দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ০৮



এলিফ শাফাক (Turkey: Elif Şafak; English: Elif Shafak) একজন টার্কিশ-বৃটিশ লেখিকা। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ছোটবেলা কাটে মাতৃভূমি তুরস্কে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। ঔপন্যাসিক এলিফকে তুরস্কের সর্বাধিক পঠিত নারী লেখক হিসাবে গণ্য করা হয়। টার্কি ও ইংরেজিতে এ পর্যন্ত এলিফের মোট উনিশটি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার বারটিই উপন্যাস।  ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস THE FORTY RULES OF LOVE প্রকাশের প্রথম মাসে দেড় লক্ষ কপি বিক্রি হয়। বলা হয়ে থাকে, এটিই তুরস্কের কোন লেখকের সর্বাধিক বিক্রিত বই। বিবিসি (BBC) একশটি উপন্যাসকে বাছাই করেছিল, যেগুলো পৃথিবীকে একটা রূপ দেয়, দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ তার মধ্যে অন্যতম।

অকালবোধনের পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি বাংলায় অনুবাদ করছেন কবি, অনুবাদক আকিল মোস্তফা। অনুবাদটি অকালবোধনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।


পূর্বের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


শিক্ষানবীশ

বাগদাদ, সেপ্টেম্বর ২৯, ১২৪৩

দরবেশ হওয়া কোন সহজ কর্ম নয় বলে সতর্ক করলেও সবাই যেটা বলতে ভুলে গিয়েছিল, তা হল এটা হতে চেয়ে আমাকে জাহান্নামের মত কষ্টকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। এখানে আসার পর থেকেই আমি কুকুরের মত শ্রম দিয়ে যাচ্ছি। অধিকাংশ দিনই আমি হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর যখন আমার তোষকে ঘুমানোর জন্য শুই তখন সারাশরীরের ব্যথা আর পায়ের অস্বস্তিতে আমি ঘুমাতে পারিনা। ভেবে অবাক লাগে কেউ দেখেও আমার সাথে এখানে কেমন আচরণ করা হয়। আর যদি দেখেও তাও বোধহয় কারো মাঝে কোন অনুভূতিই হবেনা। যত কঠিন পরিশ্রমই করিনা কেন তাতে ফলাফল এতটুকুও হেরফের হয়না। এমনকি তারা আমার নাম পর্যন্ত বলতে পারবেনা। তারা আমাকে “নতুন শিক্ষার্থী” আর পেছনে “আদা রং চুলের নির্বোধ” বলে ডাকে।
এরমধ্যে সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে রান্নাঘরে বাবুর্চির সাথে কাজ করা। এই মানুষটার হৃদয়টা একটা পাথর। এখানে বাবুর্চি না হয়ে সে বরং রক্তপিপাসু মঙ্গোল সেনাপতি হলেই বেশী মানাত। কাউকে ভালো কিছু বলতে বা একটু হাসতে তাকে কখনও দেখেছি বলে মনেও পড়েনা।
একদিন আমি একজন অগ্রজ দরবেশকে জিজ্ঞেস করলাম সব নতুন শক্ষানবীশকেই কি বাবুর্চির সাথে প্রথমে কাজ করতে হয়। সে একটা মিচকা হহাসি দিয়ে বলল, “না, সবাইকেই নয়। কাউকে কাউকে করতে হয়।“
তাহহলে আমিই কেন? কেন গুরূজী অন্যদের রেখে শুধু আমাকেই এই কষ্টের মধ্যে পাঠাচ্ছেন? অন্যদের থেকে আমার নফসের উপর নিয়ন্ত্রন কম বিধায় তাকে সুশৃঙ্খল করতেই কি রূক্ষ্ণ ব্যবহার?
কাছাকাছি একটা ঝোরা থেকে পানি আনতে প্রতিদিন আমাকে অনেক সকালে উঠে বের হতে হয়। তারপর নাহলেও পঞ্চাশজন দরবেশের জন্য চুলা জ্বেলে রুটি সেঁকতে হয়, নাস্তার শুরুতে দেয়ার জন্য স্যূপ তৈরী করতে হয়। এবং এসব করতে হয় মোটামুটি বাথটাবের মতই বড়সড় একটা চুল্লীতে। এবং ভেবে দেখুন খাওয়া শেষে ময়লা বাসন-কোসন কাকে পরিষ্কার করতে হয়? সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি ঘর মুছি, ময়লা পরিষ্কার করি, সিঁড়ি ধুই, উঠোন ঝাড় দেই, কাঠ কাটি ঘন্টার পর ঘণ্টা হাঁটু আর হাতের পর ভর দিয়ে মেঝের ফাটাফাটা পুরনো তক্তাগুলো ঘষতে থাকি। কমলালেবুর জ্যাম আর ঝাল মশলাদার খাবার, গাজর আর লাউয়ের চাটনি আর তাতে ডিম ফেটানোর উপযোগী লবণ ঠিকঠাকমত হয়েছে কিনা? যদি খালি লবণ কমবেশি কিছু একটা হইছে তাইলে খবরই আছে। বাবুর্চি এক লাথি দিয়ে সব ফেলে দেবে আর আমাকে আবার সব নতুন করে করতে হবে।
এতকিছুর পর আমাকে অন্যান্য সব কাজ করে আরবীতে দোয়া ও নামাজও সম্পন্ন করতে হত। বাবুর্চি আমাকে উচ্চস্বরে পাঠ করতে বলত যাতে সে ভুল উচ্চারন ও ভুলে যাওয়া শব্দ ধরিয়ে দিতে পারে। এভাবে আমি সারাটা দিনই কাজ ও প্রার্থনা আবার প্রার্থনা ও কাজের মধ্যেই কাটিয়ে দিতাম। আমার উপর অত্যাচারী সেই বাবুর্চির দাবি, “যতই নাকি আমি রান্নাঘরের কষ্ট কে সহ্য করতে শিখব তত দ্রুতই আমি পরিপক্ক হয়ে উঠব এবং রান্না শিক্ষা আমার অন্তরকেও তৈরী হতে শেখাবে।“
আমি তাকে তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করলাম, “কিন্তু কতদিন এই পরীক্ষা চলতে থাকবে?”
সে বলল, “একহাজার একদিন। প্রতিদিন রাতে নতুন গল্প নিয়ে সেই শাহজাদী যদি আসতে পারে তবে তুমি কেন পারবানা?”
এটা পাগলের প্রলাপ। আমাকে কি সেই বিশাল মুখের শাহজাদীর মতন লাগে? তাছাড়া সে’তো ভেলভেটের কুশনে বসে ঐ উগ্র রাজকুমারকে পাকা আঙুর খাওয়াতে খাওয়াতে আর ইচ্ছেমত পা নাড়াতে নাড়াতে যতসব উদ্ভট কল্পনাশ্রিত মিথ্যা গল্প বানিয়ে বানিয়ে বলত। এরমধ্যে কি এমন কঠিন পরিশ্রম আছে? যদি আমার কাজের অর্ধেকের দ্বায়িত্বও তাকে দেয়া হত সে এক সপ্তাহও টিকতনা। কেউ গোনে কিনা জানিনা, কিন্তু আমি ঠিকই গুনে রাখছি। আরমাত্র ৬২৪ দিন আছে আমার।
প্রথম চল্লিশ দিন আমাকে এত ছোট্ট ও নিচু একটা ঘরে রাখা হয়েছিল যেখানে না দাঁড়িয়ে না শুয়ে থাকা যায়, উল্টো সারাক্ষণ আমাকে দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে থাকতে হয়েছিল। আমাকে বলা হয়েছিল ক্ষুধা বা স্বস্তি নিবারণের জন্য কিছু লাগলে আমি যেন সিলিং থেকে ঝুলে থাকা সিলভারের ঘণ্টি ধরে খোদার সাহায্যের আশায় নাড়া দেই। সেই ছোট্ট ঘরে আমি ভীত হয়ে পড়ছিলাম অন্ধকার বা একাকীত্বে বা নারীর শরীর নিয়ে খোদার বারণ করা নিষিদ্ধ স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু আমি কখনই ঘণ্টি বাজিয়ে কিছু চাইনি। এটা বলবনা যে আমার অন্যরকম চিন্তা মাথায় আসেনি, কিন্তু যখন সামান্য হাঁটার মতও উপায় থাকেনা তখন অন্যরকম কোন চিন্তায় কিই’বা আসে যায়?
নির্জনতার দিনগুলো পার করে আমাকে বাবুর্চির কাছে পাঠানো হয় নতুনভাবে অত্যাচারিত হওয়ার জন্য। কিন্তু সত্যি হল অত্যাচারিত হলেও সেদিনের সন্ধ্যায় তাবরীজের শামসের আসার পূর্বক্ষণ পর্যন্ত আমি কখনই তার নিয়মের ব্যতিক্রম করিনি। সেই রাতে ফিরে আসার পর আমি বাবুর্চির হাতে জীবনের নিকৃষ্টতম পিটান খাই। সেদিন সে আমার পিঠে একের পর এক কাঠের কঞ্চি ভেঙ্গেছিল। তারপর সে আমার জুতা জোড়া দরজার বাহিরে মুখ করে রেখে বোঝাল এখন আমার এখান থেকে চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। দরবেশদের আশ্রমে এটা একটা নিয়মই বলা যায়, অর্থাৎ তুমি যদি ব্যর্থ হও তারা তোমাকে বের করে দেবেনা বা সরাসরি বলবেওনা তুমি ব্যর্থ বরং তোমাকে নীরবে চলে যাওয়ার সুযোগ দিবে।
“তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমরা তোমাকে দরবেশ বানাতে পারবনা” বলে বাবুর্চি ঘোষণা করল, “গাধাকে পানির কাছে নেয়া সম্ভব কিন্তু যতক্ষণ সে ইচ্ছা না করবে বা না বুঝবে তার এখন পানির দরকার তাকে খাওয়ান সম্ভব না।“
এই কথায় আমাকে হয়ত গাধার সমতুল্যই করা হল। কিন্তু সত্যি বলতে কি তাবরীজের শামস এই আশ্রমে না আসলে আমি হয়ত অনেক আগেই চলে যেতাম। তার প্রতি আমার প্রবল উৎসাহই আমাকে ওখানে থেকে যেতে বাধ্য করল। এর আগে আমি মনে হয়না আমি তার কাউকে কখনও দেখেছি। সে না কাউকে ভয় পায় না কাউকে মানে। এমনকি বাবুর্চি পর্যন্ত তাকে শ্রদ্ধা করে। যদি এই আশ্রমে কেউ আমার আদর্শ হত তবে সেটা শামস তার আকর্ষণক্ষমতা, মর্যাদাবোধ ও অদমনীয় মানসিকতার জন্য। এমনকি বিনয়ী বৃদ্ধ গুরূজীও নয়।
হ্যাঁ, তাবরীজের শামসই আমার আদর্শ। তাকে দেখার পর আমি ঠিক করি আমি কখনই নম্র, মুখচোরা অন্যান্য দরবেশদের মত হবনা। যদি আমি তার সাথে যথেষ্ট এসময় কাটাতে পারতাম, তবে অবশ্যই আমিও তার মতই বিদ্রোহী, বেপরোয়া ও অবিচলিত হতে পারতাম। শরত আসলে পর আমি যখন বুঝতে পারলাম শামস চিরদিনের জন্য আশ্রম ছেড়ে যাচ্ছে, তখন আমি ঠিক করলাম আমিও তার সাথেই চলে যাব।
মন ঠিক করে আমি বাবা জামানের সাথে দেখা করতে গিয়ে দেখলাম প্রদীপের আলোতে তিনি একটি অতি প্রাচীন বই পাঠে নিমগ্ন।
যেন আমাকে দেখে ক্লান্ত হয়ে উদ্বিগ্নভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কি চাও?”
আমি যতটা সম্ভব দ্বিধাহীনভাবে গুরূজীকে বললাম, “গুরুজী আমিও শামসের পথসঙ্গী হতে চাই। দীর্ঘপথে তার একজন সঙ্গীর দরকার হবে।“
সন্দিগ্ধচিত্তে গুরুজী বললেন, “জানতাম’না তুমি শামসকে এতটা পছন্দ কর, না’কি রান্নাঘরের কাজ এড়াতে এখান থেকে সরে পড়তে চাইছ? তোমার পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। এখন চলে গেলে তোমাকে কেউ দরবেশ হিসেবে স্বীকার করতে চাইবেনা।“
জানি কঠিন তবুও সোজাসুজি বলেই ফেললাম, “খুব সম্ভবত শামসের মত একজনের সাথে যাত্রা আমার জন্য একটা পরীক্ষাই হবে।“
গুরূজী চোখ নামিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলেন। তার দীর্ঘ নীরবতায় আমার মনে হচ্ছিল তিনি নিশ্চয়ই আমার কথায় রাগ করে আমাকে এখন বকা-ঝকা করবেন এবং বাবুর্চিকে ডেকে বলবেন আমার উপর ভালো করে একটু চোখ রাখার জন্য। কিন্তু তিনি তা না করে উল্টো মাথা নাড়াতে নাড়াতে আমার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চাইলেন।
“বেটা, খুব সম্ভবত আশ্রমের এই জীবন তোমার জন্য নয়। প্রতি সাতজনে একজনের মধ্যে এমনটা দেখা যায়। আমার মনে হয় তুমি দরবেশ হওয়ার উপযুক্ত নয়। তোমার ভাগ্যকে তাই অন্যকোথাও পরীক্ষা করে দেখা আবশ্যক। ঠিক আছে যদি চাও তবে শামসের সাথে কথা বলে দেখ।“
কথা শেষ করে বাবা জামান বিনয়ী কিন্তু রাগী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আবার তার বইয়ে মনোনিবেশ করলেন।
নিজেকে খুব ক্ষুদ্র ও দুঃখী লাগলেও অদ্ভুতভাবে নিজেকে কেমন মুক্তও লাগছিল।



শামস

বাগদাদ, সেপ্টেম্বর ৩০, ১২৪৩

বাতাসের সাথে যুদ্ধ করে আমি এবং আমার ঘোড়া সূর্য ওঠার আগেই অনেক দূর চলে আসতে পারলাম। যতক্ষণ পর্যন্ত না আশ্রমটাকে তুঁত গাছের ঝাড়ে গোপনে থাকা ছোট্ট একটা পাখির বাসার মত লাগছিল ততক্ষণ আমি ঘোরা থামালামনা। জানি বাবা জামান আমাকে নিয়ে ভাবেন তাই কিছুক্ষণের জন্য তার চিন্তিত মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠে মনের ভেতরটা একটু খচমচ করছিল। যদিও এমনটা ভাবার কোন সত্যিকার কারন খুঁজে পেলামনা যেখানে আমি নিজেই মনের গোপনে থাকা প্রেমের সন্ধানে পথে নেমেছিলাম। ক্ষতি কি হতে পারে এই যাত্রায় আমার জানানেই? আমার দশ নম্বর নিয়মঃ উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম খুব কমই কোন পার্থক্য তৈরী করতে পারে। গন্তব্য নিয়ে ভাববার কিছু নেই, শুধু জেনে রেখ প্রত্যেকটা ভ্রমণের মাঝে থাকে আরেক ভ্রমণ। যদি সেই ভ্রমণ করতে পার তবে এই বিশাল পৃথিবী এবং এর বাইরেও তোমার ঘোরা হয়ে যাবে।
কষ্ট আমার জীবনেরই একটা অংশ, এটা নিয়ে অতটা চিন্তিত নই। কোনিয়াতে আমার ভাগ্যে যাই লেখা থাকুক আমি তৈরী তাকে সাদরে গ্রহণ করতে। একজন সূফী হিসেবে আমি গোলাপের পর কাঁটা, জীবনে কষ্টের পর সুখ কে সহজেই আপন করে নিতে পারায় দীক্ষিত। এই পথের অনুসরণে আমার আরেকট নিয়মঃ ধাত্রী যেমন জানে কোন মায়ের পক্ষেই ব্যাথাহীন সন্তান জন্মদান সম্ভবনা, তেমনই নিজের আমিকে বের করে নিয়ে আসতে হলে অনেক কষ্টও করতে হয়।
মাটি যেমন না পুড়লে শক্ত হয়না তেমনই ব্যাথাহীন প্রেমও খাঁটি হতে পারে না।


————-


বিদায়ের আগের দিন রাতে আমি আশ্রমের সব দরজা জানালা খুলে দিয়েছিলাম যাতে ঘরে অন্ধকারের শব্দ ও ঘ্রাণ দুটোই আসতে পারে। বাতাসে কাঁপতে থাকায় আলোকশিখায় আমি আমার চুল, দাড়ি আর মোছ কেটে, ভ্রূও চেঁছে ফেললাম। চুলের ঘন গোছা মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। এসব শেষ আয়নায় দেখলাম এখন বেশ উজ্জ্বল ও তরুণ লাগছে। কোন চুল না থাকায় আমাকে নামহীন, বয়সের ঠিকানাহীন ও না নারী না পুরুষ লাগছিল। মনে হচ্ছিল আমার না আছে কোন অতীত না ভবিষ্যৎ, যেনবা এই মুহূর্তেই আটকে আছি চিরকাল।
গুরূজীর কাছ থেকে বিদায় নিতে তার ঘরে প্রবেশ করতেই বললেন, “এখনও যাত্রা শুরুই করনি অথচ দেখ তোমাকে কেমন তা পরিবর্তন করে ফেলতে আরম্ভ করেছে।“
নরম স্বরে আমি বললাম, “জ্বী, বুঝতে পারছি। এই বিষয়ে আমার চল্লিশ নিয়মেরই আরেকটাঃ প্রেমের অন্বেষণ আমাদেরকে পরিবর্তন করে ফেলে। এই রাস্তায় এমন কেউ নেই যে একটা সময়ের পর তার পরিবর্তন উপলব্ধি করেনি। যে মুহূর্ত থেকে প্রেমের সন্ধানে নিজকে বিলীন করবা, তখন থেকেই তোমার ভেতরে কি বাহিরে সর্বত্রই পরিবর্তনের পালা শুরু হয় যাবে।“
মৃদু হাসি দিয়ে বাবা জামান আমার হাতে একটা ছোট্ট ভেলভেটের বাক্স ধরিয়ে দিল। ভিতর আমি তিনটি জিনিষ পেলাম এক- একটা সিলভারের আয়না, দুই-একটা রেশমি কাপড়ের রূমাল, তিন- ছোট্ট একটা কাঁচের শিশি ভর্তি মলম।
ভ্রমণে এগুলো কাজে লাগবে, প্রয়োজনে ব্যবহার কর। যদি কখনও নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেল, আয়নার দিকে তাকিয়ো নিজের ভিতরের সৌন্দর্য দেখতে পাবে। এই রূমাল তোমাকে মনে করিয়ে দেবে তোমার অন্তরের শুদ্ধতা আর মলমটা তোমাকে সাহায্য করবে তোমার আঘাত সারাতে সে ভেতরের বা বাহিরের যেখানেই হোকনা কেন।
আমি বাক্সের মধ্যে জিনিষগুলো খুব যত্ন করে রাখলাম। তারপর বাবা জামানকে ধন্যবাদ জানিয়ে আর কিছু বলার না থাকায় বিদায়ের আগে দুজনেই কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেলাম।
সকালের প্রথম আলোতে যখন পাখিরা কিচিরমিচির করতে শুরু করল, ভোরের শিশির পাতায়-পাতায় ডাল-ডালে ঝুলতে লাগল তখন আমি আমার ঘোড়ায় উঠে বসলাম। কোন কিছু না জেনেই শুধু আল্লাহর উপর ভরসা করে অর্থাৎ তিনি কপালে যা লিখে রেখেছেন তার উপর নির্ভর করে, কি হতে পারে তা নিয়ে কোন চিন্তা না করে যাত্রা আরম্ভ করলাম।



অনুবাদ করছেন কবি আকিল মোস্তফা


পরবর্তী অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন:



One thought on “দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ০৮

Comments are closed.