউপনিবেশী সাংস্কৃতিক চৈতন্যের সাহায্যে তা উত্তরণের জন্য কাজ করে চলেছেন। আমি এও জানি লেখালেখি ছাড়াও আপনাকে যেখানেই ডাকা হয় সেখানেই এইসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে যান। তো আপনার এইসব তৎপরতা এবং আজকের আলাপচারিতায় সময় দেয়ার জন্য পাঠক-শ্রোতাসহ সকলের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। (সমাপ্ত)



ভয়েস ওভার LIVE এ প্রচারিত আলাপচারিতাটি এখানে দেখুন:

ভয়েস ওভার LIVE | শাপলা সপর্যিতার সাথে ফয়েজ আলমের আলাপচারিতা


One thought on “আলাপচারিতায় ফয়েজ আলম | শেষ অংশ

Comments are closed.