দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ০৬



এলিফ শাফাক (Turkey: Elif Şafak; English: Elif Shafak) একজন টার্কিশ-বৃটিশ লেখিকা। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ছোটবেলা কাটে মাতৃভূমি তুরস্কে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। ঔপন্যাসিক এলিফকে তুরস্কের সর্বাধিক পঠিত নারী লেখক হিসাবে গণ্য করা হয়। টার্কি ও ইংরেজিতে এ পর্যন্ত এলিফের মোট উনিশটি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার বারটিই উপন্যাস।  ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস THE FORTY RULES OF LOVE প্রকাশের প্রথম মাসে দেড় লক্ষ কপি বিক্রি হয়। বলা হয়ে থাকে, এটিই তুরস্কের কোন লেখকের সর্বাধিক বিক্রিত বই। বিবিসি (BBC) একশটি উপন্যাসকে বাছাই করেছিল, যেগুলো পৃথিবীকে একটা রূপ দেয়, দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ তার মধ্যে অন্যতম।

অকালবোধনের পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি বাংলায় অনুবাদ করছেন কবি, অনুবাদক আকিল মোস্তফা। অনুবাদটি অকালবোধনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।


পূর্বের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


গুরু

বাগদাদ, জানুয়ারি ২৬, ১২৪৩

দরবেশদের এই আশ্রমে থাকতে যে পরিমাণ ধৈর্‍্য্য থাকা দরকার তারও কম থাকার পরও তাবরীজের শামস নয় মাস হতে চলল এখনও আমাদের সাথেই আছেন।
নিয়মনিষ্ঠ জীবনের প্রতি তার স্পষ্ট অবজ্ঞা থাকায় আমিতো ভেবেইছিলাম যে কোনদিন তিনি হয়ত চলে যাবেন। সে হচ্ছে মুক্ত বিহঙ্গের মত বন্য এবং একাকী। আমি খেয়াল করলাম আর দশজনের মতন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, ঘুম থেকে ওঠা, প্রতিদিন একই খাবার খাওয়া এবং অন্যান্য নিয়মগুলোও সবার মতই মেনে চলা তাকে বিরক্ত করছিল। প্রায়ই সন্দেহ হচ্ছিল এই বুঝি পালাল। তার উপযুক্ত সঙ্গী খোঁজার প্রতি তার যে একাগ্রতা তা তার নিঃসঙ্গতাকে খোঁজার অভিপ্রায়ের চেয়ে বরং বেশীই ছিল। শামস দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে এখানে অবস্থান করছিল যে নিশ্চয়ই একদিন আমি তাকে জানাব যা সে খুঁজছে তার জন্য তাকে কখন কোথায় যেতে হবে।
এই নয় মাসে তাকে খুব কাছ থেকে দেখে খুবই বিস্মিত হচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল তার ক্ষেত্রে সময় যেন পাখা মেলে দ্রুত এবং তীব্র গতিতে উড়ে যাচ্ছে। যা শিখতে অন্যান্য দরবেশদের মাস বা কখনও বছরও পার হয়ে যায় তা তার ক্ষেত্রে সপ্তাহ এমনকি দিনও লাগেনা। সে যেন প্রকৃতির এক নিবিড় পর্যযবেক্ষক আর যা কিছু নতুন এবং ব্যাতিক্রম তার প্রতি তার প্রবল উৎসাহ। আমি অনেকদিনই তাকে দেখেছি বাগানে হয়ত কোন মাকড়সার ঘরের প্রশংসায় ব্যস্ত নয়ত ব্যস্ত ফুটিফুটি করা নৈশ ফুলের উপর পড়া শিশিরের ঝলমলে রূপের প্রশংসায়। পুঁথি কিম্বা পুস্তক অপেক্ষা তার কাছে পোকা-মাকড়, গাছ-গাছালি, জন্তু-জানোয়ার অনেক আকর্ষনীয় এবং আগ্রহদ্দীপক বলে মনে হয়। কিন্তু যখনই আমি কেবল ভাবতে শুরু করেছি যে তার বোধহয় পড়ায় আগ্রহ কম তখনই দেখলাম তাকে বহু প্রাচীন এক বইয়ে নিমগ্ন হতে। তারপর আবারও তাকে দেখলাম কোনরকম পড়াশোনা ছাড়াই সপ্তাহের সপ্তাহ পার করে দিতে। এমনধারা হওয়ার কারন জিজ্ঞেস করতেই সে বলল সবারই উচিত আপন বিচক্ষণতায় আস্থা রাখা আর তা থেকে বিচ্যুত না হওয়া। এটাও তারই আরেকটা নিয়ম। সে বলল, “বিচক্ষণতা আর প্রেম দুটো ভিন্ন ধাতুতে গড়া। বিচক্ষণতা দিয়ে বিভিন্ন প্যাঁচে মানুষকে বেঁধে ফেলা যায় কোন বিপদের ভয় ছাড়াই আর প্রেম দূর করে সব জটিলতা পরিণামে বিপদকে আলিঙ্গনে সে মোটেও পিছপা নয়। বিচক্ষণতা সদা সতর্ক থেকে উপদেশ দেয় ‘অতি আনন্দে আত্মহারা হওয়া থেকে সাবধান’ আর ওদিকে প্রেম বলছে ‘উহু, অতকিছু ভেবনা! আনন্দে অবগাহন কর!’ বিচক্ষণতা কখনই সহজে ভাঙ্গবার নয় আর ওদিকে প্রেম সহজেই ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু বহুমূল্য কিছুতো ক্ষুদ্রতেই লুকোন থাকে। আর ভগ্ন হৃদয় হচ্ছে সেই বহুমূল্য কিছুর গোপন আস্তানা।“
তাকে বুঝতে পারার কারণে আমি তার সাহস এবং সূক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে মুগ্ধ হলাম। একইসাথে আমি শামসের এই অকপট সরলতা ও অতুলনীয় মৌলিকতার ক্ষতিকর দিকটা নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়লাম। একটা বিষয় ঠিক সে খুবই একরোখা এবং গোঁয়ার। আমি সবসময় আমার দরবেশদের বলে থাকি কখনই অন্যের দোষ ধরতে যেওনা, যদি কেউ কোন অন্যায় করেও থাকে তবে ক্ষমা কোরো আর চুপ থেক। অথচ শামস কোন ভুল বা অন্যায়কে সহজে ছেড়ে দিবেইনা। যখনই সে কোন অন্যায় দেখত সাথে সাথে সে কাউকে গ্রাহ্য না করেই বলত যা উচিত।তার এই সততা অন্যদেরকে ক্রুদ্ধ করলেও সে তাদেরকে উৎসাহিত করত এটা বুঝাতে যে একমুহূর্তের রাগ কি ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।
তাকে দিয়ে সাধারণ কাজ করানো খুব কঠিন ছিল। এসবে তার ধৈর্‍্য্য যেমন কম ছিল তেমনই কোন কিছু তার বুঝের মধ্যে আসামাত্রই সে তার উপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলত। আর রূটিন্মাফিক কিছু করতে হলেতো কথাই নেই, সে খাঁচায় আটকা বাঘের মত ক্ষ্যাপাটে হয়ে উঠত। যখনই কোন আলোচনা তার কাছে অকারন বা বিরক্তিকর লাগত বা তাতে কেউ বোকার মত কিছু বলত সে তখনই সেখান থেকে উঠে চলে যেত এবং সে কখনই অযথা খোশগল্পে সময় কাটাতনা। মানুষের চোখে যেগুলো খুবই মূল্যবান যেমনঃ নিরাপত্তা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ সেগুলো তার কাছে অনর্থক। কথা বলায় তার অনীহা এমনই তীব্র যে কখনও কখনও দিনের পর দিন কথা না বলেই কাটিয়ে দেয়। এটাও তার আরেকটা নিয়মঃ পৃথিবীর অধিকাংশ ভুলের পেছনে দায়ী হচ্ছে ভাষাগত ত্রুটি এবং ভুল বোঝাবুঝি। মুখের ভাষা দিয়ে কখনই অন্তরের ভাষাকে যাচাই করতে নেই। প্রেমের জগতে আমাদের পরিচিত ভাষা অর্থহীন, শব্দ দিয়ে যা বোঝানো যায়না নীরবতায় তা-ই সহজেই প্রকাশ্য।
ইতোমধ্যে আমি তার কিভাবে ভালো হতে পারে বুঝে গেলাম। আমি অন্তরের ভিতর থেকে বুঝতে পারলাম যখন কারো ভিতরটা নীরবে জ্বলতে থাকে তখন তার নিজেকে যে কোন বিপদে ঠেলে দেয়ার এক প্রবণতা কাজ করে।
দিনশেষ আমাদের নিয়তি একমাত্র খোদার হাতেই নির্ধারিত, একমাত্র তিনিই জানেন কখন কিভাবে আমরা এই পৃথিবী থেকে চলে যাব। ঠিক করলাম আমার দিক থেকে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব শামস’কে এই জাগতিক পৃথিবীর শান্ত-সমাহিত দিকটিতে আত্মস্থ হতে। একটা সময় মনে হতে লাগল হয়ত আমি সফল হব। কিন্তু শীত আসতে না আসতেই বার্তাবাহক অনেক দূর হতে আসা একটা চিঠি আমার হাতে ধরিয়ে দিল।
এই চিঠিটা সব ওলট-পালট করে দিল।



চিঠি

ক্যায়সরি থেকে বাগদাদ, ফেব্রুয়ারি ১২৪৩

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রিয় ভ্রাত বাবা জামান,
খোদার অশেষ শান্তি ও রহমত তোমার উপর বর্ষিত হোক।
শেষবার দেখা হওয়ার পর অনেকদিন গত হতে চলল, আশাকরি সার্বিক মঙ্গলের মধ্যে আছ। বাগদাদের অদূরে দরবেশদের যে আশ্রমটি তুমি গড়ে তুলেছ তার সম্বন্ধে অনেক ভালো কিছু শুনতে পাই যেমন সেখানে তুমি দরবেশদের আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি প্রেম শিক্ষা দাও। তোমার অনুমতি সাপেক্ষে আমি এই চিঠির মাধ্যমে আমার মনের মধ্যে সর্বক্ষণ জুড়ে থাকা কিছু বিশেষ গোপনীয় বিষয়ের অবতারণা করতে চাই।
তোমার নিশ্চয়ই মরহুম সুলতান আলাদিন কায়কোবাদের কঠিন সময়ে সুযোগ্য নেতৃত্বের কথা জানা আছে। তার স্বপ্ন ছিল এমন একটা শহর গড়বার যেখানে কবি, কারূশিল্পী ও দার্শনিকেরা নিশ্চিন্তে তাদের সাধনা করবে ও থাকবে। অনেকের মতেই এটা একটা অসম্ভব স্বপ্ন যা পৃথিবীতে যুদ্ধ ও অশান্তি ছাড়া কিছুই দিবেনা বিশেষত যেখানে ধর্মযোদ্ধা ও মঙ্গোল উভয়ই আছে। সবই আমাদের দেখা হয়েছে যেখানে খ্রিষ্টানরা মারছে মুসলমানদের, খ্রিষ্টানরা মারছে খ্রিষ্টানদের আবার মুসলমানরা মারছে খ্রিষ্টানদের, মুসলমানরা মারছে মুসলমানদের। ধর্মে বর্নে, জাতি ও গোত্রে এমনকি ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ। কিন্তু কায়কোবাদ ছিলেন দৃঢ়চেতা নেতা। স্বপ্নপূরণে তিনি কোনিয়াকে বেছে নিলেন- মহাপ্লাবনের পর জেগে ওঠা প্রথম স্থান।
তোমার জানা আছে কিনা জানিনা বর্তমানে কোনিয়াতে মাওলানা জালাল-আদ-দ্বীন ওরফে রুমি নামে একজন বিজ্ঞ বাস করেন। তার সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। শুধু তা-ই নয় তার সাথে পড়বার, প্রথমে তার শিক্ষক হিসাবে, তার বাবার মৃত্যুর পর তার পরামর্শদাতা হিসাবে এবং অবশেষ বেশ কিছু বছর গত হবার পর তার ছাত্র হিসেবে। বন্ধু, অবাক হবার কিছু নেই আমি আমার ছাত্রের ছাত্র হয়েছিলাম। সে এতটাই বিচক্ষণ ও তীক্ষ্ণধী ছিল যে একটা জায়গা গিয়ে আমার আর তাকে কিচ্ছু শিখানোর ছিলনা উল্টো তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার ছিল। তার বাবাও অত্যন্ত জ্ঞানী ছিলেন কিন্তু রূমির জ্ঞান ছিল তার বাবার থেকেও অনেক উচ্চতর যা অনেক কম বিদ্বানের মধ্যেই থাকে। তার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল ধর্মের গভীরে প্রোথিত তার মূল সত্য ও সৌন্দর্য’কে এমনভাবে বের করে আনা যা আসলে সার্বজনীন ও শাশ্বত।
জেনে রেখ রূমি সম্বন্ধে এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত কোন মতামত নয়। যুবক বয়সে তার সাথে যখন বিখ্যাত ও সূফীসাধক ঔষধ ও সুগন্ধি বিক্রেতা ফরিদ-উদ-দ্বীন আত্তার এর সাক্ষাৎ হল তার সম্বন্ধে আত্তার তখন বলেছিলেন, “এই ছেলেটি একদিন হৃদয়ে খোদাপ্রেমের দরজার সন্ধান দিবে এবং এই প্রেমের দরজার খোঁজ যারা চালাচ্ছে তাদের দিকেই সে তার বাতির ঝলক ছুঁড়ে দেবে।“ তেমনই বিখ্যাত দার্শনিক, লেখক এবং সূফী ইবন আরাবি বালক রূমী’কে তার বাবার পেছন পেছন হেঁটে যেতে দেখে বলেছিলেন, “সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা শেষে বলতে চাই, দেখে মনে হচ্ছে হ্রদের পেছনে অনুগামী এক সাগর!“
মাত্র চব্বিশ বছর বয়সেই রূমী একজন আধ্যাত্মিক নেতা হয়ে উঠল। আজ এই তের বছর পার করে রূমী এখন কোনিয়ার একজন অনুসরনীয় ব্যক্তিত্ব এবং প্রতি শুক্রবার কোনিয়ার আশে-পাশে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষজন ছুটে আসে তার বক্তৃতা শুনতে। আইন, দর্শন, ধর্ম, জোতির্বিদ্যা, ইতিহাস, রসায়ন এবং বীজগণিতে রয়েছে তার অগাধ পাণ্ডিত্য। এরই মধ্যে তার শিষ্যর সংখ্যা দশহাজার হওয়ার সম্ভাবনা। তার অনুসারীরা তার প্রতিটি কথার উপর আস্থা রাখে এবং তাকে ইসলামের নতুন দিনের পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখে যার পক্ষে সম্ভব বিশ্বের না হলেও ইসলামের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অবদান রাখার।
কিন্তু রূমী আমার কাছে সবসময়ই পুত্রবৎ। মৃত্যুকালে আমি তার বাবাকে কথা দিয়েছিলাম সবসময় তার পাশে থাকব। কিন্তু এখন আমার বয়স হয়েছে মৃত্যু দুয়ারে উপস্থিত, আমি চাচ্ছি তাকে একটা সঠিক সঙ্গে যথাস্থানে স্থাপন করে যেতে।
কোন সন্দেহ নেই সে এখন গুরূত্বপূর্ণ ও প্রতিষ্ঠিত একজন, তারপরও আমাকে সে বিশ্বাস করে বলেছে তার ভিতরের অতৃপ্তি আর অসন্তষ্টির কথা। সে তার জীবনে এক গভীর শূন্যতা অনুভব করছে যা তার পরিবার বা শিষ্য কারোদ্বারাই পূর্ণ করা সম্ভব নয়। একদা আমি তাকে বলেছিলাম যে এখনও নবীন বিধায় তাকে দিয়ে অন্যকিছুও সম্ভবনা। তার কাপ কানায় কানায় পূর্ণ এবং এখনই সময় তার মনের দরজা খুলে দেয়ার তবেই না ভালোবাসার আদান-প্রদান সম্ভব। এটা কিভাবে সম্ভব জিজ্ঞেস করতেই আমি তাকে বললাম এজন্য তার এমন একজন সঙ্গীর দরকার হবে যে তার চলার পথের সঙ্গী হয়ে তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে কুরআনের সেই বানী যেখানে বলা হয়েছে, “বিশ্বাসীরা হচ্ছে একে অপরের আয়না।“
বিষয়টা আর আমার সামনে আসতনা আর আমিও সম্পূর্ণই ভুলে গিয়েছিলাম যদি না রূমী আমি কোনিয়া ত্যাগের পূর্বমুহূর্তে আমার কাছে এসে তার বারংবার দেখা একই স্বপ্নের ব্যাপারে আমার মতামত জিজ্ঞেস না করত। সে বলল স্বপ্নে সে একজনকে এখান থেকে অনেক দূরের এক বিশাল ব্যস্ত শহরে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আরবীতে বললে এমনটা দাঁড়ায় যে তাদের পৌঁছানোর মুহূর্তকে স্বাগতম জানাতে ধৈর্‍্য্য ধরে অপেক্ষায় আছে মনোহর সুর্যাস্ত, আর তুঁতগাছে থাকা রেশম গুটিতে সংগোপনে লুক্কায়িত রেশম। তারপরই সে দেখে তার বাড়ির উঠোনে থাকা কুয়োর পাশে লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে সে কাঁদছে।
প্রথমে আমি তার স্বপ্নের পর্বগুলোর অর্থ বুঝতে পারছিলামনা। ঠিক কোনকিছুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণও হচ্ছিলনা। তারপর একদিন একটা রেশমি উত্তরীয় উপহার স্বরূপ পাওয়ার পর আমি স্বপ্নের ধাঁধার সমাধানও হয়ে গেল আর উত্তরও পেয়ে গেলাম। আমার মনে পড়ে গেল রেশম আর রেশমের গুটি দুটোই তোমার কত পছন্দের। তোমার তরীকার চমৎকার দিকগুলো আমার স্মরণে চলে আসল। এবং আমি নিজের কাছেই সিদ্ধান্তে আসতে পারলাম রূমীর স্বপ্নে দেখা জায়গা তোমার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত দরবেশদের আশ্রম ছাড়া অন্যকোথাও নয়। সংক্ষেপে আমার এই চিঠি লেখার কারন তোমায় বলি, আমি অবাক হবনা যদি রূমীর স্বপ্নে দেখা সেই ব্যক্তি তোমার আশ্রমেই এখন থেকে থাকে।
আমি জানিনা সেই ব্যক্তি এখন তোমার ওখানে আছে কিনা। কিন্তু যদি থেকে থাকে তাহলে তোমার হাতেও ছেড়ে দিলাম তাকে তার নিয়তির কথা জানানোর। যদি তোমার এবং আমার পক্ষে সম্ভব হয় খোদার প্রেমের সন্ধানে বহমান দু’টি নদীর স্রোতকে সাক্ষাৎ পাইয়ে একই স্রোতে পরিণত করে খোদার দুই আশিকের মিলন ঘটানোর তবে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব।
এতকিছুর পরও একটা বিষয় তোমার জানা থাকা দরকার, রূমী প্রভাবশালী ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও তারও কিছু সমালোচনা আছে বৈকি। তদুপরি এই দুইজন একজায়গায় হলে কিছু অসন্তষ্টি ও বিরুদ্ধপক্ষ তৈরী হতে পারে যা থেকে হয়ত আমাদের বিবেচনার বাইরেও কোন শ্ত্রু তৈরী হতেও পারে। সঙ্গীর প্রতি মুগ্ধতা হয়ত তার পরিবার এবং নিজস্ব বলয়ের মধ্যেই অসন্তোষ তৈরী করতে পারে। যাকে কেউ প্রকাশ্যেই ভালোবাসে এবং অনেকেই যার প্রশংসা করে সে অনেকেরই হিংসার পাত্র।
এই বিষয়গুলো হয়ত রূমীর সঙ্গীকে ধারণাতীত বিপদে ফেলে দিতে পারে। অন্যভাবে বলা যেতে পারে ভাই তুমি যাকে কোনিয়াতে পাঠাবে হয়ত আর কখনই ফিরে পাবেনা। সুতরাং চিঠির ব্যাপারে রূমীর সেই সঙ্গীর সাথে কথা বলার আগে আমি অনুরোধ করব পুরো বিষয়টা পুনরায় খুব গভীরভাবে ভেবে দেখার।
তোমাকে এমন এক দ্বন্দমুখর অবস্থায় ফেলে দেয়ার জন্য আমি আন্তরিক দুঃখিত। কিন্তু আমরা উভয়েই জানি খোদা কখনই তার বান্দাকে ক্ষমতার অধিক ভার চাপিয়ে দেননা। তোমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম এবং বিশ্বাস নিশ্চয়ই তুমি সঠিক সিদ্ধান্তে সঠিক পদক্ষেপই বেছে নেবে।
সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ সর্বদাই তোমার এবং তোমার দরবেশদের ঘিরে থাকুক এই কামনায়

সাঈদ বুরহান-উদ-দ্বীন
অধ্যক্ষ



শামস

বাগদাদ, ডিসেম্বর ১৮, ১২৪৩ খ্রীঃ

বরফাবৃত রাস্তায় প্রচণ্ড তুষারপাতের মধ্যে একজন বার্তাবাহক দরজায়ে এসে দাঁড়াল। বছরের এই সময়ে কেউ এখানে আসা আর হাতে পাকা আঙুর পাওয়া একই কথা। তাই তাকে দেখে আশ্রমের দরবেশদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শুরু হল। এই তুষারঝরের মধ্যে একজন বার্তাবাহকের আগমন মানে হয় কোন গুরূত্বপূর্ন কিছু ঘটতে যাচ্ছে অথবা এরই মধ্যে মারাত্মক কিছু একটা ঘটে গেছে।
সবাই উৎসুক জানতে গুরূজীর কাছে হস্তান্তর করা চিঠিতে কি আছে। কিন্তু পুরোটা রহস্যে রেখেই গুরূজী চিঠি পড়ে কাউকে কিছু বললেনও না আবার সামণ্য কোন ইঙ্গিতও দিলেননা। উল্টো নিজেকে নির্বিকার রেখে দিনের পর দিন চিন্তার খোলসে আবৃত থেকেও কোন সিদ্ধান্তের কূলকিনারা করতে না পেরে সন্দেহের মোড়কে আবৃত নিজেই নিজের উপর বিরক্ত হয়ে উঠলেন।
ঐ সময়ে আমি বাবা জামানকে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নিছক কৌতূহল থেকে নয় বরং আমি ভিতর থেকে অনুভব করলাম চিঠিটা আমাকে নিয়েই ছিল। কিভাবে বলতে পারবনা কিন্তু অনেক সন্ধ্যা আমি খোদার নিরানব্বইটা নাম তার দিক-নির্দেশনা চেয়ে প্রার্থনায় কাটালাম। প্রত্যেকবারই তার একটা নাম আল-জব্বার বারবার আলাদাভাবে সামনে চলে আসছিল যার অর্থ অনেকটা এমন দাঁড়ায়ঃ অর্থাৎ তিনি যার ইচ্ছা ও অনুমতি ছাড়া েই বিশ্বে কোনকিছুই সংঘটিত হয়না।
ঐ দিনগুলোতে যখন সবাই ইচ্ছেমত উল্টা-পাল্টা ধারনায় ব্যস্ত আমি তখন একাই সময় কাটাচ্ছিলাম বাগানে, আর ভারী তুষারের চাদরে ঢাকা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে। অবশেষ একদিন তামার ঘণ্টিতে শব্দ করে আমাদের সবাইকে ডাকা হল এক গুরূত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত থাকার জন্য। সভার উদ্দেশ্যে খানকায় প্রবেশ করে দেখি নবীন-প্রবীন সকল দরবেশই বড় গোলাকার বৃত্তের মত করে জমায়েত হয়ে আছে। এবং সেই বৃত্তের মাঝে গুরূজী, তাঁর ঠোঁটদুটো স্থির ও দৃষ্টি অনেকটা অনিশ্চিত।
গলাখাঁকারি দিয়ে আওয়াজ পরিষ্কার করে তিইনি বললেন, “বিসমিল্লাহ, তোমরা নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছ ভেবে কেন আমি তোমাদের সবাইকে আজ এখানে ডাকলাম। কোথা থেকে আসল এটাকে গুরুত্ব না দিয়ে আমি আসলে সেদিন আসা চিঠির মূল বিষয় বস্ততে নজর দিতে চাচ্ছি যেটার ভবিষ্যৎ পরিণতি অত্যন্ত গুরুত্ববহ হতে পারে।
বাবা জামান কিছুক্ষণের বিরতি দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। তাকে দেখে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত এবং শুকনো লাগছিল, যেন এই কদিনেই তার বয়স অনেকটাই বেড়ে গেছে। কিন্তু যখন আবার শুরু কররলেন একটা আশাতীত দৃঢ়তায় তার কণ্ঠ পরিপূর্ণ মনে হল।
এখান থেকে খুব বেশী দূরে নয় যেখানে একজন পণ্ডিত ব্যক্তি থাকেন, কবি না বিধায় তার কথাগুলো খুব সরাসরি উপমায় পূর্ণ নয়। যিনি এরই মধ্যে হাজারো জনের কাছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও প্রশংসার পাত্র হলেও তিনি নিজে এখনও প্রেমিক হয়ে উঠতে পারেননি। কারনটা আমার তোমার বোঝারও অনেক উর্দ্ধে, আমাদের েই আশ্রম থেকে একজনকে তার কাছে যেতে হবে তার কাছে সঙ্গী হিসেবে।
মনে হচ্ছিল আমার বুক আমার হার্টকে চেপে ধরছে। ধীরে শ্বাস ফেলতে ফেলতে আমি মনে মনে আমার আরেকটা নিয়ম আওড়ালাম, “একাকীত্ব আর নিঃসঙ্গতা দুটো সম্পূর্ন ভিন্ন জিনিষ। যখন তুমি একা তখন এই বিশ্বাস দিয়ে নিজেকে ভুলানো সহজ যে তুমি ঠিক পথেই আছ। আর নিঃসঙ্গতা আমাদের জন্য ভালো এই কারণে যে এটা আমাদেরকে একাকীত্বের বোধ তৈরী না করেই একা হতে শেখায়। কিন্তু কখনও কখনও উত্তম হচ্ছে তাকে খুঁজে বের করা যে হবে তোমার দর্পন। মনে রেখ শুধু আরেকজনের অন্তরদৃষ্টিই পারে তোমার তুমিকে আর তোমার ভেতরে খোদার উপস্থিতিকে বুঝতে।“
নবীন এক দরবেশ প্রশ্ন করল, “কে সেই বিজ্ঞজন, গুরূজী?”
“আমি শুধু তাকেই নামটা বলব যে তার সঙ্গ পেতে ইচ্ছুক” গুরূজীর উত্তর।
শোনার পর আমি সহ দশজন দরবেশ উত্তেজনা ও অধৈর্য সহকারে হাত তুলল। বাবা জামান হাত তুলে ইশারায় চুপ করতে বলে পুনরায় বলতে শুরু করলেন, “তমাদির সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আরো কিছু বিষয় আছে যা জানা জরুরী।“
এরপরই গুরূজী জানালেন এই যাত্রায় বিপদ ও অভূতপূর্ব কঠিন পরিশ্রমের সাথে পুনরায় ফিরে না আসার সম্ভাবনাও আছে। এই কথা শুনে আমি বাদে আর সবাই হাত নামিয়ে নিল।
বাবা জামান সরাসরি আমার দিকে এই প্রথমবার চোখ তুলে তাকালেন এবং বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়েই থাকলেন। আমি বুঝলাম সে প্রথম থেকেই জানত আমিই এই যাত্রার একমাত্র স্বেচ্ছাসেবক।
“তাবরীজের শামস” মুখে উচ্চারন করে গুরূজী আমার দিকে ধীর দৃষ্টিতে দৃঢ়ভাবে আমার দিকে তাকালেন ভাবটা যেন নামটা তার মুখে খুব ভালোলাগতেছে আর বললেন, “আপনার এই দৃঢ়তা আমার পছন্দের কিন্তু আশ্রমের অতিথি হওয়ার কারনে আপনাকে এই কাজে রাখা যাচ্ছেনা।“
প্রত্যুত্তরে বললাম, “আমার মনে হয়না এটা কোন সমস্যা হতে পারে”
দীর্ঘসময় গুরূজী চুপ করে থাকলেন, সময় যেন যাচ্ছিলইনা। তারপর অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি হেঁটে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং শেষ করলেন এই বলে, “ঠিক আছে শীত শেষে পরবর্তী বসন্ত না আসার আগপর্যন্ত আলোচনার আপাতত এখানেই সমাপ্তি।“
আমার ভিতরটা বিদ্রোহী হয়ে উঠল। আমার বাগদাদে আসার কারণটা জানার পরও মনে হল তিনি যেন আমার কাছে থেকে আমার নিয়তিকে পরিপূর্ণতা দেয়ার সুযোগ ছিনিয়ে নিলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেন গুরূজী? আর অপেক্ষা কেন আমার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই মুহূর্তকে কাছে পাওয়ার পরও? আমি বললাম আমাকে শুধু সেই ব্যক্তিটির নাম আর তার ঠিকানাটা দিন আমি নিজেই পথ চিনে চলে যেতে পারব।“
কিন্তু গুরূজী শীতল কণ্ঠে কড়া ভাষায় এমনভাবে বললেন যেভাবে আমি তার সাথে অভ্যস্তব নই, “এত আলোচনার কিছু নেই। আলোচনা এখানেই সমাপ্ত।”


——–


দীর্ঘ রূক্ষ্ণ শীতের পর আমার ঠোঁটের মতই বাগানও জমে শক্ত হয়ে ছিল। পরের তিনটা মাস আমি কারো সাথে কথা বলাতো দূর একটা শব্দ পর্যন্ত উচ্চারন করিনি। প্রতিদিনই আমি গ্রামের পথে দীর্ঘ ঘোরাঘুরি করতাম দেখার জন্য কোথাও কোন গাছে নতুন পাতা আসল কিনা। কিন্তু মনে হল তুষারের পর তুষার পড়ে যাচ্ছে প্রকৃতিতে কোথাও বসন্তের ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছেনা। বাহিরে ভগ্ন-হৃদয় দেখালেও ভিতরে ভিতরে আশা ও কৃতজ্ঞচিত্ত আমি মনে করলাম আরেকটা নিয়ম, “জীবনে যাই ঘটুক, যত কষ্টই আসুক কখনই আশা করা থেকে মুখ ফেরাতে নেই। যদি সব দরজা বন্ধও হয়ে যায় মনে রেখো খোদা তোমাকে নতুন দরজার সন্ধান দেবেন। একজন সূফী শুধু জীবনে যা পেয়েছে তার জন্যই বরং নয় যে সকল সে হারিয়েছে তার জন্যও কৃতজ্ঞ থাকে।“
অবশেষে একদিন তুষার স্তূপের নীচে থেকে উঁকি দেয়া উজ্জ্বল রং চোখে পড়ল যেন একটা সুমিষ্ট সঙ্গীত। একটা বুনো ঝোপ ছেয়ে আছে ল্যাভেন্ডার ফুলে। আমার হৃদয় আনন্দে ভরে গেল। আনন্দে আমি আশ্রমের দিকে হেঁটে না গিয়ে দৌড়ে গেলাম। সেখানে আদার মত ধুসর চলের নবীন ছেলেটাকে ঘিরে ফূর্তিতে একটা সালাম দিলাম। সে আমাকে এতদিন এমনই বিকট নিশ্চুপ দেখেছে যে বিস্ময়ে তার চোয়াল নীচে ঝুলে পড়ল।
“হাস বালক হাস” চিৎকার করে আমি তাকে বললাম, “বাতাসে কি বসন্তের আগমনী গান শুনতে পাচ্ছনা?”
ঐদিনের পর হতে আশে-পাশে প্রকৃতির দ্রুত ও লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন হতে লাগল। তুষার কণার শেষটুকু অদৃশ্য হতে না হতে গাছে গাছে পাতারা কুড়ি মেলতে লাগল, চড়ুই ও আরো অন্যান্য ছোট ছোট পাখিরা ফিরে এসে ডালে বসে কিচির-মিচির করতে লাগল আর কিছুদিনের মধ্যেই বাতাসে মশলার হাল্কা সুগন্ধ ভেসে বেড়াতে লাগল।
একদিন সকালে আমরা আবার সেই তামার ঘণ্টীর শব্দ পেলাম। আওয়াজ পাওয়ামাত্রই সবার প্রথম আমি প্রধান বড় ঘরটায় পৌঁছে গেলাম। আবার পূর্বের মতই সবাই গুরূজীকে ঘিরে বড় গোলাকার বৃত্তের মত করে বসলাম সেই বিখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি সম্বন্ধে শুনবার জন্য, যে ভালোবাসা ছাড়া আর সব বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান রাখে। আবার কেউ স্বেচ্ছাসেবক হতে রাজি হলনা।
বাবা জামান বাতাসে গর্জনের মতই উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, “যদিও দেখা যাচ্ছে শামসই একমাত্র স্বেচ্ছাসেবক হতে আগ্রহী, তারপরও আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে শরৎ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাই।“
আমি বিস্মিত, বিশ্বাসই হচ্ছিলনা যেখানে আমি উপস্থিত এবং তিন মাসের দীর্ঘ বিরতির পরও তৈরী যাওয়ার জন্য সেখানে গুরূজী আবারও ছয়মাসের জন্য বিরতি নিতে চাচ্ছেন। ভ্রাক্রান্ত হৃদয়ে আমি গুরূজীর সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ ও অসন্তোষ জানিয়ে তাকে আবারও অনুরোধ জানালাম আমাকে সেই ব্যক্তির নাম ও অবস্থান জানানোর জন্য তাহলে আমি নিজের মত করে রওনা দিতে পারি। কিন্তু গুরূজী আবার পূর্বের মতই নিশ্চুপ থাকলেন।
যাইহোক এবার আমার কাছে অপেক্ষা অতটা কঠিন মনে হলনা, কেননা শীত থেকে বসন্ত পর্যন্ত অপেক্ষা সহ্য করা যায়। তার সাথে মিলিত হওয়ার যে বাসনা মনের মধ্যে জ্বলছিল তাকে আমি বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত স্তিমিত করে রাখলাম। বাবা জামানের এই না বলা আমাকে মোটেও কষ্ট দেয়নি। যখন কোন কিছু আমার আত্মাকে জাগ্রত করে তখন আমি লক্ষ্যে আরো অবিচল হয়ে উঠি। এ বিষয়ে আমার আরেকটা নিয়ম, ধৈর্য মানে নীরবে সহ্য করে যাওয়া নয় বরং কোন কিছুর শেষের পরিণতি সম্পর্কে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হওয়া। ধৈর্য তাহলে কি? ধৈর্য হচ্ছে কাঁটার দিকে লক্ষ্য রেখে গোলাপের দিকে তাকানো, ধৈর্য হচ্ছে রাতের দিকে লক্ষ্য রেখে সুর্যাস্তের দিকে তাকানো। আর অধৈর্য হওয়া মানে ফলাফলের স্বরূপ নির্ধারনের যোগ্যতায় অদূরদর্শিতা। খোদার আশিকরা কখনই অধৈর্য হয়না, তারা জানে চন্দ্রের কলা পূর্ণ করতে সময়ের দরকার হয়।
শরত আসতেই তামার সেই ঘণ্টি পুনরায় বেজে উঠল। তাড়াহুড়ো না করে ধীর পায়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে অগ্রসর হলাম, কারন আমার বিশ্বাস ছিল এবার ফলাফল নির্ধারিত দিকেই এগোবে। গুরূজীকে পূর্বের তুলনায় আরো ফ্যাকাসে আর দুর্বল লাগছিল মনে হচ্ছিল তার শরীরে আর কোন শক্তি অবশিষ্ট নেই। এবারও যখন আমার হাতই উত্তোলিত দেখলেন তিনি আমার দিক থেকে আর চোখও সরিয়ে নিলেননা বা প্রসঙ্গ এড়িয়েও গেলেননা। উল্টো আমার দৃঢ়তাকে হাল্কা মাথা নুইয়ে সম্মান জানালেন।
“ঠিক আছে শামস, মেনে নেয়া যায় এই যাত্রায় তুমিই একমাত্র উপযুক্ত লোক। ইনশা আল্লাহ আশা করা যায় কাল খুব সকালে তুমি তোমার গন্তব্যে রওনা করতে পারবে।“
আমি গুরূজীর হাতে চুমু খেলাম। অবশেষে আমি আমার প্রার্থিত সঙ্গীর দেখা পেতে যাচ্ছি। বাবা জামান আমার দিকে তাকিয়ে উষ্ণ এবং চিন্তিত হাসি দিলেন, ঠিক যেভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর আগে পিতা তার পুত্রের দিকে তাকিয়ে হাসে। তিনি তখন তার লম্বা খাঁকি জোব্বার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে খামে আবদ্ধ একটা চিঠি বের করে আমার হাতে দিয়ে নীরবে ঘর ত্যাগ করলেন। সবাই তাকে অনুসরণ করে বের হয়ে গেল। একাকী আমি মোম দিয়ে আটকান চিঠি খুলে ভেতরে সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখিত দুটি পৃথক তথ্যপূর্ণ পত্র পেলাম। শহর ও সেই পণ্ডিত ব্যক্তির নাম। পরিষ্কার হল আমি কোনিয়াতে যাচ্ছি কোন এক রূমী নামের ব্যক্তির সাথে মিলিত হতে।
মনে হল একটা হার্টবিট হারিয়ে ফেললাম। আগে কখনই তার নাম শুনেছি বলে মনে পড়েনা। সবার কাছে সে একজন পরিচিত বিদ্বান হতে পারেন কিন্তু আমার কাছে তিনি একদমই অজানা। আমি তার নামের প্রতিটি অক্ষর একটা একটা করে উচ্চারন করতে লাগলামঃ প্রথমে নির্মল ও শক্তিশালী R, তারপরে মখমলের মত U, তারপর নির্ভীক এবং আত্মবিশ্বাসী M আর অবশেষে রহস্যময় I যার রহস্য এখনও অমীমাংসিত।
পত্র দুটি একত্র করে আমি তার নাম বারবার বলতে লাগলাম যতক্ষণ না তা আমার জ্বিহবাতে সুমিষ্ট মিছরির মতই গলে যায় আর “পানি”, “রুটি” আর “দুধ” এর মতই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।



অনুবাদ করছেন কবি আকিল মোস্তফা


পরবর্তী অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন:



One thought on “দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ০৬

Comments are closed.