দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ১২



এলিফ শাফাক (Turkey: Elif Şafak; English: Elif Shafak) একজন টার্কিশ-বৃটিশ লেখিকা। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ছোটবেলা কাটে মাতৃভূমি তুরস্কে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। ঔপন্যাসিক এলিফকে তুরস্কের সর্বাধিক পঠিত নারী লেখক হিসাবে গণ্য করা হয়। টার্কি ও ইংরেজিতে এ পর্যন্ত এলিফের মোট উনিশটি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার বারটিই উপন্যাস।  ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস THE FORTY RULES OF LOVE প্রকাশের প্রথম মাসে দেড় লক্ষ কপি বিক্রি হয়। বলা হয়ে থাকে, এটিই তুরস্কের কোন লেখকের সর্বাধিক বিক্রিত বই। বিবিসি (BBC) একশটি উপন্যাসকে বাছাই করেছিল, যেগুলো পৃথিবীকে একটা রূপ দেয়, দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ তার মধ্যে অন্যতম।

অকালবোধনের পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি বাংলায় অনুবাদ করছেন কবি, অনুবাদক আকিল মোস্তফা। অনুবাদটি অকালবোধনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।


পূর্বের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


 


লজ্জায় আমার গাল লাল হয়ে গেল, এ ধরণের অনভিপ্রেত প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমি চুপ থাকলাম। যা বুঝলাম, তা হল আমার এই এই লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়াটাই ছিল তার জন্য উত্তর।
যখন কান্নাকাটি করেও তাদের প্রতিরোধ করতে পারছিলাম না, তখন ভ্রমণকারী সঙ্গীদের মাঝ থেকে একজনও এগিয়ে আসেনি। ডাকাতরা আমাকে অবাক করে ঘন জঙ্গলের মাঝে এক গ্রামে নিয়ে গেল, যেখানে নারী, শিশু, হাঁস-মুরগী, ছাগল, শুকর সবই আছে। একমাত্র অপরাধীদের অবস্থান ছাড়া এটিকে এক আদর্শ গ্রাম বলেই মনে হচ্ছিল।
শীঘ্রই আমি ডাকাত সর্দারের আমার কুমারীত্ব নিয়ে প্রশ্নের কারণ বুঝতে পারলাম। গ্রামের প্রধান জ্বর সহ মারাত্মক অসুস্থ। দীর্ঘদিনের চিকিৎসার পরও সারা শরীরে লাল ছোপ ছোপ দাগ নিয়ে এখনো শয্যাশায়ী। এরইমধ্যে কেউ একজন তাকে বুঝিয়েছে যে, সে যদি কোন কুমারী মেয়ের সাথে রাত্রিযাপন করে তাহলে তার শরীরের অসুখ অই কুমারী মেয়ের শরীরে চলে যাবে এবং সে সুস্থ হবে।
এরপর অই জঙ্গলে থাকাকালীন আমার জীবনের ঘটনাগুলো আমি কোনভাবেই আর মনে করতে চাই না। এমনকি আজও যখন আমার মনের মধ্যে অই জঙ্গলের স্মৃতি আসতে চায়, আমি শুধুই জঙ্গলে থাকা পাইন গাছগুলোর কথাই ভাবতে চাই। গ্রামের মহিলা ও মেয়েদের সঙ্গে আমি গাছগুলোর নিচে একা বসে থাকাটাই তখন পছন্দ করতাম। সেখানে নিজের ইচ্ছায় আসা কিছু বেশ্যাও অবশ্য ছিল। আমি বুঝতেই পারছিলাম না কেন তারা এখান থেকে পালিয়ে যাচ্ছে না। মনে মনে ঠিক করলাম একদিন পালাব।
এই জঙ্গলের মাঝদিয়ে অনেক গাড়ি যায়, যার বেশীরভাগই ধনীদের ও সমাজের উঁচু স্থানীয়দের। কিন্তু আমি ততদিন বুঝতে পারিনি ওগুলো কেন ডাকাতি হয় না। যতদিন আমার জানা ছিল না ওগুলো এখান দিয়ে যাবার জন্য ডাকাতদের আগে থেকেই উৎকোচ দিয়ে রাখতে, যাতে ফেরার সময়ও কোন সমস্যা না হয়। অবশেষ পুরা চক্রটা বুঝতে পেরে মনে মনে আমার পরিকল্পনা ঠিক করলাম।
একদিন এখান দিয়ে যাওয়া এক গাড়ির চালককে কাকুতি-মিনতি করে অনুরোধ করলাম আমাকে সাথে নেয়ার জন্য। সে রাজি হলেও বিনিময়ে এমন অর্থ চাইল যদিও সে জানত আমার পক্ষে তা দেয়া সম্ভব না। অপারগ আমি বুঝলাম কিসের বিনিময়ে তাকে রাজি করাতে হবে, আমার একমাত্র সম্পদ, আমার সৌন্দর্য।
দীর্ঘযাত্রা শেষে কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছে বুঝলাম সেই পতিতারা কেন পালাতে চায়নি, বাজে অসভ্য নিষ্ঠুর এক শহর এই জায়গা। আমার বর্তমান অবস্থায় আর খালাকে খোঁজার চেষ্টা করলাম না। জানতাম তার মত একজন নিষ্ঠাবান নারী আমাকে পছন্দ করবেন না। আমার দ্বায়িত্ব এখন আমাকেই নিতে হবে। অতঃপর এই শহরটা আমার আত্মা আর শরীরকে নষ্ট করতে খুব বেশী সময় নেয়নি। তারপর আমি যেন হঠাতই অন্য এক দুনিয়ার সামনে চলে আসলাম যে পৃথিবী ভরপুর জিঘাংসা, ধর্ষণ, নিষ্ঠুরতা আর রোগ দিয়ে। পরপর কতগুলো গর্ভপাত করার পর আমার অবস্থা এতই খারাপ হল যে আমি চিরদিনের জন্যই গর্ভধারন করার ক্ষমতা হারালাম।
এই শহরের রাস্তায় আমি এমন কিছু প্রত্যক্ষ করলাম, যা বর্ণনা করার ভাষা আমার জানা নাই। এই শহর ত্যাগ করে পরে আমি সৈন্য, অভিনেতা, যাযাবরদের সাথে তাদের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। এরই মধ্যে জ্যাকল হেডের সাথে আমার দেখা হলে সেই আমাকে কোনিয়াতে তার পতিতালয়ে নিয়ে আসল। আমার সুন্দর স্বাস্থ্যের জন্য দলপতির আমি কোথায় থেকে আসছি তা নিয়ে কোন আগ্রহ ছিল না। বরঞ্চ সে শুনে খুশী হল আমার কোন বাচ্চা-কাচ্চা নাই এবং এই নিয়ে তাকে কোন ঝামেলাও পোহাতে হবে না। বাঁজা বিধায় সে আমার নতুন নাম রাখল ‘ডেজার্ট ’। আর নামটাকে আরেকটু মাহাত্ম্য দিতে তার সাথে ‘রোজ’ যোগ করল। তাতে অবশ্য আমি কোন আপত্তি করলাম না, যেহেতু গোলাপ আমার পছন্দ।
নিয়তি বলতে আমি যা বুঝি, যেমন একটা লুকানো গোলাপ বাগান যেখানে আমি ঘুরে ঘুরে ফুলের গন্ধ নিচ্ছি কিন্তু তার ভেতরে ঢুকতে পারছি না। পুনরায় খোদাকে আমার বন্ধু হিসেবে পাবার আশায় বাগানের মধ্যে ক্রমাগত ঘুরে বেড়াচ্ছি। আশা এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে একদিন হয়তো বা বাগানে প্রবেশের রাস্তাও খুঁজে পাবো।



সেস্যামকে নিয়ে আমি যখন মসজিদে পৌঁছলাম আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে সব বয়সের ও সব পেশার মানুষদের দিয়ে প্রত্যেকটা কোণা ভরে আছে, এমনকি যেখানে মহিলাদের বসার স্থান নির্ধারিত, সেটাও। আমি যখন ভিতরে প্রবেশের আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম তখনই দেখলাম একজন ভিক্ষুক তার বসার স্থান ছেড়ে উঠে আসার চেষ্টা করছে। আর দেরী না করে আমি তার বসার স্থান দখল করার চেষ্টা করলাম। সেস্যাম বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করতে থাকল।
রুমির বক্তৃতা শুনতে মসজিদ ভর্তি লোকজনের মাঝে নিজেকে অবস্থান করে দিতে পেরে ভালো লাগলো। মসজিদের লোকজন যদি টের পেয়ে যায় যে তাদের মধ্যে একজন মহিলা তাও আবার পতিতা বসে রুমির বক্তৃতা শুনছে তাহলে কী হতে পারে আমি ভাবতেই পারছিলাম না। এসব আজেবাজে চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে আমি রুমির বক্তৃতায় মনোনিবেশ করলাম। রুমি বলতে লাগলেন, ‘খোদা দুঃখ-দুর্দশা কে সৃষ্টি করেছেন যেন আনন্দকে তার বিপরীতে আমরা অনুভব করতে পারি। আসলে প্রত্যেকটা বিষয় বা জিনিসই তার বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই সঠিকভাবে প্রকাশিত হয়। যেহেতু খোদা এক ও অদ্বিতীয় তাঁর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই তাই তিনি লুক্কায়িত থাকেন’। বক্তৃতা দেওয়ার সময় তাঁর কণ্ঠের ধ্বনি যেন পাহাড় থেকে নেমে আসা গলিত তুষারের ঝর্ণার পানির মতো ওঠানামা করছিল। তিনি বলতে লাগলেন, ‘বেহেশতের মহিমা আর পৃথিবীর নীচতার দিকে খেয়াল করে দেখুন। পৃথিবীর সর্বত্রই দেখতে পাবেন বন্যা, খরা, যুদ্ধ ও শান্তি। যাই ঘটুক না কেন ভুলে যাবেন না প্রতিটা সৃষ্টি কিংবা ঘটনার পেছনে সৃষ্টিকর্তার কোন না কোন কারণ থাকে, সে হোক ক্রোধ কিংবা সহনশীলতা, সততা কিংবা চাতুরী’।
বসে বসে আমিও ভাবছিলাম আমার জীবনে এখন পর্যন্ত যা যা ঘটেছে তার প্রতিটার পিছনেই কোন না কোন কারণ ছিল। আমার মায়ের গর্ভবতী হওয়া, তার গর্ভে আমার ভাইদের অসহনীয় একাকীত্ব এবং পারস্পরিক যুদ্ধ, এমনকি আমার পিতা এবং সৎ মা খুন হওয়া, জঙ্গলের মধ্যে আমার অসহনীয় দিন এবং এই কনস্টান্টিনোপলের রাস্তায় যত নিষ্ঠুরতা আমি দেখেছি তার প্রত্যেকটাই আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনায় কিছু-না-কিছু ছাপ তার মত করে রেখে গেছে। প্রত্যেকটা কষ্টের পিছনে বড় কোন উদ্দেশ্য থাকে, আমি হয়তো এখনো তা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারিনি কিন্তু অনুভব করতে পারি আমার সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে। আমার মায়ের রুটি বানানোর দৃশ্যটা আমার মনের ভিতর ভেসে উঠলে আমি আনন্দের সাথে খেয়াল করি একটা শান্তির ঢেউ আমার উপর থেকে নিচে নেমে যাচ্ছে।



বিজ্ঞাপন | দশে কুড়ি: সিনেমা

ভিক্ষুক হাসান

কোনিয়া, অক্টোবর ১৭, ১২৪৪

ম্যাপল গাছের নিচে বসে শরীরের বিভিন্ন স্থানে চুলকানির কারণে বিরক্ত লাগছিল। রঙের অতিগোছানো কথাবার্তা ভালো লাগছিল না, কষ্ট বা দুর্দশার সে কতটুকুইবা বোঝে? মিনারের ছায়াটা রাস্তার দিকে আড়াআড়ি হয়ে কিছুটা ঝুঁকেছিল। আমার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া পথিকের দিকে আধখোলা ঢুলুঢুলু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলাম এরই মধ্যে একজন অচেনা দরবেশের দিকে চোখ পড়তেই আমার ঘুম টুটে গেল। কালো রংয়ের ছিন্ন বস্ত্র, হাতে বেশ বড়সড় একটা ঝোলা, এক কানে দুল পরিহিত ও দাড়িগোঁফহীন একদমই অন্যরকম দেখতে একজন দরবেশের উপরে চোখ পড়ল। সে দেখতে অন্য সবার থেকে এতটাই ভিন্ন ছিল যে আমি তার উপরে কোনভাবেই দৃষ্টি স্থির রাখতে পারছিলাম না।
তাঁর দৃষ্টি ডানে-বাঁয়ে এতটাই দ্রুততার সাথে ঘুরছিলো যে আমাকে খেয়াল করতে তার খুব বেশি সময় লাগল না। প্রথমবার আমাকে দেখে সাধারণ মানুষ যেভাবে আমাকে বা আমার অবস্থাকে অবজ্ঞা করে এড়িয়ে যায়, সে তা না করে উল্টো বুকে হাত দিয়ে আমাকে এমনভাবে অভিবাদন জানাল যেন সে আমার বহুদিনের চেনা। খুবই অবাক হয়ে আমি এদিক ওদিক তাকাতে থাকলাম, বোঝার চেষ্টা করলাম সে আমাকে নাকি অন্য কাউকে এই অভিবাদন জানাল। কিন্তু সেখানে আমি আর ম্যাপল গাছ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। হতভম্ব আমি বিহ্বল হয়ে তাঁকেও বুকে হাত দিয়ে অভিবাদন জানালাম।
দরবেশ ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকল। আমি আমার দৃষ্টি নত করে নিলাম। আশা করছিলাম যে সে আমার খালায় একটি কপারের কয়েন দিবে অথবা একটুকরো রুটি দিবে, কিন্তু সে তা না করে উল্টো হাঁটু মুড়ে বসে আমার চোখের দিকে চোখ রেখে তাকাল।
সে বলল, ‘সালামুন আলাইকুম, ভাই’।
প্রত্যুত্তরে আমিও ওয়ালাইকুম সালাম বললাম। কিন্তু নিজের কন্ঠ নিজের কাছেই কেমন অদ্ভুত ও খসখসে শোনালো। অনেকদিন হয়ে গেল আমি ভুলতেই বসেছিলাম অন্যের সাথে কথা বলতে গেলে আমার কন্ঠস্বর কেমন শোনায়।
সে নিজেকে তাবরীজের শামস হিসাবে পরিচয় দিয়ে আমার নাম জানতে চাইল।
হাসতে হাসতে তাঁকে বললাম, ‘আমার মত মানুষের নাম দিয়ে কি কাজ?’।
সে প্রতিবাদ করে বলল, ‘তা হয় না। প্রত্যেকেরই একটা নাম অবশ্যই থাকে। যেখানে সৃষ্টিকর্তার অসংখ্য নাম রয়েছে, যদিও আমরা তাঁর নিরানব্বইটা নাম জানি মাত্র। আর খোদারই যদি অসংখ্য নাম থাকে তবে তাঁরই সৃষ্টি মানুষের কেন নাম থাকবে না?’।
কী উত্তর হতে পারে বুঝতে না পেরে আমি চুপ করে গেলাম। উল্টো স্বীকার করে তাঁকে বললাম, ‘একসময় আমার মা ও স্ত্রী ছিল, যারা আমাকে হাসান নামে ডাকত’।
তাহলে তোমাকে হাসান নামে ডাকা যেতে পারে, এই বলে সে আমাকে পুনরায় সম্ভাষণ করল। তারপর সে আমাকে ভীষণ অবাক করে একটা রূপোর আয়না দিয়ে বলল, ‘এটা রাখ। বাগদাদে থাকাকালীন একজন অসম্ভব ভাল মানুষ আমাকে এই আয়নাটি দিয়েছিল। এটি আমার থেকেও তোমার বেশি কাজে লাগবে।এর মাধ্যমে তুমি নিজের মধ্যে খোদার অস্তিত্বকে টের পাবে’।
তাঁকে কিছু বলার আগেই পেছন থেকে একটা হৈ-হট্টগলের আওয়াজ পাওয়া গেল। প্রথমে ভেবেছিলাম মসজিদের ভিতরে হয়তো কোন পকেটমার ধরা পড়েছে কিন্তু যখন চেঁচামেচি ক্রমাগত বাড়তেই থাকল তখন বুঝলাম এটা পকেটমার না অন্য কিছু হবে। ধারণা করলাম আরো বড় কিছু ভয়ঙ্কর কিছু হবে কেননা পকেটমারের কারণে এমন ভয়ঙ্কর চেঁচামেচি হওয়ার কথা নয়।
শীঘ্রই বুঝা গেল শহরের একজন অতি পরিচিত পতিতা পুরুষের পোশাকের এসেছে বক্তৃতা শুনতে। একদল লোক তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে আনতে আনতে চিৎকার করে বলছিল, ‘এই প্রতারককে মারো! এই বেশ্যাকে মারো!’।
উত্তেজিত জনতা যখন রাস্তায় নেমে আসলো তখন আমি পুরুষের পোশাক পরা মেয়েটিকে দেখতে পেলাম তার মুখ মৃত মানুষের মত পান্ডুর আর বাদামী চোখ দুটো ভীতসন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিলো। জনতার রোষে পতিত ব্যক্তিকে হেনস্থা হতে এর আগেও আমি বহুবার দেখেছি। আমি আর অবাক হই না, কেননা উত্তেজিত জনতার যে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন হতে খুব একটা সময় লাগে না। চারুশিল্পী, বিক্রেতা অথবা ফেরিওয়ালাদের মত সাধারণ মানুষও যাদের পূর্বের কোন সন্ত্রাসের অভিজ্ঞতাই নেই তারাও এই ধরনের হত্যাযজ্ঞে যখন সবাই একসাথে থাকে, খুবই হিংস্র হয়ে ওঠে। এই ধরনের জনরোষ সাধারণত শেষ হয়ে থাকে কোন হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যেটা দিয়ে অন্যদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করা হয়।
তাবরিজ এর শামসের উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বললাম, হায়রে মেয়েমানুষ। কিন্তু তার উত্তরের প্রত্যাশায় ফিরতেই দেখলাম সে সেখানে নেই।
পরে দরবেশকে দেখলাম তীরের বেগে সেই ভিড়ের মধ্যে ছুটে যেতে যেন আকাশের দিকে ছুঁড়ে মারা কোন তির। দেরী না করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম আর তীব্রবেগে তাঁর দিকে ছুটে গেলাম তাকে ধরার জন্য।
উন্মুক্ত জনতার নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তির কাছাকাছি পৌছে তাঁর হাতের ঝোলাটাকে পতাকার মত উঠিয়ে চিৎকার করে বলল, ‘থাম তোমরা, স্থির হও’।
হতভম্ব এবং হঠাৎ করে চুপ হয়ে গিয়ে লোকজন অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালো।
হাতে ধরা ঝোলাটা কে মাটিতে সজোরে রেখে তাবরিজের শামস চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘এটা কি ন্যায্য হলো, একজন মহিলার বিপক্ষে ৩০ জন পুরুষ, তোমাদের লজ্জা থাকা উচিত’।
চৌকো মুখাবয়বের দশাসই চেহারার একজন, দেখে মনে হচ্ছিল উৎসুক জনতার নেতৃত্ব সে-ই দিচ্ছে, অলস দৃষ্টি নিয়ে বলল, ‘ন্যায় বিচারের অধিকার তার নাই’। তাকে আমি সাথে সাথেই চিনতে পারলাম, সে আসলে বেবার নামে একজন চৌকিদার। এই শহরের সকল ব্যক্তি তার নিশ্চয়তা আর লোভের সাথে পরিচিত।
বেবার বলল, ‘এই মহিলা পুরুষ সেজে এই মসজিদে একজন ভালো মুসলিম এর ভাব নিয়ে বসেছিল’।
অবজ্ঞা ভরা কন্ঠে তাবরীজের শামস জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কি কোন পাপ? তাহলে কি তুমি বলতে চাচ্ছ মসজিদে আসার জন্য তুমি কাউকে শাস্তি দিতে পারো?’।
তাঁর এই প্রশ্ন জনতার উত্তেজনাকে হঠাৎই যেন ঘুম পাড়িয়ে দিল। আসলে কেউ বুঝতেই পারেনি পুরো বিষয়টাকে এভাবেও ভাবা যেতে পারে।
একজন চিৎকার করে বলল, ‘সে একজন পতিতা মসজিদে তার কোন স্থান হতে পারে না’। বলার সময় রাগে তার মুখ টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করল।
জনতার প্রশমিত উত্তেজনাকে আবারও চাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তার এই কথা কয়টি যথেষ্ট ছিল। কিছু লোক একযোগে বেশ্যা! বেশ্যা! বলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে তার বিচার চাইতে লাগলো।
এরইমধ্যে অতিউৎসাহী এক যুবক দৌড়ে এসে মেয়েটির মাথার পাগড়ী ধরে জোরে জোরে ঝাঁকাতে লাগলো। জোরে ঝাঁকানোর কারণে মেয়েটির মাথার পাগড়ী আলগা হয়ে আসতেই সূর্যমুখীর মত তার দীর্ঘ রেশমি চুল ঢেউ খেলিয়ে নেমে আসল। উন্মোচিত তার যৌবন আমাদেরকে এতটাই বিহ্বল করে দিল যেন দম বন্ধ হয়ে যাবে।
শামস খুব সম্ভবত সম্মিলিত জনতার মিশ্র অনুভূতিকে বুঝে থাকবে তাই সে বলে উঠল, ‘ভাই সকল, তোমরা সত্যিই কি তাকে অপমান করতে চাও নাকি ভালবাসতে চাও?’।
এই কথা বলতে বলতেই দরবেশ তার হাত ধরে টান দিয়ে তার দিকে নিয়ে আসলো এবং জনতার থেকে দূরে সরিয়ে নিল। পতিতা তার পিছনে এমন ভাবে অবস্থান নিল যেন ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে তার মায়ের স্কার্টের পিছনে লুকাচ্ছে।
জনতার গুঞ্জনকে ছাপিয়ে উচ্চকিত কন্ঠে নেতৃত্বদানকারী সেই লোক বলে উঠলো, ‘ভুল করছ তুমি। একজন বহিরাগত হিসাবে তুমি আমাদের শহরের নিয়মকানুন জান না। ভালো হয় তুমি যদি এর থেকে দূরে থাক’।
মধ্যে কেউ একজন বলে উঠল, ‘কী ধরনের দরবেশ হে তুমি! একজন বেশ্যার হয়ে কথা বলার থেকে ভাল কোন কাজ কি তোমার কাছে নেই?’।
কিছুক্ষণের জন্য তাবরিজের শামস চুপ করে থাকল যেন প্রশ্নটা তাঁকে ভাবাচ্ছে। কোন ধরনের উত্তেজনা না দিয়ে সে বরং অবিচল স্থিরতায় বলে উঠলো, ‘কিন্তু সে যে একজন নারী এটা তুমি প্রথমে কিভাবে বুঝতে পারলে? তাহলে তুমি মসজিদে যাচ্ছ খোদার জন্য অথচ খোদার প্রতি ধ্যান না দিয়ে তুমি অন্য দিকে মনোযোগ দিচ্ছ। তুমি যদি সত্যি সত্যি খোদাবিশ্বাসী হয়ে থাক, তাহলে মসজিদে কখনই তোমার মনোযোগ কোন নারীর দিকে যেতে পারে না এমনকি সে যদি উলঙ্গও থাকে । তাহলে তোমার এখন উচিত মসজিদে ফিরে গিয়ে বক্তৃতা শোনায় মনোনিবেশ করা, যেটা হবে এই মুহুর্তের জন্য সবচেয়ে উত্তম কর্ম’।
কেমন অপ্রতিভ এক নীরবতা নেমে এলো রাস্তায়। শুকনো পাতারা এদিক ওদিক উড়ে বেড়াচ্ছিল আর এ ছাড়া তাদের কিছু করারও ছিল না।
জনতার দিকে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নেড়ে তাবরিজের শামস বলে উঠল, ‘অনেক হয়েছে এবার মসজিদে ফিরে যাও বক্তৃতা শুনতে’।
তাদের সবাই যে ফিরে গেল ঠিক তা নয় কিন্তু কিছুটাতো পেছালো অবশ্যই যেন অনেকটা দ্বিধান্বিত এবং হতচকিত কী করা যায় এই ভেবে। তাদের কেউ কেউ মসজিদের দিকে এমন ভাবে ফিরে তাকালো যেন মসজিদে ফিরে যাওয়াটাই উত্তম হবে। এর মধ্যে সেই পতিতা মেয়েটাও কিছুটা সাহস ফিরে পেল এবং দরবেশের পেছন থেকে বের হয়ে আসল আর পায়ের জুতো জোড়া পরে চুল উড়িয়ে দ্রুততম সময়ে সে নিকটতম পাশের গলিতে চলে গেল।
জনতার মধ্যে থেকে মাত্র দুইজন লোক তাকে তাড়া করার চেষ্টা করল কিন্তু তাবরীজ এর শামস তাদের পথরোধ করে দাঁড়িয়ে এতটাই ক্ষিপ্রতায় তাঁর হাতের ঝোলাটা তাদের দিকে নিক্ষেপ করল যে তারা তাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কিছু মানুষ এ দৃশ্য দেখে হেসে গড়াগড়ি খেল, আমিও।
লজ্জিত এবং বেকুব হওয়া লোক দুজন কোনমতে উঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের স্বাভাবিক করতে করতে সেই পতিতা মেয়েটি তাদের থেকে অনেক দূরে চলে গেল আর দরবেশও রাস্তায় হাঁটা দিল যেন এখানে তাঁর কাজ শেষ আর কিছু করার নেই। (চলবে)



অনুবাদ করছেন কবি আকিল মোস্তফা


পরবর্তী অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন



One thought on “দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ | পর্ব: ১২

Comments are closed.

error: Content is protected !!