রহস্য গল্প | বসন্ত বিলাস বোর্ডিং



এক.

সকালবেলা স্কুলে শওকত স্যার এসেই টিচার রুমে রাখা চেয়ারের উপর ধপ করে বসে পড়ল। চোখ দুটো লাল টকটকে, চোয়াল ঝুলে পড়েছে, কপালে চিন্তার ভাঁজের রেখা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে বেশ একটা ঝড় বয়ে গেছে তাঁর উপর দিয়ে।

শওকতের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা কেউই আগে কোনদিন দেখেনি। টিচার রুমের সবাই যেন একটু বিচলিত হয়েছে। শওকত জেলা হাই স্কুলের অংকের শিক্ষক। চমৎকার ব্যক্তিত্ব, ছিপছিপে গড়ন, মুখে হাসি লেগেই থাকে। বলা চলে শওকতের কাছে কেউ এলে, মানে ছাত্র বা শিক্ষক বা যে কেউ এলে তিনি হাসতে হাসতে ফিরে যাবেন। এমনই প্রাণবন্ত মানুষ তিনি। আর সেই তিনিই কিনা এমন উশকো-খুশকো চেহারা নিয়ে স্কুলে এসেছেন।

অবস্থা দেখে বারী স্যার এগিয়ে এলেন। তিনিও এই স্কুলের শিক্ষক, তবে বিজ্ঞান শিক্ষক।

“শওকত ভাই, কী অবস্থা? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? রাতে ঘুম বিশেষ কিছু হয়নি নাকি?”
ওপাশ থেকে ঝর্না ম্যাডাম বলল, “ আ্যই শওকত ভাই, আপনি না গত সপ্তাহে ছুটি নিয়ে শ্যালকের বিয়েতে গেলেন। সেখানে কোন গন্ডগোল?”

শওকতের মুখ শুকিয়ে কাঠ। কোনরকমে খরখরে গলায় বলল, “একটু পানি দিতে পারেন?”
বারী খানিকটা দূরে রাখা জগ থেকে পানি গ্লাসে ঢেলে নিয়ে এসে শওকতের দিকে এগিয়ে দিলেন। ঢকঢক করে গ্লাসের সবচুকু পানি খেয়ে শওকত বলল, “ভূভূ-ত কিনা জানিনা, তবে ব্যাখ্যাতীত এটা বলতে পারি।বাসায় যেতে পারিনি ভয়ে, তাই সোজা স্কুলে চলে এলাম।”
তারপর হঠাৎই বারী স্যারের হাত চেপে ধরে বলল, “ভাই, বিজ্ঞান বলে ভূত নেই। আমিও বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে তাই মানি। কিন্তু এই ঘটনার ব্যাখ্যা না জানলে, আমি শান্তি পাব না। আর যে কয়দিন আপনাদের ভাবী ও বাচ্চারা না ফিরছে, আমি আপনার ওখানে থাকতে পারব?, বারী ভাই। দোহায় লাগে, না বলবেন না।”

বারী সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বলল, “ছি: শওকত ভাই, এ কি বলছেন! অবশ্যই থাকবেন। কিন্তু সবকিছুর আগে, সমস্যাটি খুলে বলেন।”

স্কুলের ২য় পিরিওডের ঘন্টা পড়ে গেল। টিচার রুমের অন্যান্য স্যার ও ম্যাডামরা ক্লাশ নিতে চলে গেল। টিচার্স রুমে এখন শওকত ও বারী মুখোমুখি বসে।

শওকত শুরু করল। গতকাল বিকেলে শ্যালকের শ্বশুরবাড়ী থেকে রওনা দিয়েছি আমাদের বাড়ির উদ্দ্যেশে। বেশি দূর তো না। মোটে ১০০ কিমি রাস্তা। মোটরসাইকেলে ঘন্টা দুই-তিন লাগার কথা। আমি একটা শর্টকার্ট রাস্তার খবর পেয়ে সেদিক দিয়েই আসছিলাম। আপনাদের ভাবী ও বাচ্চারা বলল যে, ওরা কয়েকদিন পর আসবে।
এখন মনে হচ্ছে ওই শর্টকার্ট রাস্তাটাই যত নষ্টের মূল। ওদিক দিয়ে না আসলেই বোধহয় ভাল হত। বারী প্রশ্ন চেপে না রাখতে পেরে জিজ্ঞেস করে বসল, “কেন? ওই শর্টকার্ট রাস্তায় কী সমস্যা?”
শওকত কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় হেডস্যার ঢুকলেন টিচার রুমে। ঢুকেই একটা হেড়ে গলায় ডাক ছাড়লেন, “কী ব্যাপার শওকত? শুনলাম তোমার যেন কী হয়েছে? মুখখানা শুকিয়ে আমসীর মত হয়ে গেছে দেখছি।”

বারী হেডস্যার কে বললেন, “সেইটেই তো শুনতে চাচ্ছি স্যার? শওকত ভাই কী একটা যেন ভূতের কথা বলছিল। তাই না, শওকত ভাই?”

“তবে আর বলছি কি স্যার?” বলেই শওকত একটা ঢোক গিললো।

বারী আবার তাগাদা দিতে লাগলেন, “তো কী অসুবিধা হলো ওই রাস্তায়?”

শওকতের কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিয়েছে। তোতলা তোতলা স্বরে সে বলতে লাগল, “কিছুদূর আসার পর আমি লক্ষ্য করলাম যে আকাশে মেঘ জমেছে। এসময় তো একটু ঘন মেঘের ঘনঘটা ও বৃষ্টি হয়ই। তাই আমি একটু জোরেই মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম মোটরসাইকেলে খুব একটা তেল নেই। তবে সেটা বড় কথা নয়। আমার মনে হলো এই দূর্যোগপূর্ণ সন্ধ্যায় আর না আগানোই ভাল। রাতটা কোনরকমে কোথাও কাটিয়ে দিতে পারলে ভাল হয়। ওদিকে মোবাইলের নেটওয়ার্ক খুব একটা কাজ করছেনা। তাই আমি একটা হোটেল খুঁজতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি আপাদমস্তক কাপড়ে ঢাকা একজন মহিলা দূরে একজায়গায় দাড়িয়ে আমাকে ডাকছে। এমনিতে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। ঘোর অন্ধকার জমাট বেঁধে যাচ্ছে। মোটরসাইকেলের আলোয় খুব ভাল একটা বুঝতে পারলাম না। কাছে এগিয়ে যেতে মহিলাটি বলল, ‘এত রাতে খুব বেশি দূর যেতে পারবেন না। জায়গাটা ভালও না। আমার একটা হোটেল আছে। খুব বড়সড় হোটেল না। মাথা গুঁজতে পারবেন আজ রাতের মত’।”

হেডস্যার উত্তেজনা চেপে রাখতে পারলেন না, “তা তুমি কি সেই হোটেলওয়ালীর সাথে গেলে?”
শওকত হেডস্যারের মনোভাব কিছুটা বুঝতে পারল।

বলল, “ওরকম দূর্যোগপূর্ণ রাতে আমার কিছু করার ছিল না। ঝড়ে যদি কোন গাছ টাছ মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ত, তাহলে আমায় আর পেতেন না স্যার।”

হেডস্যার সরু চোখে বারী আর শওকতের দিকে তাকালেন। তারপর গল্প চালিয়ে যাবার ইঙ্গিত দিলেন।

শওকত বলতে লাগল, “আমি হোটেলওয়ালীর দেখানো পথ ধরলাম। কিছুদূর মোটরসাইকেল নিয়ে হাটার পর তিনি বেশ পুরোনো ধরণের একটি হোটেলের সামনে নিয়ে এলেন। দোতলা হোটেল। বহু পুরোনো আমলের হোটেল বলে মনে হলো। হোটেলের নাম চোখে পড়ল খাতায় সাইন করার সময়। হোটেলটির নাম ‘বসন্ত বিলাস বোর্ডিং।’ খাতায় সাইন করে সিড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে লাগলাম। চারপাশে তাকিয়ে দেখছি। একটা কেমন যেন গুমোট ও স্যাতস্যাতে পরিবেশ। আর জানেনই তো স্যার, ঝড়-বাদলের সময় বিদ্যুৎ থাকেনা। মোমবাতির আলোয় যতটুকু দেখতে পেয়েছি তার থেকেই এই আন্দাজ।”
বারী ও হেডস্যার একটু নড়ে চড়ে বসলেন। “তারপর!” হেড স্যার উত্তেজিত কন্ঠে বললেন।
শওকত এখন একটু থিতু হয়েছে, হেডস্যারের দিকে চোখ রেখে বলতে লাগল, “তখন আমার গা ছম ছম করছিল হোটেলের পরিবেশ দেখে। কিন্তু আমি বিজ্ঞানের ছাত্র।
অত ভয় পাবার পাত্র আমি নই। একটা জিনিস শুধু মনে খচ খচ করছিল।”

“কী সেটা?” হেডস্যার জিজ্ঞেস করলেন।

“যদি ডাকাতি করে মোটরসাইকেলটা কেড়ে নেয় কেউ। এমনিতে খুব বেশি টাকা পয়সা আমার কাছে নেই। ঐ মোটরসাইকেলটা আমার খুব শখের। অনেকদিন ধরে টাকা জমিয়ে কিনেছি।
তবু আমি সিদ্ধান্ত নিলাম। যদি মোটরসাইকেল যায় তো যাক, নিজের জীবন বাঁচাতে হবে। বেঁচে থাকলে আবার কিনতে পারব।
এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে হোটেলের ঘরে চলে এসেছি। ও, হ্যা! বলে রাখি সেই হোটেলওয়ালীও দুই হাতে দুই-তিনটি মোমবাতি নিয়ে আমার সাথে দোতলাতে এসেছে। আমাকে ঘর দেখিয়ে দিয়ে, নীচে চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল, ‘কোন কিছুর দরকার হলে যেন নীচে গিয়ে ডাকি।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার নামটা তো জানা হলো না। কি নাম ধরে ডাকব, নীচে গিয়ে? আর আপনি ছাড়া আর কাউকে তো দেখছিনা।’ উনি একটু হেসে বলল, ‘সবাই আছে। ব্যাস্ত চারিদিকে। আর আমাকে হোটেলওয়ালী বলেই না হয় ডাকবেন।’ আমি আর কথা না বাড়িয়ে ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলাম। ছোট্ট একটি ঘর। মোমবাতি জ্বলছে ঘরের ভিতর। মেঝেতে পা দিয়ে মনে হলো, মোটা কার্পেট পাতা রয়েছে। পাশে একটি বাথরুম। বহু পুরোনো ট্যাপ ও টয়লেট মনে হলো। ট্যাপ ঘুরাতেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ হতে লাগল। ট্যাপের পানিতে হাতমুখ ধুয়ে ঘরে এলাম। বাথরুমের ঝাপসা আলোয় আয়নাতে দেখেছিলাম আমার চোখে মুখে একটি ক্লান্তির ছাপ। তাই আর দেরী না করে সংগে থাকা কিছু শুকনো খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। বলে রাখি ঘরের ভিতর একটি ছোট চৌকি ও একটি টেবিল আছে। ঘরটির আয়তন খুব একটা ছোট বা বড় নয়, বরং মাঝারী বলা চলে। শুয়ে শুয়ে বিভিন্ন ভাবনা মাথায় আসছে। একবার ভাবলাম মোমবাতি নিভিয়ে দেব আবার ভাবলাম, না থাক জ্বলুক যতক্ষণ জ্বলতে পারে। পরে না হয় আরেকটা মোমবাতি জ্বাললেই হবে। এসব ভাবতে ভাবতে একটু তন্দ্রা মত এলো। হঠাৎ শুনলাম বাথরুমের বেসিনে পানি পড়ার শব্দ। আমি তখন একটু কনফিউজ্ড। আমি কি তাহলে বেসিনের কল বন্ধ করিনি? কিছু না ভেবে উঠে গিয়ে বেসিনের কল বন্ধ করে এলাম। আবার বেশ কিছুক্ষণ পর শুনলাম, বাথরুমে বেসিন ও বালতির কল দিয়ে পানি পড়ার শব্দ। এবার আমি সত্যিই ভয় পেয়ে গেলাম। তবুও অনেক সাহস সন্চয় করে বাথরুমে গিয়ে কল বন্ধ করলাম। আমি ভাবছি প্রথমবার না হয় আমার কল বন্ধ করতে ভুল হয়েছে, দ্বিতীয়বার তাহলে কিভাবে কল খুলে পানি পড়তে লাগল। আমি মনে মনে একটা জিনিস বুঝলাম যে, এই ঘরে নিশ্চয় কোন মানুষ আছে। মোমবাতির আলোয় সারা ঘর আতি পাতি করে খুঁজে কাউকে পেলাম না। হঠাৎ মনে হলো, হোটেলওয়ালীকে ডাকি। কিন্তু দরজা খুলে বাইরে যাবার সাহস হলো না। ঘরের মধ্যে কাঠ হয়ে বসে আছি। চারিদিক শুনশান নিরবতা। হাত ঘড়ির ক্ষীণ টিক টিক শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ক্যাঁচ করে একটি শব্দ শুনলাম। দেখি জানালার কাঠের পাল্লা খুলে গেল। খুবই সুশ্রী মুখের একটি কিশোরী মেয়ে জানালার ওপাশে উল্টো করে রয়েছে।”

এটুকু বলে শওকত আরেক গ্লাস পানি পান করল। হেডস্যার বোধহয় আর ধৈর্য রাখতে পারছেন না। তাগাদা দেবার ভঙ্গীতে বললেন, “আহা! থামলে কেন? উল্টো করে মানে?”

শওকত এবার কপালের ঘাম মুছে বলল, “মানে স্যার, মানে…এ…এ স্যার।” শওকতের গলাটা কেমন একটা যান্ত্রিক কন্ঠস্বর শোনাচ্ছে।

“আবার মানে মানে করছ কেন? বল উল্টো মানে কি?”

“উল্টো মানে, মেয়েটির কপাল নিচের দিকে আর থুতনি উপরের দিকে।”

“তাও কখনও হয় নাকি। এ তোমার নিশ্চয় হ্যালুসিনেশন হচ্ছিল।”

কথাটাকে মাটিতে পড়তে দিল না শওকত। বলল, “স্যার সত্যিই আমি দেখেছি। এক বর্ণ মিথ্যে নয়। আমাকে মেয়েটি বলল, ‘হোটেলওয়ালীকে ডাকতে চাচ্ছিলে বুঝি? ওসব ডেকে লাভ হবে না। তার চেয়ে গান শোনো, বলে অনেকটা সম্মোহন করার সুরের মত করে “খোকা ঘুমাল, পাড়া জুড়াল….” গানটি গাইতে লাগল। আমি তো ভয়ে প্রায় সিটিয়ে আছি। তবে জানালা খোলাতে ভালই লাগছিল। কারণ, জানালা খোলাতে ঘরের গুমোট পরিবেশটা একটু হালকা হয়ে গেল আর সুন্দর ফুলের গন্ধ বাতাসে ভেসে ঘরে আসছিল।
তখনও বাথরুমে পানির পড়ার আওয়াজ আসছে। আমি অনেক চেষ্টা করেও বিছানা ছেড়ে উঠতে পারলাম না। শেষে ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম যখন ভাংল তখন অনেক বেলা। প্রচন্ড মাথার যন্ত্রণা নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলাম।
বাইরে এসে আমি অবাক। কোন হোটেলের চিহ্ন নেই। কাঠের একটা ঘর উঁচুতে মাচার উপর অবস্থিত। আর একটা কাঠের মই সেখানে লাগানো। পুরো ঘরটি একটি মাঠের মধ্যে বট গাছের পাশে তৈরি। আমি কী তাহলে সারারাত একটি খোলা মাঠের মধ্যে বটগাছের পাশে শুয়ে ছিলাম! জানালা দিয়ে দেখলাম নীচে দূরে মোটরসাইকেলটি পড়ে আছে। হুড়মুড় করে নীচে নামলাম। মোটরসাইকেলের উপর একটি ভিজিটিং কার্ড। তাতে হাতে লেখা ‘আপ্যায়নে কোন ত্রুটি থাকলে জানাবেন’। আর কার্ডটি ‘বসন্ত বিলাস বোর্ডিং’ এর। আমি কোনদিকে আর তাকাই নি। কোন রকমে মোটরসাইকেল চালিয়ে সোজা স্কুলে।”
অনেকক্ষণ নিরব থেকে এবার বারী এবার বলল, “আচ্ছা শওকত ভাই, রাস্তায় আসার সময় কাউকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন নি?”

শওকত বলল, “আমার তখন এই অবস্থা সেই অবস্থা? তবুও আমি একজনকে মাঠের ভিতরের মাচা ঘর ও ‘বসন্ত বিলাস বোর্ডিং’ এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সেই লোক নাকি জানে না এরকম মাচা ঘরের ব্যাপারে আর বসন্ত বিলাস বোর্ডিং বলে না কি কিছু নেই।”

“জায়গাটার নাম কী যেন।”

শওকতের কাঁপা কাঁপা কন্ঠের উত্তর, “ বসন্তপূর”

হেডস্যার সব শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “শওকত, তুমি একটু ছুটি নিয়ে রেস্ট নাও দিনকতক। অনেক ধকল গেছে তোমার উপর। আর পারলে একজন সাইক্রিয়াটিস্ট দেখাতে পারো। আমি বলছিনা যে, তোমার মাথায় গোলমাল হয়েছে। তবে একটু… বোঝোই তো!”

এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। শওকত আর আগের মত হাসে না। শুধু যন্ত্রের মত ক্লাশ নেয় আর বাসায় চলে যায়। পত্র-পত্রিকাতেও বসন্তপুরের এরকম ভুতুড়ে বিষয় ছাপা হতে লাগল। যদিও কেউই কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। তবে কেউ কেউ বিভিন্ন রকমভাবে ভৌতিক পরিবেশের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
যদিও এসব অদ্ভুতুড়ে কান্ডের কোন ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, তারপরও বসন্তপুর অনেকটা হন্টেট এলাকা হিসাবে বেশ পরিচিতি পেয়েছে।



দুই.

এবার শীতকাল একটু আগে ভাগেই চলে এসেছে। রাতে কুয়াশা, দিনে একটু বেলা হলে মিঠে কড়া রোদ আর সেই সাথে হাড় কাঁপুনি ঠান্ডা যেন শীতকে আরও জাঁকিয়ে বসতে সাহায্যই করছে। স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। ছাত্র ও শিক্ষক সবাই একটি অখন্ড অবসর উপভোগ করে এই সময়টাতে।
এরকম একদিন হেডস্যার টেলিফোন করলেন বারী কে। বললেন, “শোনো বারী। আজ সন্ধ্যায় আমার বাসায় আসতে পারবে? কিছু আলাপ ছিল।”

বারী রাজী হলো। সন্ধ্যার পর হেডস্যারের বাসায় উপস্থিত হলো, হাতে এক জগ খেজুড়ের রস। হেডস্যার সান্ধ্য খেজুড়ের রস দেখে তো মহাখুশি। একথায় সেকথায় হেডস্যার আলাপটা শুরু করলেন, “দেখ বারী,

শওকত ধীরে ধীরে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। সেই আমুদে ভাব নেই, কোথায় যেন একটি ভীত সন্ত্রস্ত চেহারা। আমারও একেক সময় মনে হয়, ভুত সত্যিই আছে নাকি।”

বারী ঘাড় নেড়ে বলল, “ভুত বলতে কিছু নেই। কোন কিছুর ব্যাখ্যা এখন দেয়া যাচ্ছে না, এর মানে এই নয় যে এর ব্যাখ্যা ভবিষ্যতে দেয়া যাবে না। স্যরি স্যার একটু বেশিই বলে ফেললাম।”

“না বারী। তুমি ঠিক কথাই বলেছ। আমি বলি কি? শীতের এই ছুটিতে চলো ঐ গ্রামে যাই, কী যেন নাম গ্রামের!”

“বসন্তপুর, স্যার।”

“হ্যা, বসন্তপুর। চলো ঐ গ্রামে ঘুরে আসি। তাহলে কিছু একটা বোঝা যাবে।”

“কিন্তু স্যার, আপনি এই বয়সে ঐসব ভুত প্রেত ধরতে যাবেন?” কথাটা বারী কাচুমাচু মুখ নিয়ে বলল।
এই কথা শুনে হেডস্যার তড়াক করে লাফিয়ে বললেন, “কী বললে বারী! আমার এই বয়স! যুবক বয়সে আমি কত আ্যডভেন্চার করেছি জানো? আর ছেলেবেলায় গোয়েন্দা গল্প ও আ্যডভেন্চারের গল্প সব গুলে খেয়েছি। আমার নিজের উপর আমার যথেষ্ঠ আস্থা আছে। বরং তোমাদের উপর ভরসা করতে পারি কম। দেখছো তো, শওকতের অবস্থা। তুমি আমার সাথে যাবে কিনা বলো?”

বারী বুঝল আর কোনভাবে হেডস্যারকে বোঝানো যাবেনা। তাই ঠিক করল, আগামী কালই তাঁরা দু’জন বসন্তপুর যাবে।

পরের দিন বারী সারা সকাল-দুপুর কোথায় কোথায় টই টই করে ঘুরে বেড়িয়ে ঠিক বিকাল সাড়ে ৩ টের সময় হেডস্যারের বাসায় আসল। হেডস্যার তো রেগে আগুন। বললেন, “ এই আসবার সময় হলো তোমার?”

বারী হেসে বলল, “স্যার, সকালের দিকে বসন্তপুর গ্রাম নিয়ে একটু খোঁজ খবর করলাম। আর আজ রাত জাগার জন্য কফি, গায়ে মাখবার জন্য মশার ঔষধ, কিছু শুকনো খাবার ও পানি যোগাড় করলাম।”

“মানে কি? রাত জাগতে হবে নাকি?”

বারী সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। ওদিকে বাসার বাইরে থেকে গরর-গররর ও ঘেউ ঘেউ শব্দ শোনা গেল।

হেডস্যার জিজ্ঞেস করলেন, “কুকুর এল আবার কোথ্থেকে?”

বারী বলল, “আমার কুকুর স্যার। খুবই বাধ্য আমার। নাম টিনা।”

“কুকুরও যাবে নাকি, আমাদের সাথে?”

“জ্বী, স্যার। টিনা সাথে থাকলে আমার সাহস ১০ গুন বেড়ে যায়। ওর ঘ্রান শক্তি প্রচন্ড।”, বারীর উত্তর।
হেডস্যার রাগে গজ গজ করতে লাগলেন। কিন্তু মুখে কিছু বললেন না।

বারী ও হেডস্যার যখন গ্রামে পৌছালেন তখন সন্ধ্যা প্রায় ছুই ছুই। দিনের আলো কমে গেছে। রাস্তার টিমটিমে আলো জ্বলে উঠতে আরম্ভ করেছে। বারী, হেডস্যার ও টিনা একটি বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে। দূর থেকে লক্ষ্য করছে। এই বাঁশ ঝাড়ের লোকেশন একটি চমৎকার জায়গায়। একটু নীচু এলাকা তবে এখান থেকে বলা চলে পুরো গ্রামটি ভালভাবে দেখা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘন কুয়াশা পড়তে লাগল গ্রামে। দশ গজ দূরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

বেশ কিছুক্ষণ পর বারী একটি সানাইয়ের শব্দ শুনতে পেল। টিনাও ওদিকে কান খাড়া করে দাড়িয়ে আছে।
বারী হেডস্যারকে বলল, “স্যার, একটা বাজনা মত কি যেন শুনতে পাচ্ছি। চলুন স্যার ওদিকটা দেখে আসি।”

হেডস্যার বললেন, “যদি ধরা পড়ে যায়।”

“ধরা পড়বার কী আছে স্যার! আমরা তো আর চুরি করতে যাচ্ছিনা।”

“তবুও, কেউ যদি জিজ্ঞেস টিজ্ঞেস করে।”

“তাহলে বলব, এদিকে এসে পথ হারিয়ে ফেলেছি। চলুনতো স্যার কিছু হবে না।”

গুটি গুটি পায়ে ওরা তিনজন সানাইয়ের শব্দের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পায়ের নীচে শুকনো পাতার খস খস শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। সানাই ও খস খস শব্দের একটি মাদকতা তৈরী হয়েছে। বারীরা কুয়াশামুড়ি দেয়া চাঁদের আলো-আঁধারীতে ঠাউরে ঠাউরে হাঁটছে। হঠাৎ পথিমধ্যে এক ছায়ামূর্তির সাথে দেখা। চাঁদের সেই অস্পষ্ট জোছনায় বারী বুঝতে পারল, ইনি একজন মহিলা। এমনভাবে ভালভাবে কাপড়চোপড় জড়িয়ে এসেছে, যেন মুখ ও অবয়ব বোঝা না যায়।

খ্যান খ্যানে গলায় বলল, “তা তোমরা কে? এই এত রাতে এখানে কী করছ?”

হেডস্যার বলা শুরু করলেন, “এই আমরা পথ হা…..”

হেডস্যারের কথা থামিয়ে দিয়ে বারী বলে উঠল, “আসলে আমরা এদিকে জমি দেখতে এসেছিলাম। দেখতে দেখতে আসলে রাত হয়ে গেল। তাই ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না।”

হেডস্যার কেমন যেন কটমটিয়ে তাকাচ্ছিল বারীর দিকে, তাঁর কথা কেড়ে নেবার জন্য। ভাগ্যিস আলো খুব বেশি নেই। তা না হলে বারী ঐ চাহনীতে পুড়ে ছাই হয়ে যেত।

মহিলাটি বলল, “আমাকে সবাই হোটেলওয়ালী বলে ডাকে। আমার মেয়ের বিয়ে আজ। তাই একটু সামান্য আয়োজন করেছি। চলুন কিছু মুখে দেবেন।”

বারী আগবাড়িয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, “আপনার কি হোটেল আছে?”

“আছে তো। হোটেলের নাম ‘বসন্ত বিলাস বোর্ডিং’।”

বারী কিছুই জানে না এমন ভঙ্গিতে বলল, “ও আচ্ছা। থাকার হোটেল?”

মহিলাটি হেসে বলল, “শুধু থাকার হবে কেন! খাওয়া-থাকা দু’টোরই ব্যবস্থা আছে।”

বারী রাজি হয়ে গেল। হেডস্যার বারীর হাত চেপে সাইডে টেনে নিতে চাইলেন। কিন্তু পারলেন না। বারী ভাল মুখ করে নিমন্ত্রণ কবুল করে নিল। হেডস্যার আবার কটমট দৃষ্টিতে বারীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

হেডস্যার এবার আর না বলে পারলেন না, “তা আপনার মেয়ের বিয়ে। আর আপনি বাইরে এসেছেন এই অন্ধকারে নেমন্তন্ন করবার লোক খুঁজতে? ব্যাপার বুঝলাম না।”

হোটেলওয়ালী হেসে উঠল। বলল, “ঐটেই নিয়ম আমাদের। আগে চলুন, তারপর সব বুঝবেন।”
হোটেলওয়ালীর দেখানো পথ দিয়ে বারীরা চলতে লাগল। বিয়ে বাড়ী মোটামুটি সাজানো। মানে গরীব মানুষেরা যতটুকু সাজাতে পারে আর কি!

একটি দো’চালা কাঠের বাড়ির দাওয়ায় মাদুর পেড়ে রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ নেই। হারিকেনের আলো জ্বলছে। বাড়ীর উঠোন ও অন্যান্য এলাকা অন্ধকারই বলা চলে। রাস্তার সরকারী বিদ্যুতের আলো যতটুকু বাড়ীর ভিতরে পড়ছে ততটুকুই দেখা যাচ্ছে। তাও আবার কুয়াশার কারণে অস্পষ্ট। বারীদের সেই দাওয়ায় বসিয়ে খেতে দেয়া হলো। আরও দু’তিনজনও বারীদের সাথে খেতে বসেছে। কথায় কথায় জানা গেল তাঁরাও এই অন্চলে বিভিন্নরকম পার্ক বা দোকানপাট করবার জন্য জমি দেখতে এসেছে। জমির দালালী করে তাঁরা। বিয়ে বাড়ীর দাওয়াত পেয়ে খেতে এসেছে।

বারী খুব সাবধানে হেডস্যারের হাত চেপে দিল। তারপর চোখের ঈশারায় বুঝিয়ে দিল যে, এই খাবার যতই লোভনীয় হোক না কেন, তা কোনভাবেই খাওয়া চলে না। শুধু খাওয়ার ভান করতে হবে। হেডস্যার ততক্ষণে খাবার খেতে শুরু করেছে। বারীর ইংগিত বুঝতে পেরে বিষম খেল।

বারী হেডস্যারের দিকে খুব একটা নজর না দিয়ে, হোটেলওয়ালীকে জিজ্ঞেস করল, “আপনার মেয়ে বা বরযাত্রী এরা সব কই?”

প্রশ্ন শেষ হতেই, হারিকেনের আলো ধপ করে নিভে গেল। আর বাড়ীর সামনের দিকটাই তিনটি জায়গা থেকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো। আগুনের লেলিহান শিখা অনেক উপর পর্যন্ত উঠতে লাগল। বারী সহ সবাই হকচকিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৌ সাজে একটি মেয়ে উপর থেকে উল্টো হয়ে ঝুলতে ঝুলতে দাওয়ার সামনে এল। এসেই একটু খ্যানখেনে গলায় বলল, “আমিই বৌ। কি বলবে বল। আর আশেপাশে যে কয়জন দেখতে পাচ্ছ ওরা বরযাত্রী।”

বারী ও হেডস্যার বেশ ভয় পেয়েছে। হেডস্যার তবুও সাহস করে বললেন, “কই আমরা তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।”

চারপাশ থেকে গম গম গম করে আওয়াজ হতে লাগল। কোথা থেকে একজন লোক হাঁটতে হাঁটতে এলো ওদের সামনে। লোকটির মুখ দেখতে বিভৎস। কিন্তু লোকটি এতই লম্বা যে তাঁর উচ্চতা ঘরের ছাদের থেকেও অনেক উপরে। নীচের আগুনের শিখার আলো লোকটা মুখে নীচ থেকে পড়ছিল। তাতে মুখের চেহারা আরও বিভৎস ও ভয়ন্কর লাগছিল।

হঠাৎ বারী মেয়েটির হাত ধরে ফেলল। তাতে কয়েকটি কাঁচের চুড়ি ভেংগে পড়ল। মেয়েটির হাত কেটে গেল বোধহয়। ওদিকে তীর বেগে বারীর কুকুর টিনা ছোঁ মেরে মেয়েটির নীচে ঝুলতে থাকা আঁচল কামড় দিয়ে ছিড়ে ফেলল। এসব কান্ড এতই দ্রুত ঘটে গেল যে, সেই হোটেলওয়ালী বা অন্যান্যরা বুঝতে পারল না। কিন্তু যখন বুঝল তখন বারীর ঘাড়ে একটা আচমকা আঘাত পড়ল। বারী চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল। শেষ পর্যন্ত যতক্ষণ চোখ খুলে রাখতে পেরেছিল তাতে বারী মোট তিনটি দৃশ্য দেখেছিল। এক, মেয়েটিকে উপরে উঠে যেতে দেখেছিল; দুই, হেডস্যারসহ সবাইকে খাবার খেতে খেতে ঘুমে ঢলে পড়তে দেখেছিল; আর তিন, টিনা যেমন তীর বেগে এসেছিল তেমনই তীর বেগে বাড়ী ছেড়ে চলে যেতে দেখেছিল।



তিন.

পরেরদিন ভোরের আলো ফুটতেই বারীর ঘুম ভেংগে গেল। ঘাড়ের জায়গাটা বেশ যন্ত্রণা হচ্ছে। অনুভব করল টিনা বারীর প্যান্ট দাঁত দিয়ে টেনে টেনে ঘুম থেকে তুলছে ওকে। বারী উঠে প্রথমে হেডস্যারের চোখে মুখে পানির ছিটা দিল। হেডস্যার ধুড়মুড় করে উঠে পড়লেন। চারিদিকে তাকিয়ে বললেন, “গতকাল রাতের বিয়ে বাড়ীর কোন চিহ্নই তো নেই দেখছি। সেই আগুনের চুলা, সাজানো গেট এমনকি খাবার দাবার কিচ্ছু নেই।”

বারীও লক্ষ করেছে সেটা। বারী হঠাৎ মাটি থেকে ‘বসন্ত বিলাস বোর্ডিং’ এর একটি ভিজিটিং কার্ড কুড়িয়ে পেল। আর তাতে হাতে লেখা ‘আপ্যায়নে কোন ত্রুটি থাকলে জানাবেন’। বারী পকেট থেকে শওকতের দেয়া কার্ডটি বের করল। হুবুহু একই কার্ড ও একই হাতের লেখা।

বারীর মাথায় কী যেন একটা খেলে গেল। মুখে ওর মুচকি হাসি। চটপট রেডি হয়ে নিল। হেডস্যারকে বলল, “স্যার এই গ্রামের মাতবরদের খুঁজে বের করতে হবে। আপনি একটু খোঁজ খবর করুন। তবে যাই করবেন, সাবধানে। আর শওকতকে পারলে একটি টেলিফোন করে সেই বটগাছের নিকট আসতে বলেন।”

হেডস্যার বললেন, “এসবের মানে কী? তুমি যাচ্ছ কোথায়?”

বারী বাইরে যেতে যেতে বলল, “স্যার সব বলব আগে কয়েকটা জিনিস কনফার্ম হই। বটগাছের ওখানে আমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করবেন।”

হেডস্যার অনেকটা বোকার মত বসে রইলেন। আরও দু’তিনজন যারা ছিলেন, তাঁদেরকেও ঘুম থেকে উঠিয়ে শওকতের সাথে কথা বলার জন্য ভাল নেটওয়ার্ক আছে এমন জায়গায় গেলেন। সেই সাথে বটগাছের ওখানে বারীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

ওদিকে বারী প্রথমেই গেল থানাতে। থানার ওসিকে সবকিছু খুলে বলতে তিনি বললেন, “দেখুন অনেকদিন থেকেই শুনছি এসব অশরীরী কর্মকান্ডের কথা। কিন্তু ভুতের ব্যপারে পুলিশ কি করতে পারে বলুন।”
বারী তখন বলল, “ভাই, আমাকে একটা উপকার করতে পারেন? আপনাদের এখানে হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্ট কেউ আছে?”

বারীর কথা শুনে ওসি সাহেব হাসলেন। বললেন, “বড় বড় মেট্রোপলিটন শহরে হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্ট ঠিকমত আছে কিনা তার ঠিক নেই। আর সেখানে এই গ্রামের এই ছোট্ট পুলিশ অফিসে! হা হা হা!!”
বারী তখন বলল, “আচ্ছা ভাই, আপনি তো অনেক অভিজ্ঞ পুলিশের কাজের ব্যপারে। এই যে দু’টো ভিজিটিং কার্ডের পিছনে হাতের লেখা দেখুন। এই লেখা কেমন ধরণের বা কেমন বয়সী লোকের হতে পারে?”

ওসি সাহেব লেখাটা দেখে বললেন’ “টিনেজার কোন মেয়ের হতে পারে, বলে আমার ধারণা।”

কথাটা শুনে বারী আর একমূহুর্ত দাড়ালো না। ওসি সাহেবের ফোন নম্বর নিয়ে বের হয়ে গেল থানা থেকে। বাইরে এসে একটা সাইকেল ভ্যানে চড়ে বসল। তারপর বলল, “এই অন্চলের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বাসায় চলুন।” সেখানে বারী নিজের পরিচয় দিল যে সেও একটি জেলা হাইস্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক। বারী প্রধান শিক্ষকের নিকট থেকে ক্লাশ সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত সবার পরীক্ষার খাতা চেক করতে লাগল । একসময় বলল ইউরেকো। বারী প্রধান শিক্ষকের নিকট হতে প্রয়োজনীয় সব তথ্য নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ল। হেডস্যারকে ফোন দিল, “স্যার জানতে পেরেছেন এ এলাকার মাতবর কে?”

হেডস্যার বলল, “এখানকার গ্রামের চেয়ারম্যান হলো মিজান সাহেব।” বারী আবার বলল, “ইউরেকা। শওকত ভাই এসেছে স্যার?”

“হ্যা, এই তো আমার পাশে দাড়িয়ে। কথা বলবা?”

“না স্যার। শওকত ভাইকে নিয়ে মিজান সাহবের বাড়ি আসেন।”

তারপর বারী থানার ওসিকেও আসতে বললেন মিজান সাহবের বাড়িতে।



বিজ্ঞাপন | দশে কুড়ি: সিনেমা


চার.

মিজান সাহবের বাড়িতে বারী, শওকত, হেডস্যার, ওসি সাহেব আর টিনা ঢুকল। ওসি সাহেবই ডাকলেন, “চেয়ারম্যান সাহেব বাড়ি আছেন?”

মিজান সাহেব ও তাঁর স্ত্রী বের হয়ে আসলেন। বারী সালাম দিয়ে বলল, “চেয়ারম্যান সাহেব জমির দর কেমন চলছে এদিকে?”

সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল বারীর প্রশ্ন শুনে। মিজান সাহেব বললেন, “আমরা কোন জমি বিক্রি করব না। সেটা তো আগেই বলেছি।”

বারী বলল, “জমি বেঁচবেন না, ভাল কথা। তাই বলে আপ্যায়নে ত্রুটি রাখবেন। ঠান্ডার মধ্যে একটা কম্বল দিবেন না?”

এ সময় ভিতর থেকে মিজান সাহেবের বউ চেচিয়ে বললেন, “এ সবের মানে কী?”

বারী আবার বলল, “ভাবীসাব। আমার উপর রাগ কইরেন না। আপনার স্বামী যে, দালালদের সাথে হাত মিলিয়ে সব জমি বিক্রি করার পাঁয়তারা করছে সে খবর জানেন?”

মিজান সাহেবের স্ত্রী শ্যেন দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকালেন।

হেডস্যার বলে উঠলেন, “জমি, বিক্রি, দালাল এসব কী বলছ বারী?”

“ঠিকই বলছি স্যার।”

মিজান সাহেব বলল, “মিথ্যে কথা। সত্যিই বলছি আমি কেন দালালদের সাথে হাত মেলাব?”
ওদিকে গতকালের সেই দালালরা বলতে লাগল, “আপনিই বললেন আপনার কমিশন লাগবে।”

বারী বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে। আমাদের লিখে দেন যে, আপনারা জমি বিক্রি করবেন না। আর সেখানে সাইন করবেন চেয়ারম্যান সাহেব।”

মিজান সাহেব বললেন, “আমার মুখের কথা দিয়ে এই গ্রাম চলে। আমাকে লিখতে হবে কেন?”

বারী মনে হয় এই কথাটার জন্য অপেক্ষো করছিল। সে বলল, “দেখছেন ভাবীসাব। মনে জোর না থাকলে মিথ্যা কথা লেখা যায় না।”

মিজান সাহেবের স্ত্রী তখন তাঁদের মেয়েকে ডাকলেন। মেয়েটি আসলে বললেন, “এই কাগজে লিখে দে তো মা। ‘আমরা কোন জমি বিক্রি করব না’।” মেয়েটি লিখে দিল।

বারী ততক্ষণাৎ একটি জোরে সিটি মারল। টিনা আবার তীর বেগে ঘরে ঢুকে গেল।

“কি হচ্ছে এসব?” মিজান সাহেবের স্ত্রী বলে উঠলেন।
মেয়েটিও টিনার পিছনে ছুটতে ছুটতে ঘরের ভিতর গেল। টিনা ততক্ষণে মুখে করে গতকালকের বিয়ের শাড়ী ও ছদ্মবেশ ধরার সরঞ্জাম বের করে নিয়ে এসেছে।
বারী টিনার মুখ থেকে শাড়ীটি নিয়ে সেই ছেড়া জায়াগার সাথে নিজের পকেটে থাকা গতকাল রাতে ছেড়া অংশ জোড়া লাগিয়ে সবাই কে দেখালেন। ছেড়া অংশটি হুবুহু মিলে গেল।
এতক্ষণে হেডস্যারের বুঝতে পারলেন যে, গতকাল রাতের সেই হোটেলওয়ালী আসলে এই মিজান সাহেবের স্ত্রী আর মেয়েটি হলো উল্টো ঝুলে থাকা বৌ। ছদ্মবেশ থাকার কারণে গতরাতে বুঝতে পারেননি।

হেডস্যারের ও শওকতের কাছে এখন সব পরিষ্কার। হেডস্যার সে কথা স্পষ্ট জানিয়েও দিলেন। মিজানের স্ত্রী বললেন, “শাড়ীর জোড়া মিলে যাওয়া তে কিছুই প্রমান হয় না যে আমরা এই ভৌতিক কাজের সাথে জড়িত।”

বারী বললেন, “আপনার মেয়ের হাতের লেখার সাথে এই কার্ডের হাতের লেখা একেবারে মিল। এতেও অবশ্য কিছুই প্রমান হয় না। কিন্তু গতকাল রাতে যে কারণে ঘাড়ে আঘাত করলেন, সেই যে আপনার মেয়ের হাত ধরা। মনে পড়ে? সেই ভাংগা চুরির অংশ আমার পকেটে আছে। ওই চুরির গায়ে লেগে থাকা রক্ত আর আপনার মেয়ে ডান হাতের কেটে যাওয়া জায়াগার রক্ত পরীক্ষা করলেই সব বোঝা যাবে। সেসব করবে পুলিশ ভায়েরা। আমি শুধু সূত্রগুলো দিলাম। এখন বলেন, এতকিছুর কারণ কি? আপনারা পেশাদার ক্রিমিনাল নন বুঝেছি। তা না হলে আমাদের রাত্রিতেই মেরে ফেলতে পারতেন। চুরির ভাংগা অংশটাও পকেট থেকে নিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু তা করেননি। এতসব করার কী প্রয়োজন ছিল?”

চেয়ারম্যান ও হোটেলওয়ালী ভয় পেয়েছে মনে হল। ধরাপড়ে যাওয়ায় তাঁদের মুখ বিবর্ণ।

শেষ পর্যন্ত হোটেলওয়ালী বললেন, “বসন্ত বিলাস নামে একটি পর্যটন গ্রুপ অনেকদিন ধরেই এই গ্রামের উপর নজর দিয়ে আসছে। আমাদের বাপ-দাদাদের জায়গা আমরা বিক্রি করবনা। কিন্তু তারা নানারকম হুমকি ধামকি দিয়ে আসছে। আপনি যখন সব বুঝতে পেরেই গেছেন, তখন এটাও বুঝেছেন আমাদের পুরোনো পেশার এখন আর খুব কদর নেই।”

কথাটা শুনে হেডস্যার বললেন, “পুরোনো পেশা মানে?”

বারী বলল, “স্যার আসলে এই গ্রামের সবাই বলা চলে সার্কাস ও যাত্রাপালার সাথে যুক্ত। তাই তাঁরা ওরকম করে বিভিন্ন প্রপস ব্যবহার করে দ্রুত স্টেজ নির্মান করে কখনও হোটেল বা কখনও বিয়ে বাড়ীর সেট বানাতে পারে এবং সেটাকে মূহূর্তের মধ্যে খুলে ফেলতে পারে। আর ঐ যে মেয়েটিকে গতকাল দেখলেন উল্টো করে ঝুলে আছে, সেই মেয়েটিও সার্কাস ও এ্যক্রোব্যাটে করতে পটু। এদেরই কোন আত্মীয়ই গতকাল রণপা লাগিয়ে কাল আমাদের ভয় দেখিয়েছিল। কিন্তু আমার প্রশ্ন এইভাবে ভয় দেখিয়ে কি বসন্ত বিলাস গ্রুপ কে দূরে রাখা সম্ভব?”
হোটেলওয়ালী বললেন, “হয়ত সম্ভব না। পুলিশ প্রশাসন সবই তো ওদের কথায় চলে। তাঁরা আমাদের কথা পাত্তা দেয় না। আমরা লেখাপড়া শিখিনি। মূর্খ মানুষ। আমাদের কথা কেইবা শুনবে। তাই এই বুদ্ধি আমি করি। ভুতের ভয় দেখিয়ে যদি কিছু করা যায়। ভুতের এলাকায় কেউতো আসতে চাইবে না।”

এবার মেয়েটি মুখ খুলল, “আমাদের জমাজমি সব কেড়ে নিলে আমরা কোথায় যাব স্যার। আমরা শুধু ভয় দেখিয়েছি। কিন্তু কারোর কোন ক্ষতি তো করিনি। এই যে এই স্যার….” শওকতকে দেখিয়ে মেয়েটি বলে চলল, “ এই স্যার রাতে আমাদের বটগাছের ওখানে কাঠের বাড়ীতে থাকলেন। আমরা তাঁর সব জিনিস কেড়ে নিতে পারতাম। কিন্তু কিছুই নেইনি। জিজ্ঞেস করেন ওনাকে।”

বারী বলল, “প্রথমে শওকত ভায়ের মুখ থেকে ঘটনা শুনে আমার সেইটিই খটকা লেগেছিল। আমার মনে হয়েছিল এই অন্চলের লোক কিছু বলতে চাই। শুধু ডাকাতি বা ক্ষতি করবার উদ্দেশ্য তাদের নেই। তাই আমি বসন্তপুর সম্পর্কে গত কয়েকমাস খোঁজ খবর করতে থাকি। পত্রিকাতে জমি বিক্রয় হবে ও পর্যটন কেন্দ্রের খবরটা চোখে পড়ে আমার। হন্টেট গ্রাম বিষয়টিও পত্রিকাতে এসেছিল। এটাই আমার দ্বিতীয় খটকা। হন্টেট গ্রাম কি করে পর্যটন কেন্দ্রের জন্য ভাবা হচ্ছে? নাকি আগে পর্যটন কেন্দ্র করার পরিকল্পনা হয়েছে? আর পরে হন্টেট গ্রামের আবির্ভাব? এই চিন্তার উত্তর পাই যখন আমি জমির দালালদের এখানে পাঠাই।”

কথা শুনে হেডস্যার বলল, “তুমি এই দালালদের চেন নাকি?”

“জ্বী স্যার। ওদের জমি কেনাবেচার খবর আমিই দেই। এই এলাকার খোঁজ খবর জানার জন্য।”

“বলো কী! তোমার পেটে পেটে এত! এখন বলো হাতের লেখা ঐ মেয়েটির বুঝলে কী করে?”

“নিজে যেহেতু শিক্ষকতা করি, তাই বিভিন্ন হাতের লেখা দেখতে দেখতে একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাই বুঝেছিলাম যে, এটি একটি কিশোরী মেয়ের হাতের লেখা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর আমার সন্দেহ দূর করেন ওসি সাহেব ও ঐ মেয়েটির স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহোদয়। ওখান থেকেই এই বাড়ির খবর জানতে পারি। জানতে পারি এই হাতের লেখা যার সে চেয়ারম্যান সাহেবের মেয়ে। তখন শওকত ভায়ের সেই উল্টো ঝুলে থাকা মেয়ে আর আমাদের বৌ সাজে থাকা মেয়ের কথা মাথায় আসে। আর বাকিটা তো আপনাদের সামনেই ঘটল।”

শওকত এতক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল, “আর ঐ রাতের বাথরুমের কল খুলে যাওয়ার ব্যপারটা?”

বারী মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা আমি বলব, নাকি তুমিই বলবে?”

মেয়েটি বলল, “আসলে বাথরুমের কল সব প্যাঁচ কাটা। ঘুরালে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে। আপনি যখন বন্ধ করছিলেন কলগুলোকে তখন শব্দ হচ্ছিল, আর সেই শব্দ শুনে ছাদের উপর থেকে আমি পানির ট্যাংকের চাবি ঘুরিয়ে পানি বন্ধ করে দিচ্ছিলাম। আবার আপনি যখন বিছানায় শুয়ে পড়ছিলেন তখন আমি আবার পানির ট্যাংকের চাবি ঘুরিয়ে পানি ছেড়ে দিচ্ছিলাম। আপনি মনে করেছিলেন ভুত।”

শওকত ব্যাখ্যা শুনে এবার শান্তি পেল মনে।

মেয়েটি বলল, “আমাদের ক্ষমা করে দিন স্যার।”

বারী বলল, “পুলিশ কি করবে জানি না। তবে আমি রেকমেন্ড করব এই গ্রামবাসিকে না ধরে ঐ পর্যটন গ্রপকে ধরেন। আর হেডস্যার পুরো ঘটনাটি লিখে পত্রিকায় পাঠাবেন আশা করি। তাতে গ্রামবাসি আর এই পরিবারের উপকার হবে। এরা গ্রামটিকে রক্ষা করতে অনেক চেষ্টা করেছে ও শ্রম দিয়েছে।”

হেডস্যার বললেন, “নিশ্চয়। নিশ্চয়।”

সব ঘটনা শেষে বারী, হেডস্যার, শওকত ও টিনা ফিরে গেল। চেয়ারম্যান সাহেব, হোটেলওয়ালী ও তাঁদের মেয়েটি ওদের বিদায় দিল চোখের জলে।



রাকসান্দ কামাল


error: Content is protected !!