মান কথ্যবাংলা ও আমাদের লেখনরীতি



ভাষার লিখিত রূপের সৃষ্টি অনুপস্থিতি’র প্রতিনিধি হিসাবে। যে উপস্থিত সে নিজেই মুখের ভাষায় তার প্রকাশ করতে পারছে। কিন্তু যে সামনে হাজির নাই তার না-কওয়া কথা প্রকাশের জন্য দরকার অন্য কিছু। এ থেকেই ধাপে ধাপে মার্কা, ছবি, প্রতীক আর অক্ষরের ব্যবহার শুরু। তার থেকে শত শত বা হাজার বছরের রূপান্তরে মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছে আধুনিক লেখন পদ্ধতির।

লেখার সূচনা বহু আগের ঘটনা। চীনসহ কয়েকটি দেশে পাওয়া গেছে এমন পুরানা নিদর্শন যাতে আঁকা কিছু ছবি ও প্রতীককে লেখার প্রতœ-রূপ মনে করা হচ্ছে। এগুলোর কোন কোনটার বয়স খ্রিস্ট পূর্ব সাত হাজার বছরের কাছাকাছি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এখন পর্যন্ত মেসোপোটামিয়া সভ্যতার লেখন পদ্ধতিই তর্কাতীতভাবে সবচেয়ে পুরানা বলে ধরে নেয়া হয়, যার কাল নির্ধারিত হয়েছে খ্রি.পূ. ৩৪০০-৩১০০।১২   লেখার শুরু যখনই হোক এর উদ্দেশ্য ছিলো প্রতিনিধিত্বই। এজন্য লেখার অন্তত তিনটা বৈশিষ্ট থাকা দরকার: এর মধ্যে কোন সম্পূর্ণ কথা/বক্তব্য/অর্থ থাকবে ও তার উদ্দেশ্য থাকবে, এসব কথার বদলি হিসাবে নির্দিষ্ট কিছু প্রতীক থাকবে এবং সেইগুলা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কায়দায় সাজানো থাকবে, আর এইসব প্রতীক মিলে মুখে উচ্চারিত কোন শব্দ/শব্দগুচ্ছের আওয়াজী অনুকরণের সর্বজনগ্রাহ্য ইঙ্গিত দিবে যাতে দর্শক/পাঠক সেগুলোকে আবার প্রায় কাছাকাছি রূপে উচ্চারণ করতে পারে। ৩ লেখার এই শেষ দিকটার উপর আমি জোর দিতে চাই।

সংগঠিত ও সুষ্ঠ লেখন পদ্ধতি বানিয়ে নেয়ার পর মানুষ অনুপস্থিতকে অন্যের কাছে হাজির করার সুযোগ পেল। সে যা বলতে চায় সেটি সে প্রতীকের মধ্যে জড়িয়ে দেয়। অন্য মানুষটি সেটি দেখে বা পাঠ করে প্রায় হুবুহু তার মত করে শব্দগুলো আওড়ায় আর এভাবে তার কথা বুঝে নেয়। শব্দ আওড়ানোর কাজটা আওয়াজবিহীনও হতে পারে, সে মনে মনে পড়তে পারে। কিন্তু যাই করুক, লেখার উদ্ভব হয় একজনের মনের কথা লিখিতভাবে প্রকাশ করার পর আরেকজন যাতে বুঝতে পারে সে জন্যই। লেখার প্রাথমিক নমুনাগুলো তাই প্রমাণ করে। পরবর্তী স্তরের নমুনা যেমন কাব্য সৃষ্টির পর ছন্দ, উপমা, অনুপ্রাস, অলংকার ইত্যাদি এসে কবিতার ভাষাকে কিছুটা দুর্বোধ্য করে, কিন্তু সেইসঙ্গে তার প্রকাশের ক্ষমতায়ও বাড়ায়, সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্নও করে কতকটা। কবিতার পাঠ মূলত মানুষের আনন্দ আস্বাদনের সাথে জড়িত, কাজ সেখানে গৌণ।

প্রাথমিকভাবে গদ্য সৃষ্টি হয় একেবারেই আরেক কারণে, একজনের কাছে আরেকজনের কাজের কথাটা পৌঁছে দেয়ার জন্য। এ জন্য মুখের কথা কিছুটা সাজিয়েগুছিয়ে লেখার দরকার পরে। দুজনের পারস্পরিক বুঝের বিষয়টা এখানে জরুরি। নগরায়ন ও অন্যান্য কারণে মানুষের চিন্তা ও বোধ জটিল হয়। গদ্যও জটিলতা ধারণ করে। কিন্তু সবই হয় মানুষের পরিবর্তনের সাথে সঙ্গতি রেখে। কাজেই বলা যায় গদ্য মুখ্যত মুখের ভাষার অনুকরণ। ষোল সতের ও আঠার শতকের গদ্যের নমুনা তাই প্রমাণ করে। এসব গদ্য পড়লে মনে হয় যেন একজন মানুষ আরেকজনের উদ্দেশ্যে কথা বলছে।

বাংলাগদ্যের শুরুর সময়টাতে দূর্ভাগ্যজনকভাবে লেখার এই স্বভাবকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হলো, সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে সাজিয়েগুছিয়ে লেখায় রূপ দেয়ার পরিবর্তে গদ্য ‘তৈরি’ করা হল। তৈরি বলতে আমি এখানে সজ্ঞান চেষ্টায় নতুন কিছুকে বানানোই বুঝাচ্ছি। এভাবে সংস্কৃত শব্দ ও ব্যাকরণের নিয়ম ধার করে লেখা হলো এক আজব বাংলাগদ্য যা বাংলাভাষী মানুষের মুখের ভাষা নয়, সহজে বোধগম্যও নয়। ইংরেজ উপনিবেশক প্রভুর নির্দেশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বসে সে গদ্য লিখলেন একদল সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যাদেরকে বলেছেন ‘শাস্ত্রাদি অধ্যয়নকারী’ ‘সংস্কৃত ব্যবসায়ী’ ।

এমন না যে, এই পন্ডিতরা বিরাট গোপন কোন প্রকল্প বাস্তাবায়নের কথা মাথায় নিয়ে তা করেছেন। তারা বাংলা গদ্য লেখা জানতেন না, কিন্তু ফোর্ট ইউলিয়াম কলেছে চাকরি নিলেন উপনিবেশক মালিকের নির্দেশে বাংলা গদ্যের বই লেখার আর শেখানোর। তাই তাদের জানার মধ্যে সংস্কৃতের আছরে তৈরি হলে তাদের ভাষা– বঙ্কিমচন্দ্রের কথায় ‘সংস্কৃতানুযায়ী ভাষা’। ইংরেজরাও ভালো বাংলা জানে না, জানে না সারা বাংলাদেশে প্রচলিত মৌখিক ভাষার রূপটা কেমন, আঞ্চলিক ভেদাভেদ কেমন। তাই তাদের নিয়োগকৃত পন্ডিতদের পন্ডিতির উপর নির্ভর করা ছাড়া গতি নাই, আর বিশ্বাস করতেও কোন যৌক্তিক আপত্তি নাই। এর আগেই জোনস-হ্যালহেড ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে সংস্কৃতকে ভারতের সকল ভাষার মা-বাপ ঘোষণা করে বসে আছেন, তেমনি সংস্কৃতের উচ্চমূল্য সম্পর্কে তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি-অনুবাদ ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে সংস্কৃতায়িত বাংলা রচনার মধ্য দিয়ে অর্থ অর্জনের পাশাপাশি ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের আবেগের স্ফূর্তিরও সুযোগ দেখেন ফোর্ট উইলিয়ামের পন্ডিতরা। এ ছিলো তাদের কাছে সোনায় সোহাগা, আর বাংলাদের মানুষের জন্য এক বিরাট ভাষিক-সাংস্কৃতিক বিপর্যয়।

উপনিবেশী প্রভুর দরকারে আর আয়োজনে উনিশ শতকের শুরুতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা-না-জানা সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতদের হাতে যে-লেখ্য বাংলা ভাষার সূচনা হলো তা লিখিত ভাষা ও সাহিত্যকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো সাধারণ মানুষ থেকে। পরবর্তী চার-পাঁচ দশক সংস্কৃত ব্যকরণ ও শব্দ-নির্ভর এ ভাষাই পুষ্টি পেল বিদ্যাসাগর-বঙ্কিম-মধূসুদন প্রমুখের হাতে। ১৮৬০ সাল নাগাদ যে-বাংলা ভাষা আমরা পেলাম তা আর সাধারণ বাংলাভাষীর বুঝের আওতায় থাকলো না, হয়ে উঠলো নিতান্ত সংখ্যালঘু কিছু নাগরিকের লেখার ও রস আস্বাদনের জিনিষ। এই যে নতুন ভাষা তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকলো দেশের বিশেষ করে বাংলাদেশের বিপুল মানুষ। পারিবারিকসূত্রে সংস্কৃত পাঠে অভ্যস্ত থাকার কারণে এই নতুন ভাষা রপ্ত করে নিতে খুব একটা সময় লাগলো না উচ্চশ্রেণীর হিন্দুদের। কিন্তু নিম্ন শ্রেণির হিন্দু, বৌদ্ধ আর মুসলমানসহ দেশের অন্যান্য মানুষ এর বাইরেই থেকে গেল। তাদের কাছে এই ভাষা হয়ে উঠলো আজকের দিনে কোন বিদেশী ভাষা আয়ত্ত করার মত বিষয় প্রায়।

নতুন বাংলাভাষার সাথে জনমানুষের যে বিচ্ছিন্নতার কথা বললাম বাস্তবে তার মাত্রা কেমন ছিলো ? দুশো বছর পর আজ এ পর্যায়ে বসে আমরা নানা রকম বিশ্লেষণ আর যুক্তিতর্কে গিয়ে তা পুরাপুরি বুঝাতে বা বুঝতে পারব কি না সন্দেহ। তাই ঐ কালে সাধারণ মানুষের কাছে ঐ সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতদের বানানো ‘সংস্কৃতানুযায়ী ভাষা’ কেমন লাগতো তার ধারণা দেয়া দরকার সে কালের লেখকের রচনা থেকে। কবি মোহাম্মদ দানিশ কাব্য চর্চা করেছেন উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। তার লেখা কাব্যগুলো হলো চাহার দরবেশ, গোলবে ছানুয়ার, নুরুল ইমান ও হাতেম তাই। বাংলা ভাষায় কবিতা লেখার কারণ হিসাবে তিনি নিজের কৈফিয়ত তুলে ধরেন এভাবে:

চলিত বাঙ্গালায় কেচ্ছা করিনু তৈয়ার।
সকলে বুঝিবে ভাই কারণে ইহার॥
আসল বাঙ্গালা সবে বুঝিতে না পারে।
এ খাতেরে না লিখিলাম শোন বেরাদরে॥৪


পড়ুন এলিফ শাফাকের উপন্যাস দ্য ফর্টি রুলস অফ লাভ।
অনুবাদ করছেন আকিল মোস্তফা।


এ চারটি লাইনে জড়িয়ে আছে ঐ সময়ের বাংলা ভাষা বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ। প্রথম কথা হলো, তিনি দাবী করেছেন তার বইটি ‘চলিত বাঙ্গালায়’ অর্থাৎ সমাজে চলমান মুখের ভাষায় রচিত। এ ভাষাই আরো অনেক আগে থেকে আরম্ভ হয়ে দানিশের কাল পর্যন্ত এসেছে। পরের কথাটাও বিশেষ গুরুত্ববহ: ‘আসল বাঙ্গালা’ তিনি লেখতে পারেন, কিন্তু মানুষ তা বুঝতে পারে না। তাই তিনি আসল বাংলা লেখলেন না।

এই ‘আসল বাঙ্গালা’ জিনিষটাই হলো ইংরেজ মালিক আর সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত কর্মচারীর যৌথ কারিগরিতে বানানো বাংলা ভাষা, যা উনিশ শতকের শুরুতে জন্ম নিয়ে দানিশের কালে এসে নিশ্চয়ই অফিস-আদালত, ইস্কুল-কলেজ-সংবাদপত্র আর পাঠ্যপুস্তক ইত্যাদিতে পোক্তা হয়ে বসেছে। বাংলাদেশের মূল জনগোষ্ঠীর ভাষা তখনো ভিন্ন আর সে ভাষার চর্চাও থেমে নাই। এই সাক্ষ্য উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাভাষী মানুষের মুখের ভাষা ও লিখিতি ভাষার যে বিরাট ব্যবধান তুলে ধরে আমরা এ যুগে বসে তা অস্বীকার করবো কি করে?

দানিশের নির্দেশিত ‘চলিত বাঙ্গালা’কেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন বিষয়ী লোকের ভাষা যা বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষার সবচেয়ে কাছাকাছি। তিনি লিখেছেন: “আমাদের সমাজে সেকালে ভদ্র সমাজে তিন প্রকার বাঙ্গালা প্রচলিত ছিলো। মুসলমান নবাব ও ওমরাহদিগের সহিত যে সকল ভদ্রলোকের ব্যবহার করিতে হইত, তাঁহাদের বাঙ্গালায় অনেক উর্দ্দু মিশান থাকিত। যাঁহারা শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করিতেন তাহাদের ভাষায় অনেক সংস্কৃত শব্দ ব্যবহৃত হইত। এই দুই ক্ষুদ্র সম্পদ্রায় ভিন্ন বহুসংখ্যাক বিষয়ী লোক ছিলেন। তাহাদের বাঙ্গালায় উর্দ্দু ও সংস্কৃত দুই মিশান থাকিত। কবি ও পাঁচালিওয়ালারা এই ভাষায় গীতি বাঁধিত। মোটামুটি ব্রাহ্মণ পন্ডিত, বিষয়ী লোক ও আদালতের লোক এই তিন দল লোকের তিন রকম বাঙ্গালা ছিলো। বিষয়ী লোকের যে বাঙ্গালা তাহাই পত্রাদিতে লিখিত হইত, এবং নিম্ন-শ্রেণির লোকেরা ঐরূপ বাঙ্গালা শিখিলেই যথেষ্ট জ্ঞান করিত। কথক মহাশয়েরা বহুকালাবধি বাঙ্গালায় কথা কহিয়া আসিতেছেন। তাহারা সংস্কৃত ব্যবসায়ী, কিন্তু তাহারা যে ভাষায় কথা কহিতেন তাহা প্রায়ই বিশুদ্ধ বিষয়ীলোকের ভাষা।”৫  এই ভাষার আলোচনা করতে গিয়ে শ্রীপ্রমথনাথ বিশী তার বাংলা গদ্যের পদাঙ্ক বইয়ে ১১৯৪ সালে গভর্ণর জেনারেলের কাছে ভদ্রলোক বাঙালিদের লেখা এক আর্জির নমুনা তুলে ধরে লিখেছেন যে, “খুব সম্ভবত এই হচ্ছে তৎকালীন শিষ্ট সমাজের ভাষা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যাকে বলেছেন বিষয়ীলোকের ভাষা। এতে ফারসি, বাংলা, সংস্কৃত (এবং ইংরেজী) সমস্ত মিশেল ঘটেছে আর কোন একটা দিকে ঝোঁক না থাকায় ভারসাম্য ঘটে আগের নমুনাগুলোর (ধর্মীয় রচনা ও আদালতের চিঠিপত্রর) চেয়ে সরল ও সুবোধ্য হয়ে উঠেছে। আরও একটি কথা: পরবতী কালের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকদের অনেকের ভাষার চেয়ে এ ভাষা সরলতর।”৬

শাস্ত্রী মহাশয় তিন ধরণের বংলা ব্যবহাকারীর মধ্যে একটি ক্ষুদ্রতর সম্প্রদায়ের কথা বলেছেন “যাহারা শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করিতেন, তাহাদের ভাষায় অনেক সংস্কৃত শব্দ ব্যবহৃত হইত”। আমরা জানি দুর্ভাগ্যক্রমে ধর্মীয় শাস্ত্রাদি অধ্যয়নকারী এই শ্রেণীটির হাতে বাংলা বই লেখার ভার দেয় ইংরেজরা। বাংলাদেশের ভাষার কি হলো না হলো সে বিষয়ে তো উপনিবেশী শাসকের মাথাব্যথা নেই। তার প্রয়োজন ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা শেখানোর জন্য বইপত্র। তাই দানিশ বা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর নির্দেশিত যে-বাংলা বাঙালি জাতির প্রধান ভাষা ছিলো তা পাশ কাটিয়ে নতুন এক ভাষা তৈয়ার করা হলো, যার মূল উপাদান সংস্কৃত শব্দভান্ডার আর তার ব্যাকরণ। ধর্মব্যবসায়ীদের চেষ্টায় বানানো সংস্কৃত শব্দবহুল ও সংস্কৃত ব্যাকরণের দ্বারা শাসিত ‘সংস্কৃতানুযায়ী ভাষা’ হলো আমাদের লেখার ভাষা।


পড়ুন:

ভাষার বিবর্তন ও রাজনীতি


যারা উনিশ শতকের বাংলাসাহিত্যে মুসলমানের বিশেষ অবদান না-থাকার কারণ খোঁজেন তাদেরকে অনুরোধ করি আজগুবি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে না গিয়ে এই বাস্তব তথ্যে যেন নজর দেন যে, সে কালে সংস্কৃতায়িত যে-বাংলা ভাষা তৈয়ার করে চাপিয়ে দেয়া হয়, ধর্মীয় কারণে সে ভাষায় উচ্চশ্রেণির হিন্দুরা আগে থেকেই কিছুটা দক্ষ ছিলেন। তাই প্রথম দিকে তাদের হাতেই বইপত্র লেখা হয়েছে। আর মুসলমান ও  নিম্ন-শ্রেণির হিন্দু, বৌদ্ধ বা অন্য ধর্মের লোকদেরকে রীতিমত ছাত্রগিরি করে সেই ভাষা আয়ত্ত করতে হয়েছে। এ কাজে চলে গেছে অনেকটা সময়। এ জন্যই কলিকাতার উচ্চশ্রেণির হিন্দুরা ১৮৫০-৬০ সাল নাগাদই নতুন ভাষায় উল্লেখযোগ্য কিছু সাহিত্যিক গদ্য লিখে ফেলেন। কিন্তু মুসলমানের উল্লেখযোগ্য রচনা পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুুতিকালের জন্য। আরো প্রায় দুই দশক পর সেই নতুন বাংলা আয়ত্ত করে মীর মোশারফ হোসেন লিখলেন রতœবতী (১৮৬৯) উপন্যাস। কলিকাতা-নদীয়া বৃত্তের বাইরের বাংলার সবাই যে নতুন ভাষা আয়ত্ত করতে পারেন বা এ কাজে এগিয়ে আসেন তাও নয়। তখন বাঙালি মুসলমানদের নেতৃত্ব ছিলেন অবাঙালি কিছু মুসলিম এবং উর্দ্দুভাষী বাঙালি মুসলমান। তাদের অনেকে তখন পর্যন্ত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন মনে করতেন না, আরব-ইরানের অনুকরণে গড়ে উঠা উত্তর ভারতীয় মুসলিম তমুদ্দুনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তারা বাংলা ভাষার চর্চা নিরুৎসাহিত করতেন। তাদের আরেকটা দল নববাংলা শেখার ব্যাপারে উৎসাহ দিলেও রাতারাতি পরস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ ছিলো না। এসব কারণে তখন পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্য হতে খুব বেশি লেখক সৃষ্টি হয়নি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের দরিদ্র বৌদ্ধ ও নিম্ন-শ্রেণির  হিন্দুরা তো স্কুলে-কলেজে পড়াশোনা করার আর্থিক সামর্থই অর্জন করতে পারে নাই। তাই উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের চালক হয়ে থাকলো নয়া বাংলা ভাষার উদ্ভাবক কলিকাতা কেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ শ্রেণির কিছু মানুষ ও তাদের তাবেদাররা।

কিন্তু এই চালকেরা ছিলেন সংখ্যালঘু আর কলিকাতা ও দুএকটি বড় বড় নগরে মেলবন্দি। তাই সারা দেশের বিপুল সংখ্যক বাঙালির মুখের ভাষা রাতারাতি বদলে গেল না। বরং সময় সময় তার উপভাষাকেন্দ্রিক বৈচিত্রগুলো ফোর্ট-উইলিয়ামী বাংলায় হানাও দিল। যেমন প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালী ভাষার আবির্ভাব।

প্যারীচাঁদ মিত্র সে কালে প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতায়িত বাংলার বিদ্যাসাগরীয় রীতি সম্পূর্ণ উপক্ষা করে কলিকাতা-নদীয়া ও আশপাশের অঞ্চলের বাঙালির মুখের ভাষার কাছাকাছি রীতিতে লিখলেন আলালের ঘরের দুলাল উপন্যাস (১৮৫৮)। বঙ্কিমচন্দ্রের মত মানুষও আলালী রীতি সম্পর্কে বলতে বাধ্য হলেন, “উহাতে গাম্ভীর্যের এবং বিশুদ্ধির অভাব আছে এবং উহাতে অতি উন্নত ভাব সকল, সকল সময়ে পরিস্ফুট করা যায় কি না সন্দেহ। কিন্তু, উহাতেই প্রথম এ বাংলাদেশে প্রচার হইল যে, যে-বাংলা সর্বজনমধ্যে কথিত এবং প্রচলিত তাহাতে গ্রন্থ রচনা সুন্দরও হয় এবং যে সর্বজনহৃদয় গ্রাহিতা সস্কৃতানুযায়ী ভাষার পক্ষে দুর্লভ, এ ভাষার তাহা সহজ গুণ”।৭

বঙ্কিম বাবুর প্রবল ‘সংস্কৃতানুযায়ী ভাষায়’ লেখা উদ্ধৃত অংশটুকুর মর্ম পরিষ্কার করে বোঝার জন্য এর অর্থ স্বাভাবিক বাংলায় অনুবাদ করে এভাবে লেখার লোভ সামালাতে পারছি না:

বঙ্কিম বলছেন,

১। আলালী রীতিতে গাম্ভীর্যের ও শুদ্ধির অভাব এবং তা উন্নত ভাব প্রকাশের যোগ্য না।

২। “আলালের ঘরের দুলাল” উপন্যাসের গদ্যরীতি সকলের (জনমানুষের) মুখের ভাষা। (সুতরাং বিদ্যাসাগরীয় ও বঙ্কিমীয় রীতি মানুষের মুখের ভাষা না।)

৩। সবাই জানলো যে, যে-ভাষা সবাই মুখে বলে সেই ভাষায় বই লেখলে তা সুন্দর হয়।

৪। বঙ্কিম-বিদ্যাসাগর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বানানো সংস্কৃতায়িত যে-বাংলায় লেখেন সেই ভাষা সবাই সহজে বুঝতে পারে না।

৫। মুখের ভাষার স্বাভাবিক গুণ হলো এ ভাষা সবাই বুঝতে পারে।

প্যারীচাঁদের পর কালীপ্রসন্ন সিংহ তার হুতোম প্যাঁচার নকশা’য় আরেকবার কলিকাতা শহরের মৌখিক ভাষারীতি নিয়ে এলেন। এ ভাষারও প্রশংসা হলো, এখনো হয়। কিন্তু স্থায়ী লেখনরীতি হিসাবে তা প্রসার পেল না। এর বড় কারণ প্যারীচাঁদ মিত্ররা যখন নদীয়া-কলিকাতার মুখের ভাষা অবলম্বনে বাংলা লেখার চেষ্টা করছেন তখন কলিকাতা কেন্দ্রিক উচ্চশ্রেণির হিন্দুর হাতে স্কুল-কলেজ, পত্রপত্রিকা, স্কুল বুক সোসাইটি, মুদ্রণযন্ত্র জাতীয় সব নিয়ামক প্রতিষ্ঠান। তাদের উদ্ভাবিত বাংলায় দেদার বই পত্র লেখা হচ্ছে, স্কুলগুলোতে অনিচ্ছুক ছাত্ররা তা পড়তে বাধ্য হচ্ছে। কলিকাতার সমাজ তখন নিয়ত তাদের দ্বারা উদ্ভুত আন্দোলন আলোড়নে বেসামাল। সেই সমাজের প্রভাব ছড়াচ্ছে মফস্বলের দিকেও। তাই সংস্কৃতায়িত বাংলার প্রসার অব্যাহত থাকে। মিত্র বা সিংহের রীতি টিকে নাই।

বরং পুরা উনিশ শতক ধরে রাজা রামমোহন রায়,  ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত, রাজনারায়ন বসু, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, কালীপ্রসন্ন ঘোষ, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ‘সংস্কৃতানুযায়ী ভাষা’র যথেষ্ট উন্নতি সাধন ও প্রসার প্রচার করে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা দিতে সক্ষম হন। জোর চেষ্টার মধ্য দিয়ে এ স্রোতে শামিল হতে পারেন কিছু মুসলমানও। এদের মধ্যে মীর মোশারফ হোসেন, রেয়াজউদ্দীন আহমদ মাশহাদী, শেখ আবদুর রহিম, মোহাম্মদ মেজাম্মেল হক, মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ  মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর নাম উল্লেখযোগ্য।

এদের কেউ কেউ আবার বাংলাদেশের মুখের ভাষার পক্ষে মিনেমিনে স্বরে আলাপ তোলার চেষ্টাও করেছেন। যেমন আবুদল হামিদ খান ইউসুফজয়ী উদাসী কাব্যের ভূমিকায় লেখেন, “বাস্তবিক বাঙ্গালীদের বাঙ্গালীত্ব প্রাণের ভিতরের প্রশংসাংর্হ ও উল্লেখযোগ্য যে সকল খাঁটি জিনিষ আছে তন্মধ্যে দেশীয় প্রাচীন সঙ্গীতও একটি। প্রকৃত প্রস্তাবে সাদাসিদে সরল ভাবের গ্রাম্য সঙ্গীতগুলিই জাতীয় ভাষার প্রাণ…।”৮  বিদেশী সাহিত্যের ভাবাদর্শ নয়, তিনি সরল গ্রাম্য ভাষা ও পরিমার্জিত সাধু ভাষার সংমিশ্রণে দেশীয় ও জাতীয় ভাবাদর্শকে অনুসরণ করার পক্ষপাতী।৯


পড়ুন:

ভাষার কোন ধর্ম পরিচয় নাই


গণবিচ্ছিন্ন ‘সংস্কৃতানুযায়ী ভাষা’র উপর বাঙালির মুখের ভাষার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানে উল্লেখ করা দরকার। যে-মৌখিক ভাষা রীতি অবলম্বনে আলালী বা হুতুমী রীতি গড়ে উঠে তা ছিলো মূলত নদীয়া-কলিকাতা ও আশপাশের অঞ্চলের কথ্য ভাষা। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের ভাষা থেকে তা অনেকটাই অন্যরকম। তার কিছুটা আভাস মিলে উইলিয়াম কেরির কথোপকথন-এ।১০

এ উপভাষার ক্রিয়াপদের পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও পার্থক্য সূচিত হয় বহু আগেই, অন্তত আধুনিক যুগের আগেই। মোট কথা বাংলাদেশের ভাষার সাথে নদীয়া-কলিকাতার ভাষার পার্থক্য বেশ উল্লেখযোগ্য, পরে আমরা এ বিষয়ে আরেকটু বিস্তারিত আলোচনায় যাব। আলালীরীতি ও হুতুমী রীতি গড়ে উঠেছিলো এই ভাষার আশ্রয়ে। বঙ্কিমের সংস্কৃতানুযায়ী ভাষার চেয়ে এ ভাষা সংশ্লিষ্ট কথকদের কাছে ছিলো অনেক সহজবোধ্য, সহজে আয়ত্তযোগ্য, মনের ভাব প্রকাশে বেশি পারঙ্গম। তবু তা বাংলাদেশের ভাষা নয়। তাই এর সাথে বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের সংযোগ ঘটেনি। বিশ শতকের শুরুতে প্রমথ চৌধুরী এ ভাষার আশ্রয়েই গড়ে তুললেন বীরবলী রীতি যা পরে চলিত রীতি নামে প্রসিদ্ধি ও গ্রহণযোগ্যতা পায়। প্রমথ চৌধুরী বীরবল ছদ্মনামে লিখতেন। তাই তার ছদ্ম নামেই এ রীতি পরিচিত হয়। এবার কবি রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গী হলেন। এর আগেই তিনি বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমের দুরূহ ভাষারীতি এড়িয়ে লিখিত ভাষাকে সহজবোধ্য ও সুললিত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। ফলে মুখের ভাষার আদলে লেখার দাবীকে আর দূরে ঠেলে দেয়া সম্ভব হলো না। বিশ শতকের প্রথম দুই দশকেই চলিত রীতি বাংলা সাহিত্যে অনেকটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।

এটি ছিলো কলিকাতার মানুষের যথার্থ কান্ডজ্ঞানের পরিচয়। উপনিবেশী মালিকের নির্দেশে যে-গণবিচ্ছিন্ন লেখ্য ভাষা তৈরি হয়েছিলো তার সাথে তাদের প্রাণের সংযোগ ঘটেনি। সাধারণ মানুষ সে ভাষার সাহিত্য বুঝতই না। শিক্ষিত পন্ডিতরা ধর্মীয় আবেগের বশীভুত হয়ে হয়তো সংস্কৃত প্রধান ভাষা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু সে ভাষায় ভাব বিনিময়ের কাজ তো সার্বজনীন হলো না। এ জন্যই কা-জ্ঞান সম্পন্ন কোন কোন মানুষ যেমন প্যারীচাঁদ ও কালীপ্রসন্ন সিংহ মুখের ভাষার আদলে একটা লিখিত রূপ পত্তনের চেষ্টা করেছিলেন। তাদের সময়ে তা ব্যর্থ হলেও  কুড়ি শতকের শুরুতে রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ পেয়ে প্রমথ চৌধুরী তা করতে পারলেন। মুখের ভাষার কাছাকাছি লেখ্য রূপ প্রবর্তন করতে সক্ষম হলেন তিনি। এবং এভাবে নদীয়া-কলিকাতা এলাকার বাঙালি সমাজের পক্ষে এক বড় দায়িত্ব পালন যান তিনি।

কিন্তু বিপত্তি রয়ে যায় আরেক জায়গায়। সাধু চলিত রীতির পরিবর্তনটা হয় মূলত ক্রিয়াপদের রূপে। অন্যান্য শব্দ আগের মত সংস্কৃত বা সংস্কৃত-ঘেঁষাই রয়ে যায়। অনেক শব্দ মধ্যযুগেই সহজ রূপ নিয়েছিলো। যেমন চান্দ, সুরুজ, ধরম, মূরতি, চক্কর ইত্যাদি বহু শব্দ। ফোর্ট উইলিয়ামের পন্ডিতরা আগেই সেগুলোকে সরিয়ে মূল সংস্কৃত শব্দ চন্দ্র, সূর্য, ধর্ম, মূর্তি, চক্র এভাবে বসিয়ে দিয়েছিলেন। আবার তারা যেহেতু মনে করতেন আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা ভাষার জাতিনাশ করেছে তাই আরবি-ফারসি শব্দ সরিয়ে তার বদলে নিয়ে এলেন সমার্থক সংস্কৃত শব্দ । চলিত রীতিতে কিন্তু সংস্কৃত শব্দগুলোই থেকে গেলো। কেবল তাই না পরবর্তী সময়ের লেখকরা বিশেষত প্রবন্ধ লেখোয়ারা (নিজ নিজ ধারণা অনুযায়ী) গাম্ভীর্য আনার জন্য আরো বেশি সংস্কৃত ও তৎসম শব্দ ব্যবহার করতে থাকলেন। এ প্রবণতা এখনো দূর হয়নি। বাংলাদেশে এখনো তথাকথিত ‘পন্ডিতমনষ্ক’ লেখোয়া আছেন যারা মনে করেন প্রবন্ধের ভাষায় বেশি বেশি সংস্কৃত-তৎসম শব্দ ব্যবহারে গাম্ভীর্য ও পন্ডিতি বাড়ে। ফলত যে চলিত ভাষা প্রচলিত হয় তাতে থেকে যায় বঙ্কিমীয় ভাষার সংস্কৃত শব্দবহুলতা, কলিকাতা নগরকেন্দ্রিক জীবনের উপাদান এবং কলিকাতা-নদীয়ার আশপাশের সমাজ জীবনের বিশিষ্টতার ছাপ। বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতার বাহন যে মৌখিক ভাষা তা লিখিত ভাষার বাইরেই রয়ে যায়। তবে সে ভাষাকে সকলের ভাষা হিসাবেই মেনে নেন পশ্চিসবঙ্গের সাধারণ শিক্ষিত মানুষ।

চলিত রীতি প্রবর্তিত হলে বাংলাদেশের লেখকরা নতুন রীতি রপ্ত করে ফেললেন দ্রুতই। এর কারণও আছে। ‘সংস্কৃতানুযায়ী বাঙ্গালা’ আয়ত্ত করতে তাদের সময় লেগেছিলো কয়েক দশক। ফলে লেখালেখিতে পিছিয়ে পড়েছিলেন তারা। এবার বাড়তি কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। সাধু ভাষা ভালো ভাবে বুঝতে ও লেখতে পারার সূত্রে সংস্কৃত শব্দভা-ার, ব্যাকরণ, আর এসব শব্দের উৎসগত সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দ্যোতনা বিষয়ে আগেই ওয়াকিবহাল হয়ে উঠেছিলেন তারা। অনেকে নদীয়ার উপভাষার আদলে গড়ে উঠা কলিকাতার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মার্জিত কথ্যভাষার সাথে পরিচিতিও ছিলেন। তাই নতুন চলিত রীতি সঙ্গে সঙ্গেই আয়ত্ত করে নিতে পারেন বাংলাদেশের লেখকরাও।তবে যে-কান্ডজ্ঞানের পরিচয় দিলেন কলিকাতার লোকেরা সেই কান্ডজ্ঞান কিন্তু বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে জাগলো না। তারা একবারও ভাবলেন না বাংলাদেশের মৌখিক রীতির আদলে লেখার রীতি চালু করলে তা সাধারণ মানুষের প্রাণের কাছাকাছি পৌঁছতে সহায়ক হবে।  তো, বাংলাদেশের মানুষের মুখের ভাষা লেখায় উপেক্ষিতই থেকে গেল।

দুই. হরপসাদ শাস্ত্রীর বিষয়ীলোকের ভাষা বা জনসাধারণের কথ্যভাষা 

আঠারো শতকের শেষাশেষি বাংলাদেশে প্রচলিত ভাষা বিষয়ে যে বিশ্লেষণ হাজির করেছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তা আমাদের ভাষার এক জরুরী ঐতিহাসিক অধ্যায়ের উন্মোচক। তিনি সে কালে চলা তিন প্রকার ভাষার কথা বলেছেন: (১) ধর্ম ব্যবসায়ী ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের সংস্কৃতানুযায়ী বাংলা যা কেবল ধর্মের কাজে ব্যবহৃত হত, (২) আদালত ও প্রশাসনের সাথে সম্পর্কিত উর্দ্দু-ফারসি ঘেঁষা বাংলা আর (৩) বিষয়ী লোকের বাংলা ভাষা অর্থাৎ জনসাধারণের ভাষা যেখানে সংস্কৃত, আরবী, ফারসি, এমনকি কতকটা ইংরেজী পরিমাণমত মিশে ভাষাকে করে তুলে শক্তিশালী, সহজে বোধযাগ্য  এবং শুনতে মধুর। আদালতের ভাষা আর ধর্মব্যবসায়ের ভাষা, এই দুই ভাষা শুধু লিখিত রূপে ছিলো। এগুলো মুখের ভাষা না। বিষয়ী লোকের অর্থাৎ জনসাধারণের ভাষার মুখের ও লেখার দুই রূপই ছিলো। আসলে এই ভাষাই ছিলো বাঙালির প্রধান ভাষা, ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সাধারনের ভাষা। সাধারণ মানুষ কথা বলতো এ ভাষায়, লেখতো এ ভাষায়, চিঠি চালাচালি করতো এ ভাষাতেই। ষোল, সতর, আঠারো শতকে লেখা চিঠিপত্রে তার নমুনা রয়ে গেছে। এ ছাড়া বাংলার যে-জনসাহিত্যকে পুঁথি সাহিত্য, পাঁচালি ইত্যাদি বলে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে সেসব সৃষ্টিকর্মও এই ভাষায় রচনা।

প্রমথনাথ বিশী বিষয়ী লোকের ভাষা অর্থাৎ জনগণের মুখের ও লেখার ভাষার একটা উদাহরণ দিয়েছেন ড: সুরেন্দ্রনাথ সেনের প্রাচীন বাঙ্গালা পত্র সঙ্কলন থেকে। পত্রটি কলিকাতাবাসীরা লিখেছেন গভর্ণর জেনারেল বরাবর, সমৃদ্ধ অধিবাসীদের নিকট হতে মাথট আদায় করে সেই অর্থে সরকারী উদ্যোগে বাড়ি বানিয়ে সেখানে কলিকাতা শহরের ঘরবাড়িহীন অসহায় মানুষদের জায়গা দেয়ার আবেদন জানিয়ে; তার অংশ বিশেষ এখানে উদ্ধৃত করছি: “. . . আমাদ্দিগের দেসের দস্তরমত যদি সাহেবরা মাথট্টের এক নিয়ম করিয়া দেন তবে অতিত্বরায় এ জায়গা বানাইবার টাকা মজুত হইতে পারে (।) তাহার নিয়ম এই কোমবেষ লাক টাকা খরচ হইলে বাটী ইহার লওজিমা স্থান তৈয়ার হইবেক (।) ইহার আনেয়োন কোম্পানির ইঙ্গরেজ ও বাঙ্গালি চাকরহায়ের উপর উহাদ্দিগের পায়া কিম্বা খেদমত মাফিক এবং সহরের কোম্পানীর চাকর সেওায় পাকা হাবেলিওয়ালা বাসিন্দার উপর এক নিরিখ মকরর করিয়া দেন (।) সরকারের খাচাঞ্চি ও পুলিষ আফিসের দ্বারা এ টাকা আদায় হয় এমত হইলে অতি শীঘ্র টাকা আদায় হইয়া বাটী তৈয়ার হইতে পারে (।)  । সহরের গলি ও রাস্তা হইতে এ সকল অক্ষেম গরিব অন্যত্র স্থাপিত হইলে সহরের লোকের অনেক প্রকার আরাম হইবেক।”১১

কেরির কথোপকথন-এর ভাষা, আলারী রীতি, হুতোমী রীতি এবং প্রমথ চৌধুরীর দ্বারা প্রবর্তিত চলিত রীতি’র সাথে এ গদ্যের পার্থক্য পরিষ্কার। এই ভাষা বংলাদেশের মানুষের মুখের ভাষার সবচেয়ে কাছাকাছি রূপ। সবচেযে কাছাকাছি বললাম এজন্য যে মুখের ভাষা লিখিত হলে তার মধ্যে সামান্য কিছু রদবদল মেনে নিতে হয়। অনেক উচ্চারিত শব্দ বানানে লেখার জন্য পর্যাপ্ত আক্ষরিক প্রতীকও থাকে না। তাই মুখের ভাষাকে হুবুহু লেখায় আনা কঠিন। তবে সাধারণ আলোচনায় সবচেয়ে কাছাকাছির রূপটাকেই আমরা মৌখিক রীতি বলে মানি।

উদ্ধৃত অংশটিতে মোট ৯৯টি শব্দ আছে। এর মধ্যে নিম্ন-রেখ সতরটি শব্দসহ আরো আটটি শব্দ নিয়ে মোট পঁচিশটি শব্দ তথাকথিত প্রমিত বাংলায় পরিবর্তিত হয়েছে। অন্য শব্দগুলোর অনেকগুলোই নাম শব্দ বা অব্যয় বা সর্বনাম। সেজন্য পরিবর্তনের আওতায় আসে নাই। কথোপকথনে এই পঁচিশটি শব্দের বেশিরভাগ আগে থেকেই পরিবর্তিতরূপে ছিলো। আলালী বা হুতোমী রীতিতেও তাই। প্রমথ চৌধুরী যে-চলিত রীতি প্রবর্তন করেন তাতেও এ পঁচিশটি শব্দের রপ ভিন্ন।

যা বলতে চাইছি তা হলো ‘সংস্কৃতানুযায়ী বাঙ্গালা’ ভাষার বিরুদ্ধে মুখের ভাষার কাছাকাছি লিখিত রূপ প্রবর্তনের যে-চেষ্টা চলে আসছিলো কথোপকথন থেকে প্রমথ চৌধুরী পর্যন্ত সেগুলোর মধ্যে পূর্ণ সামঞ্জস্য আছে। কথোপকথন-এর ভাষা, আলালী ভাষা, হুতোমী রীতি এবং প্রমথ চৌধুরীর চলিত রীতি সবই নদীয়া-কলিকাতা ও তার আশপাশের অঞ্চলের কথ্যরীতি। এ রীতিই পরিপুষ্টি পেয়ে বিশ শতকের শুরুতে চলিত রীতি হিসাবে প্রচলিত হয়। এবং কথোপকথন প্রমাণ করে যে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় যে-ভাষাকে ‘বিষয়ীয়লোকের ভাষা’ বা সাধারণের ভাষা বলেছেন তার সাথে নদীয়া-কলিকাতা ও আশপাশের অঞ্চলের ভাষার পার্থক্য সূচিত হয়ে গিয়েছিলো সেই সময়ে বা হয়ত তার আগেই।

প্রথমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের চাকুরে সংস্কৃত ব্যবসায়ী পন্ডিতদের দ্বারা সংস্কৃত-নির্ভর ভাষাকে সাধু লেখ্য বাংলা হিসাবে প্রচলন, পরে প্রমথ চৌধুরী কর্তৃক নদীয়ার উপভাষাকে চলিত লেখন রীতি হিসাবে গ্রহণ এসমস্ত পরিবর্তনেই বাংলার সাধারণ মানুষের ভাষা অর্থাৎ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-নির্দেশিত সাধারণ মানুষের ভাষাকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। জনসাধারণের ভাষাকে বাদ দিয়েই বাংলাদেশের ভাষা বিষয়ক পরিবর্তন-পরিবর্ধন-‘বিকাশ’ সাধন চলতে থাকে।

আমরা এবার সময় ও জায়গার বিচারে একটু বড় পরিসর থেকে জনমানুষের ভাষার কিছু নমুনা তুলে ধরবে। সতর শতকের শেষ অথবা আঠার শতকের শূরুর নেয়াখালীর কবি আবদুল হাকিম, উনিশ শতকের একেবারে শুরুর দিকের চট্টগ্রামের কবি মুহম্মদ চুহর এবং সংস্কৃতানুযায়ী বাংলা প্রতিষ্ঠার পর উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের হাওড়ার কবি মুহাম্মদ দানিশের রচনা থেকে খানিকটা তুলে দিচ্ছি:

কবি আবদুল হাকিম শিহাবুদ্দীন-নামা কাব্যে শাস্ত্র অধ্যয়নের বিষয়ে উপদেশ দিতে গিয়ে লিখেছেন:

আরবী পড়িয়া বুঝ শাস্ত্রের বাখান।
যথেক এলেম মধ্যে আরবী প্রধান॥
আরবী পড়িতে যদি ন পার কদাচিত।
ফারছি পড়িয়া বুঝ পরিণাম হিত॥
ফারছি পড়িতে যদি না পার কিঞ্চিত।
নিজ দেশী ভাষে শাস্ত্র পড়িতে উচিত॥১২

মুহম্মদ চুহর চট্টগ্রামের কবি, উনিশ শতকের একাবারে সূচনাতে কাব্য লিখেছেন। তিনি তার কাব্য আজরশাহ ছমনরোখ-এ পৃষ্ঠপোষক জাফর আলী সম্পর্কে লিখেন:

চাটিগ্রাম ঢাকা আদি ভ্রমি নানা স্থান।
কলিকাত্তা টাকসালে লেখাইল নাম।
ভাগ্যবলে কোম্পানির উকিল হইয়া।
পুনরুপি চাটিগ্রামে  আইল পালটায়া॥১৩

সবশেষে হাওড়ার কবি মুহাম্মদ দানিশের ‘চাহার দরবেশ’ কাব্য থেকে:

চলিত বাঙ্গালায় কেচ্ছা করিনু তৈয়ার।
সকলে বুঝিবে ভাই কারণে ইহার॥
আসল বাঙ্গালা সবে বুঝিতে না পারে।
এ খাতেরে না লিখিলাম শোন বেরাদরে॥১৪

দেড়শ  বছরের ব্যবধান এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তিন জন কবির উদ্ধৃতির সাথে তুলনা করলে বুঝা যায় এর সাথে প্রমথনাথ বিশীর পূর্বোক্ত চিঠির বিষয়ীলোকের ভাষা বা সাধারণের ভাষার সাথে মিল অনেক। এসব উদ্ধৃতির সব কটিই মুখের ভাষার কাছাকাছি রূপে লিখিত, অর্থাৎ সাধারণের ভাষার অনুরূপ। শেষ উদ্ধৃতিতে দানিশ দাবীই করেছেন যে, তিনি চলতি বাংলায় কাব্যটি লিখেছেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ সংস্কৃত ব্যবসায়ীদের ভাষাকে লেখার ভাষা রূপে চালু করলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষা স্বাভাবিকভাবেই বয়ে চলে। কুড়ি শতকের শুরুর দুই দশকে প্রমথ চৌধুরী নদীয়ার উপভাষার রীতিকে লেখায় নিয়ে আসেন। একসময় তা লেখ্য ভাষা হিসাবে গৃহীত হয়ে যায়। অর্থাৎ লেখার রীতি আবার পরিবির্তত হয় চলিত রীতিতে। কলিকাতার সর্বমুখি প্রধান্যের কারণে এক সময় লিখিত চলিত রীতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মুখের ভাষাতেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। এখন তাদের মুখের ভাষা আর লেখার ভাষার পার্থক্য খুব বেশি না। অন্যদিকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কথায় ‘বিষয়ী লোকের ভাষা’ অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ভাষার কালিক-রদবদল সম্বলিত ধারাটি বাংলাদেশে বহমান থেকে যায়।  সময়ের প্রয়োজনে এ ভাষা পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত হয়েছে, দরকারে বিদেশী শব্দ, বাকভঙ্গি আপন করে গ্রহণ করে নিয়েছে। এ ভাষাই কালের ও পরিবেশ-পরিপার্শ্বের প্রয়োজনে বিকশিত হয়ে বাংলাদেশের মানুষের মান কথ্যবাংলায় পরিণত হয়েছে।

এবার কথোপকথন থেকে একটু উদ্ধৃত করি:
আসগো ঠাকুরঝি নাতে যাই।
ওগো দিদি কালি তোরা কি রেন্ধেছিলি।
আমর মাচ আর কলাইর ডাইল আর বাগুন ছেঁচকি করেছিলাম।
তোরদের কি হইয়াছিলা।”১৫

এই উদ্ধৃতির সাথে তুলনা করলে পড়লে ধরা পড়ে এ ভাষা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বিষয়ী লোকের ভাষা হতে ভিন্ন, কিন্তু আলালী রীতি, হুতোমী রীতি ও চলিত রীতির অনেক কাছের এক ধরণ।

এবার প্রমথনাথ বিশীর বরাতে উদ্ধৃত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সাধারণের ভাষার নমুনা প্রসঙ্গে আসি। উদ্ধৃতির ৯৯টি শব্দের মধ্যে ২৫-৩০টি শব্দ এখন পর্যন্ত রূপান্তরিত হয়েছে। এর মধ্যে নিচে উল্লিখিত ১৭টি শব্দ ও সমজাতীয় শব্দের রূপান্তরের দিকে আমরা নজর দেব।

* ‘করিয়া’, ‘রাখিয়া’, ‘ধরিয়া’ ‘মারিয়া’ প্রভৃতি ক্রিয়াপদের পরিবর্তন অপিনিহিতির নিয়মে নদীয়া-কলিকাতার ভাষায় এক রকম আর বাংলাদেশের মুখের ভাষায় অর্থাৎ মান কথ্যবাংলায় আরেকরকম ভাবে হয়েছে। ব্যঞ্জনের পরে অবস্থিত ’ই’কার  অপিনিহিতির স্বাভাবিক নিয়মে মান কথ্যবাংলায় লাগোয়া ব্য্ঞ্জনের আগে বসে এই রূপ ধরেছে: ‘কইরা’, রাইখ্যা/রাইখা, ধইরা, মাইরা। কিন্তু নদীয়া-কলিকাতার ভাষায় এই পরিবর্তন হয়েছে একটু উদ্ভট এবং অনেক বেশি: কোরে, রেখে, ধরে, মেরে এ রকম। নদীয়া-কলিকাতার ভাষায় এ জাতীয় প্রতিটি ক্রিয়াপদ একইভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

* রাতি শব্দের পরিবর্তনে (মান কথ্যবাংলায় রাইত, রাইতের বেলা, কলিকাতায়- রেতের বেলা) পার্থক্য চোখে পড়ার মত। আবার স্বরসঙ্গতির কারণে পিঠালি, নগরিয়া, শহরিয়া, এ জাতীয় শব্দ বাংলাদেশে হয়েছে পিঠালি, নগইরা, শহইরা; কলিকাতার ভাষায় হয়েছে পিঠুলি, নগুরে, শহুরে ইত্যাদি। এসব নাম শব্দের বিশেষণ নির্মাণের সময়  দেখা যায় নদীয়া-কলিকাতার ভাষায় ‘ে া’ কার বা ‘ ু ’ কার লাগানোর প্রবণতা খুব বেশি। কিন্তু স্বাভাবিক ভাষিক পরিবর্তনের স্বরসঙ্গতির নিয়মানুযায়ী মান কথ্যবাংলায় ব্যবহৃত শব্দরূপের পরিবর্তনই সঠিক বলে মনে হয়।

* মান কথ্যবাংলায় দুই ব্যঞ্জনের মাঝখানের ‘র’ স্বাভাবিক উচ্চারণে বহাল আছে। এখানে খুব বেশি চাপ দিতে হয় না বলে তা পরিবর্তিত হয়নি, হওয়ার কথাও ছিলে না। কারণ মূলত উচ্চারণ সহজ করতে গিয়ে ভাষার পরিবর্তন সূচিত হয়।

* কিন্ত কোন অজ্ঞাত কারণে নদীয়া-কলিকাতার ভাষায় দুই ব্যঞ্জনের মাঝখানের ‘র’ পরবর্তী ব্যঞ্জনে রূপান্তরিত হয়ে দ্বিত উচ্চারণ হয়। যেমন করলাম-কল্লাম-কল্লেম;করছি- কচ্ছি; করিতে-করতে-কত্তে, ইত্যাদি। কলিকাতার এ রীতি বাংলাদেশের মানুষের কাছে অনেকটাই উদ্ভট ঠেকে।


পড়ুন:

পাঁচটি কবিতা | শাহেদ কায়েস


নদীয়া-কলিকাতার উপভাষা আর বাংলাদেশের মান কথ্যভাষার সকল বৈশিষ্ট নিয়ে এখানে আলোচনা করার সুযোগ নাই, তার প্রয়োজনও বোধ করি না। আমি মান কথ্যবাংলার কয়েকটি বৈশিষ্ট নিয়ে আলোচনা করলাম যাতে বুঝা যায় যে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর দ্বারা নির্দেশিত আঠার-উনিশ শতকের বিষয়ী লোকের ভাষাই স্বাভাবিক ভাষিক নিয়মে বিকশিত হয়ে আজকের মান কথ্যবাংলায় এসে দাড়িয়েছে। আর একই সময়ে আমাদের অজানা কোন কারণে নদীয়া-কলিকাতা অঞ্চলে এই ভাষা বেশ খানিকটা পরিবর্তিত হয়ে এমনকি বিকৃতে উচ্চারণে বদলে গিয়ে পরিণত হয়েছে একটি উপভাষায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হলো নদীয়া-কলিকাতার ভাষা প্রভাবশালী হয়ে উঠায় তার চাপে পশ্চিমবঙ্গে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর চিহ্নিত মধ্যযুগের শেষকালের জনসাধারণের ভাষা পিছু হটে গেছে। কলিকাতা-নদীয়ার ভাষা ঐতিহ্যিক বাংলা ভাষা থেকে বের হয়ে এক নতুন উপভাষিক রূপ নেয়। কিন্তু জনসাধারণের মুখের ভাষা বাংলাদেশে মৌখিক ভাষা হিসাবে অনেকটাই স্বাভাবিক ভাবে বিকশিত হয়ে এখনো টিকে আছে। বাংলাদেশের আঞ্চলিক উপভাষাগুলো পরীক্ষা করলেও তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশে নগরমুখি স্থানান্তর এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে মেলামেশা বাড়ার পর এই মৌখিক ভাষা একটি বিশিষ্ট রূপ লাভ করে। এটি ঘটে মূলত বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কথাবার্তা, আলাপ আলোচনা বৃদ্ধি পাওয়ায়। বিশেষত বড় বড় শহরগুলোয় বাংলাদেশের প্রায় সমস্ত অঞ্চলের মানুষ বাস করে। এখানে পরস্পরের বোধগম্য ভাষায় ভাববিনিময়ের প্রয়োজনে ‘বিষয়ীলোকের ভাষা’ বা জনসাধারণের ভাষা কালের পরিবর্তনকে ধারণ করে এই রূপ নিয়েছে। এই রীতির একটা গ্রহণযোগ্যতাও তৈরি হয়েছে সারা দেশের মানুষের কাছে। এটিই বাংলাদেশের মানুষের ‘মান কথ্যবাংলা’।

তিন . মান কথ্যবাংলা

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যে-কালের ভাষার নমুনা নিয়ে কথা বলেছেন সে কালে ভাষার পরিবর্তন ছিলো ধীর, দরকারের ভিত্তিতেই। তখন চারপাশের পরিবেশ  ও ব্যবহারিক জিনিষপত্র খুব তাড়াতাড়ি বদলাতো না বলে নতুন শব্দের উদ্ভাবন বা আমদানী হতো ধীরে ধীরে। আবার এক অঞ্চলের মানুষের সাথে আরেক অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যাপকভাবে না থাকায় কদাচিত অঞ্চলভেদের ভিন্ন অভিজ্ঞতাকে ভাষায় চিহ্নিত ও ধারণ করার প্রয়োজন পড়ত। আস্তে আস্তে নগরে মানুষের বসবাস বাড়তে থাকে, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মেলামেশা ও ভাববিনিময় বাড়ে। এ কারণে ভাষার প্রকাশ ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনে নতুন শব্দ বিশেষত যৌগিক শব্দ ও সাধিত শব্দ বৃদ্ধি পায়, আবার আঞ্চলিক রূপভেদগুলোও প্রভাব ফেলতে থাকে নগরের ভাষায়। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের শহরকেন্দ্রিক ভাষাও পরিবর্তিত হয়। এর মধ্যে ক্ষুদ্র একদল শিক্ষিত মানুষ আবার নদীয়া-কলিকাতা কেন্দ্রিক চলিত রীতির অনুকরণে প্রচলিত কলিকাতার কথ্য রীতিতে কথা বলা রপ্ত করে সে রীতিও বাঁচিয়ে রাখে; এদের মধ্যে লেখালেখিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত মানুষের সংখ্যাই বেশি।

১৯৪৭ সালের পর বাংলাদেশের মানুষের রোখ ঘুরে যায় ঢাকার দিকে। নগরমুখি স্থানান্তর ও যাওয়া আসা খুবই বেড়ে যায়। ফলে সাধারণ শহুরে মানুষের মুখের ভাষারীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠা মানুষের সংখ্যা কেবল বাড়তেই থাকে। নগরের আওতাও প্রসারিত হয়, দুইভাবে: এক. পুরানা শহরগুলা বিস্তৃত হয় আবার নতুন অনেক শহর গড়ে উঠে, দুই. শহরের সুবিধাদি ও ভাষিক-সাংস্কৃতিক স্বভাব গ্রামীন জনগোষ্ঠীর মোটামুটি শিক্ষিত অংশে দ্রুত প্রভাব ফেলে। আবার শহুরে কথ্যরীতিকে প্রভাবিত করতে থাকে আঞ্চলিক ভাষাগুলিও। এভাবে, আমরা আগে যেটাকে বলেছি মান কথ্যবাংলা সেটিই বাংলাদেশে মানুষের সাধারণ প্রধান ভাষা হিসাবে বিস্তৃত পরিসর নিয়ে বিকশিত হতে থাকে। এ পর্যায়ে আমরা পাই চারধরণের ভাষাভেদ: এক. শহর ও প্রশাসনিক কেন্দ্রভিত্তিক সকল সাধারণ মানুষ এবং ধর্ম-বর্ণ-স্থান নির্বিশেষে সকল শিক্ষিত সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা যা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বিষয়ীলোকের ভাষা থেকে বিকশিত হয়েছে এবং আমরা যকে বলছি মান কথ্যবাংলা, দুই. কলিকাতা-নদীয়ার চলিত রীতির অনুকরণে লিখিত রূপ যেখানে স্বাভাবিক কারণেই সংস্কৃত ও তৎসম শব্দের ব্যবহার বেশি, তিন. বিভিন্ন আঞ্চলিক উপভাষাগুচ্ছ, আর, চার. কলিকাতার কথ্য বাংলার সামান্য পরিবর্তিত রূপ যা মুস্টিমেয় লেখক-সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক কর্মীর মুখের ভাষা ।

এখানে একট বিষয় পাঠকের নজরে আনতে চাই। অনেকে আঞ্চলিক বাংলায় লেখাকে মান কথ্যবাংলার লেখা বলে চিহ্নিত করেন। আঞ্চলিক বাংলা বাংলা ভাষার উপভাষিক বৈচিত্র, মান কথ্যবাংলা ব্যাপক সংখ্যক সাধারণের মৌখিক ভাষা। পরে আমরা কয়েকটা উদাহরণে তার রূপটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তার সাথে চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষার পার্থক্য পষ্ট।

ভাষা প্রায়-সবসময়ই বৃহত্তর কথক গোষ্ঠীর যৌথ সম্মতির মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। কেউ একটা নতুন শব্দ ব্যবহার করতে চাইলে অন্যরা যদি তা নিজেদের কথাবার্তায় কাজে না লাগায় তাহলে সে শব্দটি এ ভাষায় আর জায়গা পায় না। সংবাদপত্রের রিপোর্টিং-এ এমন নতুন বিদেশী শব্দ ব্যবহারের চেষ্টা দেখা যায়। আবার কিছুদিন পর সেই শব্দ হারিয়েও যায়, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুখে জায়গা না পাওয়ায়। ১৯৪৭ সাালের পর ঢাকা ও অন্যান বড় শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলের লোকের মিশ্রণ খুব  বেড়ে যায়। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময়ে শহুরে কথ্যরীতিই ব্যবহার করে। শহরগুলোয় প্রচুর নতুন লোকের আগমন হতে থাকে। নবাগতরা মান শহুরে রীতি ব্যবহার করলেও নিজ নিজ আঞ্চলিক উপভাষার প্রিয় কোন শব্দ, বাগধারা, পরিভাষাও মাঝেমধ্যে বলে থাকেন। এ ধরণের শব্দ আকর্ষণীয় মনে হলে বৃহত্তর কথক গোষ্ঠীও তা ব্যবহার করেন। ফলে ঐ নির্দিষ্ট আঞ্চলিক শব্দ বা বাগধারাটি মান শহুরে রীতিতে জায়গা পেয়ে যায়। যেমন বরিশালের অতি সাম্প্রতিক ‘বেইল নাই’ এমনই একটি পরিভাষা যার প্রকাশক্ষমতা অনেক। এটি সহজেই মান কথ্যবাংলায় স্থান করে নিয়েছে। আঞ্চলিক উপভাষা এবং মান কথ্যবাংলা এ দুয়ের মধ্যে এই যে দেয়া নেয়া তা মান কথ্যবাংলার প্রকাশক্ষমতা সামগ্রিকভাবেভাবে বাড়িয়েছে। এ প্রক্রিয়া সবসময় জারি থাকে। তাই আঞ্চলিক উপভাষাগুলো থেকে মান কথ্যবাংলা প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ, পরিবর্ধিত হয়। এটি এই ভাষার শক্তির বড় একটা জায়গা। গত সত্তর বছরে আমরা এ ভাষার একটা খুবই শক্তিশালী বিকশিত রপ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। বিশেষত স্বাধীনতার পর এর সমৃদ্ধি হয়েছে অত্যন্ত দ্রুত।

স্বাধীনতার পর যেমন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রচুর লোক বড় বড় শহুরগুলোতে বসবাস করতে শুরু করে তেমনি বড় বড় শহুরের রীতিনীতি ও সংস্কৃতির ঢেউ লাগে ছোট মফস্বল শহর ও গ্রামগুলোতেও। এর ফলে মফস্বল শহর ও গ্রামের মানুষের মধ্যেও এই কথ্যরীতি জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। মফস্বল বা গ্রামের অনেকে নিজস্ব ভালবাসা থেকে হয়তো কথা বলেন আঞ্চলিক বাংলায়, কিন্তু মান কথ্যবাংলা বুঝতে বা ব্যবহার করতে তাদের আপত্তি নাই। এখন এই সময়ে একেবারেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন পাড়াগাঁয়ের প্রাচীনপন্থী লোক ছাড়া সকলেই মান কথ্যবাংলায় অভ্যস্ত। গ্রামে বসবাসকারী অনেক স্কুলগামী ছেলেমেয়েও মান কথ্যবাংলায় কথা বলে থাকে।

মান কথ্যবাংলার ব্যবহারিক কিছুটা পরিচয় তুলে ধরা প্রয়োজন। বাংলাদেশে লেখার ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরীর চলিত রীতিই এখনো চলমান। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, চিঠিপত্রের ভাষা–সবখানেই। ইলেকট্রনিক পরিসর বিশেষত ফেইসবুক ও ওয়েব সাইট এ ক্ষেত্রে একটা বিপ্লব নিয়ে এসেছে। নয়া সাম্রারাজ্যবাদী পুঁজির দৌরাত্মে সব মিডিয়া যখন সুবিধাবাদী গ্রুপগুলোর কুক্ষিগত তখন ফেইস বুক ওয়েবসাইট ভিন্ন মতাবলম্বীদের বড় অবলম্বন হয় উঠে। নয়া সাম্রারাজ্যবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোখার জন্য আমি বিকল্প পরিসর তৈয়ার ও ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা করেছি বিভিন্ন প্রবন্ধে।১৬  এগুলো হলো সে ধরণেরই বিকল্প পরিসর। সম্প্রতি ফেইসবুক এবং ওয়েবসাইটে মান কথ্যবাংলা শক্তিশালী লেখনরীতি হিসাবে উঠে এসেছে। এসব লেখায় বাংলাদেশের ব্রাহ্মণ্যবাদী লেখন রীতিকে পুরাই অস্বীকার করা হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে আমি এখানে দুটো উদ্ধৃতি যোগ করতে চাই:

“এইরকমের একটা ধারণা তো এখনো আছে যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে ‘কাল্পনিক’ ঝগড়া লাগানোর চেষ্টা করেন বাংলাদেশের ‘সাম্প্রদায়িক মুসলমানরা’। কিন্তু উনারা দুইজনেই তো ছিলেন ‘অসাম্প্রদায়িক’, অ্যাজ ইফ উনাদের মধ্যে সাহিত্যিক কোন ডিফরেন্সও নাই! তো, এইটা আসলে সত্যি কথা না। একটা সময়ের মানুশ হিসাবে, একই এলাকার এবং একই ইন্টারেস্টের মানুশ হইলে পারসোনাল যোগাযোগ, ভক্তি-শ্রদ্ধা-সম্মান এইসব থাকতে পারে, কিন্তু তার মানে এইটা কখনোই না যে, উনারা একই আইডিওলজির লোক! রবীন্দ্রনাথ এবং কাজী নজরুল ইসলাম নিয়া এই ভুল ধারণা বাজারে এখনো কম-বেশি চালু আছে। তো, এই তর্কের জায়গাটা দিয়া কিছুটা খেয়াল করা যাইতে পারে, উনাদের ডিফরেন্সের জায়গাটা কই ছিল, বা আছে? পয়লা কথা হইতেছে, এইটা খালি সংস্কৃত-শব্দ আর আরবী-ফার্সি শব্দের মামলা না, যেইটা প্রমথ চৌধুরী পরে বুঝাইতে চাইতেছেন, বরং ঘটনা’টা হইতেছে “পাবলিকের ফর-এ” আর “পাবলিকের এগেনেস্টে”। নজরুলরে রবীন্দ্রনাথ কইছেন, “তোমাকে জনসাধারণ একেবারে খানায় নিয়ে ফেলবে” মানে, পাবলিকের লাইগা লেইখো না! পাবলিকরে কেয়ার কইরো না! পাবলিক তো ‘সাহিত্য’ বুঝে না! এইরকম। রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরীদের এই মত এখনো ডমিনেন্ট যে, ‘সাহিত্য’ করতে চাইলে পাবলিকের চিন্তা বাদ দিতে হবে। এখন এর এগেনেস্টে কাজী নজরুল ইসলাম যে ‘পাবলিক যা খায়’ সেই সাহিত্য করছেন বা করার কথা বলছেন তা না; কিন্তু উনি ধরে নিছেন, সমাজে মানুশ আছে, মানুশ কবিতা পড়ে, গান শুনে, কবি হিসাবে সমাজের বাইরের মানুশ না উনি। মানুশ যেমনে কথা কয়, যেই জিনিস ভাবে, সেইগুলা আমার সাহিত্যে আসতে পারে, আসলে ভালো। এইরকম। এইটা হইতেছে বেসিক ডিফরেন্সের জায়গা।”১৭

“যতীন সরকারঃ দেখো, আমি সবচাইতে বেশি পড়ছি ধর্মের বই। এবং পড়ছি বইলাই আমার পক্ষে সম্ভব হইছে মার্ক্সিস্ট হওয়া। এবং এইটা আমি সবাইরেই বলি। ধর্ম না জানলে পৃথিবীর কিছুই জানা হয় না। ধর্ম এমনভাবে মানুষের মধ্যে আছে, মানুষের চিন্তা চেতনাই ধারণ করছে ধর্ম।

পারভেজ আলমঃ কার্ল মার্ক্সও তো বলছেন যে, ধর্মের পর্যালোচনা হইল সকল পর্যালোচনার পূর্বশর্ত।

যতীন সরকারঃ হ্যাঁ। কিন্তু এইডাতো তোমরা করতে রাজি না। আমাদের কমিউনিস্টরাও করতে রাজি না। এবং এইটা তারা বুঝেও না। তারা কাইষ্ঠা মাইরা রইছে, . . .। এপ্রিল, ২০১৫।” (পারভেজ আলমের ফেইসবুক একাউন্টে ২০২১ সালের ২ শে মের পোস্ট থেকে।)”

দুটো উদ্ধৃতিই মান কথ্যবাংলায় লেখা। প্রথমটিতে ইংরেজী শব্দের অপরিমিত ব্যবহার আছে। দ্বিতীয়টাতে তা নেই। দুই উদ্ধৃতির আলোচ্যই তথাকথিত ‘গুরুগম্ভীর’, ‘উন্নত ভাব’-এর শামিল। তাহলে এ ভাষায় ‘গুরুগম্ভীর’ ও ‘উন্নত ভাবা’ প্রকাশ করা যায় না বলে যে-অভিযোগ তোলা হয় তাও সত্য নয়। দু’জায়গাতেই ক্রিয়াপদের রূপসহ অন্যান কতিপয় শব্দের রূপ মান কথ্যবাংলার রীতিতে লেখা। যেমন: প্রথমটায় এইরকমের, উনারা, দুইজনেই, উনাদের, এইটা, ‘সত্যি কথা না’, হইলে, এইসব, উনারা, নিয়া, এই, দিয়া, মামলা, যাইতে, উনাদের, কই ছিল, পয়লা, হইতেছে, এইটা, খালি, যেইটা, বুঝাইতে, চাইতেছেন, ঘটনা’টা হইতেছে, “পাবলিকের ফর-এ”, কইছেন, লাইগা, লেইখো না, পাবলিকরে, কইরো, না, এইরকম, করছেন , বলছেন , তা না, নিছেন,  যেমনে, কয়, ‘যেই জিনিস ভাবে’, সেইগুলা, এইরকম। এইটা, হইতেছে। দ্বিতীয় উদ্ধৃতিতে : পড়ছি, পড়ছি বইলাই, সম্ভব হইছে, এইটা, সবাইরেই, করছে, বলছেন, হইল, এইডাতো, রাজি না। আমাদের কমিউনিস্টরাও রাজি না, এইটা, তারা কাইষ্ঠা মাইরা রইছে, এইখানেই ইত্যাদি।

দেখা যাচ্ছে এখানে ক্রিয়াপদসহ অব্যয়, নামশব্দ, সর্বনাম, নির্দেশক সবই আছে। নদীয়া-কলিকাতা কেন্দ্রিক চলিত রীতি অর্থাৎ আমাদের সাহিত্যের লেখন রীতিতে ব্যহৃত এসব পদের রূপ কিন্তু অনেকটাই ভিন্ন। উনিশ শতকের প্রথমভাগে ভাষার বেশ বড় এলাকা জুড়ে এই পার্থক্যের সূচনা করে মূল ভাষা রীতি থেকে বের হয়ে যায় নদীয়া-কলিকাতার কথ্য ভাষা পরে যা প্রমথ চৌধুরীর চেষ্টায় চলিত ভাষা হিসাবে লেখায় গৃহীত হয়; তাতে আবার থেকে যায় ফোর্ট উইলিয়ামী ভাষার সংস্কৃত শব্দের বাহুল্য। এ ভাষাই আমাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী লেখকদের বর্তমানকালের ’প্রমিত বাংলা’। এ ভাষা বাংলাদেশের মানুষের মুখের ভাষা ও মনের আবেগ থেকে অনেক দূরবর্তী জিনিষ। বাংলাদেশের মানুষের একটা ক্ষুদ্র অংশ সে ভাষা বুঝতে ও বলতে পারে, লিখতে পারে আরো কম সংখ্যক লোক। তার বিপরীতে মান কথ্যবাংলা বিপুল সংখ্যক মানুষের কথ্য ভাষা, মুখের উচ্চারিত ভাষাকেই কিছুটা ঘষেমেজে লেখা হয় বলে সকলেই বুঝতে পারে এবং এ ভাষায় লেখার জন্য আলাদা চর্চা ও অভিধানের প্রয়োজন পড়ে না, কেবল মুখে বা মনে মনে উচ্চারিত শব্দগুলো লিখলেই হলো।

মান কথ্যবাংলার কিছু বিশেষত¦ সূত্রাকারে উল্লেখ করা যাক:

ক.  মান কথ্যবাংলার আলোচনা প্রসঙ্গে প্রথমেই বলে রাখার মত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় এই যে, এই মৌখিক রীতিই বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের ভাষা। শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম বা রংপুর শহরের মত বড় শহরে বসবাসকারী মানুষই যে এই ভাষায় কথা বলে তা নয়। বরং প্রতিটি ছোট বড় শহর অঞ্চল, উপজেলা প্রশাসনিক কেন্দ্রসহ সাংস্কৃতিকভাবে সক্রিয় অন্যান্য ক্ষুদ্র মেলগুলোতেও শিক্ষিত বা সাংস্কৃতিভাবে সচেতন মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। হয়তো বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সাথে অথবা একই এলাকার ইয়ার দোস্তদের সাথে দেখা হলে তারা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে থাকেন।

খ.  অনেক বয়স্ক মানুষ আছেন যারা আঞ্চলিক বাংলায় কথা বলেই অভ্যস্ত, মান কথ্যবাংলা বলতেও জানেন না। কিন্তু বুঝতে তাদের অসুবিধা হয় না, কোন ভাবগত দূরত্বও তৈরি হয় না।

গ.  মৌখিক ভাষা বলে এর প্রকাশ ক্ষমতা অনেক বেশি। এ প্রসঙ্গেই বঙ্কিমচন্দ্র স্বীকার করে লিখেছিলেন, “. . .যে-বাংলা সর্বজনমধ্যে কথিত এবং প্রচলিত তাহাতে গ্রন্থ রচনা সুন্দরও হয় এবং যে সর্বজনহৃদয় গ্রাহিতা সস্কৃতানুযায়ী ভাষার পক্ষে দুর্লভ, এ ভাষার তাহা সহজ গুণ”।১৮  প্রকাশ ক্ষমতা বেশি হওয়ার কারণ হলো লেখক/কথক মুখে মুখে যে শব্দ/শব্দবন্ধে সারাদিন তার ভাব প্রকাশ করছেন লেখার সময় তিনি সেগুলোই ব্যবহার করছেন। তার বোধ, অনুভুতি, বুদ্ধি এইসব শব্দরাজিকে চিনে নিজের হাতের তালুর মতই। কোন ভাবটির জন্য কেন শব্দ/শব্দবন্ধ দরকার সে জন্য তার চিন্তা করতে হয় না, দোনামোনা করতে হয় না, অভিধানের আশ্রয় নিতে হয় না। এইটা এই ভাষার বড় একটা সুবিধা।

ঘ.  নিজেকে এবং চারপাশকে প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা ও আকুতি থেকে ভাষার সূচনা ও বিকাশ। তাই কোন একটা সমাজে যে-ভাষা বিকশিত হয়েছে সেই ভাষাই সেই সমাজের ভাব প্রকাশের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ও ভাল বাহন। এর বাইরের যে কোন ভাষা সেখানে আড়ষ্ট হতে বাধ্য। মান কথ্যবাংলা বিকশিত হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের মুখের ভাষা হিসাবে। এখানে কৃত্রিমতা নাই। প্রকৃতি অর্থাৎ এই মাটি, পানি, বাতাস, আবহাওয়া, পরিবেশ আবার ভূগোল, সমাজ, ভাবচর্চা, ধর্মবোধ, সাংস্কৃতিক বোধের থেকে নিয়েই এই ভাষার সমৃদ্ধি। চারপাশ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের যে জীবন সে জীবনকে প্রকাশ করতে গিয়ে এই ভাষার বিকাশ ও পরিবর্ধন। কাজেই এ জীবনকে প্রকাশ করার জন্য আর কোন ভাষা এর চেয়ে বেশি উপযোগী হতে পারে না।

ঙ.  মান কথ্যবাংলার বাকভঙ্গি অনেক গতিশীল, হালকা চালের, তীরের মত লক্ষ্যমুখি। এর কারণ হলো এ ভাষার যে কোন শব্দ যে অর্থ নির্দেশ করে তার সম্পর্কে ব্যবহাকারী চেতন-অবচেতনে ওয়াকিবহাল। শব্দটি কানে যাওয়া মাত্রই তার সংবেদে অর্থের ব্যঞ্জন বেজে উঠে। (প্রমিত বাংলায় ব্যবহৃত অনেক শব্দই ধার করে আনা বলে তার সাথে জড়ানো অর্থবোধ অনেক পাঠকের সংবেদনায় বাজতে সময় নেয়। বাকভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রেই তীর্যক নয়, নানা বাঁক ঘুরে মর্মার্থের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রবণতা যথেষ্ট।)

চ.          ‘মান কথ্যবাংলা’র ‘মান’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে অনেক ভাষার মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ কর্তৃক মেনে-নেয়া রূপ বুঝাতে। বাংলাদেশে অনেকগুলো কথ্যউপভাষা আছে। এর মধ্যে যে-কথ্যরীতিটি বেশিরভাগ লোক ব্যবহার করে এবং এলাকাভিত্তিক ঐতিহ্য ও সঙ্কীর্ণতার চাপমুক্ত সেটিই মান কথ্যভাষা। মান বলতে এখানে এমন কোন আদর্শ বোঝানো হচ্ছে না যা স্থির থাকবে। বরং মুখের ভাষা হওয়ায় তা বরাবরই স্থিরতার বিরুদ্ধে, সকল পরিবর্তন আয়ত্তে নেয়ার জন্য উন্মুখ।

ছ.         ভাষা লিখিত হওয়ার পর তার প্রতিটি শব্দই একটা স্থায়ী রূপ পায়। এই লিখিত রূপ ভাষার পরিবর্তনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যদি না লিখিত ভাষার কোন মৌখিক ভাষার মানের সাথে তাল মিলিয়ে চলার দায় থাকে। আমাদের বর্তমান লেখনরীতি অর্থাৎ চলিত রীতি বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষার আদল নয়। ফলে কালে কালে মুখের ভাষা বদলে গেলেও সে অনুযায়ী লিখিত ভাষা পরিবর্তিত হওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। কারণ দুই ভাষার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নাই। মান কথ্যবাংলা লেখন রীতি হিসাবে চালু হলে মুখের ভাষার প্রতিটি পরিবর্তনই লেখার ভাষায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে। ফলে দুয়ের সাজুয্য যেমন থাকবে, তেমনি সময়ের প্রয়োজনে লেখন রীতির প্রকাশ ক্ষমতাও বাড়বে।

কিছুদিন থেকে ফেইসবুক ইত্যাদি ইলেকট্রনিক সামাজিক পরিসরে, নাটকে এবং তরুণ কবিদের কবিতায় মান কথ্যবাংলার চমৎকার ব্যবহার এ ভাষার লিখিত রূপের প্রকাশ ক্ষমতা সফলভাবে জাহির করতে পেরেছে। এখানে কয়েকজন কবির কবিতা থেকে অংশ বিশেষ তুলে দেয়া যেতে পারে:

“আত্মাই আম্মার হাঁসগুলিরে চিলের ছোঁ,
শেয়ালের হাত-পা থাকি বাঁচাইত।
আত্মারে আমরা
ভাবতাম তার শরীর আছে।
সে আমাদের বোন।
আম্মাদের হাঁসগুলা
কিছুদিন দেখেশুনে রাখে।
আমি ওরে একদিন ছুঁই
দেখছিলাম।
কইছিলাম, তুই তো
আমারই পোড়া পালকের বোন!  ” ১৯

“এমন গাভীন রাত্তির ভাঙ্গা পাটাতনও নাই, কীভাবে
ঢেউয়ের উপর ঘর সাজাই। মনকড়ালি পাখি ডাইকা যায়
প্রাচীন গুহায়। শুইনাছি, পাহাড়পুরী এক মেয়ে প্রতœজন্ম
থেইকা আছে এখানে, গাভীন রাত্তিরে তেজস্বী এক
ঘোড়ার পিঠে জাইগা উঠে সে, আর তখণ মেরুন-রঙের
একটা পাখি কীরকম শব্দ করে–নাচে। সেই পাখিটা
তোমার মত বাংলা চক্ষু তার, বুকের ভিতর গভীর নদী
ভাঙে দূর-পাহাড়। ”২০

“এইসব ভাবতে ভাবতে আইসা সামনে দাঁড়ায়
এক নিরাকের কাল
বুকের ভিতরে নিরাক
ফরফর শব্দ তুইলা উইড়া চলে এক
নিরাকপঙ্খী . . .
এইখানে মনে কয় একখান দাঁড়ি দেওন যায়।  ” ২১

“কথা আমার দূরে যাইতে যাইতে
ভাটির আওয়াজ তুলবে
আমি গাইলে গান কলকল করবে পানি
নইলে অপেক্ষা করি, আইসা যাক ফসলের মাস
মুরালি ধানের পিঠার গন্ধে জাইনা যাবে
আমাদের বাড়িত একই রীত।  ”২২

“আমি ঝুপড়ির চালে বইসা একলা ঝিমাই। গায়ে রোইদ লাগাই। কান পাইত্যা শহরের দু:খী বাতাসের গুন গুন গান শুনি। বেচারা বাতাস শহরের দালানে ধাক্কা খাইয়া ভাঙ্গা মন নিয়া আবার বনাঞ্চলে ফিরা যায়। আমারো মনটা ফিইরা যাইতে চায়, ইচ্ছা করে ছোট

বেলার মত মায়ের বুকের দুধে কামড় দিয়া ঝুইল্যা থাকি, এক গাছ থেইক্যা আরেক গাছের ডালে লাফায়া বেড়াই। আমার দলের অন্যদের সাথে ঘুরিফিরি ছোটাছুটি করি আর আপনমনে দাঁত বাইর কইরা কিচিরমিচির করি। নাইলে মন্ডলের মত উদাস কণ্ঠে কই, ‘বিচিত্র এই ঢাকা নগর, কে খেলাড়ি কে বাজিকর?”২৩

বিভিন্ন কবিতা এবং একটি গল্প থেকে যে-পাঁচটি উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে সেগুলো মান কথ্যবাংলায় লেখা। কবিতার উদ্ধৃতিগুলোয় আমরা দেখছি কাব্যিক সংবেদনা প্রকাশে এ ভাষা পারঙ্গম, সহজেই মনের গহীনে হানা দেয়ার উপযোগী। শেষ উদ্ধৃতিটি মানুষের অন্তর্গত আবেগের চমৎকার নির্মোহ এক বয়ান। এ ভাষার বিরুদ্ধে অন্তত এমন অভিযোগ তোলা যায় না যে, এটি গভীর ভাবের বাহন হতে অক্ষম।বরং আমরা দেখছি মনের আবেগ তুলে ধরতে এর উপযোগিতা অনেক বেশি, সৃজনশীলতার প্রকাশে এর সক্ষমতা প্রশ্নাতীত। বিভিন্ন ক্রিয়াপদের রূপে উচ্চরাণগত সামান্য ব্যবধান থাকতে পারে। মান কথ্যবাংলায় ব্যাপকভাবে লেখালেখি শুরু হলে সেগুলোরও একটা সর্বজানগ্রাহ্য রূপ স্থির হয়ে যাবে। না হলেও ক্ষতি নেই। প্রমিত বাংলায় তো কোনো কোনো ক্রিয়াপদের তিন চারটা রূপও রয়েছে।

মুখের ভাষাকে অনুসরণের জন্যই লেখার সৃষ্টি। আজ নতুন করে এ বিতর্ক তোলার দরকার পড়ে না যে, মুখের ভাষায় সাহিত্য চর্চা করা সম্ভব কি না, গভীরতর চিন্তা প্রকাশ করা সম্ভব কি না। কুড়ি শতকের গোড়ায় প্রমথ চৌধুরী যখন নদীয়া অঞ্চলের কথ্যরীতিকে সাহিত্যে নিয়ে আসলেন তখনো অনেক বিরোধিতা হয়েছে। বুঝে না বুঝে অনেকে প্রতিবাদ করেছেন, কুযুক্তি তুলে বাধা দিতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের মত বিরাট বটগাছের ছায়া পেয়ে প্রমথ চৌধুরী নদীয়ার কথ্যভাষাকে শেষ পর্যন্ত লেখার রীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। তাতে অবশ্য বাংলাদেশের মানুষের খুব একটা লাভ হয়নি, বরং ক্ষতিই হয়েছে। তারা তখনো নিজের কথ্য ভাষাকে সাহিত্যে আনার প্রস্তাব তুলেনি, অবশ্য রাজনৈতিক সামাজিক আবহ সে কাজের অনুকূল ছিলো বলা যাবে না। আজ প্রায় একশ বছর পর বাংলাদেশের মান কথ্যবাংলাকে লেখার রীতি হিসাবে চালু করার কথা যখন উঠছে তখন মুখের ভাষায় লেখার পক্ষে প্রমথ চৌধুরীর একটা কথা উল্লেখ করা যেতে পারে: “মুখের ভাষা যে জীবন্ত ভাষা, এ বিষয়ে দুমত নেই। একমাত্র সেই ভাষা অবলম্বন করেই আমরা সাহিত্যকে সজীব করে তুলতে পারি।”২৪

সময়ের সাথে ভাষা পরিবর্তিত হয়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার এই পরিবর্তনকেই ভাষার বিকাশ বলে। তবে তার গতি ধীর। একটা সমাজে পরিবর্তন চোখে পড়ার মত না হলে ভাষার পরিবর্তনও চোখে পড়ে না। মান কথ্যবাংলাকে লিখিত ভাষারীতিতে নিয়ে আসার কাজেও সময় লাগবে। তার শুরুটা হয়েও গেছে কবিতায়, নাটকে, গানে, ইলেকট্রনিক সামাজিক পরিসরে। এখন তার দ্রুত প্রসার দরকার। প্রায় দুইশ বছর ধরে আমাদের লেখার ভাষা আলাদা হয়ে থেকেছে গণমানুষের ভাষা থেকে। ফলে আমাদের সাহিত্য গেছে একদিকে, গণমানুষ আরেকদিকে। এখন সময় হয়েছে এ দুরত্ব ঘোচানোর। মান কথ্যবাংলাকে সাহিত্যে নিয়ে আসতে পারলে আমাদের প্রকাশক্ষমতা বাড়বে, প্রকাশিত চিন্তা-ভাব-আবেগের বানোয়াট ভাবটা থাকবে না, পাঠকের সাথে দূরত্ব কমবে। প্রমথ চৌধুরীর ভাষায় ‘সাহিত্য সজীব’ হবে। যে ভাষায় জমা হয়ে আছে আমাদের শত শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাব, সংস্কৃতির তাবত চিহ্ন, সেই ভাষায় ফেরার অর্থ তো নিজের শিকড়ে ফেরার মতই।

———————–

1        Daniels, Peter T , The World’s Writing Systems., Oxford University Press., 1996,  p. 45 |

2        Boudreau, Vincent , The First Writing: Script Invention as History and Process. Cambridge

          University Press, 2004,  p. 71.  

3        Fischer, Steven R.,  . A history of reading,  Reaktion, London, 2003,.

৪   মোহাম্মদ দানিশ, চাহার দরবেশ; অধ্যাপক মাহবুব আলম, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খান ব্রাদার্স এ্যান্ড

    কোম্পানি, ঢাকা, ১৯৯৪; পৃ-২৮৫-তে উদ্ধৃত।

৫.   সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও অনিলকুমার কাঞ্জিলাল (সম্পা), বাঙ্গালা ভাষা, হরপ্রসাদ রচনাবলী, ইস্টার্ন ট্রেডিং  

     কোম্পানি, কলিকাতা, ১৯৫৬, পৃ-১৯৯-২০০।

৬   শ্রীপ্রমথনাথ বিশী শ্রীবিজিতকুমার দত্ত (সম্পা.), বাংলা গদ্যের পদাঙ্ক, মিত্র ও ঘোষ, কলিকাতা,  ১৩৬৭; ভূমিকা, পৃ-১৫।

৭    অধ্যাপক মাহবুব আলম, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা, ১৯৯৪; পৃ-৩২৮-২৯-এ উদ্ধৃত।

৮   আবদুল হামিদ খান ইউসুফজয়ী, উদাসী, টাঙ্গাইল, ১৩০৭; ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, বাংলা একাডেমী, ১৯৮৩; পৃ-২৮৮-৮৯-এ উদ্ধৃত।

৯   ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, বাংলা একাডেমী, ১৯৮৩; পৃ-২৮৯।

১০  দ্র: W, Carey; Dialogue intented to Facilitate Acquiring of The Bengali Langauge, Third Ed., 

         the Mission Press, 1818.  

১১   শ্রীপমথনাথ বিশী শ্রীবিজিতকুমার দত্ত (সম্পা.), বাংলা গদ্যের পদাঙ্ক, মিত্র ও ঘোষ, কলিকাতা,  ১৩৬৭; ভূমিকা, পৃ-১৪।

১২  আবদুল হাকিম, শিহাবুদ্দীন-নামা; আজহারুল ইসলাম, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবি, বাংলা একাডেমী, ১৯৯২; পৃ-১২৬-এ উদ্ধৃত।

১৩  মুহম্মদ চুহর, আজরশাহ ছমনরোখ ; আজহারুল ইসলাম, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবি, বাংলা একাডেমী, ১৯৯২; পৃ-২৬৭-তে উদ্ধৃত।

১৪   মোহাম্মদ দানিশ, চাহার দরবেশ; অধ্যাপক মাহবুব আলম, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা, ১৯৯৪; পৃ-২৮৫-তে উদ্ধৃত।

১৫  দ্র: W, Carey; Dialogue intented to Facilitate Acquiring of The Bengali Langauge, Third Ed.,    

         the Mission Press, 1818.

১৬  ফয়েজ আলম, নাম প্রবন্ধ, ভাষা ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে, নাগরী সংস্করণ, ২০২১; পৃ-৪৪ দ্রষ্টব্য।

১৭  ওয়েবসাইট, বাছবিছার, ‘তর্ক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কাজী নজরুল ইসলাম-প্রমথ চৌধুরী’, এডিটর; মে ২০২১-এ প্রকাশিত।

১৮  বঙ্কিমচন্দ্রের এ বক্তব্য অধ্যাপক মাহবুব আলম, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা, ১৯৯৪; পৃ-৩২৮-২৯-এ উদ্ধৃত।

১৯  জহির হাসান, আম্মার হাঁসগুলি, আম্মার হাঁসগুলি, বেড়াল প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১৭, পৃ-১০।

২০  শামীম রেজা, চুয়াল্লিশ নম্বর কবিতা, যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণ নগরে, লোক নালন্দা প্রকাশন, ঢাকা, ২০০৬; পৃষ্ঠা-৫৫।

২১   আসমা সুলতানা শাপলা, ‘নিরাকপঙ্খী’, অগ্রন্থিত কবিতা (তার ফেইসবুকে ২৫.০৯.২০২১ তারিখে প্রদত্ত পোস্ট থেকে)।

২২  ওয়াহিদ রুকন, ‘আমি তো দ্রাবিড় নই, বাঙালের ছাওয়াল’, অগ্রন্থিত কবিতা (তার ফেইসবুকে ২৯.০৭.২০২১ তারিখে প্রদত্ত পোস্ট থেকে)।

২৩  শাহনাজ মুন্নী, ‘রঙের হাটের বেচাকেনা’, অনশ্বর, সম্পাদক-বহ্নিকুসুম, ঢাকা, ষষ্ঠ সংখ্যা, জুলাই ২০২১, পৃষ্ঠ-১৪১।

২৪  প্রমথ চৌধুরী, বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধুভাষা, প্রবন্ধ সংগ্রহ, (সম্পা. অতুলচন্দ্র গুপ্ত), বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলিকাতা, ১৯৬৮; পৃষ্ঠা-২৬২-৬৩।