মুক্তগদ্য | প্রকৃতি ও মানুষের গল্পে নস্টালজিয়া অন্যদিন



হৃদয়ে অসুখ নামলে বারান্দায় পা রাখি । পিঠে কোমল বালিশ চেপে বসে পড়ি বেতের চেয়ারে। এক কাপ চা খেতে খেতে শুনি কাজরির গান। বর্ষার বাতাস শরীরকে শীতল করে দেয়। একটা শঙ্খ রঙের চাঁদর জড়িয়ে তাকিয়ে থাকি দূরের আকাশ। অদূরে কৃষ্ণচূড়া গাছটি আমার ন্যায় জ্বলছে। মানুষ মানুষের হৃদয় বুঝেছে এমন শুনিনি কখনো, কিন্তু প্রকৃতি বোঝে। আকাশ তার সমস্ত বৃষ্টি ঢেলে কৃষ্ণচূড়ার লাল আগুন নেভাতে চেষ্টা করে।

পাশেই অর্কিডের টব অযত্নে, অবহেলায় পড়ে আছে। কে জানে তার জন্য এতোটা অদয় হবে। গাছেদের জীবন আছে, এই কথা অনিবার আমার হৃদয়ে হেঁটে চলে। টব তোলে হাত বাড়িয়ে দিলাম বৃষ্টির দিকে। সামনে বাগান, তার ছিটে বেড়ায় কুমড়ো লতা গুলো ডগা ছড়িয়ে ভিজছে। কি কোমলতায় আর সতেজ আমেজ নিয়ে তারা দিন দিন বেড়ে চলছে! কি সুন্দর গাছেদের জীবন..!

সময়ের ঘুলঘুলিতে চোখ যায় সেই প্রাচীন নিমগাছটার দিকে। মানুষের মতো সেইও একদিন সটাং দেহে দাঁড়িয়েছিল অনেকটি সময় ধরে। ক্রমে নিস্তেজ হতে হতে আজ একেবার বুড়ো থুরথুরে। বড্ড মায়া হয় এই সমাজের বুড়ো মানুষগুলো দ্যাখলে। অনেক সন্তানরা তাদের বুড়ো বাপ-মা কে অযত্নে ফেলে রাখে অর্কিডের টব গাছের মতো। ইচ্ছে হলে খেতে দেয়, নইলে দু-চার কথা শুনিয়ে সেখান থেকে চলে যায়। বেচারা বুড়ো প্রহর গুনতে থাকে, কবে অস্ত যাবে তাঁর সময়ের সূর্য।

আমি ইচ্ছে দেবতার কাছে প্রার্থনা করি। রঙে রঙে ভরা জীবনগুলো যেনো আরো একবার ফিরিয়ে দেয় সেসব মানুষদের যারা দুঃখের পারাবারে অতি অল্প সুখ নিয়ে হেসে খেলে জীবন কাটিয়েছে। কে কেড়ে নে সেসব সোনালি দিন? কোন পাড়ার দস্যূ সে? যে এই নব নব মুখরিত জীবনটাকে ম্লান করে দেয়। ঈশ্বর আমার দিক হতে তাঁর মুখ ফিরিয়ে নেয়।

মানুষ কেবল’ই মানুষের আপন হয়ে উঠতে পারে না। ভালবাসলে যে কোনো প্রাণী ও মানুষের আপন হয়ে উঠে। প্রাণীর কথা উঠতেই নস্টালজিয়া আমাকে শৈশবের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। টুপ করে পকেট হতে একটা গোল্ডলিফ সিগারেট নিলাম। চায়ের টেবিল হতে দেশলাইকাঠি নিয়ে যেই আগুন ধরাব কাঠিটা জ্বলছে না। আসলে ঠান্ডা পরিবেশে বারুদের উম চলে গেছে। “সম্পর্ক” ঠিক একি রকম। যদি সম্পর্কে উষ্মতা না থাকে সম্পর্ক বরফের মতো জমে যাবে। কোনরকমে দেশলাই দিয়ে সিগারেটটি ধরালাম। কড়া আমেজে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নস্টালজিয়ায় সন্তরণ করছি।

আমার একটা কুকুর ছিলো। ডাকনাম রোমিও। রোমিও বলে ডাক দিলেই আমার নিকট দৌড়ে চলে আসতো। লেজ নেড়ে নেড়ে সারাদিন পায়ের কাছে ঘুরঘুর করতো। হাত বাড়িয়ে দিলে হ্যান্ডসেক করতো। যখন তার পায়খানা কিংবা পস্রাব করবার সময় হতো সে আওয়াজ করতো। মা বুঝে নিতো। মা তাকে হাত উঁচিয়ে বিলের দিকে যেতে বলতো। রোমিও কতদুর গিয়ে আবার ফিরে তাকাতো। মা বলতো আরো যাও। সে আরও যেতো এবং আবার ফিরে তাকাতো। মা যখন বলতো ঠিক আছে, তখন সে সেখানেই তার কাজ শেষ করতো।

কোনদিন আমার ফেরবার দেরি হলে মুখ তুলে বাতাস ঘ্রাণ করে করে ঘুরে বেড়াত। একদিন বিকেল বেলা আমি বাড়ির দরজায় বসে ছিলাম। সে হাউ মাউ করতে করতে আমার সামনে বসে পড়ল আর গড়াগড়ি করতে লাগল। দ্যাখলাম তার শরীরে দাগ। মৃত্যূর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি পরম যত্নে তাকে কোলে নিলাম, একটু পানি খাওয়ালাম। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে লেজের কুণ্ডলীর মধ্যে নৈরাশ্যকে বেষ্টিত করে কোলের মধ্যে রোমিও মৃত্যূর কোলে ঢলে পড়ল..
আমি আর্তনাদ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম কেন? তার সরল চোখজোড়া আমার দিকে তাকিয়ে রইল। সে কিছু বলতে চেয়েছিল। সে আমাকে নালিশ করতে চেয়েছিল। আমি তার চোখে বিমুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম…

শেষে জানতে পেরেছিলাম রোমিও একটা অটো ট্যাক্সির নিচে চাপা পড়েছিলো। মানুষ মানুষের কাছে ফিরে আসে তখনি, যখন মনে করে সে অসহায় হয়ে পড়েছে। এর আগ অব্দি তারা সকল দাম্ভিকতা নিয়ে সম্পর্ক ছিঁড়ে বাঁচতে চায়। চলতে চায় একা পথে। বরং তার মাঝে রোমিও ছিল ব্যাতিক্রম। পশু আমাদের শেখায়, প্রকৃতি আমাদের শেখায়- কি করে ভালবাসতে হয়…



আদিত্য টিটু


error: Content is protected !!