দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ০৯



এলিফ শাফাক (Turkey: Elif Şafak; English: Elif Shafak) একজন টার্কিশ-বৃটিশ লেখিকা। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ছোটবেলা কাটে মাতৃভূমি তুরস্কে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। ঔপন্যাসিক এলিফকে তুরস্কের সর্বাধিক পঠিত নারী লেখক হিসাবে গণ্য করা হয়। টার্কি ও ইংরেজিতে এ পর্যন্ত এলিফের মোট উনিশটি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার বারটিই উপন্যাস।  ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস THE FORTY RULES OF LOVE প্রকাশের প্রথম মাসে দেড় লক্ষ কপি বিক্রি হয়। বলা হয়ে থাকে, এটিই তুরস্কের কোন লেখকের সর্বাধিক বিক্রিত বই। বিবিসি (BBC) একশটি উপন্যাসকে বাছাই করেছিল, যেগুলো পৃথিবীকে একটা রূপ দেয়, দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ তার মধ্যে অন্যতম।

অকালবোধনের পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি বাংলায় অনুবাদ করছেন কবি, অনুবাদক আকিল মোস্তফা। অনুবাদটি অকালবোধনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।


পূর্বের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


শিক্ষানবীশ

বাগদাদ, সেপ্টেম্বর ৩০, ১২৪৩

শামসের পিছনে পিছনে আমি আমার চুরি করা ঘোড়ায় অনুসরণ করতে লাগলাম। সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলাম সে যেন আমাকে দেখতে না পায়, কিন্তু কিছুসময়ের মধ্যেই বুঝে গেলাম এভাবে নিজেকে লুকিয়ে রাখা সম্ভবনা। পথিমধ্যে একটা বাজারে প্রয়োজনীয় কিছু দ্রব্যাদি কিনতে সে থামলে আমি নিজেকে আর গোপনে না রেখে তার সামনে চলে আসলাম।
কিছুটা আমোদিত কিছুটা বিস্মিতভাবে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “আরে, আদা-চুল মূর্খ এই মাঠের মধ্যে শুয়ে তুমি এখানে কি করছ?”
যেমনটা ভিক্ষুকরা করে তেমনই হাঁটু গেড়ে, দুই হাত জড়ো করে, কাঁধটা সামনের দিকে একটু ঝুঁকিয়ে বললাম, “আমি তোমার সাথে থাকার জন্য এসেছি। অনুগ্রহ করে আমাকে তোমার সাথী হওয়ার অনুমতি দাও।“
“তুমি কি জান কোথায় যাচ্ছি?”
আগে কখনও এ ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হইনি বিধায় কিছুটা থেমে উত্তর দিলাম, “না জানিনা, কিন্তু এটা এক্ষেত্রে কোন গুরুত্বও রাখেনা। আপনাকেই আমার আদর্শ মেনে আপনার শিষ্য হওয়ার জন্য এসেছি।“
শামস জানাল, “আমি সবসময় একাই ভ্রমণ করে থাকি এবং কখনই কাউকে আমার শিষ্য বা ছাত্র বানায়নি। ধন্যবাদ। আরে আমি তোমার থেকেও ক্ষুদ্র আমি কারো আদর্শ হবার যোগ্য নই। সুতরাং নিজের রাস্তা দেখ এবং তারপরও যদি ভবিষ্যতের জন্য কাউকে নিজের আদর্শ হিসাবে দেখতে চাও তাহলে এই নিয়মটি স্বর্ণাক্ষরে নিজের অন্তরে লিখে রেখঃ আকাশের তারার চেয়েও বেশী ভুয়া গুরু বা শিক্ষকের দেখা পাওয়া যাবে। এসব স্বার্থপর, ক্ষমতালিপ্সু শিক্ষকের সাথে সঠিক গুরুকে মিলিয়ে ফেলা যাবেনা। প্রকৃত আধ্যাত্মিক গুরু কখনই তার দিকে তোমার মনোযোগ আকর্ষণও করবেনা বা সর্বোচ্চ আনুগত্য বা প্রশংসাও আশা করবেনা। সে যা করবে তাহল তোমার ভেতরের মানুষটার গুণ বের করে তার প্রশংসা করা আর এভাবেই তারমধ্যে আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করা। গুরু হচ্ছে একটা স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাস, যারা নিজের মাঝ দিয়ে খোদার রশ্মিকে প্রবাহিত হতে দেন।“
“আমাকে একটা সুযোগ দাও। সকল ভ্রমণকারীরই পথে একজন সাহায্যকারীর দরকার হয়েই থাকে। সেটা একজন শিক্ষানবিশ বা যাইহোকনা কেন।“ আমি অনুনয়-বিনয় করে বললাম। শামস তার চিবুক জোরে জোরে চুলকাতে চুলকাতে আমার কথায় বাস্তবতাকে স্বীকার করে জিজ্ঞেস করল, “আমার মত একজনের সাহচর্য নেয়ার দৃঢ়তা কি তোমার মধ্যে আছে বলে বিশ্বাস কর?”
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে মাথা নুইয়ে তাকে জানালাম, “নিশ্চয়ই এবং আমি আমার অন্তঃস্থল থেকে তা বিশ্বাস করি।“
“খুব ভালো। তাহলে তোমার প্রথম কাজ হচ্ছে নিকটবর্তী তাঁবুর কাছে যাও, সেখান থেকে এক ঘড়া মদ সংগ্রহ করে এই বাজারে মধ্যে দাঁড়িয়ে তা পান করা।“
এতদিন আমি অভ্যস্ত ছিলাম ন্যাকড়া দিয়ে মেঝে ঘষা কিংবা ভেনিস থেকে আসা কাঁচের মত হাঁড়ি-পাতিল চকচকে করে পলিশ করা যা একবার কনস্ট্যানটানিপোল থেকে ক্রুসেডের সময় পালিয়ে আসা এক কারুশিল্পীর কাছে দেখেছিলাম। আধ্যাত্মিক উন্নতির লক্ষ্যে আমি এক বসায় একশ পেঁয়াজ কেটে কুচিকুচি করে ফেলতে বা একশ রসূনের কোয়া ছাড়িয়ে ফেলতে পারব কিন্তু এই বাজারের মধ্যে দাঁড়িয়ে সবার সামনে মদ খাওয়া আমার ক্ষমতার বাইরে। আমি তার দিকে ভীত হয়ে চাইলাম।
“আমি পারবনা। যদি আমার বাবা জানেন তবে মেরে আমার ঠ্যাং ভেঙ্গে দেবে। আমাকে তিনি দরবেশদের আশ্রমে পাঠিয়েছিলেন একজন ভালো মুসলিম হওয়ার জন্য অধার্মিক হওয়ার জন্য নয়। আমার বন্ধু এবং পরিবার আমার সম্বন্ধে কি ভাববে তাহলে?”
শামসের জ্বলন্ত দৃষ্টির তেজ টের পাচ্ছিলাম এবং দরজার আড়ালে লুকিয়ে সেদিনের মতই গোয়েন্দাগিরি করার সময় যেমনটি কাঁপছিলাম তেমনটাই কাঁপতে আরম্ভ করলাম।
প্রত্যয়ের সাথে সে বলল, “দেখলেতো, তুমি পারলেনা। আমার সাথে চলার জন্য তুমি অনেক ভীরূ। অন্যরা কি ভাবছে তা নিয়ে তুমি অনেকবেশী বিচলিত। কেন কর এমনটা, তা কি জান? কেননা, তুমি অন্যের সমর্থের জন্য মরিয়া। কিন্তু তুমি কখনই তা অর্জন করতে বা তাদের কটূক্তি থেকে বাঁচতে সমর্থ হবেনা তা তুমি যতই কঠিন পরিশ্রম করনা কেন।“
অনুভব করলাম তার সঙ্গী হওয়া আমার হাত হতে ফসকে যাচ্ছে, বিধায় উপায় না দেখে আত্মপক্ষ সমর্থনে বললাম, “কি করে বুঝব আপনার এই প্রশ্নের পেছনে কোন উদ্দেশ্য ছিলনা? ইসলামে মদপান নিষিদ্ধ তাই ভেবেছিলাম আপনি আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন।“
শামস উত্তর দিল, “কিন্তু এটাতো খোদার সাথে খেলা হয়ে গেল। তার প্রতি আমাদের কার ভক্তি ও অনুরাগ কতটুকু তা বিচারের ভার তিনি আমাদেরকে দেননি।“
কি করা উচিত ভেবে না পেয়ে আমি হতাশায় এদিক-সেদিক তাকাতে থাকলাম আর আমার ভিতরটা ময়দা খাস্তা করার মত চিপতে থাকল।
শামস তার করে বলে যেতে থাকলেন, “তুমি ভ্রমণ সঙ্গী হতে চাও অথচ এর বিনিময়ে কোনকিছু ত্যাগ করতে চাওনা। অর্থ, যশ, ক্ষমতা, প্রাচুর্য বা ইন্দ্রিয়সুখ – এর যে কোনটা মানুষের জীবনে পরম আরাধ্য, তা অবশ্যই প্রথমে ত্যাগ করতে হবে।“
ঘোড়ায় মৃদু চাপড় দিয়ে শামস কথার পরিসমাপ্তি টানলেন, “আমার মনে হয় তোমার উচিত হবে বাগদাদে ফিরে পরিবারের সাথে অবস্থান করে একজন সৎ ব্যবসায়ী খুঁজে তার শিষ্য বনে যাওয়া। আমার মনে হচ্ছে একদিন তুমি অনেক নামকরা একজন বনিক হতে পারবে। কিন্তু কখনও লোভী হয়োনা! এখন দয়া করে অনুমতি দাও আমি রওনা করি।“
কথা শেষ হতেই সে শেষবারের মত আমাকে আরেকবার সালাম ঠুকে ঘোড়ায় লাথি মেরে ছোটা শুরু করল, মনে হচ্ছিল তার ঘোড়ার দাবিয়ে চলা ক্ষুরের নিচে সমগ্র পৃথিবীটা পিছলে পিছলে সরে যাচ্ছে। দ্রুত ঘোড়ায় উঠে আমি তাকে বাগদাদের বাহির পর্যন্ত অনুসরণ করতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু দূরত্ব ক্রমশ বেড়ে যেতে যেতে একটা সময় তাকে দূরের একটা কালো বিন্দুর মত লাগছিল। এমনকি কালো বিন্দুটাও যখন দিগন্ত থেকে অপসৃত হল, তখনও মনে হচ্ছিল শামস তার জ্বলন্ত দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।



এলা

নর্দাম্পটন, মে ২৪, ২০০৮

সকালের খাবার সারাদিনের জন্য অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ- এই কথায় দৃঢ় আস্থা রাখা এলার কাছে তাই দিনের প্রথমটা রান্নাঘরে কাটে সে প্রতিদিন সকাল হোক বা সপ্তাহের শুরু কিংবা শেষ। তার বিশ্বাস সকালের একটা ভালো নাস্তা সারাদিনের কাঠামোটা দাঁড় করিয়ে দেয়। সে একবার একটা মহিলাদের ম্যাগাজিনে পড়েছিল যে পরিবারের সবাই সকালের নাস্তা একসাথে করে তাদের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন এবং ঐক্য অনেক শক্তিশালী তাদের থেকে যাদের পরিবারের সদস্যরা সকালের নাস্তার অর্ধেকটা খেয়ে বাসার থেকে বের হয়। যদিও সে দৃঢ়ভাবে এই কথা বিশ্বাস করে কিন্তু তারপরও তার জীবনে এই নিয়মের বাস্তব আনন্দকর অভিজ্ঞতা হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি ঠিক যেমনটা ঐ ম্যাগাজিনে বলেছিল। তার অভিজ্ঞতা হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন গ্যালাক্সির মধ্যের ধুন্ধুমার সংঘর্ষের মত যেখানে তার পরিবারের প্রত্যেক সদস্য যেন ভিন্ন ভিন্ন ড্রামারের পেছনে মার্চপাস্টে ব্যস্ত। এক একজনের সকালের নাস্তারা মেন্যু একেকরকম যা এলার নিয়ম মেনে একসাথে নাস্তার একদম বিপরীত। এইব্যাপারে একতা কিভাবে সম্ভব যখন একজন (জেনেট) খাবে জ্যাম দিয়ে ভাজা পাউরূটি তখন আরেকজন (অভি) খাবেন মধু দিয়ে ওটস মিল, এদিকে তৃতীয়জন ধৈর্য ধরে অপেক্ষায় থাকবেন কখন তাকে দেয়া হবে ডিমের মামলেট তখন চতুর্থজন (অরলি) কিছুই খাবেননা? তবুও সকালের নাস্তা খুবই গুরূত্বপূর্ণ। সে প্রতি সকালেই নিয়ম মেনে নাস্তা তৈরী করে যেন তার কোন সন্তানকে বিস্কিট আর জাঙ্কফুড দিয়ে শুরু করতে না হয়।
কিন্তু আজকের সকালে যখন এলা রান্নাঘরে প্রবেশ করল তখন কফি বা কমলার রসের জুস বা পাউরূটী সেঁকার কাজে মন না দিয়ে প্রথমে টেবিলে বসে তার ল্যাপটপটা খুলল। সে ইন্টারনেটে ঢুকে দেখল আজিজের পক্ষ হতে ইমেইল আছে কিনা। এবং আনন্দিত সে দেখল মেইলটা এসেছে।

প্রিয় এলা
শুনে খুশী হলাম তোমার এবং তোমার মেয়ের মধ্যে অবস্থার কিছু উন্নতি হয়েছে। আমার খবর হল আমি গতকাল খুব ভোরে মমঅসট্যানেঙ্গো ছেড়ে এসেছি। আশ্চর্য হচ্ছি এইভেবে অল্প কয়েকদিন হল এখানে এসেছি অথচ যখন যাওয়ার সময় আসল তখন খুব খারাপ লাগল যেন শোকে মুহ্যমান হয়ে গেলাম। কোনদিন কি আবার দেখা গুয়াতেমালার এই ছোট্ট গ্রামটির সাথে? মনে হয়না।
প্রতিবারই যখন একেকটা জায়গাকে বিদায় জানাই তখন মনে হয় আমি আমার একটা অংশকে পেছনে ফেলে যাচ্ছি। আমার মনে হয় যখন আমরা মার্কোপোলোর মতই ভ্রমণে বের হই কিংবা দোলনা থেকে কবরস্থ হওয়া পর্যন্ত একই জায়গায় থাকি, জীবন আসলে জন্ম আর মৃত্যুর এক নির্দিষ্ট পথ ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমার কি মনে হয়না এটা আসলে জন্ম আর মৃত্যুর সেই ক্ষণ যার মাঝ দিয়ে একটা নতুন জীবন আলোতে আসে আর কোন শুকিয়ে আসা জীবনকে চলে যেতে হয়?
মমঅসট্যানেঙ্গোতে থাকাকালীন আমি তোমার জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর উপর ধ্যানমগ্ন হওয়ার চেষ্টা করলে তিনটি রং আমার মানসচক্ষে ধরা দেয়ঃ উষ্ণ হলুদ, ধীর-শান্ত কমলা এবং গম্ভীর ধাতব বেগুনি। এগুলোকে তোমার রং বলে আমার অনুভব হচ্ছিল। কল্পনা করলাম রংগুলো একত্রে এবং আলাদাভাবে দুইভাবেই চমৎকার লাগছে।
গুয়াতেমালাতে আমার শেষ ভ্রমণস্থান হবে শ্যাজুল- ছোট ছোট ঘরের একটা শহর যার বাচ্চা-কাচ্চাদের চোখগুলো তাদের বয়সের তুলনায় পাকা। সেখানকার সববয়সী মহিলারা রং-বেরংয়ের হাতের কাজ করা বিভিন্ন ডিজাইনের একধরণের চাদর পরিধান করে। আমি দাদু মত একজনকে বললাম আমাকে একটা ট্যাপেস্ট্রি পছন্দ করে দেয়ার জন্য এবং তাকে এও বলেছি যার জন্য নিচ্ছি সে নর্দাম্পটনে থাকে। কিছুক্ষণ চিন্তার পর সে তার পিছনের বিশাল স্তূপ থেকে একটা ট্যাপেস্ট্রি একটানে বের করে দিল। খোদার কসম লাগে বিশ্বাস কর নাহলেও পঞ্চাশটারও বেশী ট্যাপেস্ট্রি থেকে সে যেটা বের করে দিল তা মোটে তিনটা রং- হলুদ, কমলা এবং বেগুনি’র উপর ভিত্তি করে তৈরী। খোদার এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে কত কিছুই যে আছে। আমার মনে হল তুমি হয়ত এই অদ্ভুত মিলের কারন কি হতে পারে জানতে চাইবে।
কখনও কি তোমার মনে হয়নি এই যে আমাদের মধ্যে এই পারস্পরিক আদান-প্রদান সেটাও এক-অর্থে কাকতলীয়ই?

উষ্ণ অভিনন্দন
আজিজ

বিঃদ্রঃ তুমি চাইলে আমি তোমাকে ডাকযোগে পাঠিয়ে দিতে পারি অথবা যদি এক কাপ কফির দাওয়াত দাও তবে আমি নিজেই সশরীরে তোমার ট্যাপেস্ট্রিটা নিয়ে আসতে পারি।

এলা চোখ বন্ধ করে বুঝতে চেষ্টা করল কিভাবে তার জ্যোতিষ্কমণ্ডলী তাকে ঘিরে আছে। অদ্ভুতভাবে সে যখন চোখ বন্ধ করে মনে মনে নিজেকে ভাবতে চেষ্টা করল তখন তার মনের পর্দায় তার যে ছবিটি ভেসে উঠল তা তার উঠতি বয়সের নয় বরং তার সাত বছর বয়সের।
অনেক হারানো দিনের স্মৃতি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল যা সে হয়ত বহু আগেই ভাবতে ভুলে গিয়েছিল। মনে ভেসে ওঠা মায়ের ছবিটা সেই আগের মতই একইরকম, কোমরে ঝুলে থাকা সবুজ-বাদামি রংয়ের অ্যাপ্রোন, হাতে পরিমাপক কাপ, মুখে লেগে থাকা ছাইরংয়া কষ্টের ছাপঃ দেয়ালে ঝুলছে কাগজ কেটে বানানো হৃদয়, উজ্জ্বল এবং ঝিকিমিকি; ছাদ থেকে ঝুলে থাকা তার বাবার শরীর যেন সে নিজেকে উৎসবের অংশ বানাতে গিয়ে ক্রিসমাসের সজ্জায় নিজেকেও অংশীদার করতে চেয়েছে। মনে পড়ে গেল বাবার আত্মহত্যার জন্য মা’কে দায়ী করে তার ছোটবেলাটা কেটে গেছে। তরুণী এলা তখন নিজের সাথে প্রতিজ্ঞা করেছিল সে যখন বিয়ে করবে তখন সে মায়ের মত তার বিবাহিত জীবনটাকে ব্যর্থ হতে দেবেনা বরং সে সবসময় তার স্বামীকে সুখী রাখতে চেষ্টা করবে। তার প্রয়াস থাকবে তার বিবাহিত জীবন যেন কোনমতেই তার মায়ের বিবাহিত জীবনের সদৃশ না হয়। সে নিজের ভেতরের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে বিয়ে করতে চেয়েছিল নামসর্বস্ব ধর্মবিশ্বাসী কোন খ্রিষ্টানকে নয়।
এই অল্প কিছুদিন হল সে তার বয়স হয়ে যাওয়া মাকে আর ঘৃণা করেনা। যদিও তাদের দুজনের সম্পর্ক এখন ভালো তবুও সত্য হল অতীতের কথা মনে আসলে সহজেই তার মন খারাপ হয়ে যায়।

“আম্মু! দুনিয়াতে আস, আম্মু! দুনিয়াতে আস!”
এলা তার ঘাড়ের পেছন থেকে আসা ফিকফিকে হাসির শব্দ শুনতে পেল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল তার দিকে চারজোড়া চোখ খুব আমুদিত ভঙ্গীতে তাকিয়ে আছে। অরলি অভি জ্যানেট আর ডেভিড চারজন একসাথে নাস্তা করতে এসে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তাকে চিড়িয়াখানায় আসা অদ্ভুত কোন জন্তুর মত দেখছে। দেখে মনে হল তারা বেশ কিছুক্ষণ যাবত দাঁড়িয়ে তার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে।
এলা হেসে বলল, “সবাইকে শুভসকাল।“
সত্যি বিস্মিত হয়েছে এই ভঙ্গীতে অরলি জিজ্ঞেস করল, “অবাক ব্যাপার তুমি আমাদের ডাক শুনতে পাওনি?”
ডেভিড তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “ল্যাপটপের স্ক্রিনে তোমাকে গভীরভাবে মগ্ন মনে হল।“
এলার দৃষ্টি তার স্বামীর চোখ অনুসরণ করে সামনেই ল্যাপটপের স্ক্রিনে পড়তেই সে দেখল আজিজ জেড জাহারার মেইলটা তখনও স্ক্রিনে মৃদু আলোয় ভাসছে। তৎক্ষণাৎ শাট ডাউনের অপেক্ষায় না থেকেই সে দ্রুতই ল্যাপটপ স্ক্রিন নামিয়ে বন্ধ করে দিল।
চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে এলা বলল, “লিটারারি এজেন্সির কাজ নিয়ে আমাকে প্রচুর পড়তে হচ্ছে। আমার প্রতিবেদনটা নিয়ে ভালোই কাজ করতে হচ্ছে।“
গুরুগম্ভীরভাবে অভি বলল, “না তুমি তা করছিলেনা। আসল ব্যাপার হচ্ছে তুমি একটা এমেইল পড়ছিলে।“
টিনেজ বালকদের মধ্যে কি কারণে জানি অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করার এক প্রবল আগ্রহ দেখা যায়? ভেবে বিস্মিত হল এলা। যাক তাও ভালো অন্যদেরকে এই বিষয়ে মোটেই আগ্রহী মনে হলনা। আদতে সবার নজর এখন নিবদ্ধ রান্নাঘরের কাউণ্টারের দিকে।
সবার পক্ষ থেকে যেন অরলি বলে উঠল, “আম্মু কি করে সম্ভব তুমি এখনও আমাদের সকালের নাস্তা তৈরী করনি?”
এবার এলা কাউণ্টার টেবিলের দিকে তাকিয়ে বুঝল কেন সবাই সেদিকে তাকিয়ে ছিল। আর দশটা দিনের মত সেখানে ছিলনা কোন ফুটতে থাকা কফি, চুল্লিতে ফেটানো ডিমের মামলেট ও ব্লুবেরী সস লাগানো সেঁকা পাউরুটি। সে বারবার মাথা ঝাঁকাচ্ছিল যেন ভেতর থেকে কে যেন অনস্বীকার্য এক চরম সত্যকে বলছিল আর সে তাতে সায় দিচ্ছিল। সে ভাবল, ঠিকইতো, কিভাবে সকালের নাস্তা বানানোর কথা বেমালুম ভুলে গেল।



অনুবাদ করছেন কবি আকিল মোস্তফা


পরবর্তী অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন:



One thought on “দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ০৯

Comments are closed.

error: Content is protected !!