দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ০৭



এলিফ শাফাক (Turkey: Elif Şafak; English: Elif Shafak) একজন টার্কিশ-বৃটিশ লেখিকা। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ছোটবেলা কাটে মাতৃভূমি তুরস্কে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। ঔপন্যাসিক এলিফকে তুরস্কের সর্বাধিক পঠিত নারী লেখক হিসাবে গণ্য করা হয়। টার্কি ও ইংরেজিতে এ পর্যন্ত এলিফের মোট উনিশটি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার বারটিই উপন্যাস।  ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস THE FORTY RULES OF LOVE প্রকাশের প্রথম মাসে দেড় লক্ষ কপি বিক্রি হয়। বলা হয়ে থাকে, এটিই তুরস্কের কোন লেখকের সর্বাধিক বিক্রিত বই। বিবিসি (BBC) একশটি উপন্যাসকে বাছাই করেছিল, যেগুলো পৃথিবীকে একটা রূপ দেয়, দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ তার মধ্যে অন্যতম।

অকালবোধনের পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি বাংলায় অনুবাদ করছেন কবি, অনুবাদক আকিল মোস্তফা। অনুবাদটি অকালবোধনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।


পূর্বের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


এলা

নর্দাম্পটন, মে ২২, ২০০৮

পুরাতন হয়ে আসা সাদা তুলতুলে কম্বলের নিচে শুয়ে এলা তার গলায় জমে থাকা তিতকুটে অনুভূতিটা গিলে ফেলল। কয়েকদিনের সীমা অতিক্রান্ত অতিরিক্ত পানাহার এবং দেরী করে ঘুমানোর ফলাফল এগুলো। এরপরও সে নিচে গিয়ে সকলের সকালের নাস্তা তৈরী করে টেবিলে এনে তার দুই যমজ ও স্বামীকে নিয়ে বসল। তার মন-প্রান বিছানায় আর ঘুমের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকলেও সে সমস্ত শক্তি এক করে আগ্রহ নিয়ে তার দুই যমজের স্কুলের কার গাড়ী সবচেয়ে দামী তাই নিয়ে উত্তেজিত আলোচনা শুনছিল।
হঠাৎই মায়ের দিকে ঘুরে কণ্ঠে সন্দেহ আর অভিযোগ নিয়ে অরলি জিজ্ঞাসা করল, “মা অভি বলল, আপু নাকি আর কখনই বাসায় ফিরবেনা, এটা কি সত্য?”
এলা বলল, “খুবই অসত্য, একদমই ঠিকনা। তোমরাতো জানই তোমাদের আপুর সাথে আমার একটু ঝগড়া হয়েছে, কিন্তু আমরা পরস্পরকে প্রচণ্ড ভালোবাসি।“
“এটা কি ঠিক তুমি স্কটকে ফোন করে বলেছ আপুর সাথে সম্পর্ক না রাখতে? অভি ফাজিলের মত হাসি দিয়ে এমনভাবে বলল বুঝাই যাচ্ছে সে তীব্র আনন্দ পাচ্ছে।
এলা চোখ বড় বড় করে তার স্বামীর দিকে তাকালে ডেভিড চোখের ভ্রূ উপরে তুলে দুই হাত নেড়ে বুঝানোর চেষ্টা করল যে এসবের কিচ্ছু তাদের বলেনি বা তার জানানেই তাদেরকে এহব কে বলেছে।
বহুদিনের চর্চায় অভ্যস্ত কতৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে এলা তার সন্তানদের নির্দেশ দিল, “সম্পূর্ণই ভুল কথা। হ্যাঁ, আমি স্কটের সাথে কথা বলেছি সত্য কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাকে তোমাদের বোনকে ত্যাগ করতে বলেছি। বরং বলেছি বিয়ের ব্যাপারে হুড়োহুড়ি না করতে।“
অরলি অত্যন্ত প্রত্যয়ের সাথে জানাল, “সে কখনই বিয়ে করবে না।“
অভি কথার মধ্যেই ফোড়ন কাটল, “আহ, ভাবটা এমন লোকজন যেন তোকে তাদের বউ করার জন্য বসেই আছে।“
এলা যখন তার দুই যমজের একে অপরকে উপহাস করে বলা কথা-বার্তা শুনছিল তখন সে খেয়াল করল কোন কারন ছাড়াই তার মুখে একটা নার্ভাসটাইপ হাসি ঝুলে আছে। বুঝতেই সে তা লুকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সে যখন দরজা পর্যন্ত তাদের এগিয়ে দিল তখন সারাটা দিন ভালো কাটুক এই শুভকামনা জানিয়ে বিদায়ের সময়ও হাসিটা তখনও তার মুখের চামড়ার নিচেই খেলছিল।
শুধুমাত্র আবারো খাবার টেবিলে নিজের চেয়ারে ফিরে এসে জোরে এক ঝাঁকুনি দিয়ে সে ঐ চাপাহাসি থেকে নিজেকে মুক্ত করল। রান্নাঘর দেখে মনে হচ্ছিল ইঁদুরের সেনাবাহিনী এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে। এখানে-সেখানে পড়ে আছে আধ-খাওয়া ডিমের মামলেট, ওটসের অসম্পূর্ন বাটি আর ময়লা করা পানির মগ। আত্মা চাচ্ছিল ঘর ছেড়ে একটু বাইরে যেতে, কিন্তু দুই কাপ কফি ও সাথে মাল্টিভিটামিন সমৃদ্ধ পানিয় খেয়েও নিজেকে বাগানে গিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটা-চলার মত শক্তি সঞ্চয় করতে পারলনা।



বাগান থেকে ফিরে এলা দেখল আনসারিং মেশিনে লাল আলো জ্বলছে-নিভছে। বোতাম চাপতেই তাকে অবাক করে দিয়ে জেনেটের সুরেলা কণ্ঠে ঘর ভরে গেল।
“আম্মু তুমি কি ফোনের আশেপাশে আছ? আমার ধারণা নেই, কেননা থাকলে তুমি আমার ফোন না ধরে থাকতেই পারতেনা।“ কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে সে আবার বলতে লাগল, “আসলে আমি তখন এত রেগে গিয়েছিলাম যে আমি তোমার মুখও পর্যন্ত দেখতে চাচ্ছিলামনা। যা’হোক এখন আমার রাগ পড়ে যাওয়ায় বুঝতে পারছি কাজটা করা ঠিক হবেনা জেনেও তুমি কেন স্কটকে ফোন করেছিলে। আমি আর সেই সময়ের আগেই জন্ম নেয়া অসম্পূর্ণ বাবুটি নই যে আমাকে সর্বক্ষণ চোখে চোখে রাখতে হবে। আমি বড় হয়েছি অতি সতর্ক হয়ে আমাকে চোখে চোখে না রেখে আমাকে আমার মত হতে দাও, ঠিক আছে?”
এলার চোখ জলে ভরে গেল। জেনেটের জন্মের ক্ষণটা এক মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে ভেসে উঠল। বলতে গেলে তার চামড়া ছিল একরকম লাল ও ম্লান, তার ছোট্ট হাতগুলি মুষ্টিবদ্ধ ও একদম স্বচ্ছ ছিল, তার ফুসফুস শ্বাসযন্ত্রের নলের সাথে লাগানো ছিল – এই পৃথিবীর জন্য সে ছিল সম্পূর্ণ অপ্রস্তত। কত রাত এলার বিনিদ্র গেছে তার শ্বাস নেয়ার শব্দ শুনে শুধু এটুকু বোঝার জন্য যে সে এখনও বেঁচে আছে এবং সে এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে।
“আম্মু, আরেকটা ব্যাপার” যেন পরে মাথায় এসেছে, জেনেট যোগ করল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।“
এই অবসরে এলা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আজিজের লেখা সেই ইমেলের কটা মনে করল, সেই ইচ্ছাপূরণ বৃক্ষ তার প্রার্থনা মঞ্জুর করেছে। অন্তত প্রথম অংশটুকু। তাকে ফোন দিয়ে জেনেট তার কাজটুকু করেছে। এবার এলার পালা বাকিটা সম্পন্ন করার। সে তখন জেনেটের মোবাইলে কল দিয়ে জানতে পারল সে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে।
এলা- “তোমার মেসেজ পেয়েছি। আমি অত্যন্ত দুঃখিত সোনা। আমাকে ক্ষমা কোরো।“
সংক্ষিপ্ত বিরতিতে জেনেটের ছোট কিন্তু কাটাকাটা উত্তর’ “না, ঠিক আছে আম্মু।“
এলা- “না, ঠিক হয়নি। তোমার অনুভূতির প্রতি আমার আরো সম্মান দেখান উচিত ছিল।“
“বাদ দেওতো এসব। অতীত নিয়ে আর ঘাঁটানো কি ঠিক হবে?” জেনেট এমনভাবে বলল যেন সে-ই মা আর এলা হচ্ছে তার বিদ্রোহী কন্যা।
এলা- “হ্যাঁ, সোনা, দরকার আছে।“
জেনেট এরপর কিছু বলার আগে তার কঠস্বরকে নামিয়ে নিয়ে আসল যেন সে ভীত যা বলতে চায়, “তুমি পরেরদিন যা বলেছিলে তা আমাকে কিছুটা চিন্তিত করেছিল। মানে বলতে চাচ্ছি, সত্যিই কি তুমি অসুখী?”
এলা যেন একটু দ্রুতই উত্তর দিল, “অবশ্যই না। তিন তিনটে দারুণ সন্তানকে জন্ম দিয়ে আমি কিভাবে অসুখী হতে পারি?”
কিন্তু এই উত্তরে জেনেটকে সন্তষ্ট মনে হলনা, উল্টো সে বলল, “আমি আসলে বলতে চাইছি তুমি কি বাবার ব্যাপারে অসুখী কিনা?”
সত্য এড়িয়ে অন্য কি বলা যায় এলা বুঝতে পারলনা, “তোমার আব্বু এবং আমার বিবাহিত জীবন দীর্ঘদিন হতে চলল। এই দীর্ঘসময়ে সবসময় ভালোবাসা বজায় রাখা কঠিন।“
“বুঝেছি, আম্মু।“জেনেট কেমন অদ্ভুতভাবে বলতেই এলার মধ্যে আবার সেই অনুভূতিটা ফিরে আসল।
জেনেট ফোনটা রাখতেই এলা আবার নিজেকে ভালোবাসার অনুভূতিতে হারিয়ে যেতে দিল। রকিং চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিতে দিতে এলা ভেবে অবাক হল তার জীবনে প্রেম কি আবার ফিরে আসতে পারে, কতটা রূঢ়প্রকৃতি সে নিজেকেই ক্ষত-বিক্ষত করেছে মাত্র। এই উদভ্রান্তভাবে ঘূর্ণায়মান পৃথিবীতে ভালোবাসা তাদের জন্যই যারা তার ছন্দ ও কারন খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের কি হবে যারা অনেক আগেই এই অন্বেষণে হার মেনে গেছে?

যাহোক দিন শেষের আগেই সে আবার আজিজকে লিখতে বসল।

প্রিয় আজিজ (অনুমতি সাপেক্ষে)
উষ্ণ ও প্রীতিময় উত্তরের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ, বিশেষত যখন আমি একটা পারিবারিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। তোমার বিনীত প্রার্থনাতেই হয়ত আমি এবং আমার মেয়ে অবশেষে ঐ বেদনাদায়ক ভুল বোঝাবুঝি থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছি।
একটা বিষয় তুমি ঠিক বলেছিলে, আমি ক্রমাগত দুই বিপরীতধর্মী শান্ত এবং অশান্ত অবস্থার মধ্যে দুলছিলাম। হয় আমি দু’টি ভালোবাসার মানুষের জীবনে অকারন হস্তক্ষেপ করছিলাম অথবা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অসহায় বোধ করছিলাম। কৃতজ্ঞচিত্তে বলতে চাই তুমি যেভাবে বলেছিলে সে অনুযায়ী নিজের হার স্বীকার করে আমি জীবনে কখনই এমন শান্তির দেখা পাইনি। সত্যি বলতে কি আমি মনে করিনা সূফী হওয়ার মত কিছু আমার মাঝে আছে। কিন্তু তোমাকে জানাতে চাই আমি জোরপূর্বক আশা করা ও অকারন হস্তক্ষেপ করা বন্ধ করতেই জেনেট আর আমার মধ্যে পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ বদলে গেল। এজন্য তোমাকে একটা বড়-সড় ধন্যবাদ সাইট চাই। বহুদিন হল খোদার দরজায় আর ধর্ণা দেইনা, জানিওনা উনি সেখানে আদৌ থাকেন কিনা, তবুও আজ তার কাছে তোমার জন্য প্রার্থনা করতে ইচ্ছে করছে। ঈশ, আমি তোমার গল্পের সরাইখানার সেই পরিচালকের মত কথা বলছি? চিন্তা কোরনা, আমি অত খারাপনা। অন্তত এখন পর্যন্ততো না।

নর্দাম্পটন থেকে তোমার বন্ধু
এলা



চিঠি

বাগদাদ থেকে ক্যায়সরি, সেপ্টেম্বর ২৯, ১২৪৩

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

ভাই বুরহান-উদ-দ্বীন
আপনার উপর আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা, আশির্বাদ ও শান্তি বর্ষিত হোক।
আপনার পত্র পেয়ে ভালোলাগল এবং জেনে খুশী হলাম আপনি পূর্বের মতই খোদা প্রেমে মশগুল আছেন। আপনার চিঠি পড়েতো আমার হতবুদ্ধি অবস্থা। আপনি রূমির জন্য যে সঙ্গীর খোঁজ চেয়েছেন আমি তাকে চিনতে পেরেছি শুধু বুঝতে পারছিনা কিভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
দেখুন আপনার চিঠির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ তাবরীজ থেকে আসা শামস নামক এক দরবেশ আমার আশ্রমে এখন আছেন। শামসের বিশ্বাস এই পৃথিবীতে তার আগমন বিশেষ উদ্দেশ্যে বিশেষ একজন আলোকিত মানুষের হৃদয়কে আরো আলোকিত করার জন্যই। এজন্য সে খোদার কাছে না কোন শিষ্য, না কোন ছাত্র বরং একজন সঙ্গীর আবেদন জানায়। একদা সে আমাকে জানায় তার এখানে আগমন কোন সাধারণের জন্য নয় বরং তাদের খোঁজে যে বা যারা পৃথিবীকে সত্যের পথ দেখাবে।
আপনার চিঠি পড়েই আমি বুঝে যাই শামসই সেই ব্যক্তি যাকে আপনি রূমীর সঙ্গী হিসেবে খুঁজছেন। আমি কোন পূর্বধারণা না দিয়েই যাতে সবাই সমান সুযোগ পায়, একত্রে করে জানালাম একজন বিদ্বানের সাথে কাজ করতে হবে যার হৃদয়কে রূহানী আলোয় উন্মুক্ত করা শিখাতে হবে। আরো কিছু প্রার্থী থাকলেও শামসই শেষ পর্যন্ত একমাত্র হয় যে এই কাজে বিপদ আছে জানানোর পরও সিদ্ধান্তে অবিচল থাকে। গত শীত থেকে শুরু করে যতবার এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে ততবারই অর্থাৎ পরবর্তীতে আগত বসন্ত ও শরতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে মাত্র।
আপনি হয়ত একটু অবাকই হচ্ছেন সবকিছু বুঝেও আমি দেরী কেন করলাম। আমি শামসকে পছন্দ করতে শুরু করেছিলাম বিধায় এমন বিপদজনক যাত্রায় সায় দিতে আমাকে অনেক ভাবতে হয়েছে আর শামসের জন্য হৃদয় ব্যথিত হয়ে উঠছিল।
দেখুন শামস কোন সহজ-স্বাভাবিক ব্যক্তি নয়। যাযাবর জীবনে সে অভ্যস্ত হলেও শহুরে জীবনে এবং শহরের মানুষদের সাথে মিশতে গিয়ে সে হয়ত কোন গোলমাল বাঁধিয়ে বসতে পারে। সেজন্য যতটা সম্ভব আমি তার যাত্রাকে বিলম্বিত করতে চেয়েছিলাম।
বিদায়ের আগের দিন সন্ধ্যায় আমার তুঁতবাগানের মাঝে আমি শামসকে সাথে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করছিলাম। জানেনইতো পুরাতন অভ্যাস ত্যাগ করা কঠিন। সূক্ষ্ণ বেদনাদায়ক হলেও বিস্ময়কর রকম মজবুত রেশম যেন ভালোবাসারই আরেক নাম। শামসকে বললাম গুটি থেকে বেরিয়ে আসতে রেশম পোকা নিজের রেশমকে কিভাবে ধ্বংস করে। এজন্যই রেশম চাষীকে আগেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোনটা রাখবে রেশম না রেশমপোকা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদেরকে গুটিতে থাকাকালীন সময়েই রেশমপোকাকে মেরে ফেলতে হয় ভিতরের মূল্যবান রেশম বাঁচাতে। আর এটা করতে গিয়ে শ’য়ে শ’য়ে রেশমপোকা মেরে ফেলতে হয় শুধু একটা রেশমের ওড়না তৈরীতেই।
সন্ধ্যাগুলো শেষ হয়ে আসছিল। এই বৃদ্ধবয়সে বয়ে যাওয়া হিমশীতল বাতাস আমার গায়ে কাঁপন জাগাচ্ছিল। খুব সহজেই আমাকে ঠাণ্ডা পেয়ে বসছিল। কিন্তু এটা ঠাণ্ডা বাতাসের কারণে হচ্ছিলনা, হচ্ছিল কেননা আমি জানতাম আমার বাগানে শামসের হয়ত এটাই শেষবারের মত সময় কাটানো। হয়ত আমাদের আর কখনই দেখা হবেনা, অন্তত এই পৃথিবীতেতো নয়ই। বোধহয় সেও বুঝতে পেরেছিল, তাই তার চোখও ভারাক্রান্ত মনে হল।
ভোরের প্রতূ্ষেই সে এসে আমার হাত চুম্বন করে আশীর্বাদ চাইল। আমিতো তাকে দেখে একদম অবাক, সে তার চুল ও দাড়ি কেটে ফেলেছে। কিন্তু না সে আমাকে বা আমি তাকে এই ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করলাম। বিদায়ের পূর্বে সে বলল ঘটতে যাওয়া আসন্ন ঘটনায় সে আসলে রেশমপোকারই সদৃশ। সে আর রূমী আসলে খোদার স্বর্গীয় ভালোবাসার রেশম আর রেশমপোকা, এখন অপেক্ষা শুধুই উপযুক্ত সময়ের, রেশম বের করে আনার সেই মহেন্দ্রক্ষণের। কিন্তু সত্যি হল রেশমকে বাঁচাতে অবশেষে রেশমপোকাকেই মৃত্যুর আলিঙ্গন নিতে হবে।
অতঃপর সে কোনিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। আল্লাহ তার সহায় হোন। জানি আমি বা আপনি দুজনই ঠিক কাজটাই করেছি, কিন্তু আমার আশ্রমের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দরবেশকে হারানোর বেদনায় আজ আমার হৃদয় দুঃখ ভারাক্রান্ত। এমন একজন হয়ত আমাদের আশ্রম আর কখনই পাবেনা।

অবশেষ বলব আমরা সবাই আল্লাহর জন্যই এবং দিনশেষে তার কাছেই ফিরতে হবে।

আল্লাহ আপনার সব আশা পূর্ণ করুন।

বাবা জামান



অনুবাদ করছেন কবি আকিল মোস্তফা


পরবর্তী অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন: