গল্প | বাবার দীর্ঘশ্বাস ও আমি



আজকের দুনিয়ায় কেউ কাউকে ত্যাজ্যপুত্র করে না। কিন্তু আজ ঘুম থেকে উঠে শুনি, আমার বাবা কোর্টে গিয়ে আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করেছেন। পরশুরাতে ছাত্রহোস্টেলে বান্ধবী ধর্ষণের যে ঘটনা ঘটেছে তার সাথে আমি জড়িত, এই অভিযোগ শুনে তার এতদিনের জমানো রাগে বিস্ফোরণ ঘটেছে। ফলে, জন্মদাতা বাবার এ চরম সিদ্ধান্ত। খোদাতালা আমার বাবার শরীরে এত রাগ কোথা থেকে দিয়েছেন কে জানে? আজকালতো বাবামায়েদের এতো শোধবোধ থাকে না। শহরে তাদের ছেলে কোথায় যায় কী করে এসব নিয়ে তেমন প্রশ্ন টশ্ন করে না, শুধু মাস শেষে তাদের কারও কারও বাড়ি থেকে মেলা টাকা পয়সা চলে আসে। সে টাকায় কেউ নতুন জুতো বা মোবাইল ফোন কেনে, নয়তো ছাত্রী হোস্টেলের সামনে গিয়ে চোখে সানগ্লাস এঁটে দাঁড়িয়ে থাকে। এতে কারোও কিছু এসে না গেলেও ছাত্রীদের কেউ কেউ মাঝেসাঝে চোখ গরম করে তাকায় ওদের দিকে। কিন্তু কিছু বলার সাহস করে উঠতে পারে না।
আমার এতকিছু জানার কথা নয়। কিন্তু জানতে হয়, যখন ব্যাপারটি ছাত্রীদের গায়ের ওড়না নিয়ে টানাটানি পর্যন্ত গড়ায়। এমন কিছু হলে, কেউ কেউ আমার কাছে এসে যখন কাঁদতে কাঁদতে ঘটনাগুলো বলতে থাকে, তখন দুরকমের ব্যাপার ঘটে। তাদের ফ্যাঁচফ্যাচ কান্নায় প্রথমে খুব বিরক্তবোধ করি। পরে বন্ধুদের ডেকে এনে মাফটাফ চাইয়ে দেই। তবে আমি জানি, এজাতীয় ঘটনা আবারও ঘটবে, এবং যথারীতি আবারও একই ধরণের কান্নাকাটি আর মিটমাট করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আমাকে থাকতে হবে। একই পার্টি করা বন্ধুদের এসব ইভটিজিং নিয়ে খুব বেশি এগোনো আমার পক্ষে সম্ভব হয়না, কারণ কেন্দ্রের নেতাদের সঙ্গে এদের দুএকজনের আবার গোপন খাতির থাকে। আমি বাধা দিলে গোপনে গোপনে তারা আবার আমার নামে তাদের কাছে কান ভাঙানি দেয়। ফলে ঢাকায় গিয়ে নিজেকে জবাবদিহি করে আসতে হয়। নিজে যেহেতু এসবের ভেতর থাকিনা, এসব নিয়ে দেনদরবার করতে আর ভাল লাগে না এখন। জেলা শহরের ছাত্রনেতাদের এতো কিছু নিয়ে মাথা ঘামালে চলে?
তবে গতরাতের ঘটনার সময় আমি ছাত্রহোস্টেলের ধারেকাছেও ছিলাম না। এবছর জেলা ছাত্র সন্মেলন হবে। সে উপলক্ষে স্মরণিকা বের হবে। স্মরণিকায় কেন্দ্রীয় নেতাদের বাণী ছাপানো হবে। সেকাজেই আরেক বন্ধুকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়া হয়েছিল। পরে নাইটকোচেই ফিরে এসেছি সকালে। যদিও ঘটনার খবর পাটুরিয়া ফেরিতে ওঠার আগেই পেয়ে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে সারাদিন খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করেছি পুলিশের চোখ এড়িয়ে।
ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, এরা সবাই বয়সে ছোট হলেও আমার ঘনিষ্ট বন্ধু। তাই আমার নামও থানার এজাহারে ঢুকে গেছে। তাই আর সবার সাথে পুলিশও খুঁজে বেড়াচ্ছে আমাকে। পুলিশ গতকাল আমাদের বাসাও একবার ঘুরে গেছে। বাবা জেলার দুঁদে উকিল, হয়তো সেকারণে পুলিশ আর দ্বিতীয়বার বাসায় আসেনি। আমিও রাতে বাড়িতে নির্বিঘেœ ফিরতে পেরেছিলাম, অবশ্যি বাবার চোখ এড়িয়ে।
বাবা অনেক ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। তারপর কোর্টে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের চেম্বারে বসে কাজ করেন। মুহরী কাকা আসেন একটু দেরি করে। তিনি এলে দুজনে কিছুুক্ষণ শলাপরামর্শ করেন। সেসময়টায় কিছু লোকজন আমাদের বাসায় আসে। ঘর থেকে তাদের অস্পষ্ট কথাবার্তা আমি শুনছিলাম শুয়েশুয়ে। বুঝতে পারছিলাম কথাবার্তা আমাকে নিয়েই হচ্ছে। গতকালের সারাদিনের দৌড়াদৌড়ি, ভিকটিম মেয়েটির পরিবারের লোকজনের নানা কথাবার্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। ফলে, সারারাত পুরো ঘুম হয়নি। বারবার নানা দু:স্বপ্ন দেখছিলাম। এভাবেই কেটে গেছে রাত।
বিছানা থেকে উঠে পড়ি। ঘরের দরজা খুলে এসে দাঁড়াই বারান্দায়। বাইরে তখন মধ্য দুপুরের রোদ। সকালে ঘুম থেকে উঠতে যত দেরিই হোক, বাসার কেউই আমার ঘুমে ব্যাঘাত করে না। বারান্দায় দেখি মা দাঁড়িয়ে। উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন আমার দিকে। কিন্তু বরাবর যেটা করেন, ‘এত দেরী করে ঘুম থেকে উঠলি ক্যান, তোদের জীবনে কিছু হইবনা’ এই টাইপের কোনো কথাবার্তায় তিনি আজ আর গেলেন না।
আমি মা’র দিকে তাকাই। অনেকদিন পর খেয়াল করলাম, মায়ের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে গেছে। তার চোখের নিচে কালি, কপালের সামনের চুলগুলো প্রায় সাদা হয়ে এসেছে। মা জানেন, কাল আমি অনেক রাতে বাসায় ফিরেছি। কিন্তু এরকম একটি ঘটনার সাথে আমি জড়িত থাকতে পারি, সেটি তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না। আমিও কিছু বলতে চাইলাম না। জানি কিছু বলতে গেলে মা শুধু নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে বিলাপ করতে থাকবেন।
ঘরে ঢুকে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াই। দেখি চোখ লাল হয়ে রয়েছে। মা ঘরেই টেবিলে নাস্তা রেখে গেছেন। বুঝলাম, বাবা বাসায় রয়েছেন, তাই খাবারঘরে আর তিনি ডাকেন নি আমাকে। যে সন্তানকে তিনি ত্যাজ্য করেছেন, সেই পুত্র বহাল তবিয়তে তার টেবিলে বসে খাওয়াদাওয়া করছে এটা নিশ্চয় তিনি মেনে নেবেন না।
আমি হাতমুখ ধুয়ে খেতে শুরু করি। মা ব্যাপারটা জেনেছেন অথচ বিষয়টা এমন যে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারছেন না। আমি দ্রত খাওয়া শেষ করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাব, দেখি মা ফিরে এসেছেন। তার চোখমুখ আরো শুকনো দেখাচ্ছে। মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু বললাম, মা আমি যাচ্ছি। বাসায় থাকা আর ঠিক হবে না।
হঠাৎ একটু ফোঁপানোর মতো শব্দ হলো। তাকিয়ে দেখি মার চোখমুখ লাল। ঘনঘন নাক টানছেন। এবার একটু বিরক্তি লাগে। বললাম, মা তুমিতো জানো আমি একাজের সাথে ছিলাম না। আমি ঢাকায় ছিলাম। এটা জসিম-বিল্টুদের কাজ।
মা বিছানার ধার ঘেঁষে বসেন। মাথা নিচু করে হাতের আঙ্গুলে শাড়ির খুঁট পেঁচাতে পেঁচাতে বলতে থাকেন- কতবার কইচি, এইসব লাফাঙ্গা পোলাপাইনদের সাথে চলিস না। এখন দেখছস কী হইল? কেউ তোরে বিশ্বাস করব? এখন তোর বাপের মুখের দিকে আমি তাকাইতে পারি না।’ বলে মা আরো ঘনঘন নাক টানতে থাকেন।
আমার রাগ হচ্ছিল। বললাম, তাই বইলা কোনো কিছু না শুইনা বুইঝা বাবা আমারে এইভাবে ঘোষণা দিয়া ত্যাজ্য করব?
মা কোনো কথা বলেন না। আগের মতোই মাথা নিচু করে বসে থাকেন।



২.


শহরের শেষ প্রান্তে নদীঘাট। মাছের আড়ত। আড়তের ব্যবসায়ী সমিতির একটা ঘরে জসিম। আমি ঘরে ঢুকে জসিমকে হঠাৎ চিনতে পারি না। তার চাপদাড়ি ছিল। এখন ক্লিনশেভড মুখ। দাড়ি ফেলে দিয়েছে। চুল উসকো খুশকো। চট করে কেউ তাকে দেখে চিনতে পারবে না। সুবিধেমতো হয়তো কাল এখানে এসে লুকিয়েছে।
আমি ঘরে ঢুকলে জসিম তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দেয়। ঘরের কোণে একটি ব্ল্যাক লেবেলের বোতল। এটা সমিতির অফিসঘর হলেও এখানে কেউ বসে না। পুরো ঘরে হাফইঞ্চি ধূুলো। দেয়ালে মাকড়সার ঝুল। ঘরের আরেককোনে একটি চাটাই বিছানো। একটা তেলচিটচিটে কুশন। বুঝলাম জসিম রাতটা এখানেই কাটিয়েছে। হোস্টেল তো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
আমি চাটাইয়ে গিয়ে বসতেই জসিম হরবড় করে বলতে থাকে, ভাই আমারে বাঁচান। মাইয়াডা হাসপাতালে মারা গেছে।
মাকড়সার জালে একটা পোকা আটকা পড়েছে। হাত-পা ছুড়ে মুক্ত হবার প্রাণপন চেষ্টা করছে ওটা। আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে জসিমের কথা শুনে। ছটফট করতে থাকা পোকাটিকে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করি, খবরটা পেলি কিভাবে?
জসিম সিগারেট ধরিয়েছে। ঘন ঘন টান দিচ্ছে। সিগারেট ধরা তার হাতটি কাঁপছে। ধোঁয়া ছেড়ে বলে, বিল্টু জানায়া গেছে।
বিল্টু কই? ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করি।
শালায় মনে হয় এতক্ষণে বর্ডার ক্রস করসে।
মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। চেঁচিয়ে বলি, শুকরের বাচ্চাটা সবাইরে ডুবায়া ভাগছে আর তুই এইখানে শুয়া শুয়া মাল টানতেছস?
জসিম সিগারেট ফেলে বোতল টেনে আনে। এখনো কিছুটা রয়ে গেছে। সেখান থেকে একটা গ্লাসে ঢেলে বলল, ভাই গলা ভিজান একটু। আমি কি কিছু করসি? শুধু মাইয়াডার হাতপাও একটু চাইপা ধরছিলাম। যা করনের করছে তো বিল্টু আর আব্বাস।’ বলে জসিম হঠাৎ খ্যাক খ্যাক করে হাসতে থাকে।
মেজাজ আর ঠিক রাখা গেলনা। সপাটে চড় কষাই জসিমের গালে- শুয়োরের বাচচ্চা, তোর না একটা বইন আছে। কেমনে এই কাজ করলি? তোর বইনের চেহারাটা একবারও মনে আসে নায় তখন?
চড় খেয়ে জসিমের হাত থেকে বোতল ছিটকে পড়ে। সে নিজেও কিছুুটা টলে যায়। সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে।
আবারও বসে পড়ি চাটাইয়ের ওপর। এরকম একটি বাজে ঘটনায় নিজে জড়িয়ে যাব বুঝতে পারি নি। মেয়েটা মারা গেছে। সে বিল্টুরই বান্ধবী ছিল। আর বিল্টুর বন্ধু হচ্ছি আমি। ঘটনার সময় আমি না থাকলেও আমার নাম এজাহারে উঠে গেছে। পুরো বিষয়টি এখন আদালতে ফয়সালা হবে। মেয়েটি মারা যাওয়াতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হলো।
জসিম চড় খাওয়া গাল ডলতে ডলতে বলে, ভাই, এখন কী করমু? বুদ্ধি দ্যান একটা।’
আমি সোজা হয়ে বসি। জসিমের প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। কেন্দ্রীয় নেতারা ঘটনা জেনে গেছে। বিল্টুকে তো বটেই, জসিম, আব্বাস এবং আমাকেও পার্টি থেকে বহিষ্কার করেছে। স্মরণিকার জন্যে সেই নেতাদের বাণী এখনও আমার ঘরে। বাবা উকিল, তাতে কী? তিনি তো আগেই আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করেছেন। এখন তো যুদ্ধটা নিজের। আবারও উঠে দাঁড়াই।
আমার দিকে তাকিয়ে থাকে জসিম।
জসিমের দিকে নয়, আমার চোখ পড়ে মাকড়সার জালে। দেখি, জাল ছিঁড়ে পোকাটি বেরিয়ে গেছে। মাটিতে উল্টো হয়ে পড়ে থাকলেও এখন ঘুরে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে সেটি।


হামীম ফারুক


error: Content is protected !!